গল্প

একজন চোর অথবা স্বদেশ প্রেমের গল্প

137views

দুপুরে রাজ বাজারে দারুণ এক হট্টগোল। প্রচুর মানুষ গোল করে ঘিরে আছে একজনকে। মাঝে মাঝে জনতার রব উঠছে- মার শালাকে, ওই হাত ভেঙে দে ব্যাটার। স্পর্ধা তো কম নয়, দিনে দুপুরে চুরি। মার বেটাকে, মার। শালা আজকের মতো শুভদিনে…। কেউ বলে, শালা দেশদ্রোহী, মার শালাকে, মার। বলার সাথে সাথে মাঝে মাঝে চড় থাপ্পড় কিল ঘুসি নেমে আসে চোরের উপর।

সমবেত জনতার মাঝে কাত হয়ে কুঁকড়ে পড়ে আছে এক তাল মাংস। একজন কোখের কাছে পা দিয়ে গুঁতো দিয়ে চিত করে দেয়। বছর ত্রিশ পঁয়ত্রিশের এক রোগা পটকা লোক। কালচে চেহারা, মুখ ভর্তি দাড়ি। মাথার চুল উস্কোখুস্কো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি তার শরীরে গেঁড়ে বসেছে।

মুঠো করে দাড়ি চেপে ধরে একজন। দাড়ি ধরে টানতে টানতে জিজ্ঞাসা করে, বল শালা তোর নাম কি? বল?

লোকটার আশ্চর্য প্রাণশক্তি বলতে হয়। এত নির্যাতনেও জ্ঞান হারায় নি। চিঁচিঁ করে বলে, রতন, রতন হালদার। দাড়ি ছেড়ে চটাস করে গালে একটা চড় কষায়। চড় খেয়ে লোকটার মুখ একদিকে ঘুরে যায়। চড় মারা ব্যক্তি আবার দাড়ি ধরে টান দিয়ে মুখটা সোজা করে বলে, শালা এখনো মিথ্যা বলছিস, ঠিক করে নাম বল। বল, কোথায় থাকিস?

কথাটা যেন সমবেত জনতার বিশ্বাস হলো না। তারা অন্য কিছু শুনতে চেয়েছিল বোধহয়। তাই তাদের ক্রোধ বেড়ে যায় আরো। একজন হিন্দিতে খিস্তি দিয়ে বলে বাধ ব্যাটাকে ওই পতাকা উত্তোলনের খুঁটিতেই বাধ। মেরে হাতের সুখ করে নিই। কেউ বলে পুলিশ ডাক, পুলিশের হাতে তুলে দিই।

সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা এক নেতাগোছের মানুষ এসে বলে, এই কি হয়েছে রে মদন, এত লোকজন কেন?

মদন নামের ছোকরা এগিয়ে আসে। মাথার উপরে বিচিত্র চুল। এক কানে দুল। কানের দুপাশ দিয়ে ঘাড়ে কোন চুল নাই। কেমন কাঁচি মারা। আগের দিনে গ্রামবাংলায় কেউ ঘোর অপরাধ করলে এমন করে চুল কেটে দাগিয়ে দিয়ে গ্রাম ঘোরানো হতো। সেটা এখন ফ্যাশন। সেই ফ্যাশনে মদন বলে, দাদা এই হারামজাদা সকালে উত্তোলন করা ওই জাতীয় পতাকা নামিয়ে দড়ি কেটে ভাঁজ করছিল। নিয়ে পালাবার তাল আর কি।

মাঝ থেকে একজন বলে, পালাবার তাল নয়, বল কেটে ফালাফালা করার তাল করছিল। শালা নির্ঘাত দেশদ্রোহী। না হলে এমন করে কেউ আজকের দিনে পতাকা নামায়।

সাদা পাঞ্জাবি দাদা বেঁধে রাখা লোকটার কাছে এগিয়ে যায়। একটু ঝুঁকে দেখে বলে, আরে এ তো সকাল বেলায়ও এসেছিল। সকালে আমি একে এখানে দেখেছি।

ভিড়ের মাঝ থেকে লম্বা পাতলা টেকো একজন বলে ওঠে, দাদা এতো পুরো পরিকল্পনা করে করেছে। সকালে দেখে গেছে
মানে রেইকি করে গেছে আর কি। মনে হচ্ছে এ কাজ ওর একার নয়, বড় কোন সংগঠন জড়িয়ে আছে ওর সঙ্গে।

জনতার মধ্যে আবার এক রব পড়ে যায়। বলাবলি করে, এতো সাধারণ কোন ছিঁচকে চোর নয়, এর পিছনে বিরাট কোন দল আছে। বড় কোন মাথা কাজ করছে নিশ্চয়। ভালো করে প্যাঁদানি দিতে হবে। তবেই সব উগরে দেবে।

সাদা পাঞ্জাবি দাদা কাকে যেন ফোন করতে থাকে। ফোন কানে নিয়ে জনতার কাছ থেকে একটু দূরে ফাঁকা মতো জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলে।

জনগণের মধ্যে গভীর আলোচনা শুরু হয়। এক একজন বিরাট তাত্ত্বিক হয়ে ওঠে। কত রকম যুক্তি দিয়ে কথা বলে। শুধু পতাকা নিয়ে পালানোই নয়, আরো কি কি পরিকল্পনা থাকতে পারে, তার একটি যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা খাড়া করে।

ইতিমধ্যে আরো কিছু নেতাগোছের মানুষ আর মিডিয়ার লোক চলে এসেছে। লাইভ টেলিকাস্ট শুরু হয়ে যায়। একজন ক্যামেরাম্যান ভালো করে চারিদিক দেখিয়ে জনতার মধ্য দিয়ে ক্যামেরা নিয়ে সাংবাদিক দাদার পিছনে পিছনে সেই খুঁটিতে বাধা লোকটির কাছে পৌঁছায়। ক্যামেরার ফোকাস লোকটার মুখের উপর ফেলে। সাংবাদিক বলে ওঠে- এই সেই চোর, যাকে কিছুক্ষণ আগে এখানকার জনগণ জাতীয় পতাকা চুরি করতে দেখেছে। হাজারো ভারতবাসী যে পতাকাকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসে, যে পতাকার সম্মান সবার উপর রাখে, সেই উড্ডীয়মান পতাকা উপর থেকে নামিয়ে, দড়ি কেটে, চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছিল। ভারতের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চেয়েছিল। ও কি উদ্দেশ্যে একাজ করেছিল তা আমরা জানবো, আপনাদেরও শোনাবো। সঙ্গে থাকুন আমাদের।

ইতিমধ্যে আরো দু একজন সাংবাদিক এসে হাজির হয়েছে। একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করে, তুমি দড়ি খুলে পতাকা নামিয়ে ছিলে?

লোকটি ফ্যাল ফ্যাল করে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ধীর গলায় বলে, হাঁ নামিয়েছি।

লোকটির কথা শেষ না হতে চিলে ছোঁ মারার মতো আরেকজন সাংবাদিক বলে, কেন? কি উদ্দেশ্য ছিল?

লোকটি আবারও একটু থেমে বলে, পতাকা ভাঁজ করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল।

এবার এখানে উপস্থিত ও টিভির সামনে বসা দর্শকদের উদ্দেশ্যে সাংবাদিকরা বলতে থাকে- আপনারা শুনলেন, চোর নিজের মুখেই স্বীকার করল যে সে পতাকা চুরি করতে এসেছিল। কি আশ্চর্য কথা, জাতীয় সম্মান, মর্যাদা চুরি করতে এসেছিল এই চোর। কিন্তু কেন? ওকি শুধুই পতাকা চুরি করতে এসেছিল নাকি অন্য কিছু উদ্দেশ্য ছিল? ওকি একা একা এ কাজ করতে এসেছে নাকি এর পিছনে অন্য কোন মাথা আছে? থাকলে তারা কারা? কি তাদের উদ্দেশ্য? এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজব।

সাংবাদিকরা কিছুক্ষণ জাতীয় পতাকার মর্যাদা, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগ, স্বাধীনতা দিবসের ইতিহাস বলতে থাকে। তারপর আবার খুঁটিতে বাধা লোকটিকে তার নাম, বাড়ি কোথায়, কেন সে পতাকা চুরি করতে এসেছিল আর কেউ তার সাথে আছে কিনা এসব জিজ্ঞাসা করে।

লোকটি বারবার সেই একই উত্তর দেয়। তার নাম রতন, রতন হালদার। বাড়ি স্বদেশ ডাঙা। না পতাকা চুরির পিছনে আর কেউ নেই, সে একাই এ কাজ করেছে।

অনেকক্ষণ টিভিতে লাইভ টেলিকাস্ট বন্ধ। সাংবাদিকরা ক্যামেরা নামিয়ে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরও বেশ কিছু নেতাগোছের লোক এসেছে। টি ভি আর সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে জনগণও এসেছে দলে দলে। রতন নামের সেই লোকটি পতাকা বাধা খুঁটির সঙ্গে তেমনি বাধা আছে। কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্ত জমাট বেঁধে আছে থুতনিতে। বুকের কাছের জামা রক্তে ভিজা।

এত মানুষজন এসেছে, কিন্তু এখনো পুলিশ আসেনি। একজন মাঝ বয়সি মানুষ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। খুঁটায় বাধা রতনের সামনে দাঁড়ায়। ভালো করে দেখে নেয়। তারপর বলে, এত রতন, স্বদেশ ডাঙার রতন হালদার। এ চোর হতে যাবে কেন, এ তো কারো ভূঁই থেকে এক আঁটি শাক চুরি করেছে বলে শুনিনি কোন দিন।

ভিড় থেকে কেউ বলে ওঠে, এই তো একজন সাগরেদ এসে হাজির হয়েছে মনে হচ্ছে।

ভদ্রলোক একটু থমকে যান। তারপর বলেন, আমরা সব ঠুলি পরা জনতা। মানুষ সম্পর্কে এর চেয়ে ভালো আর কি ভাববো। কিছু স্বার্থপর লোক যেভাবে আমাদের ভাবতে শেখায় সেভাবেই ভাবি। তারা দুর্নীতির পাহাড়ে বসে থাকে, জেলে যায়, তবুও জনগণের বোধোদয় হয় না।

সেই পাঞ্জাবি পরা নেতাগোছের লোকটা একরাশ বিরক্তি ঝরিয়ে বলে, আপনি কে, কে মশাই আপনি? একটু বলুন তো?

আমি স্বদেশ ডাঙা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সুকুমার মন্ডল। সাদা পাঞ্জাবি রতনকে দেখিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলে, চেনেন, একে চেনেন?

সুকুমার বাবু বলেন, চিনি, চিনব না কেন। এর বাড়ি তো স্বদেশ ডাঙা। ওর ছেলেটা আমাদের স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে।

ও যে এখানে বাধা আছে আপনি জানলেন কি করে?

সুকুমার বাবু বলেন, ও, এখনো মন থেকে সন্দেহ যায়নি। বিশ্বাস হচ্ছে না আমাকে। একটু আগেই টিভিতে লাইভ হচ্ছিল, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট হচ্ছিল সে খেয়াল নেই।

আমাদের না হয় খেয়াল নেই, আপনার তো খেয়াল থাকা দরকার, ওতো অন ক্যামেরা বলেছে পতাকা ওই নামিয়েছে। চুরি করার মতলব ছিল। সে কথা ভুলে গেলেন। ও একজন সাধু পুরুষ সে সার্টিফিকেট কি করে দিলেন?

ও যে পতাকা চুরি করেনি সে কথা তো একবারও বলিনি। বলেছি ও একজন ভালো মানুষ। এমন কাজ কেন করল সেটাই তো এখনো জানা হয়নি।

সুকুমার বাবু এগিয়ে গিয়ে বলেন, রতন তুই পতাকা চুরি করলি কেন? কি জন্য?

ভিড়টা আবার গোল হয়ে যায়। কিছু সু-বেশি মানুষ সামনে এসে দাঁড়ায়। এখন টিভি ক্যামেরা বন্ধ। তারাও এখন শ্রোতা।

রতন বলে, ছেলের জন্য স্যার, আমার ছেলের জন্য। ও কদিন ধরে বায়না ধরেছে পতাকা নেবে। আমি বাজার থেকে গতকাল কাঠিতে লাগানো ছোট দুটো পতাকা কিনে দিলাম। ছেলের আমার মন ভরলো না। বলে, বাবা বড় পতাকা নেব। খুঁটিতে বেঁধে আকাশে উড়াব। মাস্টার মশাইরা বলেছেন, এবার দেশজুড়ে পতাকা উড়বে। দেশ স্বাধীনের পঁচাত্তর বছর।

সাদা পাঞ্জাবি বলে, সে তো ভালো কথা। অতই যখন শখ ছেলেকে একটা পতাকা কিনে দিলেই তো হতো। তা না করে পতাকা চুরি করছিলি কেন সে কথাটা বল। চোর কোথাকার।

সুকুমার বাবু আসায় রতনের মনে একটু ভরসা আসে। মুখ তুলে চারপাশে তাকায় সে। দেখে সবার চোখে একই ধিক্কার। ধিক্কারের সাথে কেমন এক অবজ্ঞা। কারো কারো চোখে তীব্র হিংস্রতা। মুখ নামিয়ে নেয় রতন। চোখ দুটো ছল ছল করে। গতকাল সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে রতনের অসুস্থ বউটা বলেছিল, চাল আনলে না, ঘরে তো একটা দানাও নাই। কি ফুটিয়ে দিই বলতো?

দুদিন ধরে টানের রোগটা বেড়েছে বউটার। না হলে সেই কিছু একটা ব্যবস্থা করে ফেলতো। শহরের মতো ঝি চাকরের চল নেই গ্রামে। তবুও কারো বাড়িতে দুটো কাজ করে দিলে এক কাঠা চাল পাওয়া যায়। বউটা দুদিন ধরে ঘরে পড়েই হাঁপাচ্ছে। আর তাতেই সংসারটার টানের ব্যারাম বেড়েছে।

কদিন ধরে ঘন ঘন বৃষ্টি হওয়ায় এক সপ্তাহ ধরে রতন কোন কাজ পায়নি। মাঠে এখন চাষবাস প্রায় বন্ধ। তাছাড়া রতন চাষের সব কাজ জানেও না। রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করতো সে। ভারা থেকে পড়ে কোমরে লাগায় আর সে কাজে যেতে পারে না।

সন্ধ্যায় ছেলেকে খুব করে বুঝিয়েছিল রতন। কাল ঠিক বড় পতাকা এনে দেবে। তাদের বাড়িতেও পতাকা উড়বে। ছেলে অনেকক্ষণ গোঁ ধরে বসেছিল। সন্ধ্যার অন্ধকারের মতো রতনের বুকের ভেতরেও একরাশ কষ্ট জমাট বাঁধছিল। ছেলের মুখের দিকে তাকাতে পারছিল না সে। বুকের ভেতর এক অসহায়তা কুরে কুরে খাচ্ছিল। ছেলে একসময় বোঝে। সেই ছোট পতাকা হাতে নিয়ে সন্ধ্যার আঁধারে সারা উঠোন ছুটে বেড়ায়। মাথার উপর হাত তুলে মুখে অপূর্ব দীপ্তি নিয়ে ছোটে ছেলেটা। তারপর বাবার কোলের কাছে এসে বসে বলে, ঠিক আনবে তো বাবা, বলো ঠিক আনবে ?আনবো বাবা, আনবো। কাল ঠিক আনবো। ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আশ্বস্ত করে।

হাঁফ ধরা শরীরটা টেনে তুলে পাঁচি পিসির কাছ থেকে চাল ধার করে আনে রতনের বউ। জাউ রাঁধে।

রাতে বাপ মায়ের মাঝে শুয়ে ছেলেটা কত কথা বলে। লড়াইয়ের কথা। মাস্টার মশায়রা বলেছেন ইংরেজদের সাথে জোর লড়াই হয়েছিল আমাদের দেশের মানুষের। ইংরেজরা বড় দুষ্টু ছিল। অত্যাচারী। আমাদের দেশের মানুষের সব কেড়ে নিতো। টাকা কড়ি, বাড়িঘর, খাবার দাবার। দেশের মানুষ খেতে পেতো না, তবু তারা অত্যাচার করে সব আদায় করে নিত।

রতন মনে মনে ভাবে লড়াইটা এখনো বুঝি শেষ হয়নি।

ছেলেটা কত সব মানুষের নাম বলে। তারা সব দেশের জন্য লড়াই করে প্রাণ দিয়েছে। তাদের শহিদ বলতে হয়। মাস্টাররা শিখিয়েছেন। কত শহিদের নাম বলে যায় ছেলেটা। তার মধ্যে দু-একটা নাম জানতো রতন।

ছেলেটা কেমন এক আবেগে টগবগ করে ফুটছিল। বউটাও হাঁফ ধরা গলায় বলেছিল, যেমন করেই হোক কাল একটা পতাকা এনে দিও গো, বাছা আমার স্বাধীনতা বানাবে। আমাদের তো অভাব চিরকালের, তা বলে ছেলের মনটা ভেঙে দিও না।

সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে রতন। একটা মাঠ আর দুটো গাঁ ফেলে এই বাজারের কাছে আসতেই দেখে কত আয়োজন। পাড়ায় পাড়ায় বক্স বাজছে। ফুল দিয়ে মুড়ে পতাকা তোলা হচ্ছে। কত আনন্দ, কত উৎসব। চারিদিক যেন ঝলমল করছে। রতন অনেকের কাছে একটা পতাকা চায়। কেউ পতাকা দেয় না। ধমক দেয়। রতনের মুখ বেদনায় কালো হয়। আলোর পাশে কালো না থাকলে আলো কি মানায়? তার কিসের স্বাধীনতা? পতাকা হাতে নেওয়া স্পর্ধা বইতো নয়। দেয়নি, কেউ একটা পতাকা দেয়নি। অমৃত সবার জন্য নয়।

বেলা বাড়ে ছেলের মুখ মনে পড়ে। বউয়ের হাঁফ ধরা গলার মিনতি কানে ভাসে। রতন পতাকা বাধা দড়িটা খুলতে থাকে। পতাকা নামায়।

ঝরঝর করে জল ঝরছে রতনের চোখ দিয়ে। ছেলেটার বিষন্ন মুখ মনে পড়ছে। ভাঙা চালা ঘরের খুঁটি ধরে পথের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হয়ত। বড় অক্ষম বাপ সে। ছেলেকে একটা পতাকাও কিনে দিতে পারেনা। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মুষড়ে মুষড়ে উঠে। যন্ত্রণার ঢেউ জোয়ারের মতো আছড়ে পড়ে। লোক গুলো যখন মারছিল তখনো এত ব্যথা লাগেনি তার।

সুকুমার মাস্টার বলে, চুপ কর রতন, চুপ কর। কাঁদিস না। এরা কেউ তোকে বিশ্বাস করবে না। তুই চোর নোস কেউ মানবে না। ভেতর ভেতর দেশটা খোকলা হয়ে গেছে। আবেগ আর হুজুগ দিয়ে মানুষের মাথায় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষ এখন পরের হাতের যন্ত্র রে রতন, পরের হাতের যন্ত্র।

থামুন মাস্টার, থামুন। জ্ঞান ঝাড়বেন না। জ্ঞানের কথা আপনার পকেটে রাখুন। অন্য জায়গায় বের করবেন। পুলিশকে খবর দিয়েছি, পুলিশ আসুক, চোরকে থানায় নিয়ে যাক। আপনিও যান, সেখান থেকে ছাড়িয়ে আনবেন। নেতা গোছের মানুষটা আর তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের চোখ মুখ ধারালো হয়ে ওঠে। কেমনে এক জ্যান্তব হিংস্রতা ধক্ ধক্ করে। সুকুমার মাস্টারের মনে হয় সেও যেন এদের শত্রু।

একটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ায় অদূরে। কয়েকজন উর্দি ধারি পুলিশ গাড়ী থেকে নেমে এদিকে আসতে থাকে।

লিখেছেন: আব্দুল বারী

Leave a Response