দর্শন

ইমাম গাজ্জালীর ইসলামী দর্শন

54views

লেখক: মুহাম্মদ মিযানুর রহমান

ইউরোপের মাটিতে ইমাম গাজালীর দর্শন সত্তায় ইসলামের পুজ্জীবন প্রত্যক্ষ করেছে দুনিয়াবাসী। মুসলিম জাহানে গ্রীক দর্শন শেষে ইসলামের রূপান্তর। তারা চেয়েছে মুসলমানদের আকীদা-বিশ্বাসকে খরকুটোর ন্যায় ভাসিয়ে দিতে। ধর্ম বিনাশের সর্বোচ্চ কোশেশেও ছিল না কোন কমতি।

ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস যখন গ্রিক দর্শন ও মুতাজিলাদের ফাঁদে পড়ে প্রশ্নের সম্মুখীন, মুসলিম চিন্তাশীল সমাজ যখন বিচ্ছিন্ন তখন ইমাম গাজ্জালী ঘোষণা দেন অনন্ত সত্তা যুক্তির বাইরে, এখানে বিশ্বাসই মূখ্য। বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে তিনি যুক্তির ধারালো ছুরি চালান। দিকভ্রান্ত মুসলিমরা তখন দলে দলে তার দর্শনে আকৃষ্ট হতে শুরু করে। তার মতে আত্মা ও সৃষ্টির রহস্য এবং আল্লাহর অস্তিত্ব যুক্তি তর্কের বিষয় নয় এগুলো অনূভূতির বিষয়। অনন্ত সত্তাকে যুক্তি দিয়ে বিচারের সুযোগ নেই। এমন চেষ্টাকেও তিনি অন্যায় বলে দাবি করেন।

যুক্তি শুধুমাত্র আপেক্ষিকতাই তুলে আনে শুধু। তার দর্শনে কুরআন ও হাদীসকে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত করেন। তিনি প্রচার করেন আত্মার মৃত্যু হয়না। শুধুমাত্র দেহের মৃত্য ঘটতে পারে। মৃত্যুর পর আত্মার উৎকর্ষতা সাধন হয়।

ইমাম গাজ্জালী ছিলেন একাধারে আইনবেত্তা, দার্শনিক, মরমীবাদী, সংশয়বাদী, সংগীত অনুরাগী এবং নীতিবিজ্ঞানী। লিখেছেন অসংখ্য গ্রন্থ। তার অধিকাংশ বইগুলোতে ধর্মতত্ব, দর্শন ও সুফিবাদ আলোচনা করেছেন। একাত্ববাদ আর কুরআনের বাহক খলিফার হাত ধরে প্রবেশ করে মুসলমানদের মাঝে দর্শন। তার শানে নুযূলটা ও বেশ চমৎকার। এক রাতে খলিফা মামুনুর রশিদ স্বপ্ন দেখলেন এরিস্টোটলকে রাজ আসনে। তাকে প্রশ্ন করলেন, দুনিয়ার ভালো বস্তু কি? দার্শনিক বললেন- জ্ঞান যাকে ভালো বলে। উপদেশ চাইলেন

এরিস্টোটল বললেন, একাত্মবাদ ও সৎসংসর্গ মূল পুঁজি। একে হারাবেন না। এ সাক্ষাৎ খলিফা মামুনুর রশীদকে করলো আরো দর্শনপ্রেমী। তাই রোম সম্রাটের কাছে পত্র লেখলেন- “এরিস্টোটলের যতগুলো বই পাওয়া যাবে সব বাগদাদে পাঠিয়ে দাও”।

রোমে তখন পাদ্রীদের জয়জয়কার। দর্শন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। দীর্ঘকাল পর্যন্ত পাদ্রীরা দর্শন শেখার উপারে বিধিনিষেধ আরোপ করে রাখে। কারণ এর দ্বারা ধর্মীয় চিন্তা বিশ্বাসে চিড় ধরা আশঙ্কা ছিল। সুতরাং কায়সার মামুনের বার্তা উপেক্ষা করতে পারেন না।

তিনি দর্শনের বইপত্রের খোঁজা শুরু করলেন। এক পাদ্রী বললেন, গ্রিসে একটি ভবন আছে- যা কুল্গুনতিনের শাসনামল থেকে তালাবদ্ধ। প্রত্যেক শাসক নতুন করে একটি অতিরিক্ত তালা লাগিয়ে দেন। কুস্তুনতিন সবখান থেকে দর্শনের বইপত্র এখানে জমা করেন যাতে এই বিদ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

খ্রিস্টান ধর্মের ব্যাপারে বুদ্ধিবৃত্তিক কোন প্রশ্ন উত্থাপনের কেউ যেন আর না থাকে। পাদ্রীর বক্তব্য অনুযায়ী ওই ভবন খোলার পর সেখানে অনেক কিতাবাদি পাওয়া গেল। তা সত্ত্বেও কায়সারের ভয় ছিল মুসলমানদের এভাবে জ্ঞান

স্থানান্তর করা ধর্মীয়ভাবে কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে কিনা অথবা রাজনৈতিকভাবে কোন ক্ষতি হয় কিনা! তাই তিনি সভাসদের সঙ্গে পরামর্শ করলে তখন পাদ্রীরা তাকে জানান কোন সমস্যা নাই। দর্শন যদি মুসলমানদের মধ্যে বিস্তৃত ঘটে তাহলে তাদের ধর্মকেই নড়ে ভয় করবে। কেননা এই বিদ্যা যেখানে বিস্তৃত হবে সেখানেই ধর্ম নড়বড় হবে।

তাই কিসরা অনেকটা আশ্বস্ত হয়ে পাঁচ উটের উপরে করে বিপুল পরিমাণ কিতাবাদি মামুনের জন্য পাঠালেন। মামুন এর উপর নির্ভর করে বসে থাকলেন না। তিনি বায়তুল হিকমার অফিসারদের তলব করে রোমের দর্শনের সমস্ত কিতাবাদি আনালেন। এবং তার অনুবাদের জন্য তিনি লাখ লাখ দিনার খরচ করলেন।

বিশাল বই পত্র জমা হওয়ার পর প্রখ্যাত পন্ডিত ও অনুবাদক ইয়াকুব ইবনু ইসহাক কুন্দিকে (ইনতিকাল ২৬০ হি.) দায়িত্ব দেন। যাকে আরব দার্শনিক বলা হত। ইসলামের ইতিহাসে ওই সময় পর্যন্ত তাকে ছাড়া আর কেউ দার্শনিক হিসেবে খ্যাত ছিল না। ইসলামের এই চ্যালেঞ্জকে কে মোকাবেলা করবে? মহাসত মহাসত্যকে আবার প্রমাণ করবে কে মামুনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে? ইসলামের সুমহান বার্তা কে করবে বুলন্দ?

দর্শনের সবকিছুতেই মামুনের আনা গ্রীক দর্শন মুসলিম জাহানের রাজনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাসের রং পাল্টে দিয়েছে। সুতরাং ইসলামের মৌলিক অবস্থানকে উঁচু করার জন্য ইমাম গাজ্জালী দাঁড়িয়ে গেলেন। পরবর্তী দুনিয়ায় কিংবা ইউনার দর্শনবিদ্যা। সেই কথা স্বকার লাভ করেছিল ইমাম ন্তাবিদ Miguel Asim paala-cious তার La Espiritualidad Da Al Gazal Su Sim-tido Eristiano গ্রন্থে। 

ইমাম গাজালী দেখিয়েছেন- বুদ্ধিগত জ্ঞানকে চূড়ান্ত ধরে নিয়ে যেমন বুদ্ধিবাদ চর্চা হয়ে আসছে, অভিজ্ঞতাকে চূড়ান্ত ধরে নিয়ে যেমন অভিজ্ঞতাবাদের সব তত্ত্ব চর্চা হয়ে আসছে; তেমনিভাবে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের অনুকূলে ইসলামী দর্শন চর্চা সম্ভব। এর বাইরে ‘ইসলাম’-এর বিষয়কে নিয়ে দর্শন চর্চা হতে পারে। তবে তা ইসলামসম্মত নয়। যদিও তা জানাটা ইসলামের ভেতরকার অবস্থান থেকে (ইসলামী) দর্শন চর্চার জন্য অপরিহার্য। পঞ্চম শতকে গ্রীকদর্শনের একচ্ছত্র আধিপত্য মুসলিম বিশ্বকে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত করল, তখন ইসলামী চরিত্রদর্শন ইত্যাদিতে দার্শনিক বিশ্লেষণ প্রতিভাত হয়ে ছিল সময়ের দাবী রূপে। যেমন বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল নীতিদর্শনের উপর দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। পাত্রীস তিনি ঐ দুটি গ্রন্থের ব্যাখ্যা লিখেন।

পরবর্তীতে হুসাইন ইবনে ইসহাক আরবী ভাষায় গ্রন্থ দুটি অনুবাদ করেন। ইমাম গাজ্জালীর ‘তাহাফাতুল ফালাসিফা’র কথা উল্লেখ করা যায়। তাঁর বিবেচনায়, তৎকালীন মুসলিম দার্শনিকদের গৃহীত ‘ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক’ ২০টি অনুসিদ্ধান্তকে তিনি দার্শনিক যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করেছেন। ধর্মের বিষয়গুলোকে নিছক ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণের প্রচলিত পদ্ধতির (ফকীহদের পদ্ধতি) পরিবর্তে দার্শনিকদের প্রমাণ-পদ্ধতিতেই তিনি ইসলামের মূল বিষয়গুলোকে সমর্থনে যুক্তি দিয়েছেন। এমন নয় যে, এতে তিনি কোরআন ও হাদীসের রেফারেন্স দেন নাই। কোরআন-হাদীসের রেফারেন্স উভয় পদ্ধতিতেই ব্যবহৃত হয়। তফাৎ হলো, ধর্মতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে তা ‘দোহাই’ বা অবশ্য-মান্য হিসাবে আসে, আর দার্শনিক পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট রেফারেন্সের গুরুত্ব অনুসারে তা ‘যুক্তি’ হিসাবে আসে। ইমাম গাজ্জালী নিজেকে কখনো দার্শনিক ভাবেন নাই। বইয়ের নামই দিয়েছেন, ‘দর্শনের খণ্ডন’। অতএব, বুঝা গেল, কোনো কিছু দর্শন হয়ে ওঠা, সেটির উপস্থাপনা-পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। ইমাম গাজ্জালী’র এ দর্শন এই অর্থে একটি যথার্থ দর্শন।

আফসোসের কথা হলো-প্রাচ্যবিদরা (Orientalist) ঢালাওভাবে অভিযোগ করেন যে ইমাম গাজ্জালীর দর্শন ও যুক্তি ইসলামের বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। তাদের এহেন অভিযোগের ভিত্তি হলো তিনি ইবনে সিনা ও আল ফারাবীর মতো বিজ্ঞানীদের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করেছিলেন, যারা ছিলেন তৎকালীন বিশ্বে বিজ্ঞানচর্চার অগ্রদূত। মূলত বাস্তবতা ছিল অবশ্যই ভিন্ন।

ইমাম গাজ্জালী তৎকালীন বিজ্ঞানীদের দর্শনগত ধারণার সাথে মতানৈক্য পোষণ করেন, যারা ছিলেন গণিত ও বিজ্ঞানের বিখ্যাত সব গ্রন্থের রচয়িতা। তাদের যুক্তি খণ্ডন করতে গিয়ে তিনি বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরেন। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন- “গণিতশাস্ত্র নিয়ে যিনি এগিয়ে গেছেন তিনি নির্ভুলভাবে সবিস্তারে তার গাণিতিক প্রমাণাদির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারেন। একারণে তিনি দার্শনিকদের গণিতশাস্ত্রের মতো দর্শনশাস্ত্রেও একইরকম সহজবোধ্য, যুক্তিগ্রাহ্য ও প্রতিপাদনযোগ্য বিবৃতি দেয়া যাবে।” তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, গণিত এবং অন্যান্য বিজ্ঞানশাস্ত্র অধ্যয়নের ভয়াবহ দিক এটি নয় যে এই বিষয়গুলোই ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কিংবা ক্ষতিকর ও পরিত্যাজ্য। বরঞ্চ, শিক্ষার্থীদের উচিৎ সতর্কতার সাথে জ্ঞান অর্জন করা এবং দর্শন ও অন্যান্য স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা যেসব বৈজ্ঞানিক ধারণার অবতারণা করেছেন সেসব অন্ধভাবে বিশ্বাস না করা।

তিনি আরো বলেন, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের আরো একটি বিপজ্জনক পর্যায় হতে পারে যে, তারা বিজ্ঞানীদের সমস্ত আবিষ্কার ও উদ্ভাবনকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে যেহেতু এসব বিজ্ঞানী প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বিরোধী দর্শনও প্রবর্তন করেছেন। তাঁর ভাষ্য হলোঃ “কেউ যদি ধারণা করে বসে যে গণিত ও বিজ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করেই ইসলাম বিজয়ী হয়েছে, এটা হবে মস্ত বড় অপরাধ। কেননা ইসলামী আইন এসব বিষয়কে প্রত্যাখ্যান কিংবা সত্যায়ন করেনি এবং ধর্মীয় বিষয়ের অন্তর্ভুক্তও করেনি।”

আর কাল্পনিক দর্শনের বিপরীতে যুক্তিযুক্ত প্রমান সহ মুসলিম দর্শনের ইতিহাসে গাজ্জালী এত ব্যাপক বিষয়ে প্রাঞ্জল ও যুক্তিযুক্ত আলোচনা করেছেন, তা অন্যকোন মুসলিম দার্শনিকের বেলায় তা অনুপস্থিত। অধ্যাপক ম্যাকডোনান্ড এর মতে “আল গাজ্জালী ইসলামের শ্রেষ্ট ও সর্বাপেক্ষা সহনশীল চিন্তাবিদ। তার মতবাদ সমূহ তার ব্যক্তিত্বেরই অভিব্যাক্তি।” আরেক চিন্তাবিদ ইকবাল গাজ্জালী সম্পর্কে বলেন, “অষ্টাদশ শতাব্দীর জার্মানীর ইমানুয়েল কান্টের (দার্শনিক) এর মত গাজ্জালীর মহান উদ্দেশ্য ছিল প্রেরিত পুরুষের মতই।” গাজ্জালীর খ্যাতি শুধু মুসলিম জগতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল বিশ্বব্যাপি। ইমাম গাজ্জালীর দার্শনিক সত্তা এতই শক্তিশালী ছিল যে এরিস্টটলের অনুসারী দার্শনিক বিশেষ করে প্লাটিনাসের এবং তাদের মুসলিম অনুসারী তথা আল ফারাবী এবং ইবনে সিনার বিরুদ্ধাচারণ করে বইও রচনা করেন। তার রচিত বড় দুইটি গ্রন্থ হচ্ছে ইয়াহিউল উলুম এবং কিমিয়ায়ে সায়াদাত। দর্শনের সেরা কিতাব হলো তাহাফাতুল ফালাসিফা।

ইসলামের বাগানে ছড়িয়ে পড়া দর্শন শাস্ত্রের চিন্তা ও দর্শনের উপর জীবন সংহারী আঘাত হানলেন ইমাম গাযালী। ইউরোপের অপেক্ষা করছিল ইসলামের মৃত্যুর। কিন্তু সহসা তাদের আশা বজ্রাহত হলো। দর্শনের কোমর ভাঙ্গার আওয়াজ শুনলো পুরা ইউরোপবাসী

যা ছিল ছিল তাদের কাছে একেবারে অভাবনীয়। তাইতো সবার কণ্ঠে উচ্চারিত হলো ইমাম গাজ্জালী হলো মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় মুহাম্মদ।

(লেখকের নিজস্ব অভিমত)

Leave a Response