ইসলাম

উনিশ শতকে ‘মুসলিম’দের শিক্ষার সংক্ষিপ্ত পশ্চাৎপট, ৪য় পর্ব

532views

ইমানুল হক

তারপর

সিরাজের পতনের পরে এসবের অস্তিত্ব বিপন্ন হল। ‘মুসলিম’ স্বার্থের সঙ্গে খ্রিস্টান ইংরেজদের শুরু হল সংঘাত। মুসলমানদের সামনে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ তিনটি রাস্তা খুলে রেখেছিল

ক।। অসহায় আত্মসমর্পণ

খ।। লড়াই করে মরা

গ।। ভীরু চাকরবৃত্তি/ কৃষকজীবন

লড়াইয়ের রাস্তা যাঁরা বেছে নিলেন তাঁরা প্রায় সকলেই মরলেন,  ভারতের স্বাধীনতার কথা প্রথম উচ্চারিত হল এদের মুখে, ভারতের বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয় পাঠ্য ইতিহাসে যদিও এদের সেভাবে স্থান হল না।

আর যাঁরা পড়াশোনা করার পথে হাঁটলেন তাঁদের সামনে এল অর্থনৈতিক বাধা ছাড়াও ভাষা ও ধর্ম সমস্যা।

১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে মেকলে রিপোর্টে ইংরেজিকে শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাব এল। ১৮৩৭ থেকে আদালত থেকে উঠে গেল ফার্সি। ইংরেজি হল আদালতের ভাষা। এতকাল ফার্সি জানাটা ছিল শিক্ষা ও চাকরির প্রধান শর্ত। তার অনুপস্থিতি তৈরি করল এক বিরাট সংকট। (উল্লেখ্য,  ফার্সি গুরুত্বহীন হওয়ায় প্রতিবাদী স্মারকলিপি জমা পড়ে সরকারের কাছে। হিন্দুদের পক্ষে ১০০০০ (দশ হাজার) জন ও মুসলমানদের পক্ষে ৮৩১২ জন স্বাক্ষর করেন।

শুধু মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষা নিতে চায়নি বলে অনেকের মত। যদিও  ভারতীয় ইসলামের মন্ত্রগুরু হজরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলভির পুত্র আব্দুল আজিজ মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ফতোয়া দান করেন। স্যার সৈয়দ আহমেদের অনেক আগে। হজরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলভি ছিলেন একজন বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী ( (জন্ম ১৭০২ খ্রি-মৃত্যু ১৭৬২ )। তিনি মুঘল রাজশক্তির দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করেন। ওয়ালিউল্লাহ বিরোধিতা করেন অর্থনৈতিক অসাম্যের, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের উপর অতিরিক্ত করভারের। তিনি ৪০ টির বেশ বই লেখেন। তিনি-ই প্রথম কোরাণের ফারসি অনুবাদ করেন। সে জন্য গোঁড়া মোল্লারা তাঁর চরম শত্রুতা করেন। সুন্নিরা তাঁকে শিয়া ভাবত, শিয়ারা সুন্নি। দিল্লির বাইরে চলে যেতে বাধ্য হন তিনি। মসজিদে গেলে তাঁকে চরম অপমান করা হয়। হজরত ওয়ালিউল্লাহ পীরপ্রথার বিরোধিতা করেন। জ্যোতিষ, মাদুলি, কবচের বিরোধিতা করেন।

তাঁকে বলা হয়, আধুনিক ভারতীয় ইসলামের মন্ত্রগুরু।

ভারতীয় মুসলমান যে আরবের মুসলমানের থেকে পৃথক এ কথা তিনি-ই প্রথম জোর দিয়ে বলেন।

পিতার মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স আজিজের বয়স ছিল মাত্র ১৭। তিনি ইংরেজের অধীনে চাকরি করাকে প্রথম সমর্থন করেন। এবং ইংরেজরা তাঁকে কলকাতা মাদ্রসার অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ করে। কিন্তু আজিজ দিল্লি ছাড়তে চাননি বলে চাকরি নেন নি। পরে ইংরেজদের অত্যাচার, অবিচারে আজিজের মত বদলায়। তিনি প্রবল ইংরেজ বিরোধী হয়ে ওঠেন। তিনিই প্রথম ভারতের ইংরেজ শাসনকে ‘দার-উল-হারব’ হিসেবে চিহ্নিত করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেন। তাঁকে বলা হয় ‘সিরাজ-উল হিন্দ’।

জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা প্রসার ও বিদ্রোহের প্রেরণা সঞ্চারের জন্য তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।

আব্দুল আজিজের শিষ্য সৈয়দ আহমেদ ভারতে মুসলমানদের মধ্যে বিধবা বিবাহ প্রচলন করেন। শুরু করেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশশ্ত্র সংগ্রাম। ১৮২৬-র ২৬ ডিসেম্বর। তার শিষদের বলা হতো মুজাহিদিন। এরা ছিলেন শিক্ষিত এবং সশশ্ত্র। ইংরেজদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রীতি নীতির প্রতি এদের ছিল তীব্র ঘৃণা। এরাই জন্ম দেন দেওবন্দ, ফুরফুরা প্রভৃতি শিক্ষা ও বিচার ধারার। ভারতের সিপাহি বিদ্রোহে এরাই অন্যতম প্রধান ভূমিকা নেন। এদের ই একজন শের আলি হত্য করেন ভারতের বড়লাট লর্ড মেয়োকে। আরেকজন হত্যা করেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে। আদালতের আঙ্গিনায়।

১০

একদিকে সশস্ত্র সংগ্রামে ইংরেজ বিতাড়নের পরিকল্পনা অন্যদিকে ছিল নিজেদের শিক্ষাদর্শের প্রতি অনুরাগ এবং ইংরেজি শিক্ষাদর্শের প্রতি আকন্ঠ ঘৃণা। ব্রিটিশ আমলে মুসলিম শিক্ষা নিয়ে গবেষণাকারী মো আ আল মাসুম। মোহাম্মদ আজিজুল হককে উদ্ধৃত করে আল মাসুম লিখেছেন—

মুসলমানদের নিকট ইংরেজি শিক্ষাগ্রহণে সম্মত হওয়ার অর্থ ছিল, তাদের  নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি নতুন বিদেশি ব্যবস্থার নিকট প্রতিরোধহীন আত্মসমর্পণ অথচ উচ্চমানের সাংস্কৃতিক সাহিত্যিক গুঙত গরিমার জন্য শিক্ষা একদা খ্যাতি অর্জন করেছিল। মুসলমানরা যদি তা করতো সে কাজটা স্বাভাবিক হতো না।

(সূত্র: এম আজিজুল হক, মোসলেম এডুকেশন, পৃ ২০, উদ্ধৃত মো আঃ আল মাসুম, পৃ-৪৮)

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অ্যালজেব্রা বা বীজগণিত আরবিয় অবদান। এছাড়া 1,2,3,4 সংখ্যাগুলি ইংরেজি নয় আরবি । ‘মুসলমান’দের পক্ষে মানসিকভাবে অন্য একটি সমস্যা ছিল। ‘মুসলমান’রা শিক্ষার সঙ্গে ধর্মীয় বা নীতিশিক্ষাকে আবশ্যিক মনে করতো। মিশনারি শক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ধর্মশিক্ষা দেওয়া হতো। খ্রিস্টিয় ধর্মশিক্ষা । তা গ্রহণে আপত্তি ছিল ‘মুসলিম’দের। প্রসঙ্গত, রামকৃষ্ণ মিশনেও কিন্তু ধর্মশিক্ষা আবশ্যিক।

চলবে…

Leave a Response