ইসলাম

উনিশ শতকে ‘মুসলিম’দের শিক্ষার সংক্ষিপ্ত পশ্চাৎপট

596views

ইমানুল হক

তারপর

একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তার অর্থনীতিকে। অর্থনীতি ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তার সংস্কৃতিকে। সংস্কৃতি ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় শিক্ষাকে।  শিক্ষাকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তার ভাষাকে। ভাষাকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তার আত্মমর্যাদাবোধকে।

ইংরেজরা এর সবকটিই করে।

যেসব মক্তব বা পাঠশালা ছিল ‘মুসলিম’দের শিক্ষার জন্য, তার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন যেসব নবাব, আমির ওমরাহ বা জমিদাররা তাঁরা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এগুলিও ধ্বংস হয়ে যায়।

আর পূর্ববঙ্গর বেশিরভাগ নতুন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তজাত জমিদার ছিলেন ‘হিন্দু’ সম্প্রদায়ভুক্ত । তারা যেসব বিদ্যালয় গড়েছেন তা গড়েছেন পশ্চিমবঙ্গে । এমন অভিযোগ বাংলাদেশের শিক্ষা গবেষকদের।

(জেনারেল রিপোর্ট অন পাবলিক ইন্সট্রাকশন ১৮৫৬-৫৭ পৃ-৯৭, উদ্ধৃত – এ আর মল্লিক, ব্রিটিশনীতি ও বাংলার মুসলমান, পৃ-৩৫৭)

প্রসঙ্গত, অ্যাডাম ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর রিপোর্টে বাংলায় একলাখ পাঠশালা ও মক্তবের উল্লেখ করেন। এগুলি পৃষ্ঠপোষকের অভাবে ধ্বংস হয়। ধ্বংস হয় বাংলার গণশিক্ষার প্রথা।

‘মুসলমান’দের দারিদ্র, অনাহার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, ভাষা সমস্যা, ব্রিটিশ সরকার, নবোত্থিত ‘হিন্দু’ উচ্চবিত্ত ও প্রশাসকদের প্রবল বীতরাগ ও অনীহা –বাংলার মুসলমানের শিক্ষা মানচিত্রকে বিপুল্ভাবে প্রভাবিত করেছে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলার গণশিক্ষাকে ধ্বংস করে। সেই ধ্বংসাবশেশ থেকে ‘হিন্দু’ সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত অংশ নিজেদের রক্ষা করতে পারলেও ইংরেজ ও তার কর্মচারীদের সামূহিক বিরূপতায় , নব জমিদারিদের শোষণ ও ঔদাসীন্যে এবং আত্মরক্ষার প্রয়াসে নিজেদের ধর্মের আবরণে আড়ো বেশি করে লেপ্টে ফেলায় মুসলিম সমাজ পিছিয়ে পড়েছে—এর সঙে যুক্ত হয়েছে এই মনোভাব—পড়ে কি লাভ? মুসলমানদের কেউ চাকরি দেবে না। অতি সহজে মিলবে না । হতে হবে ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি’। কিন্তু সবাই তো তা নয়। তাই ব্রিটিশ যুগ শুধু নয় ২০০০ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে স্কুল সার্ভিস কমিশনের সুফল মেলার আগে শিক্ষাও চাকরি সম্পর্কে মুসলমানদের সাধারণ মনোভাব—মুসলমানদের সহজে চাকরি মিলবে না।

আল কোরানে একটা কথা আছে- পুরুষ ও নারী যেহেতু একই উৎপত্তি স্থল থেকে আগমন করেছে , তা ই নারীরা শিক্ষা, বুদ্ধি ও আত্মার অধিকারী (আল কোরান, সুরা নিসা, পারা -৪, আয়াত নং ৯)। এই বিশ্বাস মধ্যযুগেও ছিল । তা ই আমির ওমরাহ নবাব সুলতান পরিবারে প্রচুর শিক্ষিতা নারী মেলে। হুমায়ুননামার লেখিকা গুলবদন বেগন, নূরজাহান, জাহানারা, জেব উন্নিসা—অজস্র উদাহরণ মিলবে। আমার ছোটবেলাতেও দেখেছি মুসলিম মেয়েরা কমবেশি কোরান পড়তে পারত।

চলবে…

Leave a Response