
লিখেছেন: সেখ ইমরান হোসেন ও খুররম মুরাদ
বেশ কিছুদিন ধরে একটি নামকে ঘিরে বাংলার রাজনীতি উত্তাল। একজন বিতর্কিত বাংলাদেশী লেখিকা যিনি একসময় পেশায় চিকিৎসক ছিলেন, তাঁকে ঘিরে এই চাপান-উতর। তসলিমা নাসরিন নামক এই লেখিকা নিজেকে ধর্মীয় উগ্রপন্থা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে, নারীবাদ, মুক্ত চর্চার প্রবক্তা হিসাবে উপস্থাপন করেন। এমনকি নিজেকে নাস্তিক বলেও দাবি করেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে–কেন তাঁকে নিয়ে সবাই এত উদ্বিগ্ন? আর কেনই-বা পার্শ্ববর্তী দেশের একজন লেখিকা ভারতের রাজনীতিতে হঠাৎ করেই এত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলেন?
উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে দুই দশক আগে। ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা একটি উপন্যাস। নাম হল ‘লজ্জা’। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রভাবে উপমহাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও হিংসা ব্যপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ২০০২ সালে ভারতের গুজরাটে ঘটে যাওয়া দাঙ্গায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ব্যপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এহসান জাফরি হত্যা, বিলকিস বানু গণধর্ষণ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা ইত্যাদি ছিল এই দাঙ্গার ট্রেডমার্ক। ঠিক এর পরের বছর ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় উপন্যাসটি। সাহিত্য মূল্যমানের বিচারে যাইহোক, উপন্যাসের বিষয়বস্তু বেশ বিতর্কের জন্ম দেয়। উত্তাল হয় দুই বাংলার রাজনীতি।
২০০৮ সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তসলিমাকে কলকাতায় পুনর্বাসন দেওয়া হয়। জনরোষ আছড়ে পড়ে শহর কলকাতায়। চাপে পড়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। তাঁর বাংলাদেশের মৌলবাদ নিয়ে যতটা উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় উপমহাদেশের অন্যান্য ধর্মীয় মৌলবাদ ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস নিয়ে রা কাড়তে দেখা যায় না। এর পিছনে কারণ যাই হোক না কেন এটা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তার একপেশে মনোভাবের মুখোশ খুলে দেয়।
সেক্যুলারিজম নারীবাদের প্রবক্তা হিসাবে তিনি এপার বাংলা এবং ওপার বাংলায় বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। এদেশে যখন নারীবাদ ও সেক্যুলারিজম নিয়ে সোচ্চার হয়ে এবং কাশ্মীর ইস্যুতে মুখ খুলে অরুন্ধতী রায় হিন্দুত্ববাদী সরকারের দমন-পীড়নের শিকার, তখন সেই একই সরকার যদি তসলিমা নাসরিনকে তোয়াজ করে, এরপর আর বুঝতে বাকি থাকে-না–কী উদ্দেশ্যে দু-দশক আগের পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতে উদ্যত তথাকথিত ‘সবকা বিকাশ’ চাওয়া সরকার।
মুক্ত চর্চা ও গণতন্ত্রের আড়ালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে তসলিমা নাসরিনকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার একটিই উদ্দেশ্য থাকতে পারে — তা হল মেরুকরণ। পেশায় একদা চিকিৎসক এই মহিলা সাহিত্যকর্মের তুল্যমূল্য বিচারে মোটেও প্রথম সারির নন। বাংলাদেশের বিতর্কিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ শাহবাগ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন, কালক্রমে হয়ে ওঠেন নারীবাদের প্রবক্তা। তাঁর লেখা ‘লজ্জা’ সমালোচিত হয়। একইসাথে এপার বাংলায়ও তার নাম ছড়িয়ে পড়ে, লেখিকার উত্থান এখান থেকেই। ভারতের সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মুক্তচর্চার উপর সরকারী দমন-পীড়ন নিয়ে তিনি মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন। তাঁর দেশের অভিনেত্রীর মেকাপ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হন, অথচ আফরাজুলকে অন্যায়ভাবে পুড়িয়ে মারলেও তাঁর ফেসবুক ওয়ালে একটি শব্দও খরচ হয় না। এ ধরণের তথাকথিত সিলেক্টিভ বুদ্ধিজীবি-কে নিয়ে সংবাদ মাধ্যম জুড়ে মাতামাতি চলছে। দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্নীতি, ছাত্র-যুব আন্দোলন এগুলো থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে খুব কৌশলেই। তিমিরেই থাকছে বঞ্চিতদের আর্তনাদ। আর এদিকে যেন রেনেসাঁস ফিরে আসছে! তসলিমা নাসরিন দিল্লি থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসছেন মানে – যেন বিরাট বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড সুচিত হতে চলেছে। তসলিমা নাসরিন ভালো লেখিকা কিন্তু মোটেই মুক্তমনা, যুক্তিবাদী নন।
তিনি ব্যক্তিগত কারণে ইসলাম বিরোধী। কিন্তু মুক্তমনা নন। তিনি মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার থাকেন, কিন্তু হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একটা কথাও বলতে পারেন না। যার ফলে মুসলমানরা বিরাগভাজন, আর হিন্দুদের কাছে স্বজন। ভারতের হিন্দু পুনঃরোত্থানবাদীদের প্লেয়িং কার্ড হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, হবে। তসলিমার অবস্থান ভারত এবং বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ তরাম্বিত করেছে। কেউ কেউ তসলিমাকে যুক্তিবাদী আন্দোলনের অন্যতম দিশারী বলে বিরাট মাপের বুদ্ধিজীবী তকমা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আনার তদবির করছেন। কিন্তু তিনি একজন শিব ঠাকুরের পূজারিণী। নিজের ফেসবুক ওয়ালেও যা মাঝে মাঝে পোষ্ট করেন। কিন্তু তিনি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে হিন্দু হয়েছেন এমন রেকর্ডও নেই। সেটা সম্ভবত করবেও না। কারণ সেক্ষেত্রে তার লেখালেখি জগতের ব্যবসায় ক্ষতি হবে।
দেশজুড়ে হাজার হাজার অন্যায় অবিচার ঘটে চলেছে বিভিন্ন জায়গায়। আজ দেশের বহুলাংশে দলিত-সংখ্যালঘু নিপীড়নের ঘটনা ঘটে চলেছে। হাথরাস, কাঠুয়া, উন্নাও, রোহিত ভেমুলা, আখলাক জুনায়েদ, এগুলোর কোনটিই লেখিকার নজর কাড়তে পারেনি। কেবলমাত্র হিন্দুত্ববাদের সুরসুড়িমূলক ইস্যুগুলিতেই তাঁকে উষ্মা প্রকাশ করতে দেখা যায়। বাংলাদেশেও বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রভাবে আছড়ে পড়ে এবং সেখানে সংখ্যালঘু নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। এতে সংখ্যালঘুরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। ঠিক এদেশের সংখ্যালঘুদের মতই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট সামনে রেখে তসলিমা নাসরিন প্রকাশ করেন তার ‘লজ্জা’ উপন্যাস। অন্যান্য অনেক বইয়ের ভীড়ে এটি ব্যপক ভাবে চর্চিত ও সমালোচিত হয়। এর কারণ হলো– লেখিকা এই বইটিতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে গিয়ে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বহু অবমাননাকর কথা লেখেন। এছাড়াও তিনি নবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তাফা(সঃ) সম্পর্কে নানান কুমন্তব্য (Blasphemy) করেন। বাংলাদেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতা হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ভিন্ন দেশে দেশান্তরিত করেন। বর্তমানে তিনি ভারতের দিল্লিতে বসবাস করছেন। পশ্চিমবঙ্গে এর আগেও দু-দশক পুর্বে বসবাস করার অনুমতি পেলেও জনরোষ প্রশমিত করতে ও রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়।
তিনি নিজেকে সর্বদা মুক্তমনা ও স্বাধীনচেতা হিসাবে তুলে ধরেন। তাঁর সংখ্যালঘু দরদ পক্ষপাতদুষ্ট। প্রায়শই তিনি এদেশের রাজনীতি ও অন্যান্য বিষয়ে বিতর্কিত অবস্থান নিয়েছেন। অথচ এদেশে সংখ্যালঘু–দলিত নিপীড়ন এর সময় তিনি উধাও হয়ে যান।
ধর্মের সমালোচনা করলেই কেউ মুক্তমনা হয়ে যান না। একইভাবে ধর্মকে সমর্থন করলেই কেউ মৌলবাদী হয়ে যান না। মুক্তচিন্তার প্রকৃত পরিচয় হলো সত্য, যুক্তি ও ন্যায়ের প্রতি সমান অঙ্গীকার। যদি কোনো ব্যক্তি একটি বিশেষ ধর্মকে নিয়মিত সমালোচনা করেন কিন্তু অন্য মতাদর্শের একই ধরনের অসহিষ্ণুতা বা সহিংসতার ক্ষেত্রে নীরব থাকেন, তাহলে তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
মুক্তিচিন্তা ও বাকস্বাধীনতার মত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ-কে ঢাল করে একপেশে মনোভাব গ্রহণ করে একটি বিশেষ ধর্ম ও বিশেষ জাতির বিরুদ্ধে বিষোদগার করা তাঁর লেখালেখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই তাঁকে এক দেশের সংখ্যাগুরুর বিরাগভাজন করলেও আরেক দেশের মৌলবাদ ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের ব্রহ্মাস্ত্র হিসাবে তাঁকে কাজে লাগানোর পাঁয়তারা চলছে। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির পরম্পরায় চিড় ধরিয়ে এরাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা যে ধরে রাখা কঠিন, তা বিলক্ষণ জানে তারা। অন্যান্য ভারতীয় রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ স্বকীয়তা আছে। এখানকার রাজনীতি জাতপাতের উর্ধ্বে ছিল। বাম সরকারের মুখ্যমন্ত্রীরা জ্যোতি বসু হোক বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, সাম্প্রদায়িক উসকানির বিরুদ্ধে শক্ত মনোভাব দেখিয়েছিলেন। ব্রিগেড মাঠ থেক ‘মাথা ভেঙে দেওয়া’-র নিদান দিয়েছিলেন। তৃণমূল আমলে আরএসএস এর মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের কে খোলা ময়দান দিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী। আর এখন তৃণমূলের পতন ঘটিয়ে স্বয়ং তারাই ক্ষমতার মসনদে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্বকে মহান মনীষী হিসাবে উপস্থাপন, নেতাজী সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য আর এখন তসলিমা নাসরিনের জিগির একই সূত্রে গাঁথা।
উপমহাদেশে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের অভিযোগ দেশান্তরিত হওয়ার নজির আরো আছে হিন্দু দেবদেবীর অপমানকর চিত্র অঙ্কন করার অভিযোগ বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এম.এফ হুসেইন আজও দেশছাড়া। হাজার হাজার বছর ধরে ভারতের অধিকাংশ মানুষ ধর্মের প্রতি আস্থাভাজন। ধর্মকে আগলে গড়ে উঠেছে একাধিক সভ্যতা। ধর্মের নবী, ঋষি মুনীদের প্রতি তাদের অসীম ভক্তি। তাই কোনো অসদুদ্দেশ্যে কেউ যদি ধর্মীয় দেবদেবীর অপমান করে তা সমর্থন যোগ্য নয়। আবার একই সঙ্গে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ একজন ধার্মিকের কাজ হতে পারে না।
এমন কোন কাজ কোনো ভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় যা অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে। কোন ধর্মই শেখায় না অন্য কে আঘাত করতে। ভিন্নমত দমন করতে। প্রত্যেক নিজের নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী স্বাধীন ভাবে ধর্মাচরণ করবে অন্য কারোর হস্তক্ষেপ ছাড়াই। একটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ভিত্তিক রাষ্ট্রে সকল মত পথ ও চিন্তার দ্বার উন্মুক্ত থাকবে যতক্ষণ না তা অন্যের অনুভূতিতে আঘাত করে। ইসলাম ধর্মে অন্যের ধর্মকে বা দেবতাকে গালি দিতে বা অপমান করতে কঠোর ভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এমনকি কটুকথা উচ্চারণ কে জাহেলিয়্যাত ( ignorance) হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। প্রতিবেশী সহকর্মী ও সহযাত্রীদের প্রতি সদয় আচরণ করার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেশী বা সহযাত্রীর রং বর্ণ বা ধর্ম দেখে নয় বরং মানব সন্তান হিসাবে তাদের মধ্যে ভাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামি মুক্ত মনন তৈরি করার নৈতিক দায়িত্ব হল ।
গত একদশক জুড়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মান্তরন বা ঘর ওয়াপসি-র মতো অনৈতিক কার্যক্রম চলে আসছে। গ্রামের পর গ্রাম মানুষকে ভয় দেখিয়ে চাপ দিয়ে অথবা লোভ দেখিয়ে ধর্মান্তরণ চলছে। মানুষকে তার খাদ্যাভ্যাস পোশাক পরিচ্ছদ রুচি ইত্যাদির আলোকে বিচার করা হচ্ছে এবং ভিন্ন রুচির ভিন্ন চিন্তার মানুষকে দাবায়ে দেওয়া হচ্ছে। মব লিঞ্চিং সাধারণ ঘটনা হিসাবে পরিনত হয়েছে। একটি গনতান্ত্রিক পরিবেশে যার যার স্বাধীন চিন্তা ও রুচিসম্মতভাবে নিজের মত ও পথ বেছে নেবে, অন্যকে আঘাত না করে, এটাই হওয়া উচিত।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, উপমহাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একদল সাম্প্রদায়িক ব্যাধিগ্রস্থ ও কায়েমী স্বার্থবাদীরা ধর্মীয় উন্মাদনাকে পুঁজি করে তার দীর্ঘসূত্রিতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী চিন্তা ও উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ দুটোই দেশের রাজনীতিকে বিষাক্ত করে তুলেছে। এই কারণেই তারা হিংসা-বিদ্বেষ বিভাজনের রাজনীতির শিকড়কে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে চেষ্টা করছে।
সাম্প্রদায়িকমনস্কতা মেরুকরণ ও বিভাজনকে দীর্ঘমেয়াদী করা ও এর মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক অভিসন্ধিকে সিদ্ধ করা। যদিও তারা দাবী করছে পশ্চিমবঙ্গের মুক্ত চিন্তা ও গনতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়া তাদের লক্ষ্য। কিন্তু যদি তাই হতো তাহলে রাস্তায় রাস্তায় ভিন্নমতের রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদেরকে অপমান অপদস্থকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে কেন? – এ প্রশ্ন করছেন তারা। তারা এও বলছেন -যদি ইসলাম ধর্মের অপমান করা মুক্ত চিন্তার প্রতিফলন হয় তাহলে হিন্দু ধর্মকেও অপমান করার বৈধতা দেওয়া হয়। অথচ ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী কোন ধর্মীয় বিশ্বাস বা ধর্মাচরণকেই অপমান করার কোন অধিকার কারোর নেই। ভারতীয় সংবিধানের মূল্যবোধ ক্ষয়ে গেলে বা ধ্বংস হলে দেশে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে বলে তাদের মত।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে তসলিমা নাসরিনকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার পিছনেও এই উদ্দেশ্য নিহিত আছে বলে দাবি করছেন একদল বিশ্লেষক। তাঁদের প্রশ্ন হলো প্রায় দুই দশক আগে বাম আমলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে তাঁকে যখন ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে পুনর্বাসন দেওয়ার অর্থ কী?
তসলিমা নাসরিনকে ফিরিয়ে আনার পিছনে যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা হলো–গনতন্ত্র ও মুক্তচিন্তার উদার ক্ষেত্র হিসাবে পশ্চিমবঙ্গকে জাতীয় মানচিত্র উপস্থাপন করা। বিগত দুমাসে পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পটভূমি সামনে রাখলে একথা পরিস্কার হয়ে যায় যে কোন ধরনের মুক্ত চিন্তার চর্চা তারা চাইছেন।
অতএব বিশেষ বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি কলকাতায় পদার্পন করছেন। আসুন, থাকুন, ভালো কথা। কিন্তু তাঁকে বিশ্বমানের মুক্তচিন্তক হিসাবে উপস্থাপন যে রাজনৈতিক অসদুদ্দেশ্য প্রণোদিত তা বুঝতে রকেট সাইন্স লাগে না।
সুতরাং আপামর পশ্চিমবঙ্গবাসীর এ নিয়ে সজাগ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। কোনরকম প্ররোচনায় পা দেওয়া অনুচিত হবে। সকল শুভবুদ্ধি ও সুস্থ চিন্তার মানুষের ঐক্যবদ্ধভাবে এই সম্প্রীতি ও সাংবিধানিক মূল্যবোধ কে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিভাজন আর হিংসা কখনও চিরস্থায়ী হতে পারে না। একবিংশ শতাব্দীর মানুষ শান্তিকামী ও শান্তিপ্রিয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই উন্নতির যুগে মানুষ নিজেদের শিক্ষা স্বাস্থ্য কর্মসংস্থান নিয়ে ব্যস্ত। দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া, আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গুর, চারিদিকে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের হাওয়া বইছে। ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ হাজার বছর ধরে চলে আসা সম্প্রীতি সৌহার্দ্যপূর্ণ পারস্পরিক সম্পর্ক, সহিষ্ণুতা ও মেলবন্ধনকে নিজেদের জীবনাচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে স্থান দিয়েছে, রাজনৈতিক অসদুদ্দেশ্য সাময়িক ভাবে তা স্তিমিত করে রাখলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না তা বলায় বাহুল্য।





