Article

গ্যাজেটের ফাঁদে আবদ্ধ সম্পর্কের জাল

48views

আজকের দ্রুতগতির ভোগবাদী দুনিয়ায় মানুষ প্রায়ই নিজের সীমাহীন ভোগ-লালসাকে অতিক্রম করতে না পেরে স্বার্থপর হয়ে পড়ে। সমাজবদ্ধ প্রাণী হিসেবেও মানুষ ক্রমশ বাস্তব জগতে কম সামাজিক আর ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বেশি সামাজিক হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীলতা তাকে অলস ও নিষ্ক্রিয় করে তুলেছে। আজ ভবন ধ্বংস করা থেকে শুরু করে নখ কাটা – সবই সম্ভব হচ্ছে গ্যাজেটের মাধ্যমে।

মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন গ্যাজেট ব্যবহারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক গুরুতর সমস্যা। অতিরিক্ত ইন্টারনেট, গেমিং ও মোবাইল আসক্তি ইতিমধ্যেই উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছিল কোভিড-পূর্ব যুগেই। মনোবিদ ও কাউন্সেলররা বলছেন, মহামারির সময়ে এ প্রবণতা নতুন মাত্রা পায়। কারণ, অনেক শিশু অনলাইন ক্লাস ও ভার্চুয়াল সামাজিক যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেটে যুক্ত হতে গিয়ে অবচেতনে আসক্তির শিকার হয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা গ্যাজেট আসক্তি এবং তা কীভাবে মানব-সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে, তা নিয়ে আলোচনা করব।

আজকের দিনে প্রযুক্তি ও গ্যাজেট ব্যবহার হয় প্রায় প্রতিটি কাজে। বিল দেওয়া, অনলাইনে খাবার অর্ডার, গেম খেলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানো, অনলাইনে কেনাকাটা – এসব কিছুতেই গ্যাজেট ছাড়া আমাদের চলেই না। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, গ্যাজেট আমাদের দাস হওয়ার পরিবর্তে আমরা নিজেরাই গ্যাজেটের দাসে পরিণত হয়েছি।

গ্যাজেট আসক্তি

আজ এমন এক বাস্তবতায় আমরা বাস করছি, যেখানে জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই গ্যাজেটের ব্যবহার নেই – এমন উদাহরণ প্রায় নেই বললেই চলে। প্রিয়জন বা পরিবারের মানুষদের ছাড়া পৃথিবী কল্পনা করা অনেকের কাছে হয়তো সহজ, কিন্তু গ্যাজেট ছাড়া পৃথিবী কল্পনা করা একেবারেই অসম্ভব মনে হয়। খাওয়ার সময় টিভি দেখা এখন যেন নতুন সংস্কৃতি; এমনকি অনেকের কাছে পর্দা ছাড়া খাবার খাওয়াটা পাহাড় ওঠার মতো কঠিন মনে হয়। আগে পরিবারের মানুষজন একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিত, আজ ভাই-বোনেরা পর্যন্ত জানে না কে কী পড়াশোনা করছে বা কোন কাজে ব্যস্ত। পরিবারগুলো যেন সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আজকাল অনেক ঘরবাড়িই ‘স্মার্ট হোম’-এ রূপান্তরিত হচ্ছে, কিন্তু একে স্মার্ট না বলে ‘অস্মার্ট’ বলা হয়তো বেশি যথার্থ হবে।

এই নতুন স্মার্ট হোমে মানুষ শুধু নিজের কণ্ঠ দিয়েই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কেবল নির্দেশ দিলেই গ্যাজেট বাকি সব কাজ সম্পন্ন করে দেয়। ফলে সাহায্য চাওয়া, বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে ছোটদের কাজ দেওয়া কিংবা নিজের হাতে কাজ করার যে অভ্যাস, তা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট এসব পরিবর্তন পারিবারিক কাঠামোয় ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলছে, আর শেষ পর্যন্ত তা সমাজকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম গ্যাজেটের কারণে ক্রমশ অলস হয়ে পড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত পরিবার ভেঙে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। যাদের দায়িত্ব পরিবারের উপার্জন ও চালনা করা, সেই তরুণরাই গ্যাজেট আসক্তির কারণে প্রায় অকর্মণ্য হয়ে পড়ছে।

আজ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও নষ্ট হচ্ছে এই গ্যাজেট নির্ভরতার ফলে। পুরুষ ও নারীর পারস্পরিক নির্ভরশীলতা গ্যাজেটের আধিক্যে কমে আসছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্পর্ক রক্ষার মানবিক মূল্যবোধকে ক্রমশ ক্ষয় করে দিচ্ছে। দিনকে দিন মানুষ হয়ে উঠছে আরও অন্তর্মুখী, নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে সম্পর্ক ও সমাজ থেকে।

গ্যাজেট ও শিশু বিকাশ

পিতৃত্ব-মাতৃত্ব মানবজীবনের সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক। একটি পরিবার যদিও শুরু হয় বিবাহের মাধ্যমে, তবু সেটি প্রকৃত অর্থে বেড়ে ওঠে এবং দৃঢ় হয় সন্তানের আগমনে। একটি শিশুর লালন-পালন, তার মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মে সম্পর্কের বন্ধন অটুট রাখা – এ এক বিশাল দায়িত্ব। কিন্তু গ্যাজেটের অতিরিক্ত ব্যবহার সেই লালন-পালনকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। এর ফলে শিশুর বেড়ে ওঠায় মারাত্মক প্রভাব পড়ছে, আর শিশুরাই যখন সমাজের ভিত্তি, তখন তা অবধারিতভাবে সম্পর্ককেও দুর্বল করে দিচ্ছে।

আজকাল অনেক অভিভাবক কাঁদতে থাকা শিশুকে শান্ত করার সহজ উপায় হিসেবে তার স্ক্রিন টাইম বাড়িয়ে দেন। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা পরবর্তীকালে সম্পর্ককে শ্রদ্ধা করতে শেখে না। গ্যাজেট আসক্তি শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলে, প্রকৃতির সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত করে, স্থূলতা ডেকে আনে এবং ঘুমের ঘাটতি তৈরি করে। গ্যাজেটের অতিরিক্ত ব্যবহার মনোযোগ ঘাটতির সমস্যা যেমন এডিএইচডি, এমনকি শিশুর কথোপকথন ও ভাষা বিকাশেও বিলম্ব ঘটায়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অভিভাবকেরা যত বেশি সময় ধরে শিশুর হাতে স্ক্রিন ধরিয়ে দেন, শিশুর ভাষা বিকাশে বিলম্বের ঝুঁকি ততটাই বাড়ে। গবেষকেরা জানান, প্রতিদিনের স্ক্রিন টাইমে প্রতি ৩০ মিনিট বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিশুর ভাষা প্রকাশে বিলম্ব হওয়ার ঝুঁকি ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

অন্য এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ছয় মাস থেকে দুই বছরের শিশু যদি দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা প্লে-স্টেশনের মতো হ্যান্ডহেল্ড স্ক্রিন ব্যবহার করে, তবে তাদের কথাবলার বিকাশে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে।

গ্যাজেট ও গেমিং

গেমিং শিল্প দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। এর সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে সহিংসতা, গুলি, খুন, যুদ্ধ ইত্যাদিভিত্তিক গেমের সংখ্যা। এমন গেম মানুষের আচরণকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়েই, যারা নিয়মিত গেম খেলে অভ্যস্ত, তারা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিটি বিষয়কে সহিংস মনোভাব নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়। এর ফলে তাদের পরিবার হোক বা বন্ধুত্বের সম্পর্ক – সবই হয়ে ওঠে বিষাক্ত। কোনো সম্পর্কেই যদি সহিংসতা প্রবেশ করে, তবে সেই সম্পর্ক ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।

সহিংসতার পাশাপাশি গেমগুলো অশ্লীলতাও ছড়িয়ে দিচ্ছে। নারী-দেহের অশ্লীল চিত্র ব্যবহার এখন অনেক গেমেই এক সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজে এ ধরনের অশ্লীলতা নৈতিক অবক্ষয় ডেকে আনে, যা শেষ পর্যন্ত যৌন অপরাধ বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং বিবাহিত সম্পর্ককেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মানুষ তাদের সঙ্গী, বন্ধু কিংবা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও সেই একই রকম আচরণ প্রত্যাশা করতে শুরু করেছে, যা তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্য কারও মধ্যে দেখে। দুনিয়াকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চোখ দিয়ে দেখা এবং ভেবে নেওয়া যে একই জিনিস আমাদের জীবনেও ঘটবে – এটাই এখন নতুন প্রবণতা। কিন্তু এর ফলে সম্পর্কের ভিতটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

অবাস্তব প্রত্যাশা মানুষকে মানসিক রোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের যে আশীর্বাদগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে খুশি থাকা এবং সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা আজকাল খুবই বিরল। সময় নষ্ট করা, গোপনীয়তার অভাব, সরাসরি মেলামেশার ঘাটতি – এসবই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসক্তির আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক।

কীভাবে এর সমাধান সম্ভব?

এই আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। এর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করা। একটি প্রবাদ আছে: “যে পরিবার একসঙ্গে খায়, সেই পরিবার একসঙ্গে থাকে।” মানুষের উচিত প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট একত্রে বসা, যেখানে কোনো ইন্টারনেট বা গ্যাজেট ব্যবহার করা হবে না। অন্যকে সেবা করা এক বিরল সৌভাগ্য, যা খুব কম মানুষই পায়। যে কাজগুলো সহজেই শারীরিকভাবে করা সম্ভব, সেগুলোতে গ্যাজেটের সাহায্য না নেওয়াই ভালো।

গ্যাজেটের উপর অতি নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। স্ক্রিন টাইম অবশ্যই সীমিত করা উচিত। অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে যে শিশুদের ডিজিটাল শিক্ষার ব্যবহার সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা। নির্দিষ্ট সময় ধরে পড়াশোনা, খেলার সময় ইত্যাদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা উচিত এবং পরিবারের সবার একত্রে সময় কাটানো জরুরি।

উপসংহার

আমরা প্রত্যেকেই হয়তো জীবনে অন্তত একবার এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি কিংবা টেরই পাইনি, যেখানে আমরা জীবনের একটি আবেগঘন মুহূর্ত হারিয়ে ফেলেছি, শুধুমাত্র কানে ইয়ারফোন লাগানো ছিল বলে, আর আমরা বুঝতেই পারিনি যে সেই মুহূর্ত আর কখনো ফিরে আসবে না।

আজ আমরা বলি, দুনিয়া আমাদের আঙুলের ডগায়। গ্যাজেটের কল্যাণে আমরা হয়তো গোটা বিশ্বকে একত্রে এনেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি তাই? কারণ, যখন আমরা নিজেদের ঘরের ভেতর তাকাই, তখন মনে হয়, আমরা কি না আবার নিজের ঘরেই সম্পর্কের মাঝে এক অদৃশ্য প্রাচীর দাঁড় করিয়ে ফেলেছি?

লিখেছেন- নিহাল মুহাম্মদ

Leave a Response