
লেখক: গোলাম রশিদ
মক্কা ছাড়ার আগে জন্মভূমির দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, মক্কা! আমার জন্মভূমি মক্কা। আমি তোমায় ভালোবাসি। কিন্তু তারা আমাকে তোমার কোলে থাকতে দিল না। বাধ্য হয়ে আমি তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি। বিদায়!
মক্কা থেকে মদিনা, মরুভূমির পথে প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার আগে প্রিয় জন্মভূমির দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে শুধু এ কথাই কি বলেছিলেন মুহাম্মদ সা.? বিপদসংকুল পথ পাড়ি দেবেন। সঙ্গী আবুবকর সিদ্দিক রা.। উটের পিঠে চড়ে রাতের বেলা সফর। প্রচণ্ড উত্তাপ এড়াতে দিনের বেলা বিশ্রাম নিতেন। এগারো দিন লাগত এই সফরে। কিন্তু ‘মরুভূমির জাহাজে’ করে ৮ দিনেই তৎকালীন ইয়াসরিবে (পরবর্তীতে যার নাম হবে মদিনাতুন নবী বা নবীর শহর) পৌঁছেছিলেন নবী সা.। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল মদিনার আনসাররা। তাঁর উটের দেখা পেতেই ছেলেমেয়েরা গেয়ে উঠল ‘তালা আল বাদরু আলাইনা’ (পূর্ণিমার চাঁদ আমাদের ভাগ্যাকাশে উদিত হয়েছে)। এর ঠিক ১৬ বছর পর যখন ইসলামি দুনিয়ার দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর রা. হিজরি নামের নতুন একটি সন বা সাল চালু করতে যাবেন তখন এই ঘটনাকেই স্মরণ করা হবে। স্মরণ করা হবে এই ঐতিহাসিক হিজরতের ঘটনাকে। স্মরণ করা হবে চাঁদের কথা। চান্দ্রমাসের উপর ভিত্তি করে শুরু হবে ‘হিজরি’ সনের প্রচলন। আরব সংস্কৃতিতে আরও বেড়ে যাবে চাঁদের গুরুত্ব। হিজরি সন প্রচলনের আগে ঐতিহাসিক ঘটনা বা কোনও কাজের বছর অনুসারে সাল গণনা করা হত। গ্রামের দিকে এখনও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্মের বয়স জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ‘আমরা কি আর সাল-তারিখ জানি? মা বলতো, বানের বছরে জন্ম।’ কেউ বলেন, বিয়ে হয়েছে ‘জয় বাংলা’র বছরে। আরবেও এরকম বেশকিছু প্রসিদ্ধ মাইলস্টোন ছিল নূহের প্লাবনের বছর, ভূমিকম্পের বছর, ইব্রাহিমের কাবাঘর নির্মাণের বছর, কাবাঘর আক্রমণের বছর যাকে হস্তিযুদ্ধের বছর বলা হত। হযরত মুহাম্মদ সা.-এর জন্ম এই বছরে বলে ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম উল্লেখ করেছেন। তারপর এই হাতির বছরকেই প্রামাণ্য হিসেবে ধরে গণনা করত আরবরা। মক্কার পৌত্তলিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে যখন নবী সা. মদিনায় হিজরত করেন তখনও আরবে কোনও নির্দিষ্ট সন প্রচলিত ছিল না। তবে মদিনায় হিজরতের পর নবী বিশেষ সা.-এর সঙ্গে নজরানের খ্রিস্টানদের যে সন্ধিপত্র রচিত হয়, তাতে তারিখ লেখা হয়েছিল ‘হিজরতের পঞ্চম দিন’। এটা হয়েছিল মুহাম্মদ সা.-এর নির্দেশেই। এমনটাই জানা যাচ্ছে ঐতিহাসিক তাবারির বর্ণনায়। সুতরাং, হিজরি সনের বীজ কিন্তু তখনই পোঁতা হয়ে গিয়েছিল।
এরপর এল সেই দিন। তখন (৬৩৮ খ্রি.) ইসলামি জাহানের খলিফা হযরত উমর রা.। তাঁর কাছে যেসব চিঠিপত্র আসত তাতে মাসের উল্লেখ থাকলেও সনের উল্লেখ থাকত না। ফলে তাঁর মনে হল, এগুলো কোন বছরের পরবর্তীতে তা কীভাবে বুঝব? এই চিন্তা তাঁর মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিলেন আবু মুশা আশয়ারি রা.-ও। এরপর এর সমাধান নিয়ে বৈঠক বসল। হযরত আলি রা. বললেন, নতুন বর্ষগণনা চালু করতে হলে সেটা হোক মক্কা থেকে মদিনায় নবীর হিজরতের বছর থেকে। কারণ এটিই ইসলামের ইতিহাস তথা মানব সভ্যতার ইতিহাসে যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচিত করেছে। হিজরতের গুরুত্ব যে কতটা তা এই সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়। জ্ঞান সাধনা বা বিপ্লব, যে-কোনও ক্ষেত্রে আজও হিজরতের অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। হিজরি সাল বছর বছর যেন সে কথাই বলে। হিজরি সন গণনা কোনও ব্যক্তির জন্ম বা মৃত্যুর তারিখ থেকে শুরু হয়নি। মক্কা থেকে মদিনায় গিয়ে পৃথিবীর প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান গড়ে তুলেছিলেন মুহাম্মদ সা.। জুলুম, কুসংস্কার, অনৈতিকতার বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলেন ইসলামি রাষ্ট্র। বিশ্বকে এক নয়া দিশা দিয়েছিলেন। হিজরত সেই অর্থে অত্যন্ত তাৎপর্যবাহী ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে, যেন এক মাইলস্টোন। রোযা, ঈদ, কুরবানি, হজ ইত্যাদি ইসলামি উৎসব, ইবাদাত হিজরি সন মেনেই হয়। পুরো দুনিয়ার মুসলিমরা এ ক্ষেত্রে একটি ঐক্যের নিদর্শন রেখে চলেছেন। হিজরি অন্যান্য বর্ষপঞ্জির মতো নয়। হিজরি বর্ষ মানেই ইতিহাসের পাতায় ভেসে ওঠে মুহাম্মদ সা. ও তাঁর সঙ্গীসাথীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা, আপনজন, সম্পদসহ নিজেদের বংশমর্যাদা পায়ে ঠেলে অন্য দেশে পাড়ি দেওয়ার চিত্র। কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সত্যের কাফেলার এক সর্বজনীন যাত্রা।
হিজরত হয়েছিল ৬২২ খ্রিস্টাব্দের রবিউল আওয়াল মাসে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে। কিন্তু হিজরি গণনার সময় এই মাসটিকেই প্রথমে রাখা হয়নি। হযরত উসমান রা.-এর পরামর্শক্রমে হিজরি সন শুরু হয় মুহাররম মাস থেকে। সেটা আবার জুলাই মাস। হিজরি সনের মাসগুলো হল- মুহাররম (পবিত্র মাস), সফর (ভ্রমণ মাস), রবিউল আউয়াল (প্রথম বসন্ত মাস), রবিউস সানি (দ্বিতীয় বসন্ত মাস), জমাদিউল আউয়াল (প্রথম শুষ্ক মাস), জমাদিউস সানি (দ্বিতীয় শুষ্ক মাস), রজব (সম্মানের মাস), শাবান (সবুজের মাস), রমযান (উত্তাপ বা কৃষ্ণসাধনার মাস), শাওয়াল (সংযোগকারী মাস), যিলকদ (বিশ্রামের মাস), যিলহজ (হজের মাস)। বিদায় হজের সময় মুহাম্মদ সা. বলেছিলেন, যিলকদ, যিলহজ, মুহাররম ও রজব হল সম্মানিত মাস। নবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর হিজরতের বছরকে সূচনা ধরে গণনা করা হয় বঙ্গাব্দেরও। মুহাম্মদ সা.-এর সময়েই ব্যবসায়িক সূত্রে আরব বণিকরা দক্ষিণের মালাবার বন্দরে নেমেছিল। কেরলে তখন স্থাপিত হয়েছিল চেরামন মসজিদ যা এখনও দাঁড়িয়ে আছে একত্ববাদের পতাকাবাহী হয়ে। ব্যবসায়িক সূত্রে তখন থেকেই ভারতের সঙ্গে আরবদের সংযোগ গড়ে ওঠে। উমাইয়া খিলাফতকালে সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম সিদ্ধ আক্রমণ করেন। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ শতকে দিল্লির ক্ষমতা দখল করেন মুহাম্মদ ঘোরী, কুতুবউদ্দিন আইবকরা। ‘বঙ্গালাহ’তে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি ক্ষমতায় আসেন। ইখতিয়ারউদ্দিন থেকে সিরাজ-উদ-দৌলা পর্যন্ত প্রায় ৫৫০ বছর রাষ্ট্রীয় ভাবে বাংলায় হিজরি সন ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এখন ধর্মনিরপেক্ষ, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের দেশে হিজরি-স্মরণ ব্রাত্য কেন? সংস্কৃতির প্রশ্ন এলে সবসময় ‘আধিপত্যবাদ’ ব্যাপারটি চলে আসে। সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ সিন্দাবাদের জিনের মতো ঘাড়ে চেপে বসে থাকে। তাই ১৪৪৫ হিজরির সূচনালগ্ন চলে যায় নীরবে, নৈঃশব্দ্যে। পয়লা বৈশাখ আসলে আমরা ‘শুভ নববর্ষ’ বলে সোশ্যাল মেসেজিংয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি। অথচ ধর্মীয় আবেগের ব্যবহার না করেই বলা যায়, বাংলা সন বা খ্রিস্টাব্দের চেয়ে হিজরি সন এ দেশে রাষ্ট্রীয় ভাবে বেশিদিন ব্যবহৃত হয়েছে। ত্রয়োদশ শতকে ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির শাসন শুরু হওয়ার পর থেকেই হিজরিকে সরকারি কাজে ব্যবহারের শুরুয়াত, যার অবসান হয় প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর পর, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনে। অবশ্য মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে বছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের জন্য হিজরির বদলে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। সেই সময় হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সমস্ত সরকারি কাজকর্ম পরিচালিত হত। হিজরি সন চান্দ্রমাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্র বৎসর সৌর বৎসরের চেয়ে ১১-১২ দিন কম হয়। সৌর বৎসর ৩৬৫ দিন, আর চান্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিন। এ কারণে চান্দ্র বৎসরে প্রতি বছর ঋতুগুলি একই মাসে আসে না। কিন্তু কৃষিকাজ ও খাজনা আদায় মরশুম-নির্ভর। এ কারণে সম্রাট আকবরের সময়ে প্রচলিত হিজরি চান্দ্র ক্যালেন্ডারকে সৌর ক্যালেন্ডারে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর থেকে এই নতুন ক্যালেন্ডারের গণনা শুরু হয়। ফলত ৯৬৩ হিজরি সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনার সূচনা হয়। সেই হিসেবে বাংলা সন চালু হওয়া পাঁচশো বছর অতিক্রম করেনি। আর খ্রিস্টাব্দের হিসেব ইংরেজরা এ দেশে আসার আগে নিশ্চয়ই চালু হয়নি। সেখানে হিজরি সন আটশো বছরের অধিক সময় ধরে এই উপমহাদেশে প্রচলিত। হিজরি ও বাংলা সনের মধ্যেও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দুটোই বলতে চায়, মুহাম্মদ সা.-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর কত বছর হল। পার্থক্য শুধু চন্দ্র-সূর্যের আবর্তনের সময়ে। তাই তো নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘বাঙালির চিন্তাধারার ঐতিহ্যের মধ্যে একটি গুণ হল বাঙালির সভ্যতার গ্রহণশক্তি সমন্বয়প্রীতি।… আমাদের গ্রহণশক্তির পরিচয় বিভিন্ন ধরনের উদাহরণ দিয়ে ফয়সালা করা যায়।… সম্রাট আকবর নতুন একটি ক্যালেন্ডার স্থাপিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এই প্রচেষ্টার মধ্যে আকবরের সর্বসংস্কৃতির সমন্বয় করার প্রচেষ্টা ছিল। যে-বছর তিনি সিংহাসনে উঠলেন, সে বছরটি মুসলিম হিজরি সনে ৯৬৩ এবং হিন্দু শক বর্ষপঞ্জিতে ১৪৭৮ (যেটি ইউরোপীয় মতে ১৫৫৬ সাল)। তারিখ-ই-ইলাহি নাম দিয়ে এই ক্যালেন্ডারটি শক সনের সূর্যমুখী বর্ষ গণনা মানল; কিন্তু বছরের হিসাবটি শুরু হল হিজরি থেকে ৯৬৩ দিয়ে। এই সমন্বিত ক্যালেন্ডারটি অবিভক্ত ভারতবর্ষের অন্য কোনো অঞ্চলে বেশি দিন চলল না। কিন্তু সেটি নতুনভাবে গ্রহণ করা হল আমাদের সমন্বয়মুখী বাংলা সন হিসেবে। এর একটি আশ্চর্য ফল হচ্ছে, বাঙালি হিন্দু-মুসলমান-নির্বিশেষে সবাই এই সমন্বয়টি আজকেও মানেন। যেমন- একজন হিন্দু পূজারী যখন তাঁর কাজ এ বছরের সনটিকে আহ্বান জানিয়ে শুরু করেন, তখন তাঁর বোধহয় জানা থাকে না যে এই পুজো উপলক্ষ্যে তিনি স্মরণ করছেন মুহাম্মদ সা.-এর মদিনা যাত্রার পবিত্র দিনের কথা।’
এতসব হিসেব দিয়ে যেটা বোঝাতে চাইছি, সেই মোদ্দা কথাটা হল শকাব্দ ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে জাতীয় ক্যালেন্ডারের মর্যাদা পাচ্ছে যার সঙ্গে জুড়ে আছে বহিরাগত শকদের আক্রমণ।
হিজরি তবে কী দোষ করল? সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বয়ানটাই এখানে খাটে। হিজরি ইসলামি সংস্কৃতি আর বঙ্গাব্দ বাঙালি সংস্কৃতি এই ন্যারেটিভ এখন চালু করার চেষ্টা চলছে। পয়লা বৈশাখকে বিজাতীয় বলে দেগে দেওয়া যেমন রক্ষণশীলতা তেমনই হিজরিকে মুসলিমদের বছর বা আরবের সন বলাটাও সাম্প্রদায়িক ধূর্তামি। চিন, রাশিয়ার মানুষের কঠিন কঠিন দাঁতভাঙা নাম শুদ্ধ উচ্চারণের জন্য কোশিশ ষোলোআনা, কোনও অসুবিধা নেই। অথচ বাড়ির পাশের আরশিনগরের বাসিন্দাদের নাম নাকি ‘কীরকম খটোমটো’ আর ‘আরবি’! তাই বোধহয় এখনও মাঝেমাঝে প্রথম শ্রেণির দৈনিক পত্রিকায় ‘ইসলাম’কে লেখা হয় ‘ইসাম’। এই যে নতুন ‘বছর’ বলছি, উর্দু শব্দ ‘বরস’ থেকে এর উৎপত্তি। ‘সন’ আরবি, ‘সাল’ ফারসি। এতকিছুর পরেও বঙ্গাব্দ আপন হবে, আর হিজরি ‘অপর’!





