
লেখক: ডাঃ মাসুদা রায়হান
কুরআন বলে, আল্লাহ্ কোনও জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজ অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে। এই সত্যকে অনুধাবন করতে পেরেই দীর্ঘদিনের শোষণ থেকে মুক্তি পেতে পাশ্চাত্য নিয়ন্ত্রিত স্বৈরাচারী শাসক রেজা শাহ পাহলভীর অপশাসনের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিল ইরানের জনগণ। যার ফলশ্রুতি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব। এই পটপরিবর্তনের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ইমাম খোমেনির নাম আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু খুব কম লোকই চেনেন আলী শরীয়তিকে– যিনি ছিলেন এই রাষ্ট্রবিপ্লবের এক তাত্ত্বিক নেতা। তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর আলোকেই তদানীন্তন ইরানের যুবসমাজ চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছিল শাসক ও শোষিতের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে তথা ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠায় ইসলামের প্রতিশ্রুতিসমূহকে।
একদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী লিপ্সার কারণে খর্ব হচ্ছিল ইরানের সার্বভৌমত্ব। রেজা শাহ পাহলভী তা বাঁচাতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন, বরং বলা ভালো পশ্চিমা শক্তিগুলোর পাপেটে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে দেশটির সংস্কৃতি ক্রমশ আকৃষ্ট হচ্ছিল পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দিকে–ইরানি দার্শনিক জালাল আলে ইসলাম যেটার নাম দিয়েছেন ‘ঘর্যাবদেগি’। এক শ্রেণির দরবারি উলামা নিজেদের স্বার্থের তাগিদে শাহের অপকর্মের সমর্থন করে আসছিল। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে এই ত্রয়ী শক্তির পরাজয় ঘটে। তবে এই বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুতির কাজ তিন-চার দশক আগে থেকেই চলছিল। যে শ্রেণির উলেমারা শাসকের কাছে মস্তিষ্ক বন্ধক রাখেননি, তাঁরাই হজরত আলীর ( রা.) জীবনাদর্শ, কারবালায় ইমাম হোসেনের (রা.) শাহাদাত প্রভৃতির দৃষ্টান্ত দিয়ে জনগণকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উৎসাহিত করে যাচ্ছিলেন। এই সময় আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে বিপ্লবী চেতনা নির্মাণে বড় ভূমিকা পালন করেন আলী শরীয়তি, আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মোতাহারী, মাহদি বাজারগান প্রমুখ। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডাস্টিন বার্ডে এই প্রসঙ্গে স্মরণ করান, একদিকে যেমন আছেন অতীতের নানা পয়গম্বর বা প্রফেট, স্বয়ং যীশুখ্রিস্ট, ইমাম আলী (রা.) থেকে ইমাম হোসেন (রা.) প্রমুখ, অন্যদিকে কার্ল মার্ক্স, চে গুয়েভারা, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলার মতো আধুনিক সময়ের ব্যক্তিত্বরা। এদের মধ্যে একদল ধর্মীয় নেতা তো অন্যদল ধর্মনিরপেক্ষ। এই দুই নেতৃত্বের জীবনাদর্শগুলোর মধ্যে আছে বিস্তর ফারাক। আলী শরীয়তির মতো তাত্ত্বিকের সাফল্য এইখানেই যে, তিনি নিজ দার্শনিক চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে এই দুই বিপরীত মেরুর মতকে আধুনিক সময়ের নিরিখে একটা বিন্দুতে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর এই প্রচেষ্টায় সহায়ক ছিল কুরআনের গভীর অধ্যয়ন ও সমসাময়িক পাশ্চাত্য চিন্তকদের ক্ষমতা চর্চার অনুধাবন।
আলী শরীয়তি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৩ সালে ইরানের উত্তর খোরাসান প্রদেশে কাভির মরুভূমির ধারে এক গ্রামে। তাঁর বাবা মোহাম্মদ তঘি শরীয়তিসহ পূর্বপুরুষের বেশ কয়েকজন ছিলেন প্রখ্যাত উলামা। বাল্যকালে প্রথাগত পড়াশোনার চেয়ে সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে জ্ঞান অর্জনে বেশি উৎসাহ ছিল আলী শরীয়তির। তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত Center for Prop-agation of Islamic Truth থেকে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তঘি শরীয়তি কুরআনের জ্ঞানকে খুব যুক্তিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার কাজ করেন আজীবন। পরে আলী শরীয়তি স্বীকার করেন যে, ধর্মীয় জিজ্ঞাসাসমূহের উত্তর পেতে ইজতেহাদের যে পদ্ধতি উনি অনুসরণ করেন, তার অনেকটাই বাবার কর্মকান্ড দ্বারা অনুপ্রাণিত। পরবর্তীতে তিনি মাশহাদের টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ফরাসি ও আরবি ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ১৯৫৬ সালে আবু যার গিফফারির (রা.) উপর একটি বই আরবি থেকে ফার্সিতে অনুবাদ করেন।
১৯৫১ সালে মুহাম্মদ মোসাদ্দেক ইরানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সে দেশে ব্রিটিশ অধিকৃত তেল কোম্পানিগুলোর মালিকানা ইরান সরকারের নামে রাষ্ট্রায়ত্ত করতে উদ্যত হন। এর ফলে শাহের মদতে আমেরিকা ও ব্রিটেন এতদিন যে একচেটিয়া মুনাফা ভোগ করে আসছিল, তাতে ভাটা পড়ার উপক্রম হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে আমেরিকার ও ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা যথাক্রমে সিআইএ ও এম-১৫ মিলিত যোগসাজশে ১৯৫৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে। এর ফলে দেশটির রাশ পূর্বের চেয়েও শক্তভাবে সংহত করেন পাশ্চাত্য শক্তির অঙ্গুলিহেলনে ক্ষমতায় আসীন রাজা রেজা শাহ পাহলভি। এই ঘটনার প্রতিবাদে আলী শরীয়তি ছাত্র বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন ও তাঁকে এর জন্য আট মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। ১৯৫৬ সালে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তিসহ প্যারিসের সোরবর্ন বিশ্ববিদ্যালয় চলে যান। এখানে তিনি ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করেন। সেই সুবাদে জাঁ পল সাত্রে, লুইস ম্যাসিগননের মতো চিন্তকদের সংস্পর্শে আসেন। সেখান থেকেই তিনি ইরানের ছাত্র আন্দোলনের উপর নজর রাখতে থাকেন। এই সময় তিনি বেশ কিছু ফার্সিতে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী পত্রপত্রিকার সম্পাদনার কাজও করেন। একই সাথে চলতে থাকে মার্ক্সবাদ, অস্তিত্ববাদ, ইসলাম, প্রাচ্যবাদ নানা বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা। রেমন্ড এরন, রজার গারুডি (ফরাসি মার্ক্সবাদের এই তাত্ত্বিক পরে ইসলাম কবুল করেন। জায়নবাদ বিরোধী লেখালিখির জন্য ফরাসি সরকার তাঁর বই নিষিদ্ধ ও লেখকের বিরুদ্ধে মামলা করে। সে সময় ইরান সর্বতোভাবে গারুডির পাশে দাঁড়ায়), জর্জ গুরভিচ প্রমুখ সমাজতাত্ত্বিকদের চিন্তাভাবনা থেকে উনি নিজেকে সমৃদ্ধ করেন। শরীয়তি ফ্রান্সে ছাত্রাবস্থায় একবার জেলেও যান কঙ্গোর মুক্তিকামী কৃষ্ণাঙ্গ নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বার সমর্থনে মিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য। দীর্ঘ ন’বছর ফ্রান্সে জ্ঞান চর্চা করে ১৯৬৪ সালে সোরবর্ন বিশ্ববিদ্যালযয়ের ডক্টরেট ডিগ্রিসহ যখন দেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন বিমানবন্দরেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয় বিদেশে বসে তাঁর শাহ বিরোধী কর্মকান্ড ও লেখালিখির জন্য। আট মাস জেলে আটক রাখার পর আন্তর্জাতিক চাপের। মুখে ইরান সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
এরপর আলী শরীয়তি মাশহাদের কলেজ অফ লিটারেচারে, অধ্যাপনা শুরু করেন। বেশ কিছু বছর সেখানে পড়ানোর পর শাহ-বিরোধী বিপ্লবী চিন্তাভাবনার জন্য তাঁকে সেখান থেকে বহিষ্কার করা হয়। তেহরানের হোসেনিয়া এরশাদে যোগ দেন। এখানে শিক্ষকতার সময় তাঁর বক্তব্যগুলো জনমানসে ব্যাপক সমাদৃত হতে থাকে। তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। পরে তা পুস্তিকা বা অডিও টেপ হিসেবে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হত। কিন্তু ১৯৭২ সালে হঠাৎ করে এই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। একদলের মতে শাহের বিরোধিতাই ছিল এর পেছনে মূল কারণ। অপর দল মনে করেন, একদল প্রাচীনপন্থী উলামাদের কারণে। যেহেতু তাঁরা মনে করতেন এর দ্বারা আলী শরীয়তি ইসলামের আড়ালে মার্ক্সবাদ প্রচার করছেন। এরপর আবার আলী শরীয়তিকে কারাবরণ করতে হয় ১৮ মাসের জন্য। জেল থেকে মুক্তি পেয়েও চলতে থাকে লেখালিখি। কিন্তু অবশেষে ১৯৭৭ সালে দেশত্যাগ করে ইংল্যান্ডে চলে যেতে বাধ্য হন। কিছু সপ্তাহ পরে ১৯৭৭ সালের ১৮ জুন ৪৩ বছর বয়সে সাদাম্পটনের এক হাসপাতালে তাঁর মৃত্য হয়। এই মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা মত আছে। কেউ বলে হৃদরোগে, আবার অন্যদলের মতে শাহের গোয়েন্দাদের দ্বারা বিষক্রিয়ার ফলে উনি মারা যান। দামাস্কাসে হযরত জয়নবের (রা.) কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সাক্ষী হতে পারেননি। কিন্তু তাঁর ওফাতের পরও তিনি ইরানের যুবসমাজকে এর জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন রেখে যাওয়া রচনাগুলির মাধ্যমে।
আলী শরীয়তির লেখালিখির ক্ষেত্র ছিল বিস্তৃত। বেশ কিছু লেখা ছিল অন্তর্মুখী- অর্থাৎ মুসলিম সমাজের জন্য কাঙ্খিত সংস্কারের তাগিদে সেগুলো লেখা। কাভির, ইসলাম শোনাসি, ফাতিমা ফাতিমাই, হজ্জ প্রভৃতি বইগুলিকে এই শ্রেণিতে ফেলা যায়। এইসব লেখায় কখনও তিনি সুফিদের মতো কাভির মরুভূমির নিঃসঙ্গতার মধ্যে স্রষ্টাকে খুঁজছেন, তো আবার নানা দেশের মুসলিমদের উদ্দেশে ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবনের ডাক দিচ্ছেন। তদানীন্তন যে পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত মুসলিমেরা নিজেদের যুক্তিবাদী মনে করে ইসলামকে অজ্ঞতা, পশ্চাদপদতার সাথে সমার্থক করে দেখত, আলী শরীয়তি তাঁদের বোঝাতে চেয়েছেন ইসলাম যুগের নিরিখে কতটা অগ্রবর্তী, বিজ্ঞানসম্মত তথা সামাজিক ন্যায় ও সুবিচারের উৎস। তাঁর কাছে ইসলাম ও বিজ্ঞানের মধ্যে কোনও সংঘাত নেই। পরকাল, জান্নাত-জাহান্নাম এগুলো সবই যৌক্তিকতার দাবি। সমকালীন অনেক মাওলানার মননে, মসজিদ-মাদ্রাসাতে ইসলামকে আমরা নিছক কিছু ধর্মীয় আচারাদি হিসেবেই সীমাবদ্ধ দেখতে পায়, সমাজের নানা সমস্যায় ইসলামের দেওয়া সমাধানের ব্যাপারে তাদের অজ্ঞতা দেখি– সেসবের ঊর্ধ্বে উঠে একটা জীবন্ত, সর্বাঙ্গীন তথা স্থিতাবস্থার পরিবর্তনকামী ইসলামের চিত্র আমরা খুঁজে পাই আলী শরীয়তির লেখায়। এইরকমই একটা বই সম্প্রতি মাতৃত্বকালীন ছুটির অবকাশে পড়ার সুযোগ হয়েছিল, যেটির সূত্র ধরেই লেখককে জানার তাড়না। বইটির নাম On the so-ciology of Islam। হামিদ আলগার কর্তৃক ফার্সি থেকে ইংরেজিতে অনূদিত এই বইটিতে শরীয়তি স্রষ্টা ও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ও তার আলোকে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনের করণীয় কর্তব্যসমূহের বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। নানা অধ্যায়ে বিউপনিবেশায়নের সুর ধ্বনিত হয়।
বইটিতে লেখক কুরআন অনুধাবনের জন্য বিশেষ পদ্ধতির অবতারণাও করেছেন। একটি মাত্র পদ্ধতি যথেষ্ট না। কোনও ব্যক্তিত্বকে বুঝতে হলে যেমন তাঁর নিজের লেখার পাশাপাশি তাঁর জীবনীও জানতে হয়, তেমনি ইসলামকে বুঝতে হলে তার ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে ইতিহাসটাও জানতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি উত্তর আফ্রিকার উপনিবেশিকতা বিরোধী সংগ্রামের নেতা মুহাম্মদ আব্দুহের কথা বলেছেন। আলজেরিয়া, তিউনিসিয়ার মাদ্রাসাগুলিতে সে সময় কুরআন অনুধাবনের চেয়ে মুখস্থ করতেই বেশি জোর দেওয়া হত। আব্দুহ বুঝে পড়ার উপর জোর দিলে তা সেখানকার মানুষের মধ্যে সামাজিক চেতনা বৃদ্ধি করতে থাকে। একই কারণে এই বইয়ে আমরা দেখি ইবনে সিনার প্রতি আলী শরীয়তির হতাশা। তাঁর মতে, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মহৎ অবদান থাকা সত্ত্বেও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন ও চলমান সামাজিক পরিস্থিতির উপর পর্যাপ্ত ভাবনাচিন্তা না থাকার ফল হিসেবে জনগণের ‘wretchedness and destruction (দুর্দশাগ্রস্ততা ও বিপর্যয়) অবশ্যম্ভাবী। এখানেই ইশারা পাই, এত ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার প্রতি বছর বাঙালি মুসলিম সমাজ থেকে পাশ করে বেরোনোর পরও দূরবস্থার কারণ অনুধাবনে। সে আলোচনা অন্যদিন। কুরআনের ভাষাগত শৈলী নিয়ে শরীয়তি বলেন, বিভিন্ন চিত্রকল্প ও রূপক ব্যাবহারের মাধ্যমে যেভাবে। নানা সমস্যার সমাধান এখানে বলা হয়েছে– তার মধ্যেই এটির। বাণীর চিরন্তন হবার যথার্থতা অন্তনিহিত। যে কারণে হাফিজের কবিতাকে ইরানিরা অমর মনে করে-পাঠক যখনই এসব পড়ুক না কেন প্রতীকী চরিত্রগুলির মাধ্যমে একেক রকম অর্থ তাঁরা। পাবে। এর তুলনায় কুরআনের বাণীর সর্বজনীনতা অনেক অনেক ব্যাপক।
On the Sociology of Islam বইটিতে উনি আরও বলেন, মাটি ও রূহ দিয়ে মানবসৃষ্টির যে ঘটনা কুরআনে নানা জায়গায় বর্ণিত হয়েছে, তা বেশ অর্থবহ। এই দুই ধরনের উপাদান রূপক অর্থে মানুষের হৃদয়ের মধ্যে চলতে থাকা ভাল-মন্দের দ্বন্দ্বের প্রতিও ইশারা করে। কর্দমাক্ত মাটি তাকে নিচের দিকে টানে, আর রুহের গুণাবলী তাকে আল্লাহর গুণাবলী’-র আদলে মহৎ গুণগুলোর প্রতি ধাবিত হতে বলে। এই দুই ভেক্টরদ্বয়ের লব্ধির মান কেমন হতে দেবে সে স্বাধীনতা মানুষেরই উপর। বিবেক চাইলে সে তলিয়ে যেতে পারে হীনাবস্থার অতলান্তে, আবার ধাবিত হতে পারে অসীম নির্মলতার পানেও। হজরত আদমকে (আ.) সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তাকে বিভিন্ন বস্তুর নাম শিখিয়ে দেন। ফেরেশতাদের বলা হয় তাঁকে সিজদা করতে। শয়ীয়তির মতে, জ্ঞানের পার্থক্যই মানুষকে আল্লাহর কাছে প্রিয়তর করে তোলে। দুনিয়াতে নিজের খলিফা বা প্রতিনিধি পাঠাতে চাওয়ার সদিচ্ছার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার এক আত্মীয়তার বন্ধন। স্রষ্টার স্থান উপরে, সৃষ্টির নিচে–তবু উভয়ের উদ্দেশ্যে যেন কোনও পার্থক্য নেই। আল্লাহ কী চান সেটাই হওয়া উচিত বান্দার জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্য। গ্রিক পুরাণে দেবতার সাথে মানুষের সম্পর্ক দেখানো হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বীর। মানুষের প্রতি এইসব দেবতাদের আচরণে স্বৈরাচার দেখা যায়। শরীয়তির মতে, ইসলামের মহত্ত্ব এখানেই যে, মানুষকে শুরুতেই আলোকিত করা হয়েছে জ্ঞান দিয়ে। On the Sociology of Islam বইয়ে নিজের সমাজভাবনা ইসলামের আলোকে আলী শরীয়তি যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা মুসলিম আলেম-উলামাদের মধ্যে প্রচলিত গতানুগতিক চিন্তাভাবনা থেকে বেশ আলাদা ঘরানার। কুরআনে হাবিল ও কাবিলের গল্পে যে গৃহদ্বন্দ্ব ও তার পরিণতিতে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা আছে, শরীয়তি সেটির রূপক দিকটির প্রতি আলোকপাত করেছেন। তিনি মনে করেন, এখানে আদতে অনাগত ভবিষ্যতে অত্যাচারী ও অত্যাচারিত উভয়ের দ্বন্দ্বকেও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যা পরবর্তীতে প্রত্যেক যুগে, প্রত্যেক সমাজে দেখা গেছে– একদিনে ন্যায়হীন, নিষ্ঠুর, ক্ষমতালোভী, অন্যের অধিকার হরণে মস্ত গোষ্ঠী, আর অন্যদিকে বঞ্চিত, নিপীড়নের শিকার তবু সত্য-ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। লেখকের মতে যদ্দিন মানবসভ্যতা আছে, এই দ্বন্দ্ব থাকবে। ও হাবিল-কাবিলের গল্পের মধ্যে তিনি খুঁজে পান মানব ইতিহাসের সূচনাবিন্দু। পশুপালন নির্ভর সমাজে সমাজতন্ত্র মালিকানাভিত্তিক আধিপত্যকামী সমাজের দ্বান্দ্বিকতার মধ্যে দিয়েই শাসক ও শোষিতের যাত্রা শুরু। এই জন্যই সমাজে একদিকে আছে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাম্যের চেতনা, আর অন্যদিকে বৈষম্য, শোষণ, হিংসা, লোভ, পদানত করার বাসনা। শরীয়তির মতে হাবিলের মৃত্যু ও তাঁর বংশ উৎপাটনের অবধারিত ফল হিসেবেই অসততার বিস্তার ঘটে-শাসনব্যবস্থা, ধর্ম, নৈতিকতা, বিশ্বাস, আচার-ব্যবহার সব ময়দানে কাবিল-সুলভ অবনমন চোখে পড়ে। এই Transhistorical conflict -এরই আরেক রূপ তিনি মনে করেন তৌহিদ ও শির্কের দ্বন্দ্ব। একই সঙ্গে তিনি সেই দিনের প্রতিও দৃঢ়-প্রত্যয়ী যেদিন সত্যের বিজয় হবে- ‘দেশে যাদেরকে দুর্বল করা হয়েছিল, আমার ইচ্ছা হল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করার, তাদেরকে নেতা করার এবং তাদেরকে দেশের উত্তরাধিকারী করার।’ (কুরআন ২৮:৫)।
শিশুর বৃদ্ধির জন্য যেমন শারীরবৃত্তীয় দিকগুলি গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সমানভাবে জরুরি আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ।
আলী শরীয়তির সমাজ বিষয়ক ভাবনাতেও গুরুত্ব পায় এই ত্রিমুখী উন্নয়ন। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অবশ্যই দরকার। বুদ্ধিভিত্তিক উন্নতি সমাজের সদস্যদের রক্ত বা বংশের আত্মীয়গত, স্থানিক বা বস্তুগত স্বার্থের উর্দ্ধে ওঠার অনুপ্রেরণা দেবে। একই জিনিস তাঁকে উদ্বুদ্ধ করবে সমাজের সকল সদস্যের জন্য সমতা ও ন্যায় কায়েম করতে। আজকের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির রমরমার যুগে সকল জাতি-গোষ্ঠী-বর্ণের কায়েমি স্বার্থের উর্ধে উঠে সমাজ পুনর্গঠনের এই ত্রিমুখী বিকল্প বেশ অনন্য। বিশেষ করে এই বইটিতে যে আদর্শ মানুষের স্বরূপ তিনি তুলে ধরেছেন তা আমাদের ভাবায়। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা বিচ্যুত হয়ে আত্মশক্তি ব্যতীত নেহাতই ধর্ম প্রচার করে বা নির্বাচন জিতে কি কোনও সম্প্রদায়ের উন্নতি সম্ভব? ঝরঝরে দার্শনিক কবিতার মতো ভাষায় লেখা তাঁর এই গদ্যের ইংরেজি তরজমা হামিদ আলগার করেছেন এভাবে ” Ideal man passes through the very midst of nature and comes to understand God; he seeks out mankind and thus attains God. He does not bypass nature and turn his back on mankind. He holds the sword of Cae-sar in his hand and fie has the heart of Jesus in his breast. He thinks with the brain of Socra-tes and loves God with the heart of Hallaj. As Alexis Carrel desired, he is a man who under-stands the beauty of science and the beauty of God; lie listens to the words of Pascal and the words of Descartes. Like the Buddha, he is de-livered from the dungeon of pleasure-seeking and egoism; like Lao Tse, he reflects on the profundity of his primordial nature; and like Confucius, he meditates on the fate of society. Like Spartacus, he is a rebel against slaveown-ers, and like Abu Dharr, lie scatters the seed for the revolution of the hungry.”
অবশ্যই আলী শরীয়তির নানা লেখা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। হয়েওছে অনেক। ইসলামের ইতিহাস থেকে উদাহরণ দেবার সময় হজরত আলী (রা.), হজরত ফাতিমা (রা.), ইমাম হোসেন (রা.) বা আবু যার গিফফারি (রা.) প্রমুখের নাম বারবার আসে। মূলত শিয়াদের মনঃপুত ব্যক্তিত্বদের আনাগোনাই তাঁর লেখায় বেশি চোখে পড়ে। তবে জ্ঞান আহরণের ব্যাপারে যে তিনি উন্মুক্ত ছিলেন তা তার পড়াশোনা থেকেও বোঝা যায়। তাই শিয়া ঘেঁষা উদাহরণের আধিক্য থাকলেও তাঁর লেখা শুধু শিয়াদের জন্যই এমনটাও বলা যায় না। বরং আধিপত্যবাদের বিরদ্ধে যে কোনও সমাজে ক্ষমতার চর্চায় লিপ্ত জনগোষ্ঠীর জন্য তা উপকারে আসতে সক্ষম। বিশেষ করে Marxism and Other Western Fallacies: An Islamic Critique (ভারতে এটি প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লির মারকাযি মাকতাবা ইসলামি পাবলিশার্স) বইটিতে আলী শরীয়তির বহির্মুখী লেখাগুলো পাওয়া যায়। এই বইতে তিনি মার্ক্সবাদ, উদারনীতি (liberalism) ও অস্তিত্ববাদ (existentialism) প্রভৃতির। সমালোচনা পেশ করেছেন। সমাধান হিসেবে আলী শরীয়তি তাঁর নানা লেখায় যে সমাজকে বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেন, তার প্রতিষ্ঠা শিয়া সমাজের বাইরে কতটা সম্ভব– এই নিয়ে। প্রশ্নের অবকাশ আছে। মার্ক্সবাদীদের জন্য তিনি এক ধাঁধা। তাঁর সমাজবিল্পবের ধারনায় ‘শ্রেণিহীন সমাজ’, ‘ঐতিহাসিক নিয়তিবাদ’ ইত্যাদি শব্দের বারবার ব্যবহার সত্ত্বেও এটা পরিষ্কার যে, তিনি মার্ক্সবাদী ছিলেন না। বরং বলা যায় একজন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। বিশ্বাসী হিসেবে তিনি মার্ক্সের অনেক চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তিনি নিজেকে বলেছেন ‘আস্তিক সমাজতান্ত্রিক’, তাঁর ভাবনাকে রেড শিয়াইজম’। তিনি মনে করেন ন্যায় ও সমতার পৃথিবী নির্মাণের যে স্বপ্ন মার্ক্সবাদীরা দেখেন, সেই একই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতিযোগিতায় আদর্শিকভাবে তাঁদের উন্নততর প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে ইসলাম। আজকের পৃথিবীতে যেভাবে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক চিন্তা দেশে দেশে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, সেই নিরিখে নানা বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করেও আলী শরীয়তি পাঠ জরুরি। আধিপত্যবাদের বিরোধিতা তিনি করেছেন তাঁর কলম ও জীবন দিয়ে।
তথ্য সহায়তা:
১) উত্তর আধুনিক মুসলিম মন, ফাহমিদ-উর-রহমান
২) Ali Shariati Teacher, Preacher, Rebel.
৩) Ali Rahnema
৩) Barbara Celarent’s review of On the Sociology of Islam by Ali Shari’ati; Marxism and Other Western Fallacies by Ali Shari’ati, American Journal of Sociology, Vol. 117, No. 4(January 2012)
8) Shariati and Marx: A Critique of an ‘ls-lamic’ Critique of Marxism, Assef Bayat
৫) Ali Shariati and the Future of Social The-ory: Religion, Revolution, and the Role of the Intellectual, Dustin J. Byrd and Seyed Javad Miri
(ব্রিটেনে বসবাসরত লেখিকা পেশায় চিকিৎসক)





