Uncategorized

নবাবী শহরের কাটরা মসজিদ

799views

সৌমেন জানা

দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততার ফাঁকে একটু অবসর পেলেই মনটা উড়ু উড়ু করে ওঠে। ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির কাছে সেটাই স্বাভাবিক। এরকমই এক সুযোগে পাড়ি দিলাম অতীতের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক শহর মুর্শিদাবাদের দিকে।হালকা রক্তআভা ছড়ানো বসন্তের ভোরের আকাশ। পিঠে ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়ে কলকাতা স্টেশন থেকে ‘হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেসে’ চেপে বসলাম। পরিচিত বাংলার মাঠ, সবুজ ধানখেত, সাজানো ছোট ছোট গ্রাম দেখার সাথে পথচলতি নানা মুখরোচকের স্বাদ নিতে নিতে ঘণ্টা পাঁচেকের ট্রেন জার্নি শেষে পৌঁছালাম নবাবের শহর মুর্শিদাবাদে।

মুর্শিদাবাদ নামটা শুধু বাঙালি সমাজেই নয় কিংবা বাংলা, বিহার, ওডিশাতে নয় বরং সারা ভারতে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। মুর্শিদাবাদের প্রতি ইঞ্চি জমিতে মিশে আছে অতীত দিনের সোনালি স্মৃতিচিহ্ন, হাসি-কান্নার না বলা কত কথা, সুখ-দুঃখের কত না ফল্গুধারা। অনেকের ধারণা, মুর্শিদাবাদ মানে শুধু ‘হাজারদুয়ারি’ নয়। এখানকার অলিতে গলিতে মিশে আছে ইতিহাস। কাটরা মসজিদ এদের মধ্যে অন্যতম।মুর্শিদাবাদ স্টেশনের দেড় কিলোমিটার পূর্বদিকে বাজারের পাশে অবস্থিত কাটরা মসজিদ। কাটরা মসজিদটি ঢাকার করতলব খান মসজিদের অনুকরণে ১৭২৩ এবং ১৭২৪ সালের মধ্যে তৈরি হয়। মুর্শিদকুলি খান ঢাকা থেকে ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করেন। তাঁর নামানুসারে নতুন রাজধানীর নাম হয় মুর্শিদাবাদ। কাটরা মসজিদটি নতুন রাজধানীর জামে মসজিদ হিসেবে তৈরি করা হয়। মুর্শিদকুলি খানের সমাধি হিসাবে এর গুরুত্ব অপরিসীম।সম্পূর্ণ মসজিদটি আকারে চতুর্ভূজাকৃতি, পুরো মসজিদটিতে অনেক সুদৃশ্য খিলান রয়েছে। মসজিদের সামনের দিকে রয়েছে বহু ভাঁজযুক্ত খিলানের মধ্যে পাঁচটি প্রবেশ খিলান। মসজিদটি আয়তাকৃতির পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট। এটি ইট দিয়ে তৈরি এবং চারকোনায় রয়েছে চারটি বিশাল মিনার। বর্গাকার প্রাঙ্গণের চার কোণে রয়েছে চারটি বুরুজ বা নজর মিনার। মিনারগুলোর আকৃতি অষ্টাভুজাকৃতি। বুরুজগুলি সরু হয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে। বুরুজের ভিতর একটা প্যাঁচানো সিঁড়িপথ আছে। বর্তমানে শুধুমাত্র উত্তর-পশ্চিমে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের দুটি পার্শ্ব বুরুজ অবশিষ্ট রয়েছে। মিনারগুলো ৭০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট এবং চওড়ায় প্রায় ২০ ফুট। উঁচু মিনারগুলো কালের আবর্তে আজ জরাজীর্ণ। মিনারের গম্বুজগুলো ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো এগুলোতে বন্দুক রাখার জন্য গর্ত রয়েছে।মসজিদটির চারদিকেই সারি দিয়ে দোতালা ঘর। এগুলো প্রায় ভগ্নাবস্থায় টিকে রয়েছে। এই ঘরগুলি একসময় মাদ্রাসা হিসাবে ব্যবহৃত হতো। এই মসজিদের নির্মাতা মুর্শিদকুলি খানের সমাধি রয়েছে মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ তোরণের নিচে একটি ছোট্ট ঘরে। এটি নবাব মুর্শিদকুলি খানের ইচ্ছানুসারে করা হয়, যিনি তার জীবনে কৃত পাপকর্মের জন্য অনুতপ্ত ছিলেন এবং এটা তার নিরহঙ্কারতার প্রকাশ বলেই মনে করা হয়। তিনি এমন এক স্থানে সমাহিত হতে চেয়েছিলেন, যেখানে তিনি মসজিদে প্রবেশকারী পুণ্যবানেদের পায়ের নিচে নিষ্পিষ্ট হবেন এবং তাঁদের পাদস্পর্শ পাবেন। মসজিদের একটি কষ্ঠিপাথরের লেখা, ‘আরবের মুহম্মদ (স.) উভয় জগতের গৌরব, যে ব্যক্তি তার দ্বারে ধূলি লয়, তার মাথায় ধূলিবৃষ্টি হউক’। মসজিদ তৈরির কিছুদিন পরেই মুর্শিদকুলি খানের মৃত্যু হয়। কাটরা মসজিদ তৈরির পিছনে একটি কাহিনি লুকিয়ে আছে। বার্ধক্যে মুর্শিদকুলি খানের স্বাস্থ্যভঙ্গ হতে থাকলে তিনি উপলব্ধি করেন যে, এবার তার বিশ্রামের প্রয়োজন। তিনি এক বছরের মধ্যে একটি সমাধিমন্দির তৈরির আদেশ দেন। শোনা যায় এই দায়িত্ব দেওয়া হয় মোরাদ ফরাস নামে এক বিশ্বস্ত কর্মচারীকে। ছোট ছোট বাংলা ইট দিয়ে কিভাবে এই বিশাল মসজিদটি তৈরি করা হয়েছিল, তা ভাবতে গেলে আশ্চর্য হতে হয়। বর্তমানে এর তত্ত্বাবধান এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এ এস আই) এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার।দিনের শেষে ইতিহাসের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে ফিরলাম।আজ মুর্শিদাবাদ হারিয়েছে পুরানো দিনের নবাবী ঐতিহ্য। বড় সাধ, ঘোড়ার খুরের ধুলো ওড়া হারানো গৌরব ফিরে ফিরে দেখি।

সূত্র গণশক্তি

Leave a Response