Islamইসলাম

তাঁর অনুপস্থিতি যখন নিরাময়ের উৎস

59views

সারসংক্ষেপ

    ল্লাহ পবিত্র কুরআন স্পষ্টভাবে নবির উপস্থিতিকে করুণা বা রহমতের প্রতীক হিসাবে উল্লেখ করে বলেন, “(হে নবি!) আমি তোমাকে শুধুমাত্র সকল মানুষের জন্য করুণা হিসাবে প্রেরণ করেছি” (আল কুরআন ২১:১০৭)। এছাড়াও, কুরআন, যা সর্বশেষ বার্তা হিসেবে শেষ রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, তা নিজেই একটি শিফা বা নিরাময়ের উৎস হিসাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “আমরা কুরআন নাজিল করেছি, যাতে বিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে নিরাময় এবং করুণা…”(আল কুরআন ১৭:৮২)।

   আমরা এমন এক পৃথিবীতে বসবাস করছি যেখানে মানুষের জীবন থেকে রহমত (দয়া এবং করুনা) যেন ক্রমশ লুপ্ত হচ্ছে, যার ফলে আধ্যাত্মিক এবং মানসিক অসুস্থতার সৃষ্টি হচ্ছে। এমন অবস্থায় কুরআন আমাদের স্মরণ/পরিচয় করিয়ে দেয় তার নিরাময় ক্ষমতা এবং নবিজিকে রহমতের বাহক হিসাবে। যখন দুশ্চিন্তা, হতাশা এবং মানসিক চাপ বাড়ছে, তখন এই নিরাময়ের উৎস—কুরআন এবং নবি—এর অবহেলা এবং যথাযত ব্যবহার না করার ফলে বিশ্বাসীদের মধ্যে বেদনার অনুভূতি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপরন্তু, এই গবেষণাপত্রটি এই ধারণা তুলে ধরনে যে বিশ্বাসীরা, তাদের আধ্যাত্মিক সংবেদনশীলতার কারণে, অন্যদের তুলনায় আরও গভীর বেদনা অনুভব করতে পারে। এই গবেষণাপত্রটি ইসলামী ঐতিহ্য এবং তাসাওউফ বা সুফিবাদের প্রেক্ষাপটে নবিজির আধ্যাত্মিক এবং মানসিক নিরাময়ের ভূমিকা নির্ধারণের চেষ্টা করছে। এটি কিভাবে নবিজির উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি উভয়ই বিশ্বাসীদের জন্য নিরাময়ের উৎস হিসাবে কাজ করে, তা পরীক্ষা করে দেখছে। বিশেষভাবে এর মধ্যে উৎসর্গ, আকাঙ্ক্ষা, এবং বিশ্বাসী ও নবিজির মধ্যে রহস্যময় সম্পর্কের অবিজ্ঞতাগত দিকগুলোকে অন্বেষণ করা হয়েছে। এই গবেষণাপত্রটি দেখাতে চায় যে, নবিজির পবিত্র সাহাবিদের জন্য তাঁর উপস্থিতি কিভাবে নিরাময়ের উৎস ছিল এবং যারা মহান নবিকে দেখার সুযোগ পাননি, তাদের জন্য তাঁর অনুপস্থিতি কীভাবে একই ভূমিকা পালন করতে পারে।

ভূমিকা

    প্রফেসর তারিক রমাদান তার অনবদ্য সিরাতের বইয়ের ভূমিকা যে লাইনের মাধ্যমে সমাপ্তি টেনেছেন তা খুবই সহজ, তবে একইসানে গভীর তাৎপর্যপূর্ণও বটে। তিনি লিখেছেনঃ “He who cannot love cannot understand (যে ভালোবাসতে পারে না সে বুঝতে পারে না)। খুবই সহজ এবং একইসাথে কত গভীর অর্থপূর্ণ একটি বাক্য! আমার মনে হয় এই গভীর অর্থপূর্ণ লাইনটি বুঝতে না পারলে তাঁর অসাধারণ সিরাতের বইটি খুব হৃদয়য়ের সাথে অনুধাবন করা সহজ হবে না। অন্যভাবে বললে হয় যে, এই লাইনটি বুঝে নিতে পারলে পুরো সিরাতের স্পিরিটকে সহজেই উপলব্ধি করা যায়। চতুর্দশ শতাব্দির তুরস্কের বিখ্যার সুফিসাধক ইউনুস এমরে-র একটি কথা এ প্রসঙ্গে খুবই প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “I tried to make sense of the Four Books, until love arrived, and it all became a single syllable.” (আমি চারটি বইয়ের অর্থবোঝার চেষ্টা করেছি, যতক্ষণ না প্রেম এসেছিল, এবং চারটি বই একটি একক অক্ষরে পরিণত হয়ে উঠেছিল)।

    প্রেম বা ভালোবাসা মানব জীবনের এমন এক অবিচ্ছেদ্য মূল যা ছাড়া  জীবন একেবারেই অর্থহীন এবং গোলযোগপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো কিছুই বোঝা যায় না। স্বয়ং কুরআন নবিজি মুহাম্মাদ (صلى الله عليه وسلم (কে যখন ‘রহমাহ’ হিসেবে প্রেরণ করেছেন তখন ভালোবাসার ধারণার একটা গভীর বুঝ ছাড়া তাঁকে কীভাবে ভালোবাসা যায় ?

আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি যে কত গভীর এবং শর্তহীন ভালোবাসা থাকলে সাহাবিরা তাদের জীবনের বিনিময়ে নবিজিকে (صلى الله عليه وسلم ( সুরক্ষিত রাখতে বদ্ধ পরিকর ছিলেন।) হজরত খুবাইব (রা.)-এর সেই কথা কি আমাদের মনে আছে যখন তাকে মক্কার কুফফারেরা হত্যা করার আগে বলেছিলো? তাকে বলা হল, “এখন তোমার স্থানে যদি মুহাম্মাদকে বেঁধে তোমাকে মুক্তি দেয়া হয়, তবে তুমি কি [তা] পছন্দ করবে?” হজরত খুবাইব (রা.) কি বলেছিলেন? তিনি সেদিন তাদের বলেছিলেন, “নিষ্ঠুর! আল্লাহ জানেন, আমি তিলে তিলে প্রাণ দিয়ে দিতে পারি, কিন্তু আল্লাহর রাসূলের পায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হওয়ার দৃশ্যও সহ্য করতে আমি প্রস্তুত নই।”

    কিছু জিনিস এমন আছে যা কখনো বলে বোঝানো যায় না। শুনে বা পড়েও তা বুঝে আসে না। নিজের উজুদ হারাতে হয় কিছু বিষয়কে বোঝার জন্য। আমিত্বকে বিলীন করে সময় এবং স্থানের গন্ডি পেরিয়ে ট্রাভেল করতে হয় উর্ধাকাশে। অথবা রাতের দুপুরে নিজেকে জাগিয়ে রাখতে হয়। কিছু আরাম ত্যাগ করেই পাওয়া যায় সেই মণিমুক্তো যাকে আমি বলি ‘উপলব্ধি’। নির্জনে এবং রাতের গহীনেই মূলত এই মণিমুক্তোর ছড়াছড়ি। ইশক-এর এই চাদরে নিজেকে মোড়াতে আমাদের প্রয়োজন নিছক পড়া, শোনা, এবং বলার স্তর থেকে উঠে ‘উপলব্ধি-র স্তরে যাওয়া।

তাঁর শিফাপূর্ণ উপস্থিতি

    এখন আসি যে কীভাবে সাহাবিরা নবিজির (صلى الله عليه وسلم) উপস্থিতির মাঝে তাদের দুঃখ এবং যন্ত্রনাকে দূর করতো। কীভাবে তারা তাঁর সাক্ষাৎকে তাদের জন্য নিরাময়ের উৎস হিসেবে নিয়েছিল। সিরাতের পড়তে পড়তে দেখা যায় এর অসংখ্য উদাহরণ। আমরা এখানে মাত্র দু-একটি ঘটনার উল্লেখ করবো।

    তৃতীয় হিজরি। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم ) তাঁর সাহাবিদের নিয়ে মদিনার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে পড়লেন ওহুদ প্রান্তরের দিকে। ওদিকে কুফফাররা এলো। যুদ্ধ শুরু হলো। অনেক অবিশ্বাসীরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিলো। এদিকে মুসলমানদের মধ্য থেকে অনেকে শাহাদাত বরণ করলেন। যুদ্ধ শেষ হলো। মুসলমানেরা ওহুদের প্রান্তর থেকে সারি সারি ভাবে ফিরে আসলেন মদিনার দিকে। এদিকে মদিনার লোকেরা উপকন্ঠে এসে তাদের প্রিয়জনদের অপেক্ষায় আছে। একজন আনসারি মহিলা অপেক্ষায় আছেন এক অজানা এবং হৃদয় কাঁপানো চোখ নিয়ে। সাহাবিরা দুঃখ এবং ভারাক্রান্ত মনে সেই মহিলাকে খবর দিলেন যে তার ভাই যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। তিনি প্রশান্তচিত্তে পড়লেন, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন” (আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁর দিকেই ফিরে যাবো) তারপর সাহাবিদের আরেকটি দল সেই মহিলাকে ভারাক্রান্ত মনে জানালো যে যুদ্ধে তার পিতা শহিদ হয়েছে। তিনি আবারও পড়লেন, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন”। এরপর তৃতীয় একদল সাহাবি তাকে জানালেন যে তাঁর প্রিয়তম স্বামীও যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। এবারেও তিনি পড়লেন, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন”। এরপর কি হলো? এরপর আর যাইহোক, তা সত্যিকার অর্থে অনুধাবন করার আগে আমাদের আরেকটি ঘটনা জানা ভীষণ প্রয়োজন।

    ওহুদ যুদ্ধ শেষ হলো। একই বেসে সাহাবিরা ফিরনেন। সেই আনসারি মহিলা সাহাবির মতই হামনা বিনতে জাহাশ অপেক্ষা করছেন তাঁর প্রিয় মানুষদের জন্য। সাহাবিরা তাকে জানালেন যে তার পিতা এবং ভাই উভয়েই শহিদ হয়েছেন। তিনি দুইবারই চাপা কষ্ট নিয়ে পড়লেন “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন।” এবার তাকে বলা হল তাঁর প্রিয়তম স্বামী মুস’আব বিন উমাইর শহিদ হয়েছেন। তিনি নিজেকে আর সংবরণ করতে পারলেন না। কেঁদে উঠলেন। দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। পড়ে গেলেন, যেন আকাশ থেকে মাথায় বাজ পড়লো।  নবিজি (صلى الله عليه وسلم (সব দেখছিলেন। স্বামী হারানোর বেদনায় তার এই কাতর অবস্থা দেখে নবিজি (صلى الله عليه وسلم ) সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “একজন মহিলা সবেচেয়ে বেশি ভালোবাসে তার স্বা্মীকে”।  অনুভব করছেন কিছু? এবার চলুন সেই আনসারি মহিলার নিকট। তিনি কেন কান্নায় ভেঙ্গে পরেননি? কোন জিনিস তাকে এই সমস্ত কষ্ট সহ্য করতে সাহায্য করছিল? যখন সাহাবিরা একের পর এক তাঁর প্রিয়জনদের শাহাদাত বরণের কথা শোনাচ্ছিলেন আর তিনি বারবার ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন পড়ছিলেন এবং তাদের জিজ্ঞাসা করছিলেন, “আমাকে বলো, নবিজি (صلى الله عليه وسلم ) কেমন আছেন?” যখন তিনি নবিজিকে (صلى الله عليه وسلم ) দেখেন তখন উচ্চস্বরে বলে উঠেন, “আপনি যদি নিরাপদ এবং সুস্থ থাকেন তবে সমস্ত কষ্ট তুচ্ছ।” একটু থামুন এখানে। একটুচোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন তো এই কথাটির উপর…………

    সেদিন আবু বকর (রা.) সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছিলেন প্রতিদিনের মতই। নরম একটা দিল এটা কখনোই মেনে নিতে পারছে না যে তার আশেপাশের মানুষেরা এক আল্লাহর ইবাদাত বাদ দিয়ে হাজারও ইলাহকে গ্রহণ করে নিজেদের জীবনকে নিয়ে যাচ্ছে এক অনন্ত ভয়াবহ বাসস্থানের দিকে। মানুষদেরকে তিনি আল্লাহর কথা এবং তাঁর প্রেরিত রাসূলের (صلى الله عليه وسلم ) কথা মেনে নেওয়ার আহ্বান নিয়ে বেরিয়েছিলেন। মক্কার কুফফাররা তাকে সেদিন বেদম প্রহর করে। উতবা বিন রাবিয়া তার জুতো দিয়ে এমনভাবে তার মুখে প্রহার করে যে তার গাল গুলো ফুলে গিয়ে নাকের বরাবর হয়ে যায়। জ্ঞান হারিয়ে মৃতপ্রায় অবস্থার মুখোমুখি সে। তার গোত্রের লোকেরা তাকে শেষমেশ তার বাড়ি নিয়ে যায়। আত্মীয়-স্বজনেরা দেখতে আসে। সারাদিন জ্ঞানহীন থাকার পর সন্ধার দিকে সে চেতনা ফিরে পায়। তারপর?

   তারপর আবার কি! তিনি ছিলেন রাসূলের অন্তরের সাথী। জ্ঞান ফিরেই জিজ্ঞাসা করেন, “আল্লাহর রাসুল কেমন আছেন?” তাকে বোঝানো হয় যে, তিনি (صلى الله عليه وسلم ) ভালো আছেন এবং বলা হয় কিছু খাবার-পানি খেতে। তিনি পণ করে বসেন এই বলে, “আল্লাহর কসম, আমি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم ) কে না দেখা পর্যন্ত খাদ্য ও পানীয়ের স্বাদ গ্রহণ করব না।”

    একবার একটু গভীর চিন্তা করে দেখুন তো এমন অবস্থায় তাঁর (صلى الله عليه وسلم ) উপস্থিতির আকাঙ্ক্ষা কীভাবে তাদের জখম পূর্ণ দিল এবং শরীরের উপশমের কাজ করছে। তাঁর (صلى الله عليه وسلم ) উজুদ রহমতের। শিফা তাঁর (صلى الله عليه وسلم ) উপস্থিতিতে। আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদ!

তাঁর অনুপস্থিতি যখন নিরাময়ের উৎস

এবার আসি কীভাবে নবিজির অনুপস্থিতি আমাদের জন্য নিরাময়ের উৎস হতে পারে।

    আমরা এমন এক দুনিয়ায় বসবাস করছি যেখানে হতাশা, দুঃখ, দুর্দশা, যন্ত্রণা, কষ্ট, ধোঁকা সহ প্রায় সকল ধরনের নেগেটিভ বিষয় গুলো ব্যাপক হারে বাড়ছে। খুব সহজেই হতাশার শিকারে পরিণত হচ্ছি আমরা। অনেকেই এর ফলে নিজের জীবনের যাত্রায় সমাপ্তি টেনে দিচ্ছে নিরাময়ের রাস্তার খোঁজ না পেয়ে। কিন্তু কখনো আমাদের ভেবে দেখার সময় হয়নি যে, সকল রোগের মূল দাওয়া (শিফা) তো আমাদের নিকটেই আছে আর তা হল তাঁর (صلى الله عليه وسلم ) অনুপস্থিতি। 

    নবিজি (صلى الله عليه وسلم (তাঁর দুনিয়ার জীবনের শেষ দিনগুলি অতিবাহিত করছেন। আর কিছুদিন পরেই তিনি তাঁর পরম বন্ধু রব্বে কায়নাতের নিকট ফিরে যাবেন। আরবের আকাশ এবং বাতাস জুড়ে একটা বিরহ বেদনার আবহ তৈরি হয়েছে। তিনি শুয়ে আছেন। আম্মাজান উম্মে সালামা তাঁর দেখভাল করছেন। রহমতের নবি তাঁর উম্মাহর জন্য দিয়ে গেলেন শিফা-র চাবি। তিনি বললেন, “হে লোকজন! তোমাদের মধ্যে যারাই কোনো বিপদে পড়ে, তারা যেন আমার মৃত্যু স্মরণ করে সান্ত্বনা পায়। আমার উম্মতের কেউই আমার মৃত্যুর চেয়ে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হবে না।”

    আমি যেদিন প্রথম এই কথাগুলির মুখোমুখি হই, সেদিন থমকে গিয়েছিলাম। আলিগড়ে বসে এই বইটি পড়ার কথা আমার আজও সেই দিনের কথা মনে পড়ে। অনেকক্ষণ চিন্তা করেছিলাম যে, কেন এই কথা আমরা আগে শুনিনি। কেন আমাদের আলাপ-আলোচনায়, খুতবা-জালসায় এই অমিয় বাণী নিয়ে কেউ কথা বলে না। অনেকক্ষণ থমকে ছিলাম। সেইদিনই আমি এই কথাকে আমার জীবনের সকল সমস্যার সর্বশ্রেষ্ঠ (panacea of my life) সমাধান হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিলাম। কেন? কারণ, আম্মাজান উম্মে সালামাও সেদিন বলেছিলেন, “কী যন্ত্রণা ছিল সেটা! এরপর আমাদের উপর যে দুঃখ-কষ্ট নেমে এসেছে তার সাথে তাকে হারানোর তুলনা হতে পারে না, আল্লাহ তাঁর মঙ্গল করুন এবং তাকে শান্তি দান করুন!”

    নবিজির (صلى الله عليه وسلم ) প্রতি দরুদ পাঠের মধ্যে এক অনন্য শিফা আছে। এটা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? আবু তালহা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, একদিন রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم ) আনন্দিত মুখে আমাদের কাছে এলেন এবং বললেন: “জিবরাইল (আঃ) আমার কাছে এসে আমাকে বললেন যে, আমার রব বলেছেন, ‘হে মুহাম্মদ, তোমাকে কি সন্তুষ্ট করে না যে, তোমার কোনো উম্মত যদি তোমার উপর দরূদ পাঠায়, তবে আমি তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করব; এবং তোমার কোনো উম্মত যদি তোমাকে সালাম দেয়, তবে আমি তাকে দশবার সালাম দেব?’

    আপনি কিভাবে তাঁকে ভালো না বেসে থাকতে পারেন এটা জানার পর যে তিনি একটি দোয়া আমার এবং আপনার জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন। তাঁর প্রতিটি ছেলে সন্তানই শিশু অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। একজন পিতার পক্ষে তাঁর নিজ সন্তানের জানাজার কাজ এর চেয়ে ভারি কাজ আর কি হতে পারে? তারপরেও তিনি সেই দোয়া তাঁর নিজের জন্য ব্যবহার করেন নি। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবির একটি দোয়া থাকে, যা কবুল হয়ে থাকে, কিন্তু প্রত্যেক নবি দুনিয়াতে তার দোয়া করেছেন, আমি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত আমার দোয়া রেখেছি, যেন তা আমার উম্মাতের জন্য মধ্যস্থতায় ব্যবহৃত হয়। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তা আমার উম্মতদের মধ্যে যারা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করেই মারা গেছে তাদের কাছে পৌঁছে যাবে।”

    সহীহ মুসলিম শরীফে অন্যএক হাদিসে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم ) কে প্রফুল্লচিত্ত দেখে তিনি তাঁকে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم ) বলেন, “হে আল্লাহ তুমি আয়েশাকে ক্ষমা করো! তার অতীত ও ভবিষ্যতের গোপনে এবং প্রকাশ্যে কৃত সব গুনাহ মাফ করে দাও!” এটা শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে আয়েশা (রা.) এত জোরে হাসলেন যে তার মাথা তাঁর কোল থেকে পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم ) বললেন, “আমার দোয়া কি তোমাকে আনন্দিত করেছে?” তিনি উত্তরে বললেন, আপনার দোয়া কীভাবে আমাকে খুশি না করে থাকে?” নবিজী বললেন, “আল্লাহর কসম, এই দোয়া আমি আমার উম্মতের জন্য প্রতি নামাজে করি।”

    চিন্তা করে দেখুন, নবিজিকে ভালোবাসার যে ক্লেইম আমরা করি সেই ভালোবাসা দিয়ে আমরা কি কখনো আমাদের জীবনের সকল দুঃখ এবং কষ্টকে পরিমাপ করে দেখেছি? তাঁকে না দেখার বেদনা কি আমাকে কখনো কাতর করেছে? তাঁকে একবার দেখতে চাওয়ার সৌভাগ্য চেয়ে কি আল্লাহর কাছে আমি অকুণ্ঠচিত্ত আবেদন (দোয়া) জানিয়েছি? প্রতিদিন খাস করে শুধু তাঁর জন্য কি দরুদ পাঠানোর সময় আমি নির্ধারণ করেছি? জীবনে চলার পথে পাওয়া এবং না পাওয়ার হিসেবের বাইরে গিয়ে কি কখনো কেবলমাত্র তাঁকে ভালোবেসে সকল অভিমান এবং অভিযোগ থেকে নিজেকে পবিত্র রাখার চেষ্টা করেছি? যে রহমতের নির্যাস নিয়ে তিনি এসেছিলেন এই ধরায় সেই রহমতের ছোঁয়ায় কি নিজেকে একটু খানি হলেও ঢেলে সাজিয়েছি? আমার উপস্থিতির মধ্যে আমার আশেপাশের মানুষ এবং পশুপাখিরপা কি দয়া অনুভব করতে পারে? মন খুলে আমার সাথিরা আমার সাথে কথা বলতে পারে?

শেষে

    নবিজিকে উপেক্ষা করে আল্লাহুকে পাওয়ার বাসনা নেহায়েতই অলীক কল্পনা বৈ কিছুই নয়। তাঁর সুন্নাতের সাথে প্রতারণা করে পোশাকের মাঝে সেই প্রতারণাকে ঢেকে নিয়ে ‘তাঁকে ভালোবাসি’ বলা তাঁর সাথে হাসি মজা ছাড়া আর কি হতে পারে? অজ্ঞতা? আশিক কিভাবে মাশুকের ব্যপারে অজ্ঞ থাকতে পারে? কিভাবে মাশুকের যিকির ছাড়াই দিন কেটে যায়? তাঁর সাথে সাক্ষাৎ না হবার বিরহ ব্যথা বেদনা না অনুভব করে আশিকের রাত কিভাবে ঘুমে বিভোড় হয়ে ওঠে?

“আপনার বিচ্ছেদে আমার শরীর বিলীন হয়ে যাচ্ছে আর আমার হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, ইয়া রাসুলুল্লাহ!” বিখ্যাত সূফী সাধক আব্দুর রহমান জামির এই অনুভবের মত আমরা কখনো তাঁকে অনুভব করার চেষ্টা করেছি? মুহাম্মাদ সামি কত সুন্দর করে বলেছেন, “মেরাজের রাতে মুস্তাফা (صلى الله عليه وسلم ) কে আল্লাহ বললেন, “যে তোমার হয়ে গেল, সে আমারও হয়ে গেল।”সুফি ট্র্যাডিশনের এই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ কথা গুলো আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি যখন কুরআন আমাদেরকে বলে,বলুন, (হে নবী,) যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসো, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আলে ইমরানঃ ৩১)

    জীবন অত্যান্ত এক জটিল সফরের নাম। চড়াই-উতরাই রয়েছে এর মূলে। পথ অনেক বন্ধুর এবং কন্টকাকীর্ণ হবার পাশাপাশি অনেক দীর্ঘও। এখান থেকে হাওজে কাওসারের দূরত্ব অনেক। তিনি ভালোবেসে আমাদেরকে (আনসারদের মাধ্যমে) অনেক আগেই বলে গিয়েছেন, “সবর করো, হাওজে কাওসারে আমার সাথে দেখা করা পর্যন্ত।”

ইশক, কুরবানি, সবর, মোলাকাত। আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলা আলে মুহাম্মাদ।

 

রেফারেন্স এবং ফুট নোট

১) Tariq Ramadan, The Messenger: The Meanings of the Life of Muhammad, p. xii.

২) মাওলানা আবুল কালপাম আযাদ, মৃত্যুর দুয়ারে মানবতা, পৃষ্পা ১৫৭

৩) Akbar Shah Najeebabadi, History of Islam, vol-1, pp. 178-179.

৪) Syed Abul Hasan Ali Nadvi, Muhammad صلى الله عليه وسلم The Last Prophet ARole Model for All Time, pp. 39-40.

৫) Syed Abul Hasan Ali Nadvi, Muhammad صلى الله عليه وسلم The Last Prophet A Role Model for All Time, p. 189.

৬) মিশকাত আল-মাসাবীহ

৭) মিশকাত আল-মাসাবীহ

) Mohammad Elshinawy, The Final Prophet: Proofs for the Prophethood of Muhammad صلى الله عليه وسلم, pp. 41-42

৯) সহীহ বুখারী

লেখক – মুহাম্মাদ মুরসালিম

Leave a Response