
লিখেছেন: আমিনুল ইসলাম
বাঙালি মুসলমানদের আধুনিক সাহিত্যচর্চার অগ্রভাগে মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের (১৮৬০-১৯২০) প্রতিষ্ঠা। গ্রামীণ অর্থনীতির অভিজ্ঞতা, বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্পন্দন, নিজস্ব অস্তিত্ব চেতনার শেকড়সন্ধান অবলম্বী লেখক মোহাম্মদ নজিবর রহমান। তবে স্বসমাজ আর নিজের পরিবার-অভিজ্ঞতারই পুনরাবর্তন ঘটেছে তার সাহিত্যে। প্রসঙ্গত বলতেই হয়, যে সমাজে ধর্মোন্মাদনা গভীরে প্রোথিত, অর্থনীতি দুর্বল, নেতৃত্বহীন–স্ববিরোধী বা স্বার্থসঙ্কুল রাজনীতির আবর্তে মোহাম্মদ নজিবর রহমান নিজস্ব সমাজের নাড়ীর স্পন্দনকে অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদাত্ত ও জীবনবাদী, সেখানে কাহিনিতে চরিত্রে তার অভিজ্ঞতালব্ধ ও নিরঙ্কুশ মানব অনুকূল জীবনকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন।
পূর্বপুরুষগণ তৎকালীন বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের অধিবাসী হলেও মোহাম্মদ নজিবরের বাড়ি ছিল পাবনা জেলায়। ১৮৬০ সালে তিনি ওই জেলার শাহজাদপুরের সন্নিকটবর্তী চরবেলতৈল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। (য তাঁর জন্মস্থান ও কাল সম্পর্কে মতভেদ রযেছে। তিনি সম্ভ্রান্ত মীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মোহাম্মদ জয়েনউদ্দিন আহমদ, মাতা সোনা বানু। পিতা-মাতা উভয়ে অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ ও ধার্মিক ছিলেন। কৃষিজীবী হলেও বিদ্যাশিক্ষার প্রতি তাদের মনোভাব ছিল অত্যন্ত অনুকূল। তবে আর্থিক অবস্থা তেমন স্বচ্ছল ছিল না।
মোহাম্মদ নজিবর রহমানের কাকা মোহাম্মদ জযেদউদ্দিন আহমদ অত্যন্ত বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। তারই উৎসাহে নজিবর বাল্যে বিদ্যাশিক্ষার দিকে অগ্রসর হন। এই কাকার নামেই পরবর্তীকালে তার ‘গরীবের মেয়ে’ নামক উপন্যাসটি উৎসর্গ করেন। কাকার কাছেই তিনি সাহিত্য সাধনার প্রাথমিক অনুপ্রেরণা লাভ করেন। [শ ইতিমধ্যে পিতৃ বিযোগ ঘটলে তিনি কিন্তু কর্মোদ্যম হারিয়ে ফেলেননি, এ সময় তিনি নর্মাল পরীক্ষায় পাশ করেন। প্রথমে তিনি পোস্টমাস্টার হিসেবে কিছুদিন কর্মরত ছিলেন। তারপর জলপাইগুড়ির মধ্য ইংরেজি স্কুলের বাংলা শিক্ষক মনোনীত হন। ৫। পরবর্তীতে তিনি বেলকুচি থানার ভাঙ্গাবাড়িতে ছাত্রবৃত্তি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনোনীত হন। কান্তকবি রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯১৮) ছিলেন এ স্কুলের সেক্রেটারি। নজিবর কয়েকবছর কান্ত কবির বাড়িতেই সপরিবারে বসবাস করেন। রজনীকান্তের উৎসাহেই তিনি পুরোপুরিভাবে সাহিত্য সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। । এরপর তিনি রংপুর নর্মাল স্কুলের বাংলা শিক্ষক পদে যোগ দেন। এরপর রাজশাহীর নিউস্কিম মাদ্রাসায় বাংলার শিক্ষক হিসেবে মনোনীত হন। পরে সিরাজগঞ্জ জেলার সলঙ্গা মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা (হেড পণ্ডিত হিসেবে) শুরু করেন। নানা কারণে সলঙ্গা স্কুলে বেশিদিন থাকতে পারেননি। ১৯১৭ সালে তিনি হাটিকুমরুলে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই শিক্ষকতা করেন। তিনি হাটিকুমরুলে একটি বালিকা বিদ্যালয়ও স্থাপন করেন এবং স্ত্রী রহিমা খাতুনকে সেখানে শিক্ষকতার দায়িত্বভার অর্পণ করেন।।গ শিক্ষকতার পাশাপাশি নজিবর সাহিত্য চর্চাও সমানভাবে চালিয়ে গেছেন। তার বিখ্যাত ‘গরীবের মেয়ে’ (১৯২৩), ‘পরিণাম’ (১৯১৮), ‘মেহেরউন্নিসা’ (১৯২৩), ‘দুনিয়া আর চাই না’ (১৯২৪), ‘বেহেস্তের ফুল’, ‘দুনিয়া কেন চাই না’ প্রভৃতি গ্রন্থ এই হাটিকুমরুলেই রচিত হয়েছিল।
(১)
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের ইতিলগ্নে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি জনসাধারণের দুর্বলতা ও ইংরেজ প্রবর্তিত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিদ্ধে প্রবল জনমত থাকা সত্ত্বেও নজিবর রহমান ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষায় শিক্ষিত হন। এই শিক্ষা গ্রহণ সত্ত্বেও পাশ্চাত্য প্রীতির বদলে তাঁর মধ্যে প্রস্ফুটিত হয় প্রবল স্বাজাত্যবোধ। এই লালিত বোধ ও বিশ্বাস তাঁকে স্বজাতির প্রাণে নবজাগরণের প্রেরণা সঞ্চার করতে উদ্দীপিত করে। পেশা হিসেবে তিনি শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেন, পশ্চাদপদ মুসলমান অধিকাংশ নিরক্ষর ও কৃষিজীবী। ইংরেজ রাজ ও হিন্দু জমিদারের যুগপৎ নির্যাতন হতে মুসলমানের মুক্তির একমাত্র উপায় শিক্ষা বিস্তার। খন্দকার মোহাম্মদ বশিরউদ্দিন লিখেছেন, ‘তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, শিক্ষার অনগ্রসরতাই এদেশের মুসলমানদের দুঃখ-দুর্দশা ও অবনতির একমাত্র কারণ। এবং এদেরকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারলে এদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই তিনি প্রত্যহ সন্ধ্যার পরে এক এক দিন এক এক গ্রামে বা পাড়ায় যেয়ে গণ্যমান্য ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে ডেকে সমবেত করে সারগর্ভ ভাষায় তাদেরকে শিক্ষার প্রযোজনীয়তা ও উপকারিতা বুঝিয়ে দিয়ে সবাইকে শিক্ষার প্রতি আগ্রহশীল করে তুলতেন। তিনি একদিকে আপন আপন ছেলে-মেযেদেরকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর জন্য সবাইকে অনুরোধ করতেন, অপরদিকে প্রত্যেককেই আপনাপন গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করে ছেলে-মেয়ে ও বয়স্কদের শিক্ষার পথ সুগম করে তোলার জন্য আকুল আহ্বান জানাতেন। এরই ফলশ্রুতিস্বরূপ নজিবর রহমান যখন যেখানকার স্কুলেই শিক্ষকতা করতে আরম্ভ করেছেন, সেই স্কুলেরই ছাত্রসংখ্যা অসম্ভবরূপে বেড়ে উঠেছে এবং তার পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহে বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে।
তাঁর অব্যাহত প্রচেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠে শতাধিক প্রাথমিক, মধ্য ইংরেজি স্কুল, নারী শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র বিদ্যালয় ও বয়স্কদের জন্য নৈশ বিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সরকারি সাহায্য প্রাপ্তির জন্যও তিনি বিরামহীন প্রচেষ্টা চালান।শ এভাবে শিক্ষা বিস্তার প্রচেষ্টার মধ্য দিযে তিনি মুসলিম নবজাগরণে ব্যাপক অবদান রাখেন। এক্ষেত্রে তাঁর সাহিত্য প্রয়াসও বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
সাহিত্যের পরিসরে বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতায়ন করার যে তৎপরতা তখন বাঙালি হিন্দু গ্রহণ করেছিল তিনি তার বিরুদ্ধে কোনো কুটতর্কে না জড়িয়ে ইসলামি সংস্কৃতি ও মুসলমানি বাংলা শব্দকে পরিশীলিত ও অনবদ্যভাবে তাঁর শক্তিশালী রচনায় উপস্থাপন করে এর জবাব দেন। ১১০০ নজিবর রহমানের সাহিত্য সাধনার মূল লক্ষ্য যে সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য প্রচার ও মুসলিম জাগরণ সে সম্পর্কে খন্দকার মোহাম্মদ বশির উদ্দিনের মন্তব্য উল্লেখের দাবি রাখে। তিনি বলেন, ‘নজিবর রহমানের মানস গঠনে সাহায্য করেছিল তৎকালীন মুসলিম জাগরণমূলক চেতনা ও গ্রাম্যজীবন সম্পর্কে নিজস্ব অনুভূতি যা সম্পূর্ণভাবে এদেশের মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের ধর্মীয় আদর্শবাদের উৎস থেকে সঞ্চারিত। বিভিন্ন পরিবেশ থেকে অভিজ্ঞতালব্ধ সত্যকে তিনি সাহিত্যের মাধ্যমে জনসাধারণের সামনে সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন। এখানেই তাঁর সমাজপ্রীতির স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে এবং এটাই তার জীবনের চরম সার্থকতা। (১১)
গোবিন্দচন্দ্র দাস (১৮৫৪-১৯২৪), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪১), ডি এল রায় (১৮৬৩-১৯১৩), অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়য ১৮৬১-১৯৩০), মোজাম্মেল হক (১৮৬০-১৯৩৩), কায়কোবাদ (১৮৫৮-১৯৫১), রিয়াজউদ্দিন আহমদ মাশহাদি (১৮৫৯-১৯১৮), আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৬৯-১৯৫৩) প্রমুখ প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের সমকালে নজিবর রহমান জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তিনি গ্রামীণ এবং আধা-নাগরিক শিক্ষিত সমাজের মানুষকে নিয়েই লিখেছেন। উল্লেখ্য যে, শিক্ষামূলক উপন্যাসগুলোও সেই পরিবর্তনশীল সমাজে জনপ্রিয় ছিল। যেমন, উর্দু ঔপন্যাসিক নাজির আহমেদ এবং রমেশচন্দ্র দত্তের (১৮৪৮-১৯০৯) উপন্যাসসমূহ। নারী, যাকে কিনা ‘ঐতিহ্য’ এবং ‘লোকজীবনের’ আধার ভাবা হত, সেই নারীই হয়ে ওঠে যাবতীয় নির্দেশাবলীর লক্ষ্য। সেই অর্থে ‘আনোয়ারা’ (১৯১৪) এবং ‘গরীবের মেয়ে’ (১৯২৩) রচিত হয় নজিবরের নিজস্ব মডেলের নতুন নারীর পথপ্রদর্শক হিসেবে।
নজিবর রহমানের সৃষ্টিশীল সাহিত্যের পটভূমি আধা-প্রামীণ, যার প্রেক্ষাপট মহানগর কলকাতার কোলাহলে ও অন্তরালে বিদ্যমান। সেখানে স্কুল, পোস্ট অফিস বা একটি হাসপাতাল আছে তবে পাত্রপাত্রীরা প্রধানত কৃষিজীবনের সাথেই সম্পৃক্ত। তাঁর নায়িকাদের জন্ম কৃষক পরিবারে বা অবস্থাপন্ন গৃহস্থ ঘরে। তারা লেখাপড়া করেছে এবং কালে কালে স্বামীর সহযোগিতায় হয়ে উঠেছে ‘ভদ্রমহিলা’, আদর্শ স্ত্রী, মা বা গৃহকর্মী। তার নায়কেরাও নতুন প্রজন্মের, যারা মাদ্রাসা এবং ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত। নায়কেরা ঔপনিবেশিক সরকারের চাকরি করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই ‘দাসবৃত্তি’ ত্যাগ করে নিজস্ব স্বাধীন ব্যবসায় নিযোজিত হয়। এসব লেখায় বদলি, সরকারি পোস্টিং, পদোন্নতি এবং বেতনের যেমন বিস্তর উল্লেখ রযেছে তেমনি বৃটিশরাজের দাসত্ব ত্যাগের উল্লেখ আছে। এখানে বহুবিবাহের উল্লেখ রযেছে এবং তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক, সমস্যাসংকুল। তাছাড়া নজিবর রহমানের লেখায় যে সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যায় তা হল আধা-প্রামীণ প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা নিয়ত পরিবর্তনশীল মধ্যবিত্তের জীবন। এসবই সমসাময়িক সমাজচিত্রের বাস্তব উপাদান।
(২)
বাংলা সাহিত্যের ধারায় মোহাম্মদ নজিবর রহমান জনপ্রিয় লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন ‘আনোয়ারা’ (১৯১৪) উপন্যাস লিখে। নব চেতনায় উদ্যমশীল মুসলমান জনশ্রেণির সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের আশ্রয়ে রচিত হয়েছে তাঁর ‘আনোয়ারা’ সা উপন্যাসে তিনি পশ্চাদপদ বাঙালি মুসলমানের শিক্ষার প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি আকর্ষণ, ধর্মীয় অনুশাসন প্রতিপালনে আগ্রহ সৃষ্টি ও সম্প্রদায়গত সম্প্রীতির উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। [২৩] রাজশাহী স্কুলে শিক্ষকতা করা কালে এটি রচিত।[১৪]
গঠনকৌশলে চার পর্বে–‘পূর্বরাগ পর্ব’, ‘বিবাহ পর্ব’, ‘ভর্তি পর্ব’, ‘পরিণাম পর্ব’ কাহিনি বিস্তার পেয়েছে। প্রত্যেকটি পর্বে আছে একাধিক পরিচ্ছেদ। যেমন পূর্বরাগ পর্বের দশটি পরিচ্ছেদ, বিবাহ পর্বে আটটি, ভর্তি পর্বে বাইশ আর পরিণাম পর্বে পঁচিশটি পরিচ্ছেদ বিরাজমান। বৃহৎ কলেবরের উপন্যাসটির কাহিনি গ্রথিত প্রেম-বিবাহ-প্রণয় প্রতিবেশে। এক সময় যথারীতি দাম্পত্য এবং পুনর্মিলন কাঠামোটিও উপন্যাসে তৈরি হয়। তবে পাপের পরাজয় আর পুণ্যের প্রতিষ্ঠা ঔপন্যাসিকের দার্শনিক আখ্যা অর্জন করে।
‘আনোয়ারা’র পঁয়ষট্টিটি পরিচ্ছেদ ও উপসংহারের বিন্যাস অনেকটা মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ (১৮৮৫-১৮৯১)-র অনুবর্তী মনে হয়। তাছাড়া বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-৯৪) খ্যাতনামা ও জনপ্রিয় উপন্যাস ‘বিষবৃক্ষ’ (১৮৭৩)-র সঙ্গেও অনুসরণীয় বললে অত্যুক্তি হয় না। কাহিনির প্রারম্ভিক পর্বের প্রেমানুরাগ উপন্যাসে ভীষণ আকর্ষণীয় এবং আগ্রহ-উদ্দীপক। কারণ বঙ্গীয় মুসলিম সমাজে নারীর প্রেমানুরাগ কিংবা পরপুরুষের প্রতি দৃষ্টিশর নিক্ষেপ সংস্কার ও রীতিবহির্ভূত। উপন্যাসের পূর্বরাগটিতে কাহিনির সূচনা এরপর বিবাহ, আত্মপ্রতিষ্ঠা, পাপের প্রায়শ্চিত্ত, সতীর মাহাত্ম্য প্রকাশ এবং মিলনাত্মক পরিণতিতে সমাপ্তি। এখানে পল্লবিত বিবাহ পর্বটি, শাখা কাহিনিও তৈরি হয়েছে, আছে নানাবিধ চরিত্রের সমাবেশ।
উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশের পর বাঙালি মুসলমানের ব্যাপক অংশকে আলোড়িত করতে সক্ষম হয়। এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদসিন্ধু’র উত্তরকালে একমাত্র আনোয়ারা প্রবাদতুল্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। প্রথমোক্তটি ইতিহাসাশ্রয়ী আর দ্বিতীয়টি সমকালীন সামাজিক পরিবেশগত উপাদান দিয়ে সৃষ্ট। বাঙালি মুসলমান হিন্দু ঔপন্যাসিকের হিন্দু সংস্কৃতি ও আবহে গড়ে উঠা সাহিত্য-উপন্যাসের বদলে এ উপন্যাসে স্বীয় সমাজের সামগ্রিক চিত্র প্রতিবিম্বিত হতে দেখে লুফে নিয়েছিল। জুলফিকার মতিন লিখেছেন, ‘বালিকা কোরান শরিফ, মেফতাহুল জান্নাত, রাহে নাজাত, পান্দেনামা, গোলেস্তা প্রভৃতি আরবী, পারসী ও উর্দু কেতাব তাহার দাদিমার নিকট শিক্ষালাভ করিযাছিল। মোনাজাত আরবী-মিশ্রিত উর্দুতে উচ্চারিত হইতেছিল, সুতরাং সে তাহার অর্থ অনেকাংশে বুঝিতে পারিতেছিল। বুঝিয়ো-শুনিয়া বালিকার চক্ষুও অশ্রুপূর্ণ হইয়া উঠিল। সে অসহ্য মনোবেদনা ভুলিয়া চিন্তা করিতে লাগিল, আহা, আজ কি শুনিলাম! এমন খোশ-এলহানে কোরান শরিফ পাঠ ত’ কখনও শুনি নাই, এমন মধুর উচ্চারণও ত’ কখনও শ্রুতিগোচর হয় নাই। কি মধুমাখা মোনাজাত।
আনোয়ারা সর্বংসহা নারী চরিত্র। মাতৃহীন চৌদ্দ বছরের আনোয়ারা পরিবারে অনাদরে বড় হয়েছে। সখি হামিদার কাছে সে নিজের প্রত্যয় ব্যক্ত করে। বর্ষার জলে ওজু করতে গিযে মধুর সূরে সে নূরল এসলামের কোরান পাঠ শুনতে পায়। তারপর তার মনোজগতে পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু আনোয়ারার স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষাই মুখ্য নয়। সে শিক্ষিত ও বৃত্তিধারী। পরিবারে অপাংক্তেয়। বিমাতা গোলাপজানের সব লাঞ্চনা সে সহ্য করেছে। নুরল এসলামের অর্থ ও সততাই তার কাল হয়ে যায়। সেবা শুশ্রূষায় সে আনোয়ারাকে নিঃস্বার্থ করে দেখেছে। সে সমস্ত সংস্কারমুক্ত হয়ে আনোয়ারার চিকিৎসা করেছে। সখি হামিদার স্বামী আমজাদ হোসেনের প্রচেষ্টায় আনোয়ারার শুভপরিণয় সম্পন্ন হয়। কিন্তু কাহিনি সরলরেখায় চলতে থাকে না। সৎ শাশুড়ির অপবাদ, আর অপহরণের ফলে চলতে থাকে নানা রটনা। এসব সে নীরবে সহ্য করে। শাশ্বত নারীর প্রতিনিধিরূপে সে প্রতিষ্ঠিত হয় অনেক পরীক্ষার ভেতর দিয়ে।
এ উপন্যাসে লেখক ধর্মচর্চা, মুসলিম রীতি-নীতি, আচার-আচরণ, আদেশ-উপদেশ-নির্দেশ অনুপুঙ্খভাবে উপস্থাপন করেছেন। উপন্যাসে ধর্মচর্চার বিষয় পারিবারিক জীবনাগ্রহে ব্যক্ত হয়েছে। আনোয়ারার স্বামী নুরল এসলাম সৎমাকে উদ্দেশ করে এমন সচেতন উক্তি করেন যেটি তৎকালীন সমাজের বিরুদ্ধে লেখকের মনেরই আজ্ঞা। পর্দাপ্রথা, ধর্মনিষ্ঠা বা বংশমর্যাদা সম্পর্কে নজিবর রহমানের স্পর্শকাতর দৃষ্টিচেতনাই তাকে পাঠকপ্রিয়তা দিয়েছিল। তবে নজিবর রহমান বহুবিবাহ ও তালাক প্রসঙ্গে কিছুটা রক্ষণশীল মনের পরিচয় দিয়েছেন। ‘আনোয়ারা’র ‘উৎসর্গপত্রে’ আছে ‘সতীর সর্বস্ব পতি, সতী শুধু পতিময়, বিধাতার প্রেমরাজ্যে সতত সতীর জয়। প্রধানত এই আদর্শকে রূপদান করবার জন্যই লেখকের সাহিত্য প্রয়াস। ইসলামের বিধিনিষেধের নির্দেশানুযায়ী তিনি সমাজ ও ধর্মীয় আচার বিশ্বাসের সংস্কার করতে সচেষ্ট হন। এই সংস্কার প্রেরণাই তাঁকে ব্রতী করে সাহিত্য সাধনায়। নজিবর রহমানের সমগ্র সাহিত্য প্রয়াস তাই প্রত্যক্ষভাবে সংস্কার উদ্দেশ্যমূলক। (১৭)
নূরল এসলাম ও আনোয়ারা দুজনেরই ধর্মীয় জীবনের বিষয়টি উপন্যাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আনোয়ারার মোনাজাত ও কোরআন পাঠের স্বপ্ন দেখা, নামাজের জন্য অজু করতে গিয়ে কোরআন শরীফ পাঠরত তরুণ নূরল ইসলামকে দেখা এবং এই সূত্রেই সতীর (আনোয়ারার) প্রার্থিত বিধাতার প্রেমরাজ্যে প্রবেশের সূত্রপাত ও শেষে পরিণয়ের ঘটনা ঘটে। আর আনোয়ারার ধমজীবনকে ঘিরেই পুরুষতন্ত্রের জয়জয়কার চূড়ান্ত রূপ নেয়।
আনোয়ারার বিবাহোত্তর ধমজীবনে নুরল এসলামই হয়ে ওঠে তাঁর ধর্ম ও পথপ্রদর্শক। ধর্মীয় নানা বিষয়ে স্বামীর মতামতই সে অনুসরণ করে এবং অপরকেও সেই অনুযায়ীই পরামর্শ দেয়। অবশ্য ঘরোয়া ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে অর্থাৎ বৈষয়িক জীবনে নূরল ইসলামের একক প্রাধান্যের ক্ষেত্রে কিছুটা তারতম্য লক্ষ করা যায়। স্ত্রী আনোয়ারার প্রতি সৎ শাশুড়ির অত্যাচার ও দুর্ব্যবহারের প্রতিক্রিয়ায় নূরল এসলাম সৎমাকে তিরস্কার করলে এর পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে আনোয়ারা নুরল এসলামকে যুক্তিপূর্ণ পরামর্শ দেয়। এখানে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মতামতের স্বীকৃতি-নির্ভর সহাবস্থানের নীতিই অনুসৃত হয়।
পুরুষতন্ত্রের প্রাধান্য এবং কতকটা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মতামতের স্বীকৃতি অর্থাৎ একদিকে সামন্তবাদী সমাজের সতীধর্ম তথা পতির পদতলে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের জিগির অন্যদিকে ইংরেজি শিক্ষাপ্রাপ্ত বিকাশমান মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের দাম্পত্যজীবনে নারীর মতামতের কিছু হলেও গুরুত্ব উপলব্ধির নবতর চেতনার তাগিদ ও দুইয়ের সমন্বয়ের উপরেই নূরল এসলাম ও আনোয়ারার দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি রচিত হয়েছে।
বিকাশমান মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজে পুরুষদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষাপ্রাপ্ত চাকুরিজীবী, ব্যবসায়ী ও আইন পেশায় যুক্ত ব্যক্তিবর্গের আবির্ভাব ঘটে। এদের গৃহিনীরাও অল্পবিস্তর শিক্ষাপ্রাপ্ত দেখা যায়। এ সমাজে নারী শিক্ষার প্রতিও আগ্রহ দেখা দেয়। আবার শিক্ষাপ্রাপ্ত আত্মীয় পরিজনদের অনেকেই থাকে শিক্ষাহীন বা অধশিক্ষিত এবং চিন্তা-চেতনায় প্রাচীনপন্থী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রাপ্তদের অনেকের মধ্যেও অতীতমুখী চিন্তার প্রভাব বিদ্যমান থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ সময়ে নবীনে-প্রবীণে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় সমাজে এবং নবীনদের অগ্রযাত্রার সূচনা হয়। কিন্তু লেখক এর আভাস দিলেও সেদিকে যাননি।
কেননা সমাজ সচেতন, পাশ্চাত্য শিক্ষায় আগ্রহী, নিজের চেষ্টায় বাংলা ভাষায় দক্ষতা অর্জনকারী স্বশিক্ষিত এই মানুষটিও অতীতমুখী চিন্তা-চেতনার চৌহদ্দি অনেকদিন থেকেই অতিক্রম করতে সমর্থ হননি। সমাজের নানান্তরে বিদ্যমান হীন, স্বার্থবুদ্ধিতাড়িত দ্বন্দ্বসমূহের চিত্র উপন্যাসে অঙ্কিত। সৎ মা-কন্যার বিরোধ, সৎ শাশুড়ি- গৃহবধূর দ্বন্দ্ব, কর্মস্থলে সহকর্মীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের বাস্তবসম্মত চিত্রের অভাব নেই উপন্যাসে। পাত্র-পাত্রীদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে আনোয়ারার সৎ মা গোলাপজান, নুরল এসলামের সৎমা, খাদেম, আজিমুল্লা রক্তমাংসের বাস্তব মানুষে পরিণত হয়েছে। গোলাপজান চরিত্রে অতি নাটকীয়তার প্রশ্রয় না দিলে চরিত্রটি আরও বিশিষ্ট হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আনোয়ারা কিংবা নূরল এসলাম লেখকের আরোপিত আদর্শের ভার বহন করতে গিয়ে অনেকটাই নির্জীব হয়ে পড়েছে। রক্তমাংসের সজীব চরিত্র হয়ে উঠতে পারেনি।
এদেশের কৃষকের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল পাট। কৃষক সন্তানের লেখাপড়া, শিক্ষিত কৃষক সন্তানের পাটের অফিসে চাকরি ও পাট ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার স্বাভাবিক প্রসঙ্গটি নূরল এসলামের চাকরি ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করে লেখক তৎকালের কৃষকের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট-নির্ভর অর্থনৈতিক জীবনের বাস্তবতার বিশেষ একটি দিককে নিপুণভাবেই উপন্যাসে তুলে এনেছেন।
‘আনোয়ারা’র পার্শ্বচরিত্রগুলি তুলনামূলকভাবে বেশ উজ্জ্বল। এসব খল চরিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নুরল এসলামের বিমাতার ভাই আলতাফ-পুত্র খাদেম, তার ইযার দুশ্চরিত্র আব্বাস ও লম্পট রতীশ বাবু। খাদেম সম্পর্কে লেখকের উক্তি, ‘সে নবীন যুবক। কখন দুবেলা, কখন এক বেলা, কখন বা দুই একদিন পর বাড়িতে আহার করে, এতদ্ব্যতীত সে বাড়ির সাথে আর কোন সম্বন্ধ রাখে না। গ্রামের দুষ্ট যুবকদলের সহিত তাহার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ।’ প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এর মতিলাল চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে খাদেম চরিত্রের সম্বন্ধ বিচার করা চলে। আর এক মানিকজোড় আব্বাস। লাম্পট্যে তার জুড়ি নেই। স্ত্রীশব্দ শ্রবণে সে জগৎ-বিস্মৃত হয়, তখন ঘর্মাক্ত কলেবর ও কর্দমাক্ত মন নিয়ে ইন্দ্রিয়ের দাবি মেটাতে সে স্ত্রীলোকের সন্ধানে ছুটে। তখন বারাঙ্গনালয় তার কাছে স্বর্গধাম বলে মনে হয়। অসৎ চরিত্র দুর্গা বৈষ্ণবীর সহযোগিতায় সে নিরীহ নিরপরাধ কুলবধূ আনোয়ারাকেও একদা দুর্ভেদ্য অন্ধকার রাতে ঘরের বাইরে আনার সৌভাগ্য অর্জন করে। অসুস্থ স্বামীর রোগ-মুক্তির জন্য দুর্গার ছলচাতুর্যে ভুলে আনোয়ারা তার পক্ষে সম্পূর্ণ অসঙ্গত সেই অনভিপ্রেত কাজটি সেদিন করতে বাধ্য হয়। পরে অবশ্য আব্বাস থানার প্রকোষ্ঠ-বন্দি হয়ে তার দুষ্কর্মের খেসারত দেয়। লাম্পট্যে এবং ইন্দিয়পরবশতন্ত্রে রতীশ বাবুরও একটা সুনাম আছে। রক্ষিতে রক্ষণে এই বিশিষ্ট বাবু ব্যক্তিটির যে ভূমিকা সে সম্পর্কে লেখক বলেন, ‘তাহার চরিত্র মন্দ এক রক্ষিতা রাখিয়াছেন। উপার্জিত অর্থ তাহার সেবাতেই ব্যয়িত হয়।’ সে নূরল এসলামের অশেষ ক্ষতি সাধন করে। মিথ্যা তহবিল তছরূপের অপরাধে নূরলের জেল হয়। তাতে রতীশবাবুর ভূমিকা ছিল প্রধান।
‘আনোয়ারা’ উপন্যাসের শেষে মানবজীবনের আর একটি নিষ্ঠুর দিকের সঙ্গে আমরা পরিচিত হই। এক নিশীথরাতে আনোয়ারার বিমাতা গোলাপজান জামাতা নুরল এসলামের অর্থ আত্মসাৎ করতে গিয়ে ভুলক্রমে ঘুমন্ত নূরল এসলামের স্থলে তার পাশে শায়িত নিজের আগের পক্ষের সন্তান বাদশাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই কাজে তাকে সহায়তা করে আনোয়ারার পিতা ভূঁইয়া সাহেব। নজরুলের ‘পদ্ম-গোখরো’ গল্পেও পশুর-শাশুড়ি কর্তৃক জামাতা-হত্যার চেষ্টার এরকম একটা নির্মম ঘটনার বর্ণনা আছে। রিপুর বশবর্তী হয়ে মানুষ যে অবলীলায় কত নিষ্ঠুর কাজের সঙ্গে জড়িত হতে পারে, এসব ঘটনা তারই প্রমাণ।
নজিবর রহমানের লক্ষ্য একজন পুণ্যবতী নারীর দৃষ্টান্ত এবং একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম সমাজের সংকীর্ণ পরিসরে গড়ে ওঠা প্রেমের পরিণতি তুলে ধরা। উপন্যাসের শুরুতে দেখা যায় সুন্দরী আনোয়ারা গ্রামের স্কুলের মেধাবী ছাত্রী। সে একজন শরীফ মেয়ে, আদর্শ শিক্ষা গ্রহণ করেছে, আগেই বলা হয়েছে, তাঁর পাঠ্যসূচিতে ছিল পবিত্র কোরআন, মেফতাহুল জান্নাত, রাহে নাজাত, গুলিস্তাঁ ইত্যাদি। তবে তাঁর পাঠ্য বিষয়ের মধ্যে শুধু উর্দু আর আরবি গ্রন্থই ছিল না, অন্য গ্রন্থও ছিল। কারণ বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি বস্তুত মিশ্র সংস্কৃতি, ফলে লেখক আরও কিছু গ্রন্থও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন-‘মেয়েটি… আবার পড়াশুনায় আরো উত্তম। আনোয়ারার স্মরণশক্তি অসাধারণ! স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, ভূগোল পাঠ, ভারতের ইতিহাস আদ্যন্ত মুখস্থ করিয়া ফেলিয়াছে। সীতার বনবাস, মেঘনাদবধ কাব্য, পদ্যপাঠ প্রভৃতি সাহিত্য পুস্তক সুন্দররূপে বুঝাইয়া লিখিতে পারে, হাতের লেখা চমৎকার । জামা সেলাই, নীলাম্বরী কাপড়ে ফুল তোলা দেখিয়া সেইদিন ইন্সপেক্টর সাহেব তাহাকে যে ১৩ টাকা পুরস্কার দিয়া গিয়াছেন তাহা বোধ হয় জান।’
নিঃসন্দেহে অনোয়ারাকে গড়ে তোলা হযেছিল নিখুঁত নায়িকা হিসেবে এমন এক চরিত্রের যে নিখুঁত স্ত্রী, মা এবং সঙ্গিনীর সমন্বয়। তবে আনোয়ারার মাথার উপর কালো ছায়ার মতো ভেসে আছে গোলাপজান, এককালীন সুন্দরী, তিনবার বিবাহিতা, ঈর্ষাপরায়ণ সৎ মা। গোলাপজান নিরক্ষর, আনোয়ারা শিক্ষিত। সে অলস, আনোয়ারা পরিশ্রমী। সে সংকীর্ণ, আনোয়ারা উদার। গোলাপজান ছিল প্রাচীন নারী আর আনোয়ারা উজ্জ্বল ‘নব নারী’, লেখক কর্তৃক সৃষ্ট এবং অনুমোদিত। উপন্যাসে সৎ মা গোলাপজান আনোয়ারার জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে কিন্তু ভাগ্যক্রমে পরে আনোয়ারার বিয়ে হয় নায়ক নুরল এসলামের মতো আদর্শ পুরুষের সঙ্গে। বাবার মৃত্যুর কারণে কলকাতার পড়াশুনা স্থগিত রেখে নুরল এসলাম এক বন্দর নগরের পাটকলে চাকরি নেয়। নুরলের কোরআন তেলাওয়াতকে কেন্দ্র করে আনোয়ারা এবং নূরল প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। নিজের নৌকায় বসে কোরআন তেলাওয়াতের সময় নুরল দৈবাৎ জানালার ফাঁকে আনোয়ারাকে দেখে ফেলে এবং তৎক্ষণাৎ প্রেমমুগ্ধ হয় আনোয়ারা প্রেমে পড়ে যায় নূরলের চমৎকার কন্ঠে নিমগ্ন কোরআন তেলাওয়াত শুনে। লেখক আরও খানিকটা এগিয়ে যান। নুরল শখের ডাক্তারি করত। কিছুদিন পর আনোয়ারা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ডাকা হয়। যথার্থ ভিক্টোরিয়ান কায়দায় নূরল আনোয়ারার একগুচ্ছ চুল কেটে তাঁর পকেটে রাখে। এর আগে নূরল এক ধনী ঘরের মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে এই যুক্তিতে যে, ‘পাত্রী সুন্দরী হইলেও অশিক্ষিতা। তিনি আরও ভাবিলেন, বিবাহ যাবজ্জীবনের সম্বন্ধ। একটি পবিত্র সম্পর্ক তখনই ফল বয়ে আনতে পারে যদি নারী শিক্ষিত হয়।’
বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে দম্পতির ভালোবাসা বিকশিত হতে থাকে। আনোয়ারা তার উপর আরোপিত সামগ্রিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়–একজন প্রেমময়ী স্ত্রী, সহযোগী, উপদেষ্টা, গৃহকর্ত্রী এবং মা হিসেবে। নূরলকে প্রায়ই বাড়ির বাইরে যেতে হয়। চিঠির মাধ্যমে তাদের প্রেমের আদান-প্রদান হয়। নুরল তাকে অভিহিত করে ‘প্রাণাধিক’ বলে এবং আনোয়ারা তাকে তৎকালীন অজস্র নির্দেশিকার নিয়ম মাফিক লেখে ‘শ্রদ্ধেয় প্রভু আপনার চরণে লক্ষ লক্ষ সালাম রহিল’ ইত্যাদি। সুখে চলতে থাকে তাদের সংসার। উপন্যাসটিতে নাটকীয়তা সৃষ্টি করা হয় তৎকালীন জনপ্রিয় পিতৃতান্ত্রিক উপাদানের মাধ্যমে–তা হল ‘নারীর সতীত্বের পরীক্ষা’।
স্থানীয় লম্পট আব্বাস আলী আকস্মিকভাবে সুন্দরী আনোয়ারাকে দেখে। কামের বশবর্তী হয়ে সে গ্রামের বোষ্টমী দুর্গার শরণাপন্ন হয়। (ততদিনে ভদ্র-সংস্কৃতির সূত্রপাত ঘটেছে এবং তখন বৈষ্ণব সংস্কৃতি লাম্পট্যপূর্ণ বলে বিবেচিত। বৈষ্ণবদের প্রেম ও যৌনতার ধারণা নীতিবাগীশ ভদ্র মানসিকতায় অনুমোদন পায়নি)। দুর্গার ষড়যন্ত্রে নিরীহ আনোয়ারা তার অসুস্থ স্বামীর জন্য একটি ভেষজ গাছ তুলতে গভীর রাতে জঙ্গলে গেলে আব্বাসের লোকেরা তাকে অপহরণ করে। সৌভাগ্যবশত কোনও বিপদ হওয়ার আগেই সে উদ্ধার পায় এবং তার স্বামীর সঙ্গে পুনরায় মিলিত হয়। কিন্তু পরবর্তী দৃশ্যটি রাম-সীতার কাহিনিকে মনে করিয়ে দেয়। দেখা যায় নূরলের মনে সন্দেহের বীজ উদয় হয়েছে। তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ দেখা দেয়। এখানে আনন্দময় পরিসমাপ্তি ঘটে, সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে নায়িকার সতীত্ব প্রমাণিত হয়। এ উপন্যাসের মর্মবাণী হল, বাহিরের জঙ্গল (আসলে যা বাইরের পৃথিবী) নানা বিপদে ঠাসা। নব নারীকে তাই বুঝেশুনে পা ফেলতে হবে।
কিন্তু আনোয়ারাকে কি ‘নব নারী’ বলা চলে? একটি স্তবকে যেখানে তার স্বামী তাকে কোর্টে নিয়ে পর্দার আড়াল থেকে আব্বাসের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে অনুরোধ করে, তখন সে অস্বীকৃতি জানায়। সে গর্বভরে নিজেকে অসূর্যস্পর্শা দাবি করে। আনোয়ারা তার নিভৃত অবস্থান নিয়ে গর্বিত। সে তৎকালীন কোনো কোনো মহিলার মতো পর্দাপ্রথার শিথিলতার উদার দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থক নয়, যদিও সে শেষ পর্যন্ত কোর্টে সাক্ষ্য দিযেছিল। নজিবর নারীত্ব বিষয়ে তৎকালীন প্রচলিত ধারণাই চিত্রিত করেছেন। পরপুরুষের সামনে কথা বলতে আনোয়ারা রাজি না থাকলেও সে লিখিত বক্তব্য প্রদানে সম্মত হয়েছে। আনোয়ারার লেখকের বিবেচনায় এটাই ছিল ‘নব নারীত্বের’ আদর্শ।
‘আনোয়ারা’র বিষয়-ভাবনা ও চরিত্র-চিত্রণের সঙ্গে পরবর্তীকালে প্রকাশিত মোজাম্মেল হকের ‘জোহরা’ (১৯১৮),
মোহাম্মদ কোরবান আলীর ‘মানোয়ারা’ (১৯২৫) এবং কাজী ইমদাদুল হকের ‘আবদুল্লাহ’ (১৯৩২) উপন্যাসের চরিত্রগত কিছু মিল আছে। আসলে তৎকালীন মুসলিম সমাজ ও পরিবার-জীবনের প্রকাশকল্পে রচিত সব উপন্যাসেই এই মিল খুব স্বাভাবিক। আধুনিককালের বহুভার পীড়িত জীবন-বাস্তবতার সঙ্গে মনস্তত্বের জটিল সম্পর্ক রক্ষা করে মানব-সমাজ ও মানব-জীবনের অবক্ষয়ের ধারণা দেওয়ার প্রয়াস এগুলিতে নেই। তৎসমবহুল ভারী ভারী শব্দপ্রযোগে বাংলা ভাষার ক্লাসিক আভিজাত্য রক্ষা করে নায়ক-নায়িকার মধ্যে মধ্যযুগীয় প্রেম, তাদের চরিত্রমাহাত্ম্য, নীতি ও আদর্শবাদ প্রচারেই লেখকগণ বেশি ব্যস্ত থাকেন। এক ধরণের নিস্তরঙ্গ ভাবের সুধাময় বিকাশের মধ্যেই এদের যাকিছু সার্থকতা। ফলে একালের পাঠক এসব উপন্যাসের রস-নিষ্কাশনে আনন্দ পাবে এমন মনে হয় না। কেননা এ যুগের পাঠক এ যুগের উপন্যাস পাঠেই বেশি আনন্দ পায় এবং পাঠকের এই আনন্দ পাওয়ার বিষয়টি বর্তমানকে ঘিরেই আবর্তিত হয় বলে তাতে অবলীলায় স্থান পায় দেশের রাজনীতি ও তার হলাহল যা একজন সাধারণ রিকশাওয়ালার অনুভূতি ও বিবেচনাকেও এখন অনায়াসে শান দেয়, মধ্যবিত্ত জীবনের বিড়ম্বনা বা ভদ্রপাড়ার লোকদের আত্মতুষ্টি বিনাশের বহুবিধ মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা, ফুটপাতের জনজীবন ও বস্তির ছিন্নমূল মানুষের অপাঙক্তেয় জীবনের কাহিনি এবং তাদের চারপাশ ঘিরে প্রবহমান- অনাচার ও কুৎসিত জীবনকে মোকাবিলা করার অপরিমেয় শক্তি। তার পাশাপাশি বিকৃত যৌন আবেদন, জীবনের নানা ক্ষেত্রে অসুস্থ উন্নাসিকতা, বিকার, অনীহা কিংবা কৃতকর্মের আত্মপাপদগ্ধ অনুশোচনা- আধুনিক শিল্পভাবনায় এসব বিষয় সুলভ বলেই এযুগের উপন্যাস পাঠককে বেশি আকর্ষণ করে। তবে ‘আনোয়ারা’ এতসব বিষয়ের উপস্থাপনা নেই বলে আমাদের আফসোস করারও কোনও কারণ নেই। কেননা সেযুগের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত ‘আনোয়ারা’র বিষয়-ভাবনা ও তার শিল্পাদর্শকে তখনকার প্রেক্ষিতেই বিচার করতে হবে।
শৈল্পিক পরিমণ্ডলটি তৈরি হয় নিরঙ্কুশ সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে। সীমাবদ্ধ ও আচ্ছন্ন সমাজের ভেতরে থেকেও রক্তমাংসের এক মানবীয় শক্তিকে নিরীক্ষায় নামেন নজিবর রহমান। প্রসঙ্গত সত্য, সেটা তার উদ্দিষ্ট কিংবা আরোপিত চিন্তা নয়। এটি স্বতঃস্ফূর্ত এবং স্বাভাবিক। আর এ সত্যের প্রমাণ পাওয়া যায় গ্রামচিত্র বর্ণনার দিব্যদৃষ্টি কাঠামোতে ‘ভাদ্রমাসের ভোরবেলা। স্বর্গের উষা মর্ত্যে নামিয়া ঘরে ঘরে শান্তি বিলাইতেছে। তাহার অমিয় কিরণে মেদিনী-গগন হেমাভ বর্ণে রঞ্জিত হইযাছে। উত্তর-বঙ্গের নিম্ন সমতল গ্রামগুলি সোনার জলে ভাসিতেছে। কর্মজগতে জাগরণের সাড়া পড়িয়াছে… পাখীকুল সুমধুর স্বরলহরী তুলিয়া জগৎপতির মঙ্গলগানে তান ধরিযাছে। ধর্মশীল মুসলমানগণ প্রভাতিক নামাজ অন্তে মসজিদ হইতে গৃহে ফিরিতেছেন। হিন্দু-পল্লীর শঙখ- ঘন্টার রোল থামিয়া গিয়াছে।”*। হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তৎসম শব্দের উদাত্ত ব্যবহার, চমৎকার উপস্থাপন কৌশলে পৌঁছে যায় পাঠকমর্মে।
ঔপন্যাসিক-শিল্পরূপ হিসেবে গ্রন্থটি সমকালীন বাংলা উপন্যাসের পটভূমিতে উল্লেখযোগ্য নতুনত্ব বহন করেনি বটে, কিন্তু একটা বিকাশমান জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও আদর্শগত জীবনের শব্দরূপ হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এই জনজীবনের বুদ্ধিবৃত্তি ও চেতনাবিস্তারের জটিল গ্রন্থিতে ‘আনোয়ারা’র সামাজিক চাহিদা ও ব্যাপক পাঠক-নন্দিত হওয়ার কার্যকারণ নিহিত। ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসে দুই তরুণ-তরুণীর আত্মপীড়ন, ত্যাগ এবং পরম চরিতার্থতার মধ্য দিয়ে বিকাশ ও পরিণতি লাভ করেছে। আনোয়ারা এবং নূরল এসলামের জীবনবিন্যাসের অনুষঙ্গে ঔপন্যাসিক একটা সমাজের অন্তর্গত ও বহির্গত স্বরূপ উন্মোচনে অনেকাংশেই সক্ষম হয়েছেন বলা চলে। একারণেই আনোয়ারা নব্য বিকশিত বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের প্রথম ঔপন্যাসিক শিল্পরূপ। এ-উপন্যাসের আদর্শপ্রতিমা কল্পনায় আনোয়ারার স্থান মুখ্য হলেও ঔপন্যাসিকের জীবনাদর্শের প্রতিবিম্ব হল নূরল এসলামের চরিত্র। বিংশ শতাব্দীর নবজাগ্রত বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের চেতনা সক্রিয়তার সীমাবদ্ধতা বা সম্ভাবনার সারাৎসারকে ধারণ করেই নূরল এসলাম গৌরবান্বিত।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সত্যিকার চরিত্র বা বিশ্বাসযোগ্য চরিত্ররূপ নির্ণয়ে লেখকের কৃতিত্ব আমাদের মন কাড়ে। এ কারণেই ‘আনোয়ারা’ হয়ে ওঠে জনপ্রিয় উপন্যাস। প্রকৃত অর্থে চরিত্রের সন্ধানী দৃষ্টিটি আসলে লুকায়িত থাকে তার উৎপাদন-সম্পর্কে কিংবা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমাজ পরিকাঠামোতে। নূরল এসলাম তেমনই বাঙালি মুসলিম সমাজের প্রতিনিধি। সবেমাত্র সে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, এবং তখনই নতুন একটি ঘটনার সংযোগ অনিবার্য হয়ে ওঠে কাহিনিতে। আনোয়ারার সঙ্গে শুশ্রুষার অজুহাতে সাক্ষাৎ। এরপর যথারীতি কাহিনির সম্প্রসারণ যা উপন্যাসকে উপন্যাস করতে সহায়তা করে। তবে এসবের বাইরেও উপন্যাসটির জনপ্রিয়তা সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত সাহিত্যকার মুহম্মদ আবদুল হাই (১৯১৯-৬৯) বলেছেন, ‘গ্রামের অল্প শিক্ষিত মুসলমানরাই এর খরিদ্দার ও সমজদার সমাজে শিক্ষিতদের প্রযোজন, বহু বিবাহের কুফল, ভদ্রতার দোষ, স্ত্রীশিক্ষার উপকারিতা, স্বামী-স্ত্রীর পরস্পর সমঝোতা, কুলগর্বের অন্তঃসারশূন্যতা, চাকুরি জীবনের বিড়ম্বনা, স্বাধীন ব্যবসায়ের সুখ, গ্রাম্য দলাদলি, স্বার্থান্ধের হিতাহিতজ্ঞানশূন্যতা, গুণ্ডা বদমাইশের ষড়যন্ত্র, প্রকৃত সতীত্বের গৌরব আর ধর্মজীবনের মাহাত্ম্য প্রভৃতি সস্তা ভাবালুতা গ্রন্থকার সেকালের সাধু ভাষায় যেভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন, সাধারণ মুসলমানের কাছে তার আবেদন আকষণীয়। আনোয়ারা ও নূরল ইসলাম মুসলিম গ্রামীণ সমাজের টাইপ চরিত্র। এ সমাজের নর-নারীর এমন টিপিক্যাল চরিত্র নজিবর রহমানের মতো আজও কেউ চিত্রিত করতে পারেননি। এ কারণেই সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত এত অধিক সংখ্যক লোক এত আগ্রহের সঙ্গে এ বইটির রসোপলব্ধি করে আসছে। (১৯)
‘আনোয়ারা’ উপন্যাসটি সর্বাংশে মুসলমানের পারিবারিক ও সামাজিক কাহিনি হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুপুরাণ ও কাহিনি কাব্যের প্রভাব এই রচনায় দুনিরীক্ষ নয়। আনোয়ারা চরিত্র কখনো কখনো শকুন্তলা, সীতা চরিত্রের অনুসারী। লেখকের অবচেতন মনে আদর্শ নারী হিসেবে শকুন্তলা ও সীতার ইমেজ কাজ করে ছিল বলে মনে হয়। আনোয়ারার স্বামীগৃহে যাত্রার সময় দাদিমা বলছেন, ‘চিরদিন পিতৃগৃহে বাস করা কন্যার কর্তব্য নহে। শরিয়ত মতে দুনিয়ার পতিগৃহই তাহার প্রকৃত আবাসস্থল। পরন্ত পতিসেবা না করিলে স্ত্রীলোকের নামাজ, রোজা, ধর্মকর্ম সব বিফল। অতএব তুমি পতিসেবা ধর্মকর্ম রক্ষা করিবে। পতিকুলের তৃপ্তিসাধন ও মুখোজ্জ্বল করিবে। তাই বৎসে তোমাকে পতিগৃহে পাঠাইতেছি। বিদায়ের সময় আসন্ন হইয়াছে, আর অধিক কি বলিব?’ [২০]
দাদিমার এই উক্তি শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রাকালে কন্বমুনির উপদেশ স্মরণ করিয়ে দেয়। পরিণাম পর্বের তৃতীয় পরিচ্ছেদে নুরল এসলামের আত্মদংশন অনুরূপভাবে রামায়ণের দ্বারা প্রভাবান্বিত। অপহৃতা আনোয়ারার উদ্ধারের পর জনশ্রুতি শ্রবণ করে নূরল এসলাম দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছে, ‘একদিকে সাধ্বীসতী, অপরদিকে লোকাপবাদ, কোনটি ত্যাজ্য? কোনটি উপেক্ষণীয়? সরলা, অবলা-অন্ধকার রাত্রি সত্য কি পাপিষ্ঠেরা তাহার ধর্মনাশ করিতে পারিয়াছে? তাহা কি নিষ্ঠুরতা। কি নীচাশয়তা!! ধর্ম বিক্রয়ে কর্ম রক্ষা, দীন ছাড়িয়া দুনিয়া-না, না, আমার দ্বারা তাহা হইবে না, শত কোটি অপমানের বোঝা অম্লানচিত্তে বহন করিব, তথাপি সাধ্বী সহধর্মিনীকে ত্যাগ করিব না। লোকাপবাদ অমূলক হইলেও সামান্য নহে। আমি কেমন করিয়া লোকের মুখ বন্ধ করিব? ২১] সীতাকে পরিত্যাগ করবার পূর্বে এ যেন রামচন্দ্রের আত্মবিলাপ।
গভীর সমাজবোধ ও স্বতন্ত্র জীবনদৃষ্টির জন্য ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসের গুরুত্ব কম নয়। ভাব-ভাষা-আখ্যান বর্ণনায় ‘আনোয়ারা’ চিরায়ত সাহিত্যমূল্য পাওয়ার যোগ্য। ‘আনোয়ারা’র প্রশংসা করে সমকালীন বুদ্ধিজীবী পঞ্চানন নিযোগী নজিবর রহমানকে লিখেছিলেন ‘… সবিশেষ মনোযোগ দিয়াই পড়িয়াছি। আপনি মধ্যে মধ্যে অনেকগুলো ফার্সি কথার ব্যবহার করিয়াছেন। যথা আম্মাজান, কলেজা, দুলা মিয়া, বরকত, খোস এলহান প্রভৃতি। হিন্দু পাঠকবর্গের নিকট এই সকল শব্দগুলো অবোধ্য হইলেও এই সকল শব্দ ব্যবহারে আদৌ অন্যায় হয় নাই। কারণ মুসলমান সমাজে এই সকল শব্দ নিত্য ব্যবহৃত হইয়া থাকে। মনে রাখিতে হইবে বাঙ্গালা ভাষার এক-চতুর্থাংশ শব্দ আরবি-ফার্সি হইতে প্রাপ্ত। আরও মনে রাখিতে হইবে বাঙ্গালা শুধু হিন্দুর মাতৃভাষা নহে মুসলমানদের মাতৃভাষাও বটে।… এরূপ ভাষার প্রচলন হইলে মুসলমান সমাজেই মাইকেল, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের ন্যায় কবি লেখক জন্মগ্রহণ করিবেন।’ সেকালে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ কুমুদিনীকান্ত ব্যানার্জি আনোয়ারা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন ‘…ইহাতে মুসলমান সমাজের একটি সুন্দর চিত্র অঙ্কিত হইয়াছে। ২২। বঙ্গবাসী কলেজের অধ্যক্ষ গিরিশচন্দ্র বসু ‘আনোয়ারা’ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, ‘Moulvi Nazibar Rahman’s ‘Anwara” is a best novel in elegant Bengali which I have read with interest and profit. It gives an insight into Mohammedan Society, গণ এসব মন্তব্যে বোঝা যায় যে, ‘আনোয়ারা’ সাধারণ মুসলমানদের গণ্ডি পেরিযে উচ্চশিক্ষিত মহলেও সাড়া জাগিয়েছিল।
মোহাম্মদ নজিবর রহমানের পূর্ণায়ত শিল্পমেধার প্রতিফলন ঘটেছে এ উপন্যাসে। বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির আড়ষ্ঠতার বদলে যুক্তি, অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত জীবনবাদ প্রতিষ্ঠায় ‘আনোয়ারা’ প্রেরণার উৎস। আর লেখকের কৃতিত্ব এই যে, বাঙালি মুসলমানের ঘরের কথা তিনিই প্রথম উপন্যাসে প্রকাশ করলেন। সমাজচিত্র তুলে ধরা যদি উপন্যাসের অন্যতম কাজ হয়ে থাকে তবে ‘আনোয়ারা’ তা সার্থকতার সঙ্গে পালন করেছে। একদা যুগের প্রযোজনে উনবিংশ-বিংশ শতকের সন্ধিক্ষণে বাঙালি মুসলমান সমাজে সংস্কার-আন্দোলন দানা বেঁধেছিল। নজিবর রহমান তাঁর রচনার মাধ্যমে সেই আন্দোলনের শিক্ষাকে রূপায়িত করবার প্রয়াস পেয়েছেন।
(৩)
জনপ্রিয়তার নিরিখে ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসের পরেই ‘গরীবের মেয়ে’র (১৯২৩) স্থান। ‘গরীবের মেয়ে’ তেত্রিশ পরিচ্ছেদের উপন্যাস। গরীব কন্যা নূরীর (নূরজাহান) বাল্যশিক্ষা, বিদ্যার্জন, বিয়ে, দাম্পত্য সবই এ উপন্যাসের বিষয়। নূর মোহাম্মদ নজিবর রহমানের মানসকন্যা। তাকে গড়ে তোলার প্রয়াসটি বর্ণিত এর পরিপুরক স্বামী নূর মোহাম্মদের ভেতর দিয়ে। পরিবারের নীতি আদর্শ, মিতব্যয়িতার যাবতীয় বিষয় নির্দেশিত উপন্যাসে। ‘গরীবের মেয়ে’ উপন্যাসে সমকালীন সমাজচিত্র যেমন অঙ্কিত হয়েছে তেমনি পতিত মুসলমানের অধঃপতনের কারণ নির্ণয় ও তা দূরীকরণের মাধ্যমে সামাজিক জাগরণে নজিবরের চিন্তা-চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে। সমকালীন শিক্ষা-ব্যবস্থায় ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতি অনুপস্থিত। এমনকি হযরত মোহাম্মদের (সা.) জীবনী পাঠদানেরও ব্যবস্থা নেই। সদ্য বিবাহিত স্ত্রী মধ্য বাংলা পাঠরত নূরী ও স্বামী নূর মোহাম্মদের কথোপকথনে বিষয়টি প্রতিভাত হয়—
‘হযরতের জীবন চরিত পড়েছ?
জ্বি, না!
বাংলা বই কি কি পড়েছ?
মেঘনাদবধ কাব্য, সীতার বনবাস, চারুপাঠ–তৃতীয় ভাগ ও কবিতাবলী।
বাংলায় সেরা সেরা বই পড়েছ, অথচ হযরতের জীবনী পড়নি, নামাজ পড়তে শেখনি, এটা খুব দুঃখের কথা। শিক্ষার এই মহাদোষ যে কবে দূর হবে তা কে জানে? যা হোক আমি তোমাকে শিখিয়ে দিব। নূর মোহাম্মদ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হননি, জনগণের শিক্ষা-দীক্ষার প্রতিও নজর রেখেছেন। তিনি এমন একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তার স্ত্রী নূরীকে তত্ত্বাবধানের ভার দিয়েছেন, যে বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি চরকা কাটার প্রশিক্ষণ নিয়ে উপার্জনক্ষম ও স্বাবলম্বী হতে পারে। পতিত পুষ্করিণী ও সংলগ্ন অনুর্বর ৫০ বিঘা সম্পত্তি পত্তনি নিয়ে শাক-সবজীর বাগান, মাছের চাষ, হাস-মুরগী পালন প্রভৃতি কর্মের মাধ্যমে গ্রামবাসীকে তিনি উন্নয়নের পথ প্রদর্শন করেন। উপন্যাসের নায়ক নূর মোহাম্মদ স্কুল বা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাকে মসজিদ স্থাপনের চেয়েও অধিকতর প্রযোজনীয় বলে মনে করেন। স্ত্রী নূরীর মসজিদ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের জবাবে গ্রন্থকার নূর মোহাম্মদের জবানীতে বলেন যে, ‘যেখানে পানির কষ্টে লোকের প্রাণ যায়, সেখানে পুকুর না কেটে মসজিদ করায় কোন পুণ্য নেই, কোন লাভ নেই। এ দেশের মূর্খ মুসলমান তা বোঝে না–এরা কেবল মসজিদ বানায়, অথচ স্কুল বা মাদ্রাসা গড়ে না। আমাদের অধঃপতনের এটাই কারণ।
এই উপন্যাসে অন্তঃপুরের চিত্র অঙ্কনে দুর্দম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন নজিবর রহমান। উপন্যাসে সমাজচিত্র রচনার প্রতি লেখক বেশি যত্নশীল। মুসলিম ধর্মীয় চেতনায় একাধিক বিয়ের রীতিটি এ উপন্যাসের কাহিনিতে গুরুত্ব পেয়েছে। এক্ষেত্রে পারিবারিক জীবনাচার, সেখানকার ভেতরের সম্পর্ক সম্ভাবনা, দায়িত্ব-কর্তব্যনিষ্ঠা উপন্যাসে প্রতিষ্ঠিত। আদর্শায়িত হলেও কেন্দ্রীয় চরিত্র নূরীর ক্রমবিকাশ ও তার দরিদ্র-জীবনের রূপায়ণ সুন্দরভাবে বিন্যস্ত উপন্যাসে। লেখকের সাত বছর বয়সী নূরীর বিবরণটি আকর্ষণীয় –‘নূরীর পরিধানে তিন হাত লম্বা একখানি চরকাকাটা মোটা সুতার ধোবরা। দুই হাতে বেদেনীদিগের দেওয়া চারিগাছি বেলওয়ারী চুড়ি, গলায় সোনালী এক তাবিজ, মাথায় একডালি তৈলহীন চুল তাহাতে উকুনির বাসা, গা ভরা ময়লা, এই সকল লইয়া সে তাহার মায়ের সাংসারিক কার্য্যের সহায়তা করে। সময় সময় ঢেঁকিতে ধান ভানে, উনানে আগুন ধরায়, অবসর ও খুশিমত চরকায় সুতা কাটে। আবার কখনো বা বাড়ীর ছোট ছেলেমেয়ে কোলে করিয়া নিকটবর্তী অন্যান্য বাড়ীতে ঘুরিয়া বেড়ায়। নুরীর বয়স সাত বছর। ‘গরীবের মেয়ে’ উপন্যাসে সাংস্কৃতিক আবহ নির্মাণে বিবিধ ভাষ্যের প্রযোগ ঘটিয়েছেন লেখক। এক্ষেত্রে নীতি-আচার বা চরিত্রের বিচারবুদ্ধি, সামাজিক প্রতিবেশে ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ, পাপ-পুণ্যের বিধিবিধান পূর্ণাঙ্গ প্রয়াসে চিত্রিত করেছেন লেখক। ধর্মীয়-সংস্কৃতি কিংবা প্রথাবদ্ধ সমাজরীতি সম্পর্কে নজিবর রহমানের নানারকম সীমাবদ্ধতা থাকলেও ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। ‘গরীবের মেয়ে’ শুধু উপন্যাস নয়, একটি মুসলিম সমাজচিত্রের সামগ্রিক স্বরূপ নির্ধারিত। এ ক্ষেত্রে অনেকটা প্রগতিপন্থী মনে হয় তাঁকে। বিশেষ করে নারীর রূপ বর্ণনায় কিংবা প্রতিবেশ রচনায় তিনি অনেকটা সাবলীল। তাছাড়া সদ্য শিক্ষিত মুসলিম চরিত্র, তাদের জীবনদৃষ্টি কিংবা সমাজহিতৈষী চেতনা উপন্যাসে উল্লেখযোগ্য বীক্ষণ অঙ্কন করে। এ ক্ষেত্রে নজিবর রহমান অনেকটা সাবলীল এবং সার্বভৌম। মসজিদ-মাদ্রাসার শিক্ষা-সংস্কৃতি বা তার ভেতর দিয়ে আর্থ-সামাজিক উন্নতি, বিদ্যাশিক্ষার উচ্চকিত আলেখ্য উপন্যাসের জীবন-পরিচর্যায় নির্ণীত। এসব কারণে ‘গরীবের মেয়ে’ জনপ্রিয়ও বটে। তাছাড়া নজিবর রহমান নূরীর মাধ্যমে যথার্থই এক ‘নব নারী’কে গড়ে তোলেন। কিংবা বলা যায়, তিনি সেই ‘নব নারীর পুরুষ কারিগর নূর মোহাম্মদকে দিয়ে কাজটি সিদ্ধ করেন। নজিবর বিদ্রূপাত্মক স্বরে বলেন, ‘উপন্যাস হিসাবে এখানি যেন উপন্যাসই হয় নাই। কারণ ইহাতে পাশ্চাত্যের ছায়াবলম্বনে পতিতা, পতিব্রতার মনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণ দ্বারা উচ্চশিক্ষিতকে উৎকৃষ্ট মানসিক খাদ্য উপহার দেওয়ার চেষ্টা করিতে পারা যায় নাই এবং তৎসঙ্গে হরিণের রথে চড়িয়া স্বর্গে উধাও হওয়ার বন্দোবস্ত নাই। আর নাই ইহাতে নায়িকা লইয়া তীর্থে তীর্থ, দেশ-বিদেশে ঘুরিয়া বেড়াইবার কথা। তবে আছে কি? আছে কেবল পাড়াগাঁয়ের দরিদ্র মধ্যবিত্ত গৃহস্থ মেয়েদের সুশিক্ষার কথা ও তাহাদিগকে লইয়া অবিচিত্ররূপে সুখ-শান্তির ঘরকন্না করিবার কথা এবং আর একটু আছে পুরাতন চরকার ঘ্যানর-ঘ্যানানি। অতএব যাহারা ‘না’-ই চাহিবেন তাহারা এই পুস্তক হাতে না লইলে দুঃখিত হইবে না। আর যাহারা ‘আছে’ চাহিবেন, তাহারা দয়া করিয়া ইহার পাতা উল্টাইলে শ্রম সফল বোধ করিবে।’ ২৭।
নজিবর রহমান নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের জন্য একটি মডেল দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। শিক্ষার জন্য নূরীর অদম্য আগ্রহ। গরিব হওয়ার কারণে সে গ্রামের স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য নিজের ছাগল বিক্রি করে। বারো বছর বয়সে সে মধ্যম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়। আনোয়ারার মতো সে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা গ্রহণ করে। ইতিমধ্যে তার জীবনে নাটকীয় ঘটনাটি ঘটে। তার সঙ্গে বিয়ে হয় সরকারি বালক বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক নূর মোহাম্মদের। স্বামীর অভিভাবকত্বে নূরী ‘আদর্শ নারী’ হিসেবে গড়ে ওঠে।
মুসলিম সমাজের যেটুকু বাস্তবচিত্র, গরীবের মেয়েতে বিধৃত হয়েছে তার গুরুত্বও কম নয়। ভূমিকায় লেখক বলেছেন, এ গ্রন্থে ‘আছে কেবল পাড়াগাঁয়ের দরিদ্র মধ্যবিত্ত গৃহস্থ মেয়েদের সুশিক্ষার কথা ও তাহাদিগকে লইয়া অবিচিত্ররূপে সুখ শান্তির সহিত ঘরকন্যা করিবার কথা। গ্রামের সাধারণ বাঙালি মুসলমানের ঘর-গৃহস্থালীর মনোরম চিত্র আছে এই গ্রন্থে। এ চিত্র বাস্তব অভিজ্ঞতাপুষ্ট। গ্রামবাংলার ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ নজিবর রহমানের উপন্যাসের পাতায় পাতায় মাখানো, এমন আন্তরিক বর্ণনা মুসলিম লেখকদের ক্ষেত্রে দুর্লভ বললে অত্যুক্তি হয় না।
(8)
‘প্রেমের সমাধি’ (১৯১৮) ‘সামাজিক উপন্যাস-এমনটা আখ্যাপত্রে উল্লেখ আছে। তবে এটি প্রেমের উপন্যাস। ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসে যে প্রেমের ও সাধুতার জয় দেখা যায়, ‘প্রেমের সমাধি’ উপন্যাসে তারই অনুসরণ লক্ষ করা যায়। (২৯) মরিয়ম ও মতিয়ার রহমানের প্রেমবিবরণী এতে বর্ণিত। গৃহশিক্ষক মতির সঙ্গে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট শেখ মোয়াজ্জেম হোসেনের মেয়ে মরিয়মের প্রণয় বিধৃত হয়েছে উপন্যাসে। মরিয়ম সতী-সাধ্বী নারীরূপে আর মতি আদর্শবাদী ও জনকল্যাণ ব্রতীরূপে উপন্যাসে প্রতিষ্ঠিত। নায়ক-নায়িকার প্রেমে সামাজিক সত্যটি নানা বিশ্বাস-সংস্কার-শাস্ত্রানুগ রীতিতে প্রকাশিত। উপন্যাসে যথারীতি সতীত্ব ও পতি পরাকাষ্ঠার বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে। তবে যে হিন্দু-মুসলিম মিলনের আদর্শের প্রতি মোহাম্মদ নজিবর রহমানের আগ্রহ ছিল তা এ কাহিনিতে প্রবিষ্ট। তাছাড়া প্রামীণ অবকাঠামোতে লোকায়ত মূল্যবোধ, ধর্মের পারস্পরিক সম্প্রীতি, শিক্ষার প্রতি মমত্ববোধ, নারীশিক্ষা—এমন যাবতীয় বিষয় নজিবর রহমানের অভিজ্ঞতালব্ধ ছিল। ‘প্রেমের সমাধি’ শুধু নায়ক-নায়িকার প্রেমসর্বস্ব উপন্যাস নয়। লেখক সমাজ, অভিজ্ঞতা আর হিতসাধনের বিষয়টি তীক্ষ্ণভাবে নজর দিযেছিলেন। কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০) কিংবা কাজী ইমদাদুল হকের (১৮৮২-১৯২৬) লেখায় সমাজ হিত সাধনের জন্য যে প্রযোজনীয় পরামর্শ বা বিবৃতি লক্ষণীয় ছিল মোহাম্মদ নজিবর রহমানেও তা অনুপস্থিত থাকেনি। ‘প্রেমের সমাধি’র প্রথমেই দেবী নগরের বর্ণনাটিতে তার প্রমাণ মেলে, ‘দেবী নগর সুবৃহৎ হিন্দু প্রধান গ্রাম। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য, তেলী, মালী, ধোপা, নাপিত, মালাকার, কর্মকার, কুতকার, ধীবর, সাউ, শুড়ি প্রভৃতি বর্ণের লোকে গ্রামখানি গোলজার। কেবলমাত্র গ্রামের দক্ষিণাংশে কুড়ি পঁচিশ ঘর মাত্র মোসলমান। উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুগণ প্রায় সকলেই অল্প শিক্ষিত ও চাকুরিজীবী। নিম্ন শ্রেণীর হিন্দুগণ সামান্যরূপ শিক্ষিত ও ব্যবসায়ে লিপ্ত। মোসলমানগণ নিরক্ষর কৃষিজীবী।… হিন্দুর গ্রাম হিন্দুর স্কুল অধিকাংশই হিন্দু ছাত্র, কিন্তু হেডমাস্টার মোসলমান। ৩০। তবে হিতসাধনের বাসনা যতই থাক সমসাময়িক সমাজচিত্রের রূপটি বর্ণনায় লেখক বিস্মৃত হননি। কারণ ধর্মীয় গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প, পাপাচার, হিংসা-ঈর্ষা তো গ্রামে বিদ্যমান ছিলই। ভালো-মন্দ গুণেই তার চরিত্ররা নিমিতি পেয়েছে। তবে সর্বোপরি প্রেমের একনিষ্ঠতাই এ উপন্যাসের মূল কাহিনিতে প্রতিপাদ্য। ‘প্রেমের সমাধি’ উপন্যাসে শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে সমাজের জাগরণ সৃষ্টির প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। এই উপন্যাসে মতিয়ার রহমান তার শ্বশুর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর শেখ মোয়াজ্জেম হোসেনের সুপারিশে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকুরিপ্রাপ্ত হন। স্বসমাজের মধ্যে জ্ঞানালোক বিতরণের অভিপ্রাযে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ লাভের চেযে শিক্ষকতাকে শ্রেয় মনে করেন। উপযুক্ত শিক্ষাদীক্ষার অভাবই যে মুসলমানের শৌর্য-বীর্যকে নিষ্প্রভ করে দিয়েছে এ বিষয়ে তিনি নিঃসন্দেহ। পাশাপাশি দীর্ঘ লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ভোগের পর মুসলমানদের যে সম্বিত ফিরে আসতে শুরু করেছে তাতে তিনি মুসলিম জাগরণের ব্যাপারে আশাবাদী। তৃতীয় পরিচ্ছেদে তিনি বলেন, ‘যাহা হউক, সৌভাগ্যের কথা, বর্তমানে শিক্ষার প্রতি মোসলমান জাতির যেরূপ অনুরাগ পরিদৃষ্ট হইতেছে, স্কুল-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় তাহাদের যেরূপ গভীর আগ্রহ দেখা যাইতেছে, পল্লীগ্রামের অনেক স্থানের দরিদ্র মুসলমান সন্তানের উচ্চশিক্ষা দানে যেরূপ যথাসর্বস্ব ব্যয়ে বদ্ধপরিকর হইয়াছে, মোটের উপর শিক্ষার নামে মোসলমান সমাজে সম্প্রতি যেমত একটি জাগরণের সাড়া পড়িয়াছে তাহাতে আশা করা যায়, এই জাতির দুর্গতির অমানিশা শেষ হইয়া আসিয়াছে।’
‘আনোয়ারা’র পরিশিষ্ট হিসেবে লেখা। এটিও প্রেমের উপন্যাস, লেখক গ্রন্থারম্ভেই বলেছেন, ‘প্রেমের সমাধি’ উপন্যাসটি কিন্তু প্রেমের বাস্তব রূপ এখানে ধরা পড়েনি। ‘আনোয়ারা’তে যে আদর্শবাদ প্রাধান্য পেয়েছিল, এখানেও তার অনুবর্তন ঘটেছে। তবে মরিয়মের চরিত্রাঙ্কনে প্রেমের জয় ঘোষিত হযেছে। নজিবর অপেক্ষা নারী চরিত্রগুলি অধিকতর উজ্জ্বল। নায়িকা আনোয়ারার রহমানের অন্যান্য উপন্যাসের মতো এ উপন্যাসেও পুরুষ চরিত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ সতীত্বের মহিমা ‘প্রেমের সমাধি’র মরিয়ম চরিত্রে স্পষ্টরূপে লক্ষযোগ্য। মরিয়মের সতীত্বের মহিমাতেই তার অন্ধস্বামী চক্ষু ফিরে পেয়েছে। এক কথায় মরিয়ম আনোয়ারারই ভিন্ন সংস্করণ। এইসব স্ত্রী-চরিত্রের যে বিশেষ দিক নজিবর রহমানের মানস-সত্তাকে প্রভাবিত করেছিল, তার মূলে রযেছে উনিশ-বিশ শতকের বাঙালি মুসলমান সমাজের অন্তনিহিত সতীত্বের ধারণা। এ সময়ের গ্রামবাংলার বিলীয়মান আদর্শ নারীসত্তাকে উদ্ঘাটন করতে চেয়েছেন তিনি। এই চরিত্রগুলি যত না বাস্তব, তার চেয়ে অনেক বেশি আইডিয়াল।
(৫)
পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত ‘পরিণাম’ (১৯১৮) ৪০০। মোহাম্মদ নজিবর রহমানের পরিণতির দিকের উপন্যাস। এ উপন্যাসেও সমাজ-পরিবারের ভিত্তিটি কাহিনিতে গ্রথিত করেন তিনি। এটি রচনায়ও লেখকের নিজস্বতা ও সাবলীল রূপটি পরিলক্ষিত। উপন্যাসের আঙ্গিক ঋজু, পরিশীলিত। কাহিনির যথার্থতা আছে। অন্যায় অবিচার ও বঞ্চনার ভেতর দিয়ে যেমন প্রকাশ করেছেন ঘৃণা তেমনি অপরকে নিয়ে এসেছেন সম্মুখে। ভাষা ব্যবহার, শব্দ প্রযোগ, উপমা বয়ান, এসবের ভেতর দিয়ে লেখক শিল্প নির্মাণের পর্যায়টিতে বেশ সতর্ক এবং সাবলীল। প্রকৃত অর্থে সমাজ পরিবর্তনের ধারাটি চিত্রিত থাকে উপন্যাসে। পুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তির ভোগ কিংবা লালসার স্বরূপটি স্পষ্ট হয়ে যায় সবার নিকট, উল্টোদিকে অবস্থিত সামন্ত সমাজের চিত্রটিও থাকে না অলক্ষণীয়। ‘পরিণাম’ মূলত তারই প্রতীকচিহ্ন।
মুসলমান সমাজের দুর্নীতির মূল কারণ প্রদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিবিধানের জন্য লেখক যে উপদেশ দিয়েছেন, তারই ভিত্তিতে লেখা উপন্যাসটি।[২] চরিত্রগুলি ব্যক্তিত্বহীন। রচনাভঙ্গি বর্ণনাত্মক। কথকের মতো লেখক গল্প বলে গেছেন। এ কারণে চরিত্রগুলির মধ্যে নাটকীয় সংঘাত ফুটে ওঠেনি।
আবুল খয়ের ও সুরতজামাল জমিদারের দুই পুত্র। সুরতজামাল দাসী বেগমের গর্ভের আর আবুল খয়ের জমিদার বেগমের গর্ভের সন্তান। সুরতজামাল দুষ্ট দেওয়ান গোপীমোহনের সহায়তায় জমিদার সৈয়দ আবুল কাশেম চৌধুরী ও জমিদার গিন্নি আবুল খয়েরের মাতা করিমন্নেসাকে হত্যা করে জমিদারী দখল করে। আবুল খয়ের ধর্মভীরু সৎ যুবক। সে এইসব ষড়যন্ত্রের কিছুই টের পায় না। তাকে বিতাড়িত করা হয় জমিদারবাড়ি থেকে। উপন্যাসের শেষে দেখা যায় ষড়যন্ত্রকারীদের শাস্তি হয়েছে এবং আবুল খয়ের জমিদারী ফিরে পেয়েছে। পুণ্যের ফল পাপের শাস্তি প্রদর্শনই লেখকের উদ্দেশ্য। ‘পরিণাম’ উপন্যাসে ধর্মের জয়গান করা হয়েছে। পাপীকে ধর্মের পথে ফিরিয়ে আনা আর পুণ্যের জয় এখানে ঘোষিত হয়েছে। সমকালে খিস্টান ধর্মপ্রচারকদের দ্বারা মুসলমানের ধর্মান্তরকরণ প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার প্রয়াসেই হয়তো বা এই উপন্যাসে লেখক গোপীমোহন ও তাঁর স্ত্রীর ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার একটি মনোরম চিত্র অঙ্কন করেছেন।
নজিবর রহমানের ‘আনোয়ারা’ সন্দেহাতীতভাবে খ্যাতিমান উপন্যাস কিন্তু পাশাপাশি ‘পরিণামে’র মতো উপন্যাসেও তাঁর সমাজ-সংস্কৃতি বা মননচিন্তা কম প্রকাশিত নয়। এ উপন্যাসের ভেতর দিয়ে নজিবর রহমানের শিল্পচিন্তার ক্রম-উত্তরণের পথটি আমাদের নজরে আসে। তবে এসব উপন্যাসে এদেশীয় মুসলমানদের একটা প্রতিচ্ছবি বা চালচিত্র পরিলক্ষিত হয়। সেটি শিল্পমানে যে পর্যায়েরই হোক না কেন সমকালীন জীবনচেতনায় তার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া যেমন ছিল একই সঙ্গে কালাতিক্রমী চেতনাময় পথটিও হয়ে ওঠে উন্মোচিত।
পীরপ্রথা বা পীরদের ক্ষমতা, কৌশল বা আধিপত্যবাদের প্রসঙ্গও ‘পরিণাম’ উপন্যাসে উঠে এসেছে। ‘পরিণাম’-এ নজিবর রহমান তালাক সমর্থনে মন্তব্য করেন। তবে ঔপন্যাসিকের এসব মন্তব্য অনেকটা সমাজধারণাপ্রসূত ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন যা বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে অমূলক ছিল না। তবে সমস্ত রক্ষণশীলতাকে এড়িয়েই নজিবর রহমান বাংলা উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ অভিধা পেয়ে যান। বোধ করি, জনপ্রিয়তার বিষয়টিতে তাঁর রক্ষণশীল মনের সমর্থনই পাঠকদের অনুগামী হয়।
(৬)
নজিবর রহমান ‘চাঁদ-তারা বা হাসান গঙ্গা বাহমনি’ (১৯১৭)০০) নামে ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করতে চেয়েছেন। কিন্তু তা করতে গিয়ে কল্পলোকবিহারী হয়েছেন। কল্পনার গাঢ় প্রলেপে রঞ্জিত হয়েছে উপন্যাসের প্রেম কাহিনি। চাঁদের সঙ্গে তারার প্রেম অথবা বলা যায় চাঁদের প্রতি তারার প্রেম। কারণ প্রেমটি প্রথমে একতরফাই ছিল, চাঁদের মনোভাব ছিল অস্পষ্ট। কিন্তু মূলকথা হচ্ছে প্রতিক্রিয়া। বঙ্কিমচন্দ্রের (১৮৩৮-৯৪) ঐতিহাসিক রোমাঞ্চের হিন্দু যুবকের সঙ্গে মুসলিম রমণীর প্রেম কাহিনির প্রতিক্রিয়া।
নায়ক চাঁদ চাকর বটে, কিন্তু সে প্রকৃত পরিচয়ে দূরবস্থায় নিপতিত পাঠান সন্তান। সে সুপুরুষ এবং শেষে তাকে অসাধারণ ও মহৎ ত্যাগের আদর্শে আদর্শায়িত করে অঙ্কন করা হয়েছে। সে তার চরম শত্রু রঘুনাথকে ক্ষমা করেছে। মনিব কন্যা বলে তারাকে কামনার পাত্রী হিসেবে দেখেনি। শেষে তারার আচরণে বাধ্য হয়েই তাকে স্ত্রী রূপে বরণ করেছে। তবে হিন্দু রমণীর সঙ্গে মুসলমান যুবকের সম্পর্কটি প্রতিক্রিয়াজাত হলেও লেখক তাঁর উপন্যাসের চরিত্র নির্মাণে এবং ধর্ম বিষয়ক বক্তব্য উপস্থাপনে বলা যায় কখনোই সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির পরিচয় দেননি।
শ্বশুরঠাকুর ‘মহাশযের’ প্রতি চাঁদের আচরণে তার ধর্মীয় উদারতার পরিচয় পাওয়া যায়। চাঁদ তার শ্বশুর ও শ্বশুরকুলের আত্মীয়দের ধর্মান্তরিত করতে প্রয়াস পায়নি। সে তাকে নব প্রতিষ্ঠিত বাহমনি রাজ্যের উচ্চপদে আসীন করতেও দ্বিধা করেনি।
‘চাঁদ-তারা বা হাসান গঙ্গা বাহমনি’র বিষয় বঙ্গদেশের বাইরে হলেও বঙ্গীয় সংস্কৃতির ভাবনাই সেখানে পরিস্রুত। এতে সমাজমনস্ক চেতনা গভীরভাবে ধরা পড়ে। নজিবর রহমান এ উপন্যাসে মুসলিম শাসনের প্রতিও দৃকপাত করেছেন। ‘চাঁদতারা বা হাসনগঙ্গা বাহমনি’র কাহিনির সূত্রপাত হয় দিল্লির নিকটবর্তী অমরাবতী নামক এক গ্রামে। এ গ্রামের ব্রাহ্মণ গঙ্গারাম দেবশর্মা দিল্লির সুলতান তুঘলকের রাজকীয় গণক। তার মেয়ে তারা বাড়ির মুসলমান চাকর হাসান ওরফে চাঁদের প্রতি অনুরক্ত হয়, ক্রমে সে অনুরাগ ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়। এ সহাবস্থান প্রসঙ্গে লেখকের স্বগতোক্তিতে যে সুপারিশ আছে, তার মধ্য দিয়ে লেখক যে হিন্দু-মুসলমানের মিলনে আগ্রহী, সে বিষয় প্রমাণিত হয়। নজিবর রহমান অন্যত্র হিন্দুদের সমালোচনা করলেও হিন্দু-মুসলমানের মিলনের প্রশ্নে তাঁকে খুবই আগ্রহী দেখা যায়।
‘চাঁদতারা বা হাসানগঙ্গা বাহমনি’ উপন্যাসে ভিন্ন একটি দৃষ্টান্তও আছে। এখানে চাঁদ যখন এশার নামাজের পর কোরআন শরিফ পাঠ করতে থাকে, তারা তখন আড়ালে থেকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে তা শোনে, আর ভাবে পিতার পঠিত সামবেদের গানের মতোই কোরআনের আবৃত্তি সুন্দর। তারা এ কথাও ভাবে, একেশ্বরবাদের প্রশ্নে হিন্দুধর্ম এবং ইসলামধর্মে কোনো তফাত নেই। কিছুটা ভিন্নভাবে হলেও লেখক একই মনোভাবের প্রতিফলন ঘটান, যখন দেখা যায় ‘প্রেমের সমাধি’ উপন্যাসের রামজয় বৈরাগী এবং নিজাম পাগলার মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব এবং উভয়ের নিগুঢ় মনের কথা উভয়েতে অদল বদল চলে। উপন্যাসে সমসাময়িক সমাজের চিত্রটি তিনি চমৎকার করে পরিবেশন করেছেন। সেখানে বিভিন্ন বর্ণভেদ বা ছুঁতমার্গের নানারকম বিষয় তাৎপর্যমণ্ডিত করে তিনি উপন্যাসে তুলে এনেছেন। সমাজের যাবতীয় প্রতিক্রিয়া ও দ্বন্দ্বাত্মক বিষয়গুলোর সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। প্রকৃত প্রস্তাবে ‘প্রেমের সমাধি’র যে চারিত্র সেটি তিনি তাঁর রচনার মধ্যে উদ্ভিন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ব্যক্তি ও সমাজ দ্বন্দ্বের ভেতর থেকেই উপন্যাসের আলেখ্য রচিত হয়।
কিন্তু ‘চাঁদতারা বা হাসান গঙ্গা বাহমনি’ উপন্যাসে চাঁদ-তারার বিষের হৃদয়বৃত্তির যে পরাকাষ্ঠা লেখক দেখিয়েছেন সেটা আকস্মিক ও অভিনব না হলেও একটা সময়ে উগ্র ও সংকীর্ণ চেতনার কারণে তা প্রকাশ করা দুরূহ তো ছিলই। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’তে (১৮৬৫) আয়েশা ও জগৎসিংহের প্রেম প্রণয়ের বিষয়টি আমাদের জানা। সে কারণে ‘রায়নন্দিনী’ (১৯২৮) লিখতে হযেছিল ইসমাইল হোসেন শিরাজীকে (১৮৮০-১৯৩১)। আর মোহাম্মদ নজিবর রহমানও ‘বিলাতী বর্জন রহস্যে’ (১৯০৪) যে মিলনের ব্যাপারটি এনেছেন তা হয়তো এ উপন্যাসে একটা আকাঙ্ক্ষার ফলপ্রদ রূপ মাত্র। তবে হিন্দু মুসলমানের তিক্ত অভিজ্ঞতা বিষযে লেখকের বক্তব্যটি এরকম, ‘আমাদের সমাজতত্ত্বের পঞ্জবগ্রাহী মহাশয়েরা আজকাল শহরে বন্দরে দুই চারিজন হিন্দু-মুসলমানের এক আধটুকু মেলামেশা দেখিয়া জয়ধ্বনি করিয়া বলিতেছেন, এই ত হিন্দু মুসলমানের মিলনের যুগ আসিয়াছে, এই ত আমরা মানুষ হইতে চলিয়াছি। কিন্তু তাহারা যদি অনুগ্রহ পুরঃসর দু’পা হাঁটিয়া মফস্বলের হিন্দু মুসলমানের কার্যকলাপ ও ভাবাভাব চক্ষু মেলিয়া দেখিয়া আসেন তাহা হইলে দুঃখ রাখিবার স্থান পাইবেন না। যাহাতে উভয় জাতির মঙ্গল হইতে পারে পরস্পরের এমন সহানুভূতি শহরেই বা কোথায়?
প্রকৃতপক্ষে এর সমাধান কী? তিনি বলেন, ‘আমরা চাই প্রত্যেক ধৰ্ম্মে বাস্তবিক যেটুকু নিষেধ বিধি আছে, তাহা মানিয়া চলিয়া হিন্দু মুসলমান ছাত্র ভাই ভাই গলায় গলায় মিশিয়া যাওয়া, এক বিছানায় উঠাবসা কর, আলাপ পরিচয়ে পরস্পরের পারিবারিক কুশল অবগত হও, ছুটির পরে একে অন্যের বাসায় যাও, মিলিয়া মিশিয়া আমোদআহ্লাদ কর, লম্বা ছুটির পর হিন্দু ভাই মুসলমান ভাইকে, মুসলিম ভাই হিন্দু ভাইকে অবস্থা বুঝিয়া নিমন্ত্রণ করিয়া নিজ বাড়িতে লইয়া যাও, বাড়ির আত্মীয় স্বজনের সাথে ভাইয়ের পরিচয় করিয়া দাওগল।
সাম্প্রদায়িক চেতনা বা উগ্র ধর্মীয় প্রতিহিংসা যখন প্রবলভাবে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে বিচরণ করছে তখন চাঁদ-তারা বা হাসান গঙ্গা বাহমনি উভয় ধর্মের সম্মিলনের প্রস্তাব সামনে আনছে। নিশ্চিত অর্থেই উপন্যাসটি অসাম্প্রদায়িক ভাবচিন্তার প্রকাশসূচক। তবে ত্রুটি বিচ্যুতি অমূলক নয় উপন্যাসে। কাল-বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে লেখকের এখানে উজ্জীবন শিল্পস্ফূর্তির, যেটা অদম্য সাহসিকতারই পরিচায়ক। হার্দিক প্রণোদনাকে সবকিছুর উর্ধ্বে স্থান দিয়ে নিজেকে করে তুলেছেন জনপ্রিয়। শিল্পরসভোক্তাদেরও পাইয়ে দিয়েছেন অনেক কিছু। বাংলা উপন্যাসের ধারায় নজিবর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন স্বদীক্ষিত অসাম্প্রদায়িক লেখক রূপে। এক্ষেত্রে বাঙালি মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রকে যাবতীয় স্বার্থবুদ্ধি ও ধর্মবুদ্ধির ঊর্ধ্বে প্রাধান্য দিয়েছেন। উপন্যাসে বিষয় ও ভাষা-নির্মাণের সাবলীলতা ও যৌক্তিকতার স্বরটি আমাদের সে ইঙ্গিতই প্রদান করে।
নজিবরের ‘দুনিয়া আর চাই না’ (১৯২৪)] “সামাজিক খণ্ড উপন্যাস” হলেও এটি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পাঁচটি ছোটোগল্পের সংকলন। গল্পগুলি হল-যুবকের কাণ্ড, ইমানের পরশ, সতীর সাধনা, নারীর ধৈর্য্য, নারীর হৃদয়। গল্পগুলির উদ্দেশ্য-ধর্মের জয় ও অধর্মের পরাজয়। নজিবরের ‘মেহেরউন্নেসা’ নামক উপন্যাসটিও পাঠকপ্রিয়তা পেযেছিল বলে কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। তাঁর ‘দুনিয়া কেন চাই না’ ও ‘বেহেশতের ফুল’ আজও অপ্রকাশিত।
(৭)
নজিবর রহমানের বিভিন্ন প্রবন্ধে রাজনৈতিক সচেতনতার যথার্থ প্রকাশ ঘটেছে। প্রবন্ধে লেখকের চিন্তা-চেতনা ও মননশীলতার প্রকাশ ঘটেই থাকে। নজিবরের বিভিন্ন প্রবন্ধে বিশেষত ‘বিলাতী বর্জন রহস্য’ (১৯০৪) ও ‘সাহিত্য-প্রসঙ্গ’ (১৯০৪) পুস্তিকা দুটিতে রাজনীতি ও সমাজ সচেতনতার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটে ছে। তিনি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন। (৩৭) ৭২ পৃষ্ঠা সম্বলিত ‘বিলাতী বর্জন রহস্য’ পুস্তিকার ‘মুখবন্ধ’-এ নজিবর রহমান লিখেছেন, “বিলাতী বর্জন রহস্য প্রকাশিত ও প্রচারিত হইল। ইহাতে গবেষণা, যুক্তি, প্রমাণ কিছুই নাই। নিত্য প্রত্যক্ষ সত্য ও দৃষ্টান্তই ইহার মূল ভিত্তি… এই সামান্য পুস্তকে সমাজের সামান্যটুকু উপকার হইলেও শ্রম সার্থক বিবেচনা করিব।” স্বদেশী আন্দোলনের পটভূমিকায় লেখা ‘বিলাতী বর্জন রহস্য’ তৎকালীন বৃটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। এই পুস্তিকায় লেখক স্বদেশী আন্দোলন সম্পর্কে তাঁর সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করেছেন। এতে মুসলমানদের কোনও স্বার্থ জড়িত ছিল না। হিন্দুর হাতে মুসলমানদের নির্যাতন ও বিলাতি পণ্য বর্জনের ভেতর দিয়ে হিন্দু কর্তৃক মুসলমানকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণের ষড়যন্ত্রের বিষয়টাকে এভাবেই দেখেছেন নজিবর রহমান। নজিবর রহমানের ভাষায়, “তুমি বলিতেছ, বিলাতী বর্জনে দেশের মূলধন বাড়িবে, নতুন নতুন কলকারখানার সৃষ্টি হইবে। তা ঠিক। আবার ইহাও ঠিক যে দেশের জমিদার তোমরা হিন্দুরা, শিল্প বাণিজ্য… সবই তোমাদের আয়ত্তাধীন। সুতরাং বিলাতী বর্জনের ফলে যে উন্নতি হইবে তাহা তোমাদেরই হইবে, মুসলমানদের নহে।”*)
বাংলার পূর্বাঞ্চলীয় মুসলমানদের দাবির প্রেক্ষিতে পূর্বাঞ্চলীয় অনগ্রসর জনমণ্ডলীর সার্বিক উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য বঙ্গভঙ্গ করে ১৯০৫-এ ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) ও আসাম নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। এ প্রদেশ গঠনের আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ির জমিদার সৈয়দ নবাব আলি চৌধুরী প্রমুখ। হিন্দুরা প্রথম থেকেই বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে আসছিল। নজিবর রহমান স্বদেশী আন্দোলনের মাধ্যমে বিলাতী দ্রব্য বর্জন এবং বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ ঐক্যসূত্র লক্ষ করেছিলেন। বিলাতী পণ্য বর্জনের মাধ্যমে দেশীয় হিন্দু শিল্পপতি, পুঁজিপতি ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণে এবং বঙ্গভঙ্গ রদের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গীয় দরিদ্র কৃষক প্রজাসাধারণ তথা এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণকে শোষণ-শাসনের মাধ্যমে কলকাতার হিন্দু বাবু শ্রেণির লোকদের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে নজিবর রহমান সমর্থন করতে পারেননি। তাই ‘বিলাতী বর্জন রহস্য’-এ মুসলিম চরিত্রের মুখ দিয়ে হিন্দু চরিত্রের উদ্দেসবে বলিয়েছেন, “ইংরেজ গভর্নমেন্ট তাহাদের শাসন সংরক্ষণের সুবিধার জন্য বাঙ্গালা দেশটাকে দুই ভাগ করিয়া লইয়াছেন, তাহাতে তোমাদের মনে আঘাত লাগে কেন?”
এই ক্ষেত্রে নজিবর রহমানের রাজনৈতিক সচেতনতা ও দূরদৃষ্টির সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে জাতীয় জাগরণ ও উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করার লক্ষ্যেই তিনি তাঁর ‘বিলাতী বর্জন রহস্য’, ‘সাহিত্য প্রসঙ্গ’ প্রভৃতি পুস্তিকা ও প্রবন্ধাদি রচনা করেছিলেন। তবে তাঁর প্রবন্ধ-সাহিত্যে রাজনৈতিক প্রসঙ্গটি যেভাবে সরাসরি এসেছে, তাঁর গল্প-উপন্যাসে সেভাবে আসেনি। এতে নজিবরের শিল্প সচেতনতা সুস্পষ্ট হয়েছে। অবশ্য ‘সাহিত্য প্রসঙ্গ’ রচনায় শিল্প, নৈতিকতা ও মানবিক উচ্চাদর্শের দ্বারা সমাজ বিশেষত অধঃপতিত মুসলিম সমাজের উন্নতির প্রয়াস তাঁর মধ্যে সুস্পষ্টভাবেই লক্ষ করা গেছে। নজিবর রহমানের সমাজ-সচেতনতা, দেশপ্রেম ও স্বাজাত্য-প্রীতি তৎকালীন আরও কিছু ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৮৮৫-এ কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হবার পর মুসলমান সমাজ, তাদের ধর্ম-সংস্কৃতি এমনকি তাদের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করা হয়। বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের ধর্মকর্ম, ঈদ উৎসব, কুরবানী ইত্যাদিতে বাধা দেওয়া হতে থাকে। সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বিভিন্ন লেখায় মুসলিম-বিদ্বেষ প্রচার করেন, মুসলিম ধর্ম-সংস্কৃতির বিরোধিতায় তা ইন্ধন জোগায়। এ সময় কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, রঙ্গলাল, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র সেন প্রত্যেকেই কম-বেশী হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু পুনর্জাগরণ প্রয়াসে মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ ভাব প্রচার করেছেন। এই পটভূমিতে হিন্দু জমিদার, জোতদার, মহাজন অর্থাৎ বুর্জোয়া শ্রেণি নানাভাবে দরিদ্র, অনুন্নত, মুসলিম প্রজা ও কৃষকদের উপর নানারূপ অত্যাচার চালাতে থাকে। এরূপ অত্যাচারের একটি মর্মন্তুদ কাহিনি সৃষ্টি হয় পাবনা (বর্তমান সিরাজগঞ্জ) জেলার তাড়াশ থানায়। এই এলাকার অত্যাচারী হিন্দু জমিদার নিরীহ মুসলমান প্রজাদের উপর অকথ্য অত্যাচার চালায়। জমিদার রায় বাহাদুর বনমালী তার এলাকায় মুসলমানদের ধর্মকর্ম, ঈদ-উৎসব, কুরবানী ইত্যাদির উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কেউ তার আদেশ অমান্য করলে পাইক-বরকন্দাজদের দ্বারা তাদেরকে বেঁধে এনে শারীরিক নির্যাতন চালানো হত। জমিদারের অত্যাচার বন্ধ করার জন্য স্থানীয় নেতৃস্থানীয় মুসলমানগণ ‘আঞ্জুমান-ই-ইসলাম’ নামে একটি সমিতি গঠন করেন। নজিবর রহমান এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। এ সমিতির পক্ষ থেকে সলঙ্গায় এক বিশাল জনসভার আযোজন করা হয়। জনসভায় হিন্দু জমিদারদের প্রজা-গীড়ন ও মুসলমানদের ধর্ম-কর্মে বাধাদানসহ স্থানীয় জনগণের বিভিন্ন দুঃখ-দুর্দশার বর্ণনা দিয়ে তা লাঘবের উদ্দেশ্যে সরকারের প্রতি জোর আবেদন জানানো হয়। জমিদারের লেলিয়ে দেওয়া সন্ত্রাসীদের আক্রমণে সভায় বিশৃঙখলা সৃষ্টি করা হয়। সমবেত হাজার হাজার কৃষক-জনতা সে আক্রমণ প্রতিরোধে এগিয়ে আসে। ফলে বহু লোক হতাহত হয়। ইতিহাসে এটাই ‘সলঙ্গা বিদ্রোহ’ নামে খ্যাত। এর দ্বারা নজিবর রহমানের সমাজ-সচেতনতার পরিচয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। এছাড়াও তাঁর সমাজ ও রাজনীতি-সচেতনতার আরও দৃষ্টান্ত রয়েছে। ১৯০৫-র ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ হয়। পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে ‘বঙ্গাসাম’ নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয়। তার রাজধানী হয় ঢাকা। এ নতুন প্রদেশ ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। এতদিন পর্যন্ত কলকাতার হিন্দু জমিদার, ভূস্বামী, মহাজন, ব্যবসায়ী, আমলা ইত্যাদি বাবু সম্প্রদায় এ বিস্তৃত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা শোষণ-শাসন-নিপীড়ন করে কলকাতায় ইংরেজ প্রভুদের অনুগত থেকে আরাম-আযেশপূর্ণ জীবনযাপন করতো। বঙ্গভঙ্গের ফলে এ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকায় সার্বিক উন্নতির উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায়, ঢাকাকে কেন্দ্র করে নতুন প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় মুসলমানদের শাসন ও আধিপত্য কায়েম হবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় উভয়বঙ্গের হিন্দুরা ঐক্যবদ্ধভাবে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে। সর্বভারতীয় কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দও বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে। নজিবর রহমান এ সময় বঙ্গভঙ্গের জোরালো সমর্থক ছিলেন। হিন্দুদের বিরোধিতার মুকাবিলায় ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় বঙ্গভঙ্গের ঐতিহাসিক দিনে ঢাকা নর্থব্রুক হলে প্রভিন্সিয়াল মহামেডান অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়। অতঃপর নবাব সলিমুল্লাহর আহ্বানে সর্বভারতীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দের এক সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় এবং উক্ত সম্মেলনে ১৯০৬-র ৩০ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ গঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে নজিবর রহমান একজন আমন্ত্রিত প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন এবং জমিদারদের অত্যাচার, মুসলমানদের ধর্মীয় বিধান পালনে বাধা প্রদান, হিন্দু মহাজন ও বার সম্প্রদায় কর্তৃক শোষণ-নির্ধাতনের বিরুদ্ধে এবং সর্বোপরি মুসলমানদের অনগ্রসরতা ও দুর্দশা লাঘবের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া, শিক্ষাদীক্ষায় দ্রুত এগিয়ে আসার গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি আবেগময় ভাষার বক্তৃতা করেন। এ সম্পর্কে মোহাম্মদ আলি চৌধুরী লিখেছেন, ‘নজিবর রহমান শুধু শিক্ষকতা করেই ক্ষান্ত ছিলেন না। সমাজের প্রতি তাঁর সেবাদৃষ্টি সর্বদা নিয়োজিত থাকত। মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের অহেতুক শত্রুতা তিনি তীক্ষ্ণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর অকথ্য অত্যাচারের কথা উল্লেখ করে এক তেজস্বী বক্তৃতা করেন।’
এভাবে মোহাম্মদ নজিবর রহমান তাঁর সাহিত্য প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজের কলুষতা দূরীভূত করতে সচেষ্ট হযেছিলেন। তাঁর আদর্শের কথা উপদেশের মাধ্যমে বিভিন্ন রচনায় বিশেষ করে উপন্যাসগুলিতে ব্যক্ত হয়েছিল। ফলে বাঙালির জীবনযাত্রার বিকাশমান রূপটি নজিবরের হাতে ক্রমশ পরিশ্রুত হতে শুরু করেছিল।
তথ্যসূত্র:
১. মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা, দ্বিতীয় খণ্ড, রতন পাবলিশার্স, ৩য় সংস্করণ, ঢাকা, পটুয়াখালি, ১৯৮১, পৃ. ১৬৯। আজহার ইসলাম, মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন ও তাঁর অনোয়ারা উপন্যাস। দেখুন-আজহার ইসলাম, সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, অনন্যা, ঢাকা, ২০০৮, পৃ. ৯৬।
২. মাহে নও, চৈত্র ১৩৭০, পৃ. ৭৩।
৩. গোলাম সাকলায়েন, নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন, বাংলা একাডেমি পত্রিকা, পৌষ-চৈত্র-১৩৬৪, ঢাকা।
৪. মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা,দ্বিতীয় খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৫। আজাদ, ২২ চৈত্র ১৩৬৫।
৫. মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭১।
৬. মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭২।
৭. সাংবাদিক রফিকুল আলম খানের প্রতিবেদন, দৈনিক বাংলা, ২৩ অক্টোবর ১৯৯২।
৮. খন্দকার মোহাম্মদ বশিরউদ্দিন, মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ. ১৯।
৯. খন্দকার মোহাম্মদ বশিরউদ্দিন, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০।
১০. খন্দকার মোহাম্মদ বশিরউদ্দিন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪-৫।
১১. খন্দকার মোহাম্মদ বশিরউদ্দিন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২।
১২. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, আনোয়ারা, ওসমানিয়া বুক ডিপো, উনবিংশ মুদ্রণ, ঢাকা, ১৩৭৫।
১৩. রশীদ আল ফারুকী, বাংলা উপন্যাসে মুসলিম লেখকদের অবদান, রত্না প্রকাশন, কলকাতা, ১৯৮৪, পৃ. ১৮০। গোলাম সাকলায়েন, মুসলিম সাহিত্য ও সাহিত্যিক, আদিল ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, দ্বিতীয় সংস্করণ, ঢাকা, ১৯৭৬, পৃ. ১৯৩।
আনিসুজ্জামান, মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, মুক্তধারা, কলকাতা, ১৯৭১, পৃ. ৩৬৯।
১৪. মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান, বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা, ২০০৬, পৃ. ১৬৪।
১৫. জুলফিকার মতিন, মোহাম্মদ নজিবর রহমান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ. ৭৫।
১৬. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, আনোয়ারা, প্রাগুক্ত, উৎসর্গপত্র দ্রষ্টব্য
১৭. মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম, মুসলিম বাংলা সাহিত্য পাঠ পরিক্রমা, মিত্র সংঘ, রাজশাহী, ১৯৬৮, পৃ. ৫৪।
১৮. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, আনোয়ারা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯।
১৯. মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৪।
২০. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, আনোয়ারা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৭।
২১. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, আনোয়ারা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৬।
২২. উদ্ধৃত-মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৮ উদ্ধৃত-সেখ আতাউর রহমান, বাংলা কথাসাহিত্য মুসলিম চরিত্র পরিবার ও সমাজ,
বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯১, পৃ. ৫১০।
২৩. উদ্ধৃত-সেখ আতাউর রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১০।
২৪. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, গরীবের মেয়ে, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ. ৬।
২৫. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, গরীবের মেয়ে, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৩।
২৬. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, গরীবের মেয়ে, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩।
২৭. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, গরীবের মেয়ে, প্রাগুক্ত, ভূমিকা দ্রষ্টব্য।
২৮. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, প্রেমের সমাধি, ঢাকা, ১৯৯৩, ১৬তম সংস্করণ, আখ্যাপত্র দ্রষ্টব্য।
২৯. মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৯।
৩০. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, প্রেমের সমাধি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬।
৩১. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, পরিণাম, ঢাকা, ১৯৯৩।
৩২. মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮০।
৩৩. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, চাঁদতারা বা হাসান গঙ্গা বাহমনি, ওসমানিয়া বুক ডিপো, বাবুবাজার, ঢাকা, ষষ্ঠ সংস্করণ, ১৩৬৫
৩৪. জুলফিকার মতিন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪।
৩৫. জুলফিকার মতিন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫।
৩৬. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, দুনিয়া আর চাই না, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, কলকাতা, ১৩৩০।
৩৭. মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৪।
৩৮. মোহাম্মদ নজিবর রহমান, বিলাতী বর্জন রহস্য, ১৩১১, মুখবন্ধ দ্রষ্টব্য।
৩৯. আজহার ইসলাম, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, আধুনিক যুগ, অনন্যা, ঢাকা, ২০০৯, পৃ. ৪৭৬।
৪০. জুলফিকার মতিন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩।
৪১. গোলাম সাকলায়েন, মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের ‘বিলাতী বর্জন রহস্য’, সাহিত্যিকা, দ্বাদশ বর্ষ, বসন্ত সংখ্যা, ১৩৮৪, পৃ. ১৬৬-৬৭।
৪২. গোলাম সাকলায়েন, মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের ‘বিলাতী বর্জন রহস্য’, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৩।
(লেখক বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক)





