Article

যুবসমাজের জুয়া আসক্তি: ঐতিহাসিক শিকড়, সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ ও ইসলামী দিকনির্দেশনা

121views

জুয়া বলতে বোঝায় এমন কোনও খেলা বা কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করা, যেখানে মানুষ অর্থ বা মূল্যবান কোনও বস্তু ঝুঁকিতে রাখে, এই আশায় যে তিনি আরও বেশি অর্থ জিততে পারবেন। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে খেলা বা ক্রীড়া বাজি, লটারি টিকিট কেনা কিংবা অন্যান্য মাধ্যমে – সব ক্ষেত্রেই মূল ধারণাটি একই থাকে: অর্থ ঝুঁকিতে রেখে বেশি অর্থ ফেরত পাওয়ার আশা, যেখানে ফলাফল নির্ধারিত হয় মূলত ভাগ্যের ওপর।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
জুয়ার ইতিহাস বহু পুরনো। প্রাচীন চীন, মিশর ও গ্রিসে সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবেই ভাগ্যনির্ভর খেলাগুলো প্রচলিত ছিল। প্রাচীন যুগের পাশা খেলা এবং লটারিই ছিল তার প্রথম দিকের রূপ। ইউরোপে এটি টিকে ছিল তাসের খেলা ও পশু লড়াইয়ে বাজি ধরার মাধ্যমে। উনিশ ও বিংশ শতাব্দীতে জুয়া আরও সংগঠিত রূপ পায়। ঘোড়দৌড়ে বাজি ধরা জনপ্রিয় হয়, পাশাপাশি ক্যাসিনোর উত্থান ঘটে। বিশেষ করে ১৯৩০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে ক্যাসিনো বৈধ হওয়ার পর এই খাত ব্যাপক প্রসার লাভ করে। স্লট মেশিন, টেলিভিশনে ঘোড়দৌড় সম্প্রচার এবং পরবর্তী প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বিশ্বব্যাপী জুয়াকে সহজলভ্য ও আকর্ষণীয় করে তোলে। এভাবেই ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির মিশেলে আধুনিক জুয়ার রূপ গড়ে উঠেছে, যা আজও পরিবর্তিত হচ্ছে।

যুব সমাজে জুয়া বৃদ্ধির কারণসমূহ

১. প্রযুক্তিগত সহজলভ্যতা

• সহজ প্রবেশাধিকার: অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো তরুণদের কাছে জুয়াকে সহজলভ্য করেছে। অনলাইন ক্যাসিনো, স্পোর্টস বেটিং সাইট এবং ভার্চুয়াল লটারি – সবই স্মার্টফোন বা কম্পিউটার থেকে সহজে ব্যবহার করা যায়। এর ফলে তরুণদের মধ্যে জুয়ায় অংশগ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে।

• গোপনীয়তা: এই প্ল্যাটফর্মগুলো তরুণদের এমন এক গোপনীয়তার সুযোগ দেয়, যাতে তারা বিচার বা অভিভাবকের নজরদারির ভয় ছাড়াই জুয়ায় যুক্ত হতে পারে। প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে এটি খুব সহজ ও একান্ত ব্যক্তিগতভাবে করা সম্ভব, যা বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলো থেকে সাময়িক মুক্তির পথ বলে মনে হয়। এছাড়া, অনলাইন জুয়ার ভার্চুয়াল কমিউনিটিগুলো তরুণদেরকে সমর্থন ও উৎসাহ জোগায়, ফলে তারা একটি বিশেষ গোষ্ঠীর অংশ বলে অনুভব করে। এইসব কারণে তরুণদের কাছে জুয়া আরও আকর্ষণীয় ও সহজসাধ্য হয়ে উঠেছে।

২. ভিডিও গেমে জুয়ার সংযুক্তি

লুট বক্স ও ইন-গেম কেনাকাটা:
ভিডিও গেমের লুট বক্স ও ইন-গেম কেনাকাটা জুয়ার মতো এক ধরনের কাঠামো তৈরি করে। এখানে খেলোয়াড়রা অর্থ খরচ করে এমন কিছু র‍্যান্ডম পুরস্কার পায়, যেমন অস্ত্র বা গেমপ্লে উন্নত করার অন্যান্য সামগ্রী। এর ফলে প্রচলিত জুয়ার মতো অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। খেলোয়াড়রা বাস্তব অর্থ ব্যয় করে মূল্যবান ইন-গেম আইটেম পাওয়ার সুযোগ খোঁজে, যা একেবারে জুয়ার মানসিকতার প্রতিফলন। লুট বক্স খোলার সময় যে উত্তেজনা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়, তা আসক্তিমূলক আচরণে রূপ নিতে পারে, বিশেষত তরুণদের মধ্যে। এর ফলে তাদের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব পড়ে।

৩. মিডিয়া ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্বাভাবিকীকরণ:

সিনেমা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং অনলাইন কনটেন্টে জুয়াকে প্রায়শই এক আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর কার্যকলাপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতাকে প্রভাবিত করে। জুয়া কোম্পানিগুলির আক্রমণাত্মক বিপণন কৌশল, বিশেষ করে জনপ্রিয় স্পোর্টস টিম ও বড় বড় ইভেন্টের স্পনসরশিপের মাধ্যমে জুয়াকে স্বাভাবিক ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলছে। তরুণরা নিয়মিতভাবে এসব বিজ্ঞাপনের মুখোমুখি হয়, যার ফলে জুয়া তাদের কাছে এক সাধারণ ও অনুমোদিত বিনোদনের মাধ্যম বলে মনে হয়। ফলে এটিকে জীবনে সহজতম এবং সবচেয়ে বিলাসবহুল উপায়ে লাভবান হওয়ার রাস্তাস্বরূপ তুলে ধরা হচ্ছে।

৪. সামাজিক ও অনলাইন যোগাযোগ

তরুণরা প্রায়ই সামাজিক পরিবেশে জুয়ায় যুক্ত হয়, যেমন বন্ধুদের সঙ্গে ক্রীড়া ম্যাচে বাজি ধরা বা অবসরে নির্দিষ্ট গেম খেলা। সমবয়সীদের চাপ এবং দলে মিশে যাওয়ার ইচ্ছাই তাদেরকে এসব জুয়া কার্যকলাপে আরও বেশি অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে।

৫. মানসিক ও বিকাশজনিত কারণ

কৈশোরে মস্তিষ্কের বিকাশ চলমান থাকে, বিশেষত যে অংশগুলো আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দায়ী। ফলে কিশোর-কিশোরীরা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে, যেমন জুয়ায়, বেশি জড়িয়ে পড়ে। এই বয়সে তারা উত্তেজনা ও তাৎক্ষণিক পুরস্কারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়, অথচ দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি সঠিকভাবে বিচার করতে পারে না। তাই জুয়া তাদের কাছে আরও প্রলুব্ধকর মনে হয়।

৬. অপর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিক্রিয়া

অনেক অঞ্চলে তরুণদের জুয়া নিয়ন্ত্রণে আইন যথেষ্ট কঠোর নয়। বিদ্যমান আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং নানা ফাঁকফোকর তরুণদের সহজে জুয়ায় অংশ নিতে সুযোগ করে দেয়। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নতুন জুয়ার ধরণ ও প্রযুক্তির সাথে খাপ খাওয়াতে দেরি করে, ফলে যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগেই এসব নতুন রূপ দ্রুত বিস্তার লাভ করে।

প্রাদুর্ভাব ও কিশোর-কিশোরীদের সম্পৃক্ততা

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ৬০-৮০% হাই স্কুল শিক্ষার্থী জুয়ায় অংশগ্রহণ করে, যাদের মধ্যে প্রায় ৬% সমস্যা-জনিত জুয়াড়ি হিসেবে চিহ্নিত। যুক্তরাজ্যে ১১-১৬ বছর বয়সী ৩৭% কিশোর-কিশোরী গত এক বছরে জুয়ায় অংশ নিয়েছে, এবং তাদের মধ্যে ১৪% প্রতি সপ্তাহে নিজস্ব অর্থ ব্যয় করে জুয়া খেলে। কানাডায় একই ধরণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যেখানে গ্রেড ৭-১২-এর ৪২% শিক্ষার্থী জুয়ায় অংশ নিয়েছে। নিউজিল্যান্ডে ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ৩৬% জুয়ায় যুক্ত হয়েছে।

ভারতের বেঙ্গালুরুতে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্সেস পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৩-১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ১৩.৬% গত এক বছরে কোনো না কোনো ধরনের জুয়ায় অংশ নিয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৫% কিশোর-কিশোরী সমস্যা-জনিত জুয়াড়ি হিসেবে শনাক্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে অতিরিক্ত বাজি ধরা ও জুয়ায় আসক্তির মতো আচরণ দেখা গেছে। এছাড়া, ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ফ্যান্টাসি স্পোর্টস (এফআইএফএস)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২০ সাল নাগাদ ভারতে ফ্যান্টাসি স্পোর্টস প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ১০ কোটিরও বেশি, যার একটি বড় অংশ তরুণ প্রজন্ম।

মানসিক ও সামাজিক আচরণের উপর প্রভাব

জুয়া ও বাজি তরুণদের জীবনের নানান ক্ষেত্রে বহুমুখী প্রভাব ফেলে, যেমন মানসিক স্বাস্থ্য, আর্থিক অবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক, আবেগগত সুস্থতা, শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা এবং এমনকি অপরাধপ্রবণ মানসিকতা গঠনের সম্ভাবনা।

• উদ্বেগ ও হতাশা:
যেসব তরুণ জুয়ায় যুক্ত হয়, তারা উদ্বেগ ও হতাশায় ভোগার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। অর্থ হারানোর চাপ, সঙ্গে অপরাধবোধ ও লজ্জা – এসব মিলে তাদের মানসিক সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে হতাশা গভীর আকার ধারণ করে, এমনকি আত্মহননের চিন্তাও জন্ম নিতে পারে।

• ঋণগ্রস্ততা ও আর্থিক অস্থিরতা:
তরুণ জুয়াড়িরা প্রায়ই বড় ঋণে জড়িয়ে পড়ে। তারা অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত অর্থ খরচ করে ফেলে, বন্ধু-বান্ধব বা পরিবারের কাছ থেকে ধার করে, এমনকি অবৈধ কাজেও জড়িয়ে পড়ে। এই আর্থিক অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয়ক্ষমতা নষ্ট করে দেয় এবং পরিবারের উপরও প্রভাব ফেলে। পরিবারকে প্রায়শই তাদের ঋণ শোধ করতে বা আর্থিক সহায়তা দিতে হয়, যা গৃহের ভেতর চাপ ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।

• সামাজিক সম্পর্ক:
সমস্যাজনিত জুয়া তরুণদের সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। তারা পরিবার ও বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যায় – কখনও জুয়া লুকানোর জন্য, আবার কখনও পুরো সময় ও মনোযোগ জুয়াতে ব্যয় করার কারণে। জুয়ার জয়-পরাজয়ের ওঠা-নামা তাদের আবেগে অস্থিরতা তৈরি করে, যা সামাজিক সম্পর্ককে আরও দুর্বল করে তোলে।

• শিক্ষাক্ষেত্রে অবনতি:
জুয়ায় সময় ও শক্তি ব্যয় হওয়ার কারণে শিক্ষার প্রতি মনোযোগ কমে যায়। এর ফলে পরীক্ষার ফল খারাপ হয় এবং শিক্ষাবিষয়ক কার্যকলাপ থেকে তারা বিমুখ হয়ে পড়ে। স্কুল ফাঁকি দেওয়া, ক্লাসে মনোযোগের অভাব – এসব আচরণ তরুণ জুয়াড়িদের মধ্যে সাধারণ, যা প্রায়ই শৃঙ্খলাভঙ্গজনিত সমস্যার দিকে নিয়ে যায়।

• অবৈধ কাজে সম্পৃক্ততা:
নিজেদের জুয়ার খরচ চালানো বা ঋণ শোধ করার জন্য তরুণরা চুরি, প্রতারণা কিংবা মাদক ব্যবসার মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, সমস্যাজনিত জুয়া ও অপরাধমূলক আচরণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে—অনেক তরুণ জুয়াড়ির অপরাধকর্মে জড়ানোর প্রবণতা বেশি থাকে।

প্রভাব ও প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ

যুবসমাজে জুয়ার প্রসার নানা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে—যেমন আর্থিক সংকট, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অবনতি। এসব প্রভাব কমাতে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

• নিয়ন্ত্রণ ও নীতি:
সরকারের উচিত আরও কঠোর আইন প্রয়োগ করা, জুয়া প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করা এবং ভিডিও গেমে জুয়ার মতো বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ন্ত্রণ করা। বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের মতো কিছু দেশ ইতিমধ্যেই লুট বক্স নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছে।

• শিক্ষা, সচেতনতা ও সহায়তা সেবা:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের তরুণদের জুয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। আর্থিক সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ শেখানোর মতো শিক্ষামূলক কর্মসূচি জুয়ায় আসক্তি প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে তরুণ জুয়াড়িদের জন্য পরামর্শ ও সহায়তা সেবার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। হেল্পলাইন, অনলাইন রিসোর্স ও কমিউনিটি প্রোগ্রাম – এসবই আসক্তির সঙ্গে লড়াই করা তরুণদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারে।

• যুব ও সহায়তা গোষ্ঠী:
বিকল্প বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে, যাতে তারা সুস্থ উপায়ে চাপ ও বিনোদনের সুযোগ পায়। খেলাধুলা, শিল্পচর্চা ও সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রম জুয়ার বিকল্প হিসেবে কার্যকর হতে পারে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ বা ইতিমধ্যেই জুয়ায় জড়িত তরুণদের জন্য সহায়তা গোষ্ঠী গঠন করা যেতে পারে। এসব গোষ্ঠী তাদের সমবয়সীদের সমর্থন, পরামর্শ এবং বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারে।

• প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপ:
স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্কুলের কাউন্সেলিং সেবায় জুয়া-সম্পর্কিত সমস্যার স্ক্রিনিং অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। প্রাথমিক পর্যায়েই সমস্যার চিহ্নিতকরণ সময়মতো সহায়তা ও হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে পারে। যেসব তরুণ জুয়ার আসক্তিতে ভুগছে তাদের জন্য পরামর্শ ও থেরাপির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি) এবং অন্যান্য প্রমাণ-ভিত্তিক পদ্ধতি জুয়া-সম্পর্কিত সমস্যার চিকিৎসায় কার্যকর হতে পারে।

ইসলামের দৃষ্টিকোণ

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জুয়া ও বাজি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এটি একটি কবীরা গুনাহ হিসেবে গণ্য। কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “হে মু’মিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি ইত্যাদি এবং লটারীর তীর, এ সব গর্হিত বিষয়, শাইতানী কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং এ থেকে সম্পূর্ণ রূপে দূরে থাক, যেন তোমাদের কল্যাণ হয়।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৯০)

এই আয়াত সরাসরি জুয়া নিষিদ্ধ করেছে এবং একে নৈতিক অধঃপতনের অন্যান্য কাজের সমকক্ষ করেছে। কুরআন জুয়াকে শয়তানের অস্ত্র বলে অভিহিত করেছে, যার উদ্দেশ্য মানুষকে বিভেদে জড়ানো ও আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বলে, ‘আস, আমরা জুয়া খেলি,’ তার উচিত সদকা করা।”এই হাদিস জুয়ার গুরুত্ব ও ভয়াবহতা তুলে ধরে, এমনকি শুধু প্রস্তাব দেওয়ার অপরাধেও সদকা করার মাধ্যমে গুনাহ মোচনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ইসলামে জুয়া হারাম ঘোষণার পেছনে বহু নৈতিক কারণ রয়েছে। এটি মানুষকে নামাজ, রোজা ও আল্লাহর স্মরণের মতো ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। জুয়া লোভ, স্বার্থপরতা ও পরিশ্রম ছাড়া দ্রুত অর্থ অর্জনের প্রবণতা তৈরি করে, যা ইসলামের পরিশ্রম, সন্তুষ্টি ও হালাল উপার্জনের নীতির বিরোধী।ইসলাম সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখায় এবং অপচয় কঠোরভাবে নিন্দা করে। অথচ জুয়া প্রায়শই মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়, যা অন্যথায় পরিবারের ভরণপোষণ, দরিদ্রদের সাহায্য অথবা সমাজকল্যাণে ব্যয় করা যেত।

ইসলামের দৃষ্টিতে জুয়া স্পষ্ট ও সন্দেহাতীতভাবে একটি কবীরা গুনাহ। এর রয়েছে গভীর নৈতিক, আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতি। তাই এর মোকাবিলায় প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ—শিক্ষা, আধ্যাত্মিক সহায়তা, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং আইনগত সীমাবদ্ধতার পক্ষে প্রচারণা। ইসলামী নীতিমালা মেনে এবং সহায়ক সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলে আমরা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে জুয়ার ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিরোধ ও হ্রাস করতে পারি।

উপসংহার:
ঐতিহাসিক অভ্যাস এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে যুবসমাজের মধ্যে জুয়া এক গুরুতর সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর ফলে আর্থিক অস্থিরতা, মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং ভিডিও গেমের ভেতর সংযুক্ত জুয়া-সদৃশ ফিচারগুলো জুয়ার সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছে এবং তরুণদের কাছে এটিকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন কঠোর নিয়মনীতি, শিক্ষামূলক উদ্যোগ, সহায়ক পরিষেবা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপমূলক কর্মসূচি। পরিবার, সমাজ, সরকার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে তরুণদের জুয়ার ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এবং সুস্থ অভ্যাস ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ গড়ে তুলতে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, জুয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, কারণ এটি নৈতিক চরিত্র এবং সামাজিক কল্যাণকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইসলাম সঠিকভাবে সম্পদের ব্যবহার এবং আধ্যাত্মিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেয়। পরিশ্রম, নৈতিক উপায়ে উপার্জন এবং সন্তুষ্টির চর্চা ইসলামি শিক্ষার মূলভিত্তি, যা জুয়া প্রচারিত লোভ, দ্রুত অযৌক্তিক লাভের আকাঙ্ক্ষা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের বিপরীত। সুতরাং ইসলামের শিক্ষায় জুয়া শুধু একটি ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, বরং একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত, যা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য।

লেখক: ওবাইদুর রহমান

Leave a Response