গল্প

একটা লাল ঘুড়ির জন্য

75views

লেখক: মুহা: মইদুল ইসলাম

হারুর কান বাম হাত দিয়ে কষে টেনে ধরেছে তার মা নাজিরা। তারপর তার মুখের ভিতরে আঙ্গুল পুরে দিয়ে একটা আধ-খাওয়া লিচু বের করে ফেলে দিল। প্যান্টের পকেটে হাত ভরে দিয়ে সেখানেও পাওয়া গেল আরো চার-পাঁচটা লিচু। সেগুলিও নাজিরা বের করে ছুঁড়ে ফেলে দিল।

-‘বল এগুলো কোথায় পেলি? তোকে বলিনি কারো গাছে উঠবিনা- কারো কোনো কিছুতেই হাত দিবিনা।’

-‘আমাকে এটা অমল দিয়েছে মা আমি কারো গাছে উঠিনি-কারো গাছ থেকে পাড়িনি।’

-‘ছাড় তোর অমলা? ও তো একটা শয়তান- ওদের কি গাছ আছে নাকি? দেশা ও কার গাছের চুরি করে এনে তোকে দিয়েছে-তোকে বলিনি পাড়ার যার তার সাথে মিশবিনা!’

-‘কার সাথে মিশব মা- রুবিনার সাথে মিশলেও বলো মিশতে হবে না, কাজলের সাথে মিশলেও বলো মিশতে হবে না- নাড়ুর সাথেও মিশতে মানা করো, তাহলে………..

–তোকে কারো সাথে মিশতে হবে না- তোর বাপ যে জায়গায়

বাড়ি করেছে এখানে কোনো ভালো মানুষ আছে নাকি?” এই ভাবেই রাতদিন নাজিরা তার একমাত্র ছেলেকে সারাক্ষণ শাসনের মধ্যে রাখে। প্রটেকশন দিয়ে রাখে। যাতে পাড়ার ভালো মন্দ কোনো আঁচই তার ছেলের গায়ে না লাগে। সে আসলে অনেক দেরি করে আসা (জন্ম হওয়া) এই একমাত্র সন্তানকে একেবারে নিজের মত করে মানুষ করতে চায়।

হারুর এখন বয়স বড়ো জোর সাত-আট বছর হবে।

আশপাশের বাড়িগুলি থেকে তার সমবয়সি ছেলে-মেয়েরা খেলার জন্য হারুকে ডাকতে এলেই নাজিরা খিনিসমিনিস করে। বকাবকি করে। নাজিরার কেবলই মনে হয় যে, পাড়ার কেউই ভালো নয়। তাই কোনো ছেলে-মেয়ের সাথে তাকে মিশতে দেয় না- খেলতে দেয় না।

এভাবেই চলছে হারুর লেখা-পড়া ও সার্বিক পরিচর্যা তার মায়ের তত্বাবধানে। হারুর বাবা একজন পরিযায়ী শ্রমিক। বছরের বেশির ভাগ সময়ই বাড়ির বাইরে থাকে। রাজমিস্ত্রীর কাজ করে। সে লেখাপড়া একদমই জানেনা। ফলে কিছুটা শিক্ষিত বৌ হিসাবে নাজিরাকে সে অগাধ বিশ্বাস করে এবং বলা যায় সকল ক্ষেত্রে নাজিরাকেই ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসাবে মেনে চলে।

হারুকে এত যত্নে লেখা পড়া করানোর পরেও সে এবার ক্লাস গ্রীতে রেজাল্ট কিন্তু মোটেই ভালো করতে পারল না। ফলে তার ছেলে হিসাবে যাও বা পাড়াতে একটু আধটু মিশত বা খেলত মা হারুর উপর আরো বেশি কড়াকড়ি করতে লাগল। হারু ছোট সেটাও এবার তার মা নাজিরা একদম বন্ধ করে দিল।

একদিনের কথা। নাজিরা হারুকে বলল-

–এখানে চুপ করে বসে থাক, আর এই দেখ কলা থাকল যা পারবি বসে বসে খা।’ আমি যাব আর আসব।

একথা বলে হারুর মা বাড়ির পেছনে তাদের ধাড়ি ছাগলটাকে ঘাসবোনায় পুঁতে দেওয়ার জন্যে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পরে এসে দেখছে হারু হাত কেটে বসে আছে। সে একটা কলাও খায় নি। তার মা যাওয়ার পরপরই সে দা নিয়ে বাঁশের গিরো কেটে চাকা বানাতে শুরু করে। ঐ চাকা দিয়ে সে এক ধরনের গাড়ি বানাবে। কিন্তু হঠাৎ তার হাতে দাএর কোপ লেগে বেশ খানিকটাই হাত কেটে গেল। কেটেছে বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুলটি। রক্ত বন্ধ করার জন্য সে একা একাই উস্তাদি করে কাটা জায়গাটাতে মাটি চেপে

লাগিয়েছে। তার মা এসে দেখছে ছেলের হাত কাটা। রক্ত পড়েছে অনেকটা। তারপরেও সে নির্বিকার। কোনো কান্নাকাটি নেই আঃ উঃ কিছু নেই।

তখন হারুর মা বলল-‘ তুই কি চোর-ডাকাত হবি না কী হবি? একা একা হাত কাটলি? তারপর আবার চুপ করে বসে আছিস?’

ছেলেটাকে নিয়ে নাজিরা সত্যিই বড়ো পেরেশানির মধ্যে থাকে। হারুকে নিজের মত করে মানুষ করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে যা হচ্ছে তা যেন নাজিরার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই হচ্ছে।

সত্যি বলতে কি বাচ্চা ছেলের মগজ- এত কড়াকড়ি তার মোটেই ভালো লাগে না। ফলে দেখা যায় যে, নাজিরা তাকে যতই শাসন করুক না কেন নাজিরার কোনো না কোনো কাজের ফাঁকে ফুকে হারুর নিজের মত করে একটু আধটু খেলার জন্য বাড়ির বাইরে বের প্রায়ই হয়। তার পর বন্দি জীবনের বাদ পড়া শৈশবের ছুটোছুটি সে শেষ মেষ পুষিয়ে নেয়। বুড়ির পুকুরে গিয়ে ভেটুল গাছ থেকে পানিতে ঝাঁপ মারা- ডাঙগুলি খেলা-মারবেল খেলা সবই

বাড়ির পিছনে একটা জলা জায়গা আছে। সেখান থেকে আতা ফল পেড়ে আনার জন্য গতকালই মার খেয়েছে হারু। কেননা হারু জ্বর থেকে সবে ভালো হয়েছে ক’দিন হল। তার হাতের কাটা জায়গাটাও এখনো পুরোপুরি ভালো হয় নি। আজকে দুপুরে কাটানক্রিমওয়ালা এসেছিল- হারু একটা আইসক্রিম কিনে দেওয়ার জন্য অনেক আবদার করলেও নাজিরা শুনেনি।

-‘জানোয়ার তুই রাতে ঘঙ ঘঙ করে কাশছিস আর এখন বরফ খাবি-কেবল জ্বরটা একটু কমতে দেখেছিস, আর অমনি খাব খাবনা?’

নাজিরা আবারও ছেলেকে শান্তনা দেওয়ার জন্য বলল-‘ও সব দরকার নেই ওর থেকে অনেক ভালো জিনিস তোকে ঈদে কিনে দিবো। বড়ো বড়ো পাপড় ভাজা, সিঙ্গাড়া, কচুরী, আর শুধু ঘডি ঘডি করিস-এবার ঈদে তোকে সুন্দর দেখে একটা ঘড়ি কিনে দিব। এখন তুই এক কাজ কর- ছুটিতে যে অংক গুলো করতে। দিয়েছে বসে বসে কর। আমি আড়তের মোড়ে যাব আর আদব। তোর জন্যে সুন্দর দেখে একটা জামা কিনে আনি। আর ক’দিন বাদ দিয়েই তো ঈদ।’

‘কবে ঈদ মা?’

-“আর চার-পাঁচ দিন আছে।’

সুন্দর একটা খিলখিলিয়ে হাসি হাসল হারু। সে আরো খুশি হল এই জন্য যে তার মা তার জন্য এখুনি নতুন জামা কিনতে যাচ্ছে।

নাজিরা চলে গেল আড়তের মোড়ে হারুর জন্য ঈদের নতুন জামা কিনতে। হারু বেশ খুশি খুশি মনে বই খাতা নিয়ে বাড়ির বারান্দায় বই খাতা নিয়ে বসল। দুটো অংক করা হয়েছে। এমন সময় কার একটা ঘুড়ি-বেশ বড়ো ঘুড়িটা আর লাল টকটকে। ঘুড়িটা উড়তে উড়তে এসে তাদেরই বাড়ির পেছনে আমড়া গাছটায় আটকে গেল। হারু এমন সুন্দর লাল টকটকে রঙ এর ঘুড়িটার লোভ সামলাতে না পেরে বই খাতা ছেড়ে উঠে পড়ল। তারপর একটু কষ্ট করে হলেও সে আমড়া গাছটিতেও উঠল। সব মিলে তার মনে আনন্দ আর ধরছে না। কেননা ওদিকে তার মা গেছে তার জন্য ঈদের নতুন জামা কিনতে- আর এদিকে একদম নতুন একটা সুন্দর ‘ফিঙেরাজা ঘুড়ি’ তো উড়তে উড়তে সোজা বাড়িতেই এসে পড়েছে।

হারু গাছে উঠতে মোটামুটি খারাপ পারেনা। কিন্তু তার বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুল কাটা থাকায় গাছে ওঠায় একটু অসুবিধা হচ্ছে। তবুও ঘুড়ির লোভ তাকে অদম্য করে তুলেছে। তাকে খুড়িটাকে পেড়ে আনতেই হবে- এবং অক্ষত অবস্থাতেই আনতে হবে। এই তার জেদ। আর একাজে বেশি দেরি করাও যাবে না। কেননা দেরি করলে তখন পাড়ার অন্য কোনো ছেলে এসে খুড়িটা দখল করে নিতে পারে। তাই বেশ আকুপাকুও করছে হারু ঘুড়িটা পাড়ার জন্য।

আর একটা ডাল উপরে উঠলেই সে ঘুড়িটাকে ধরতে পারবে। এমন সময় সে বুঝতে না পেরে গাছের একটি মরা আর আধ পঁচা ডালে পা দিয়ে উপরে ওঠার জন্য একটা ঝুল দেয়- ধরেও ফেলে ঘুড়িটাকে কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস- ঝুল মারার সময়েই মরা ডালটি ভেঙে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নীচে পড়তে লাগল হারু। গাছের এ ডালে সে ডালে বাড়ি খেতে খেতে পড়ল। নীচে বলতে একেবারে মাটিতে নয়- সে পড়ল তাদের বাড়ি ঘেরা বাঁশের বাতার তৈরী বেড়ার উপর। যার বাতাগুলো সবই উপর দিকে ছুঁচালো করা। বেচারা এমন ভাবেই সেই ছুঁচালো বেড়ার উপর পড়ল যে তার পেট আর বুক সোজা বাঁশের ছঁচালো বাতা বেশ কয়েকটা একেবারে কষে ঢুকে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই হারু ঐ বেড়ার উপরই পেটে ছুঁচালো বাতা গাঁথা অবস্থায় ছটফট করতে করতে মারা গেল! ঘড়িটা তখনো তার হাতে ধরা ছিল!

Leave a Response