
আবদুল আজিজ আল-আমান
মক্কা বিজিত।
সাফা পর্বতের উপত্যাকায় বসে আছেন রাসূলুল্লাহ (সা.)। দলে দলে পুরুষেরা এসে ইসলামে দীক্ষা নিচ্ছেন। মিথ্যা ছেড়ে সত্য গ্রহণ করেছে। এখন দীক্ষা চলছে মেয়েদের। মক্কার মেয়েরা বেরিয়ে এসেছে শয়ে শয়ে। কাপড়ে মুখ ঢেকে হাজির হয়েছে নবীজি (সা)-এর সামনে। কাল যারা ছিল অর্ধউলঙ্গ, আজ তারা আব্রু ফিরে পেয়েছে। ফিরে পেয়েছে সম্ভ্রম। কত পরিবর্তন এক দিনে! মাত্র একটা রাতের ব্যবধানে! ভাবা যায় না।
মহিলাদের ভিড়ের মধ্যে কাপড়ে মুখ ঢেকে এল একজন। ভয়ে দুরু দুরু বুক। ভীষণ শঙ্কিত সে। হযরত চিনতে পারলে কঠিন সাজা হযে যাবে তার। কোনও সন্দেহ নেই এই বিষয়ে। যে কোনও মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে ঘটনাটা। কঠিন অপরাধে অপরাধী সে। এমন অপরাধ যা কোনও স্ত্রী লোক করেনি আজ পর্যন্ত। কোনও পুরুষও নয়। যতদিন পৃথিবী থাকবে, হযতো আর করবেও না কেউ। ভিড়ের মধ্যে আত্মগোপন করে এগোতে এগোতে আজ কত কথাই মনে পড়ছে তার। বদর যুদ্ধ। ওহদ যুদ্ধ, খন্দক যুদ্ধ, আর এ সব যুদ্ধে তার ভূমিকা বিশেষ করে ওহদ যুদ্ধে সে যে পাপ করেছে পৃথিবীতে তার কোনও নজির নেই। সব মনে পড়ছে তার।
মুসলমান সৈনিকরা একে একে লুটিয়ে পড়ছেন। হেরেই যাচ্ছেন তাঁরা।
যুদ্ধ থেমে যেতে নামল মাঠে। তার দলবল নিয়ে মক্কা থেকে যত মেয়ে এসেছিল সবাইকে সঙ্গে নিল সে। তারপর মাঠে গিয়ে শুরু করল পৈশাচিক কার্যকালাপ। আহত যেসব মুসলমান সৈনিক তখনও বেঁচে ছিল, তরবারির আঘাতে হত্যা করল তাদের। তারপর মৃত সৈনিকদের কান কাটল, নাক কাটল, চোখ ওপড়াল। সেগুলো গেঁথে মালা করল। গলায় পড়ল তারপর। নিজে পরল। সঙ্গীদেরও পরাল। তারপর গেল শহীদ হামযা রা.-এর কাছে। এই হামযা (রা.)-কে নিন্দা করার জন্য সে এক হাবশি হামযা রা.-এর দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। পা দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল একটু। তারপর হঠাৎ মৃত হামযা (রা.)-এর বুকের ওপর চড়ে বসল সে। ঠিক যেন হিংস্র পশু। বন্য বাঘিনী। তারপর উন্মাদিনীর মতো চিৎকার করতে করতে বুকটা চিরে দু’ভাগ করে ফেলল। ভিতরে হাত দিয়ে কলজে টেনে বের করে আনল উন্মত্তের মতো। সেই কলজে দু’হাতে ধরে মুখে দিল। তারপর চিবোতে শুরু করল। প্রতিহিংসায় মেতে উঠল মৃত হামযা (রা.)-কে নিয়ে, ঠিক হিংস্র জন্তুর মতো। বন্য শূকরের মতো।
হযরত হামযা (রা.)- ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা। পরে সেই বিকলাঙ্গ দেহ দেখে অদ্যন্ত মর্মাহত হয়েছিলেন নবীজি সা.। খুব ব্যাথা পেয়েছিলেন। চোখ মুছতে মুছতে চলে এসেছিলেন রণক্ষেত্র থেকে।
সেই উন্মাদনা মহিলাই আজ চলেছে রাসূলুল্লাহ সা.-এর সম্মুখে। কাপড়ে মুখ ঢেকে। আত্মগোপন করে। না এসে উপায় নেই। মক্কা বিজীত। আজ তারা পরাজিত। বাঁচার শেষ চেষ্টা করতে এসেছে সে। ইসলামে দীক্ষা নিলে যদি রেহাই পায়। যদি বাঁচি। কিন্তু তার আগে যদি চিনতে পারে হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাহলেই সর্বনাশ। সঙ্গে সঙ্গে হত্যা। কোনও সন্দেহ নেই। অন্তত সে যা পাপ করেছে এ সাজাই তার হওয়া উচিত। উতবার কন্যা সে। সে আবু সুফিযানের স্ত্রী। নাম তার হিন্দা। কাপড়ে মুখ ঢেকে হিন্দা। এগিয়ে চলল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দিকে। না এগিয়ে উপায় নেই। দীক্ষা দান করছিলেন হযরত উমর (রা.) । তিনি বসেছিলেন। হিন্দা ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল তাঁর দিকে। অত্যন্ত ভীত। অত্যন্ত শঙ্কাতুর। জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণ। বাঁচা অথবা মরা। কী হবে সে নিজেও জানে না। কিন্তু এছাড়া কোনও উপায় নেই। পথ নেই কোনও। সব কিছু নির্ভর করছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর।
শেষ পর্যন্ত তাঁকে চিনেই ফেললেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁকে চোখেতে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। শুধালেন, আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা না?
একেবারে বাকহারা হয়ে গেল হিন্দা। কোনওরকমে মাথা নেড়ে সায় দিল সে। তারপর চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর সে নিতান্ত জীবনের তাগিদায় কিছুটা শক্তি সঞ্চয করে আর্তনাদ করে উঠল, যা হবার হয়ে গেছে – আপনি আমায় – কিছু বলতে পারল না সে। নবীজি (সা.) হিন্দার মনোভাব উপলব্ধি করলেন। তারপর স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন, কোনও ভয় নেই – যাও, তোমাকে আমি ক্ষমা করলাম।
সামান্য একটা কথা। কিন্তু তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করল সেই রাক্ষসীর বুকে। রাসূল (সা.) আমাকে ক্ষমা করলেন! আমার মতো পাপীকে ক্ষমা করলেন তিনি? এক কথায়? কোনও দ্বিধা না করেই? কাপড়ের আড়াল থেকে সে তাকাল রাসূলুল্লাহ সা.-এর মুখের দিকে। শান্ত আর স্নিগ্ধ সে মুখ। কোনও দ্বেষ নেই। প্রতিহিংসা নেই। পবিত্রতায় দীপ্তিময়। অথচ এই মানুষটির সঙ্গে শত্রুতা করে এসেছি এতকাল। ভাব ততই বিগলিত হতে থাকে। কঠিন হৃদয নারী মোমের মতো গলতে থাকে। শিখা জ্বলে উঠেছে। দূর হয়েছে হৃদয়ের জমাট অন্ধকার। শত্রু এখন পরিণত হয়েছে মিত্রে। সামান্য কিছু পরে গভীর আবেগ ফুটে উঠল হিন্দার কণ্ঠে। আবেগোচ্ছ্বল গলায় সে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত আপনার তাঁবুর চেয়ে কোনও ঘৃণ্য তাঁবু আমার কাছে ছিল না, আর এখন পৃথিবীতে কোনও তাঁবুই আপনার তাঁবুর চেয়ে আমার কাছে অধিকতর প্রিয় নয়।
রাসুল (সা.) শুনল, অবাক হযে গেল সকলে। এ কি হিন্দার কণ্ঠস্বর? যেন জীবনের ওপার থেকে ভেসে আসছে এ স্বর। পবিত্র আযানের মতো।
পরশ পাথরের ছোঁয়ায় হিন্দা এখন সোনা। এ ছোঁয়ায় সবকিছুই সোনা হয়। বেদুইন, ইহুদি, কোরাইশ। এবং মানুষের মত। হিংস্র হিন্দার মনও।
উৎস- বুখারী শরীফ