
লিখেছেন: মিরাজুল ইসলাম (গবেষক, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়)
কোনও সরকারের চরিত্র শুধু তার বক্তৃতায় বোঝা যায় না; তার সিদ্ধান্তেই তার আসল পরিচয় প্রকাশ পায়। মুখে যদি বলা হয়—‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’, তাহলে সেই কথার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষের ক্ষেত্রে। পশ্চিমবঙ্গে আজ সেই পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’—এই স্লোগান যদি সত্যিই সকলের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের দিকে তাকিয়ে কয়েকটি সরল প্রশ্ন করতেই হয়। রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ হয়েও শিক্ষা, সরকারি চাকরি, উচ্চশিক্ষা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব এখনও এত কম কেন? যদিও এর দায় বর্তমান সরকারের ঘাড়ে ফেলে দেওয়া যায় না। বিগত কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ও তৃণমূল—তিন সরকারেরই এই দায় রয়েছে। আর যখন পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছে, তখন সেই প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করার বদলে তার প্রশাসনিক কাঠামো বদলের প্রয়োজন কেন দেখা দিল? বিষয়টি তাই শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দফতর বদলের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ। তাই প্রশ্নটা স্পষ্ট—সাচারের পর যে দরজা একটু একটু করে খুলেছিল, সেই দরজা কি আবার বন্ধ হওয়ার পথে?
পরিসংখ্যান আমাদের সেই প্রশ্নের গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের অংশীদারিত্ব প্রায় ৫.৭৩ শতাংশ, সরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম শিক্ষকের অনুপাত প্রায় ৭.৮ শতাংশ এবং রাজ্য পুলিশে মুসলিমদের অংশগ্রহণ প্রায় ৯.৪৪ শতাংশ। মুসলমানদের মধ্যে স্নাতক স্তরে পৌঁছনোর হার প্রায় ১২.৫ শতাংশ এবং স্নাতকোত্তরে প্রায় ৭.৭ শতাংশ। অর্থাৎ পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু জনসংখ্যার তুলনায় এখনও ব্যবধান অনেক।
২০০৬ সালের সাচার কমিটি মুসলমানদের এই পিছিয়ে পড়ার ছবিটি স্পষ্ট করে দিয়েছিল। তখন সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল ২.১ শতাংশ। তারপর সবচেয়ে জরুরি কাজ ছিল শিক্ষার দরজা আরও বড় করা। কারণ শিক্ষা ছাড়া সরকারি চাকরি, কর্মসংস্থান, গবেষণা কিংবা সামাজিক প্রতিনিধিত্বে বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়। সেই জায়গাতেই আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব।
আলিয়া বহু দরিদ্র, গ্রামীণ ও প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীর সামনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে মানববিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান ও গবেষণা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখানকার শিক্ষার্থীরা এগিয়ে গেছেন। কেউ NET, SET, GATE-এর মতো পরীক্ষায় সফল হয়েছেন, কেউ গবেষণায় গেছেন, কেউ শিক্ষকতা ও অন্যান্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। অর্থাৎ আলিয়ার সাফল্য শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নয়; এর সঙ্গে বহু পরিবারের সামাজিক পরিবর্তন জড়িয়ে আছে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদি মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব এখনও এত কম থাকে, তাহলে আলিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানকে আরও বড় করার প্রয়োজন ছিল, তার মাইনরিটি স্ট্যাটাস কেড়ে নেওয়ার প্রয়াস করে বিশ্ববিদ্যালয়কে ছোট করার নয়। আরও শিক্ষক, আরও আসন, আরও হস্টেল, আরও গবেষণার সুযোগ, আরও আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং আরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরির কথা ছিল। যে দরজা দিয়ে কিছু মানুষ বেরিয়ে আসতে পেরেছেন, সেই দরজা আরও হাজার মানুষের জন্য খুলে দেওয়াই হওয়া উচিত ছিল।
আলিয়ার স্বাতন্ত্র্য কেন গুরুত্বপূর্ণ!
আলিয়ার ইতিহাসও তার বর্তমান চরিত্রকে বুঝতে সাহায্য করে। ১৭৮০ সালে কলকাতা মাদ্রাসা হিসেবে যে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু, দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথ পেরিয়ে ২০০৭ সালের আইনের মাধ্যমে তা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয় এবং ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কাজ শুরু করে। সেই প্রতিষ্ঠান আজ বহু বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে।
তাই আলিয়াকে কেবল আর পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেখলে তার বিশেষ ভূমিকা বোঝা যাবে না। ২০০৭ সালের আইন, তার ঐতিহাসিক পরিচয় এবং সংখ্যালঘু শিক্ষার সঙ্গে তার সম্পর্ক—সব মিলিয়েই আলিয়ার একটি আলাদা চরিত্র তৈরি হয়েছে।
এই জায়গাতেই সাম্প্রতিক দফতর বদলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আলিয়াকে উচ্চশিক্ষা দপ্তরের অধীনে আনার কথা বলা হয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামো বদলানো সরকারের অধিকার। কিন্তু কেন বদলানো হচ্ছে, বদলের পরে আলিয়ার বিশেষ চরিত্র কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন কতটা বজায় থাকবে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর সরকারকে স্পষ্টভাবে দিতে হবে।
আমরা মনে করি, সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার মধ্যেই আলিয়া আরও শক্তিশালীভাবে এগোতে পারে। এর মানে এই নয় যে আলিয়াকে অন্য দপ্তরের সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত করা যাবে না। বরং প্রশ্ন হলো—তার বিশেষ প্রয়োজন ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে কোন প্রশাসনিক কাঠামো বেশি কার্যকর?
রাজ্যেই তার উদাহরণ আছে। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান কৃষি দপ্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। এগুলি উচ্চশিক্ষা দপ্তরের অধীনে নয়। তাহলে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই কেন তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশাসনিক কাঠামো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে?
আমরা দফতর নয়, উন্নয়ন চাই। আলিয়ার জন্য অর্থ চাই, শিক্ষক চাই, গবেষণার সুযোগ চাই, আধুনিক পরিকাঠামো চাই। কিন্তু উন্নয়নের নামে তার স্বাতন্ত্র্য যেন হারিয়ে না যায়—এটাই মূল কথা।
আলিয়ার ওপর চাপ কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা?
এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন বৃহত্তর পরিস্থিতির দিকে তাকানো হয়। মুসলমানদের পিছিয়ে পড়া কমানোর জন্য যে সুযোগগুলি তৈরি হয়েছিল, সেগুলির অনেকগুলিই আজ নতুন করে বিতর্কের মধ্যে।
ওবিসি সংরক্ষণের ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন হয়েছে। ২০২৪ সালে কলকাতা হাইকোর্ট ৭৭টি সম্প্রদায়কে নিয়ে আগের অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত বাতিল করে। পরে ২০২৬ সালে রাজ্য সরকার সেই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে চলা আপিল প্রত্যাহার করে এবং নতুন কাঠামোয় ওবিসি সংরক্ষণ ১৭ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশ হয়েছে। এর ফলে মুসলমানদের সংরক্ষণের পরিসরও সংকুচিত হয়েছে। যে ওবিসি মুসলিমদের সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করছিল, সেই রাস্তাই বন্ধ করে দেওয়া হলো।
মাদ্রাসা নিয়েও সরকার সমীক্ষা ও পরিদর্শন শুরু করেছে। কোথাও স্বীকৃতি, কোথাও পরিকাঠামো, কোথাও প্রশাসনিক নিয়ম—বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে এসেছে। আজকের একটি নোটিশে দেখা গেছে, ২৩৬টি আনএডেড মাদ্রাসা বন্ধের নোটিশ। পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের নানা ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্ক এবং নাগরিকত্ব যাচাইকে ঘিরে মুসলমানদের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
প্রতিটি বিষয়কে আলাদা করে দেখলে সরকার বলতে পারে—সবই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা শুধু একটি সিদ্ধান্ত দিয়ে তৈরি হয় না। একের পর এক সিদ্ধান্ত যখন একই জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, সংরক্ষণ, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে নাড়া দেয়, তখন সেই সিদ্ধান্তগুলির সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
এই কারণেই আলিয়ার দফতর বদলকে শুধু একটি প্রশাসনিক ফাইলের বিষয় বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। এর পিছনে রয়েছে একটি সমাজকে আরও আরও অন্ধকারে নিমজ্জিত করার ষড়যন্ত্র। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ঈর্ষা ও শিরঃপীড়ার কারণ হয়েছে।
সমস্যা কোথায়, সমাধানই বা কী?
আলিয়ার সামনে বাস্তব সমস্যা আছে। শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর ঘাটতি, পর্যাপ্ত হস্টেলের অভাব, গবেষণার পরিকাঠামোর দুর্বলতা, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও লাইব্রেরির প্রয়োজন, পর্যাপ্ত ফেলোশিপ এবং নানা প্রশাসনিক সমস্যা—এসব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান আলিয়াকে দুর্বল করে নয়, বরং বিনিয়োগ বাড়িয়ে করতে হবে।
সরকার চাইলে পাঁচ বছরের একটি বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ করতে পারে, গবেষণার জন্য আলাদা তহবিল তৈরি করতে পারে, নতুন হস্টেল ও ল্যাবরেটরি নির্মাণ করতে পারে, লাইব্রেরি আধুনিক করতে পারে এবং দেশের নামী বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে পারে। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থাও করা যায়।
এতে শুধু আলিয়ার উন্নতি হবে না। যে পরিবারে প্রথম কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, সেই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের পথও সহজ হবে। শিক্ষার এই পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত চাকরি, আয় এবং সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটাবে।
তাই আলিয়ার সাফল্যকে কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য বাড়তি সুবিধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পিছিয়ে থাকা মানুষকে এগিয়ে আনা মানে গোটা সমাজকে এগিয়ে নেওয়া।
শেষ কথা
পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা এই রাজ্যেরই নাগরিক। তাদের শিক্ষা, চাকরি, গবেষণা, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা কোনও দয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।সুতরাং আলিয়ার দাবি কোনও বিশেষ সুবিধার দাবি নয়। এটি সমান সুযোগের দাবি। যে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব এখনও জনসংখ্যার তুলনায় এত কম, তাদের জন্য আলিয়ার মতো প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার।
আমাদের দাবি পরিষ্কার—২০০৭ সালের আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় আইনের উদ্দেশ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য, সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তার মর্যাদা এবং প্রয়োজনীয় স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
দফতর বদল যদি হয়, তাহলে তার উদ্দেশ্য ও ফলাফল নিয়ে স্বচ্ছতা চাই। আর যদি সত্যিই উন্নয়ন সরকারের লক্ষ্য হয়, তাহলে আলিয়ার বাজেট বাড়ুক, শিক্ষক নিয়োগ হোক, গবেষণা বাড়ুক, হস্টেল ও ল্যাবরেটরি তৈরি হোক। কথায় নয়, কাজে দেখা যাক উন্নয়ন। কারণ প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত আলিয়ার একার নয়।
প্রশ্নটা হলো—পশ্চিমবঙ্গের ৩০ শতাংশের কাছাকাছি মুসলমান জনগোষ্ঠীকে আমরা আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেব, নাকি যে দরজাটা সবে একটু খুলেছে, সেটাকেই আবার সংকীর্ণ করে দেব?
আলিয়ার আকাশে আজ কালো মেঘ জমেছে। সেই মেঘ সরানোর দায়িত্ব সরকারেরও, সমাজেরও। আর সেই দায়িত্বের প্রথম শর্ত একটাই—আলিয়াকে দুর্বল নয়, আরও শক্তিশালী করতে হবে।



