
লিখেছেন: সেখ আনিসুর
রবীন্দ্র যুগের শেষ অধ্যায়ে বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় নজরুলের আগমন। ধূমকেতুর মতো আগমনে কবি যে বিদ্রোহের ঝড় বাংলা সাহিত্যের জগতে তুলেছিলেন, তাতে জাহাজ-মাস্তুল ছারখার হওয়ার উপক্রম। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে বলেছেন, নজরুলের এই স্বভাবসিদ্ধ উচ্ছ্বাস একসময় কবিগুরুর প্রভাবকেও কিছুটা ম্লান করে দিয়েছিল।
একজন কবি দিনের শেষে হয়ে ওঠেন আবহমান জীবনের কল্যাণকামী। মানুষের দেহ-মনে ভাসতে থাকা কথা একসময় প্রকাশ পায় কবির কাব্যে, গানের সুরে কিংবা সৃজনশীল গদ্যের ভাঁজে-ভাঁজে।
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ মূলত ছিল দেব-দেবীপ্রধান। মঙ্গলকাব্য থেকে শুরু করে বৈষ্ণব পদাবলী–সমস্তটাই জুড়ে ছিল ঐশ্বরিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ। সে সময় মহামানব মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কথাও বিভিন্ন কাব্য-কবিতায় উঠে আসে। পরবর্তীতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত হতে সাহিত্যের আধুনিক যুগের সুস্পষ্ট বিকাশ-যাত্রা শুরু হয়। অতঃপর রবীন্দ্র যুগ এবং নজরুল-জীবনানন্দদের হাত ধরে মানুষের বিষয়-আশয় প্রাধান্য পেতে শুরু করে কাব্য-কবিতায়।
২৪ মে ১৮৯৯ সনে নজরুলের জন্ম। মাত্র ২৩ বছর তিনি সাহিত্য রচনা করেছেন। নজরুল যে সময় বাংলা সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেন, তখন আধুনিক যুগের বেশ কিছু সময় অতিক্রান্ত। মুখ্যত প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে মানুষ। ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মানুষের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনাই ছিল সে সময়ের অন্যতম অ্যাজেন্ডা। সাম্যের গান, নারী-পুরুষের সহাবস্থান এবং বিদ্রোহের আগুনে দাপিয়ে বেড়ানোর সময়কালে নজরুল মানবতার শ্রেষ্ঠ মহামানবের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের যোগসূত্র স্থাপন করেন।
তিনি যেভাবে নবীজিকে বাংলা সাহিত্যে তুলে ধরেছেন এবং তাঁকে নিয়ে কাব্য-কবিতা রচনা করেছেন, এর আগে এই ধরনের কাজ কখনোই বাংলা সাহিত্যে হয়নি। নজরুল সুফি তরিকার মরমি স্রোতে ভেসে গিয়ে হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃত আশেক। সেই আশেকের মুখ থেকেই নিঃসৃত হলো–
“বক্ষে আমার কা’বার ছবি,
চক্ষে মোহাম্মদ রসুল।
শিরোপরি মোর খোদার আরশ,
গাই তাঁরি গান পথ বেভুল॥”
নবীজি ছিলেন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় মানুষের জীবনকে তার সর্বোচ্চ সম্মানসহ প্রকৃত মূল্যের সহিত প্রতিষ্ঠা করছেন। জনৈক ফারসি কবি লিখেছিলেন–
‘আদমকে ইনসান বানিয়েছেন নবী (সাঃ)’।
নজরুল এই মহামানবের জীবনসুধা তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। তাঁর রচিত গান-কবিতা আজও প্রতিটি মানুষের কাছে চির-নতুন। এবং বারংবার নবীর প্রতি শ্রদ্ধা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। কী তাঁর গান, কী কবিতা, সব জায়গায় তিনি রাসূলপ্রেমের এমন এক দ্যুতি ছড়িয়েছেন, যা আজও কোটি কোটি রাসূলপ্রেমী আশেকের মুখের কথা, প্রাণের কথা। কবি কেবলমাত্র বিশ্বনন্দিত মহামানবকে নুর নবী বলেই ক্ষান্ত হননি। বরং তাঁর পদতলে নিজেকে বিছিয়ে দিতেও চেয়েছেন। তিনি লিখলেন–
“আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ
এই পথে মোর চলে যেতেন নূরনবী হযরত।”
প্রকৃত আশেকের জীবনের পূর্ণতা মাশুকের মিলনেই। আশেকে-রসূল কবি মিলনানন্দের উচ্ছ্বাস হতে যারা বঞ্চিত, তাদের উদ্দেশ্যে লিখলেন–
“তর্ক করে দুঃখ ছাড়া কী পেয়েছিস অবিশ্বাসী
কী পাওয়া যায় দেখনা বারেক হযরতে মোর ভালবাসি।”
নজরুল তাঁর ‘বিষের বাঁশী’ কাব্যগ্রন্থের ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ দহম’ কবিতায় নবীজির আগমন প্রসঙ্গে আলোকপাত করেছেন। মহানবীর আবির্ভাবের ফলে সমস্ত অন্যায়, অবিচার, পাপাচার, অজ্ঞতা, অন্ধকার দূরীভূত হলো এবং সারা জাহান আলোকিত হলো ন্যায় ও সত্যের আলোয়। তাই নবীজির প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তাঁর নামের সাথে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ দরুদ পাঠ করা হয়। কিন্তু কারা পাঠ করেন এই দরুদ? সে ব্যাখ্যারও একটি ইঙ্গিত আছে। কবি বলেন–
“শোন্ দামাম কামান তামান সামান
নির্ঘোষি’ কার নাম
পড় ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্লাম!
ভয়ে ভূমি চুমে ‘লাত্ মানাত’-এর ওয়ারেশীন।
‘ওয্যা হোবল’ ইবলিস, খারেজীন।
‘এয় শামসোজ্জ্বাহা বদরোদ্দাজা কামারোজ্জাঁমা সালাম!”
নবীজির আগমনে আত্মহারা পরিবেশকে সাক্ষী রেখে তিনি আরও লিখলেন–
“তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
মধু পূর্ণিমারি সেথা চাঁদ দোলে
যেন ঊষার কোলে রাঙা-রবি দোলে॥”
এছাড়া নজরুলের লেখা অতি পরিচিত এই গানটি আজও বাংলার ঘরে ঘরে সুরের স্রোতধারা বইয়ে দেয়—
“ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়।
আয় রে সাগর আকাশ বাতাস দেখ্বি যদি আয়॥
ধূলির ধরা বেহেশ্তে আজ, জয় করিল দিল রে লাজ।
আজকে খুশির ঢল নেমেছে ধূসর সাহারায়।”
অন্ধকার পৃথিবীর আলোকবর্তিকা হয়ে এসেছিলেন নবীজি। সেই সিরাজুম মুনিরাকে উৎসর্গ করে নজরুল লিখলেন—
“মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লে আলা
তুমি বাদ্শারও বাদ্শাহ্ কম্লিওয়ালা॥
পাপে-তাপে পূর্ণ আঁধার দুনিয়া
হ’ল পুণ্য বেহেশ্তী নূরে উজালা॥”
প্রকৃত আশিক তার মাশুকের প্রতি ভালোবাসাকে কেবল নিজের হৃদয়ের মধ্যেই আবদ্ধ রাখেন না, একসময় তাঁর কাছে মনে হতে থাকে, পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টিই যেন সেই মাশুকের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। তখন ব্যক্তি ও পরিবেশের সম্মিলনে সৃষ্টি হয় এক অভূতপূর্ব আবহ। চারপাশের প্রকৃতিও যেন মাশুকের প্রেমে আত্মহারা হয়ে ওঠে। কবি যেন সেই ভাবসাগরে ভেসে বুলবুলিকে প্রশ্ন করেন–
“মোহাম্মদের নাম জপেছিলি
বুলবুলি তুই আগে।
তাই কিরে তোর কণ্ঠেরি গান,
(ওরে) এমন মধুর লাগে॥”
তিনি আরও লিখলেন–
“হে মদিনার বুলবুলি গো
গাইলে তুমি কোন গজল।
মরুর বুকে উঠল ফুটে
প্রেমের রঙিন গোলাপ দল।
দুনিয়ার দেশ-বিদেশ থেকে
গানের পাখি উঠল ডেকে,
মুয়াজ্জিনের আজান ধ্বনি
উঠল ভেদি গগনতল।”
গ্রামীণ বাংলার মুসলিম সমাজে আজও মিলাদ মাহফিলের আসরে শেখ সাদীর প্রসিদ্ধ কবিতার পঙ্ক্তিগুলো সুরের আবেশ সৃষ্টি করে। ‘বালাগাল উলা বি-কামালিহি, কাশাফাদ্দুজা বি-জামালিহি, হাসুনাৎ জামিয়ু খিসালিহি, সাল্লু আলায়হি ওয়া আলিহি’–এই সম্মিলিত সুর আজও আধ্যাত্মিক চিত্তে গভীর আবেগ ও কাঁপন জাগায়। সেই সুরকেই পাথেয় করে নজরুল লিখলেন–
“কুল মখলুক গাহে হযরত
বালাগাল উলা বেকামালিহী।
আঁধার ধরায় এলে আফতাব
কাশাফাদ দুজা বেজমালিহী॥
রৌশনীতে আজো ধরা মশগুল
তাইতো ওফাতে করি না কবুল,
হাসনাতে আজো উজালা জাহান
হাসুনাত জমিউ খেসালিহী॥”
প্রেমের পাত্রের নাম স্মরণে প্রেমিকের মন যেমন আকুল হয়ে ওঠে, তেমনি প্রিয়তমের নামের কীর্তনে শুষ্ক কণ্ঠেও যেন প্রাণের সঞ্চার ঘটে। নবীজির নাম জপতে জপতে নজরুল লিখলেন–
“তৌহিদেরই মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম
ঐ নাম জপলেই বুঝতে পারি, খোদায়ী-কালাম।
ঐ নামের দামন ধ’রে আছি—আমার কিসের ভয়,
ঐ নামের গুণে পাবো আমি খোদার পরিচয়।
তাঁর কদম মোবারক যে আমার বেহেশতী তান্জাম—
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম॥”
সৃষ্টির মধ্য দিয়েই স্রষ্টাকে পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়। সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা মানুষকে স্রষ্টার নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়। আর স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি যদি কেউ হয়ে থাকেন, তবে তিনি মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.)। নজরুল এই ভাবনাকেই হৃদয়ে ধারণ করে লিখলেন—
“আল্লাহকে যে পাইতে চায় হযরতকে ভালবেসে—
আরশ কুরশি লওহ কালাম না চাইতেই পেয়েছে সে।”
নবীজি (সা.)-কে নিয়ে নজরুলের সর্ববৃহৎ সাহিত্যকর্ম ছিল ‘মরু-ভাস্কর’ কাব্যগ্রন্থ রচনা। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে নজরুল যখন ইসলামী গান রচনায় আত্মনিয়োগ করেন, তখন একই সঙ্গে নবীজির জীবনকে অবলম্বন করে একটি বৃহৎ কাব্যগ্রন্থ রচনাতেও মনোনিবেশ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কবি এই কাব্যটি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি।
নবীজির জীবনকাহিনি অবলম্বনে রচিত এই দীর্ঘ প্রবন্ধ-কাব্যের ১৭টি পরিচ্ছেদ কবি সম্পূর্ণ করেছিলেন। কিন্তু ১৮তম পরিচ্ছেদটি তিনি আর শেষ করতে পারেননি। ‘সাম্যবাদী’ নামে এই পরিচ্ছেদের মাত্র ১৬টি পঙ্ক্তি রচিত হয়েছিল। নজরুল আকস্মিকভাবে রোগাক্রান্ত হয়ে নির্বাক হয়ে যাওয়ায় ‘মরু-ভাস্কর’ অসমাপ্তই থেকে যায়।
‘মরু-ভাস্কর’-এর ভূমিকায় কাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী প্রমীলা দেবী লিখেছেন, “বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জীবনী নিয়ে একখানি বৃহৎ কাব্যগ্রন্থ রচনার কথা তিনি প্রায়ই বলতেন।”
এই কাব্যগ্রন্থে নজরুল নবীজির বাল্যজীবনকে অত্যন্ত সুচারুভাবে এবং কাব্যিক অলংকারে সজ্জিত করে তুলেছেন। বিশেষ করে পিতা আবদুল্লাহর কবর জিয়ারতের সময়কার হৃদয়বিদারক ঘটনাটি তিনি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন–
“কিছু দূর আসি’ পথ-মঞ্জিলে আমিনা কয়—
বুকে বড় ব্যথা, আহমদ, বুঝি হ’ল সময়
তোরে একলাটি ফেলিয়া যাবার! চাঁদ আমার,
কাঁদিসনে তুই, রহিল যে রহমত খোদার!”
কবি নজরুলের হৃদয় যে রাসুল (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আবেগে পরিপূর্ণ ছিল, তাঁর বিভিন্ন কবিতায় তার উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে। বিশেষত, শিশু এতিম নবীর শোকময় শৈশব কবির হৃদয়কে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। সেই বেদনারই মর্মস্পর্শী প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়–
“সব শোকে দিবে শান্তি যে-শৈশব তাহার
কেন এত শোক-দুঃখময়?”
যিনি সমগ্র বিশ্বজাহানের মানুষের দুঃখ-বেদনা মোচনের জন্য আগমন করেছেন, তাঁর নিজের শৈশবই কেন এত শোক ও দুঃখে পরিপূর্ণ–কবির হৃদয়ে যেন সেই প্রশ্নই বেদনার ঢেউ তোলে। এ যেন সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমার এক গভীর লীলাখেলা–
প্রেমের এক অনির্বচনীয় রহস্য, বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর, হাবিবের সঙ্গে মাহবুবের, প্রেমাস্পদের সঙ্গে প্রেমিকের।
এই রহস্যের গভীরতা হয়তো কেবল তাঁরাই উপলব্ধি করতে পারেন, যাঁদের হৃদয় প্রেমে সিক্ত এবং যাঁরা আল্লাহর প্রিয় হাবিবের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায় নিজেদের অন্তরকে আলোকিত করেছেন।





