
লিখেছেন: মেহেবুব সাহানা / অনুবাদ: খুররম মুরাদ
নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলার ক্ষমতা দখলের লড়াই শেষ করার পর, বাংলার অতীত ও ইতিহাসের মালিকানা নিয়ে সংঘ পরিবার এখন আরও একটি সূক্ষ্ম লড়াই লড়ছে। নেতাজি, রাজা রামমোহন রায় এবং বিদ্যাসাগরের সংস্কার ও স্বাধীনতা সংগ্রামকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা যেমন এই লড়াইয়ের একটি দিক, তেমনই বঙ্কিমচন্দ্র ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে নিজেদের আদর্শিক গুরু হিসেবে দেখানোর চেষ্টাও এই মুদ্রার ঠিক উল্টোপিঠ।
হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও তার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার
স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল, তখন হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের অনেক প্রতিষ্ঠাতা ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে আপসের পথ বেছে নিয়েছিলেন। হিন্দু জাতীয়তাবাদের ইতিহাসের এই দিকটি সবসময়ই তাদের জন্য বিব্রতকর।
হিন্দুত্ববাদী নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকর আন্দামানের সেলুলার জেল থেকে ব্রিটিশ রাজের কাছে একের পর এক ক্ষমার আবেদন করেছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যুদ্ধকালীন বাংলায় ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলেন। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, কংগ্রেসের মন্ত্রিসভার সদস্যরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করলেও হিন্দু মহাসভা সেই সময়ে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে বিভিন্ন প্রদেশে জোট সরকারে অংশ নিয়েছিল।
বাংলার ক্ষেত্রে এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার আরও বেশি অস্বস্তিকর। কারণ বাংলায় যেসব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব তাঁদের ব্রিটিশবিরোধী এবং সমাজসংস্কারমূলক ভূমিকার কারণে বাঙালির চোখে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন এবং আছেন, তাঁদের অধিকাংশকেই হিন্দুত্ববাদীরা নিজের আদর্শের সঙ্গে সহজে মেলাতে পারে না।
স্বাধীনতার পর থেকে কয়েক দশক ধরে বাংলায় বুকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও উদারনৈতিক সংস্কৃতির চর্চার ধারাবাহিকতা ছিল, এর ফলে সাধারণ বাঙালির আবেগ ও শ্রদ্ধা নেতাজি, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সঙ্গে অনেক বেশিই সামঞ্জস্যপূর্ণ। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বা বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে তুলনায় তা অনেক বেশি গভীর। অথচ সংঘ পরিবার চায় এই ব্যক্তিত্বদের–অর্থাৎ মুখার্জি ও বঙ্কিমচন্দ্রকে–আরও বেশি চর্চায় আনতে।
মূলত বিজেপি ও আরএসএসের কাছে বাংলা কখনোই শুধুমাত্র আরেকটি রাজ্য জয়ের ক্ষেত্র ছিল না। এটি ছিল একটি আদর্শগত লড়াইয়ের ক্ষেত্র, যার ওপর তাদের আন্দোলনের ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ নির্ভর করে আছে। তাদের মতে, বাংলার রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারলেই তারা এমন একটি জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্য নির্মাণ করতে পারবে, যার জন্য তারা সবসময়-ই মুখিয়ে ছিল।
রাজ্য জয়ের পর তারা এখন এমনসব কর্মকান্ড পরিচালনা করতে চলেছে, যা কেবলমাত্র ভোট-রাজনীতির মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। বর্তমানে সংঘ পরিবারের অদ্বিতীয় অ্যাজেন্ডা হলো বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারনৈতিক অতীতকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা বা পুনর্লিখন করা।
বাংলার মহান ব্যক্তিত্বদের মাঝে প্রাচীর নির্মাণ
ফলত এর প্রায়োগিক রূপ হিসেবে বাংলার ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নীরবেই দুটি শিবিরে ভাগ করা হচ্ছে। একদিকে রয়েছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং কিছু ক্ষেত্রে অরবিন্দ ঘোষের মতো ব্যক্তিত্বরা, যাঁদের সংঘ পরিবার হিন্দুত্ববাদের আঙ্গিকে জনমানুষের সামনে তুলে ধরতে চায়। এই ধারার মধ্য থেকেই সংঘ পরিবার ‘বন্দে মাতরম্’-এর ঐতিহ্য এবং নিজেদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের দাবির ভিত্তি খুঁজে পেতে চায়।
অন্যদিকে রয়েছেন এমন সব ব্যক্তিত্ব, যাঁদের গুরুত্ব তারা জনমানুষের মনে সীমিত করতে চায়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন— সুভাষচন্দ্র বসু (নেতাজি): যিনি সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। রাজা রামমোহন রায়: বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব, যিনি সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: যিনি ব্রাহ্মণ্যবাদী গোঁড়ামি এবং পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: যিনি অন্ধ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপদের বিরুদ্ধে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। এবং কাজী নজরুল ইসলাম: বিদ্রোহী কবি, যাঁর কবিতা ও সাহিত্য আজও বাংলায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে সবচেয়ে স্পষ্ট ও দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক বক্তব্যগুলোর একটি।
একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনৈতিক প্রকল্পের কাছে দ্বিতীয় তালিকার ব্যক্তিত্বরা সহজে উদযাপন করা যায় এমন কোনো ঐতিহ্য নন। বরং তাঁরা এমন একটি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, যাঁদের গুরুত্বকে কোনো না কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করা প্রয়োজন—আদতে আমার মূল বক্তব্য এটাই।
বাংলার অতীত নিয়ে বিজেপির অনুসন্ধান
আমার আগের লেখায়, “শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি এবং বাংলার অতীতের সন্ধানে বিজেপি”–তে আমি যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছিলাম, যে ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় এমন একটি দ্বিতীয় লড়াইয়ের দরজা খুলে দিয়েছে, যার মীমাংসা কোনো নির্বাচন দিয়ে সম্ভব নয়—সেটি হলো ইতিহাসকে ঘিরে লড়াই।
রাজ্যে ক্ষমতা দখলের পর সংঘ পরিবার এমন এক ধরনের হিন্দু-জাতীয়তাবাদী বাঙালি ভদ্রলোকের ভাবমূর্তি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে, যাকে আমি বলেছি হিন্দুত্ববাদী ভদ্রলোক। এই প্রচেষ্টার প্রাথমিক পর্যায়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে এবং বঙ্কিমচন্দ্রকে এই ভাবধারার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। উদ্দেশ্য হলো, সমগ্র হিন্দুত্ববাদকে এমন একটি বাঙালি বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার দেওয়া, যা তার ইতিহাসে আসলে কোনোদিন ছিলই না।
এই ইতিহাস পুনর্দখলের প্রচেষ্টার একটি বিপরীত দিকও আছে। একদিকে যেসব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে হিন্দুত্ববাদ নিজেদের বলে দাবি করতে পারে, তাঁদের গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে; অন্যদিকে যাঁদের নিজেদের আদর্শের সঙ্গে মেলানো কঠিন, তাঁদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। আর বাংলায় এমন ব্যক্তিত্বের সংখ্যা কম নয়।
এই গল্পের ঊর্ধ্বে যাঁরা
গত কয়েক মাসের ঘটনাগুলো একনজরে লক্ষ্য করা যাক। বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ নগেন্দ্র রায়, যিনি অনন্ত মহারাজ নামে অধিক পরিচিত, প্রকাশ্যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি ছিল, নেতাজির “আজাদ হিন্দ ফৌজের মতো একটি বাহিনী সংগঠিত ও গড়ে তোলার ক্ষমতা ছিল না” এবং এই বাহিনী মূলত প্রাক্তন ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাদের একটি দল ছিল।
এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা হয় রাজনৈতিক মহলের বিভিন্ন অংশে, এমনকি তাঁর নিজের দলের মধ্য থেকেও। এর কিছুদিন পর পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, নেতাজি প্রতিষ্ঠিত ফরওয়ার্ড ব্লক-এর সদস্যদের “গুন্ডা” বলে মন্তব্য করেন এবং নেতাজির রাজনীতির সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির রাজনীতির তুলনা করেন। এসবকে কেবল অসাবধানতাবশত করা মন্তব্য বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নেতাজি এমন এক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতীক, যা হিন্দুত্ববাদ সহজে নিজের মধ্যে গ্রহণ করতে পারে না। তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু, মুসলমান, শিখ ও খ্রিস্টান—সব সম্প্রদায়ের মানুষ একটি ঔপনিবেশিক-বিরোধী পতাকার নিচে একত্রিত হয়েছিলেন। অপরদিকে বর্তমানে যে সংগঠনগুলো নেতাজির উত্তরাধিকার নিয়ে দাবি করে, তারা তাঁর নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা সংগ্রামে কার্যত অনুপস্থিত ছিল।
নেতাজির পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও অনিতা বসু পাফের মতো অনেকে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে নেতাজির ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আরএসএসের আদর্শের মিল নেই। তাই নেতাজির সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক অবস্থানকে সম্মান জানালে, তৎকালীন সময়ে সংঘ পরিবার আদতে কী ছিল, সেটিও সামনে চলে আসে। আর সেই তুলনার মুখোমুখি হওয়ার বদলে নেতাজির মর্যাদা ও গুরুত্বকে ধীরে ধীরে কমিয়ে দেওয়া সংঘ পরিবারের কাছে অধিক সহজতর।
প্রবণতা শুধু নেতাজির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়:
২০২৫ সালের নভেম্বরে মধ্যপ্রদেশের শিক্ষামন্ত্রী ইন্দর সিং পারমার এক জনসভায় রাজা রামমোহন রায়কে “অংরেজোঁ কে দালাল”, অর্থাৎ “ইংরেজদের দালাল” বলে অভিহিত করেন। প্রবল প্রতিবাদের মুখে, এমনকি নিজের দলের মধ্যেও সমালোচনা হওয়ার পর তিনি ক্ষমা চান। অথচ রামমোহন রায়কে বাংলার নবজাগরণের জনক বলা হয়। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর আন্দোলন আধুনিক ভারতের উদারনৈতিক চিন্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব একটা আলাদা নয়। ২০১৯ সালের মে মাসে অমিত শাহের রোড-শো চলাকালীন সংঘর্ষের সময় বিদ্যাসাগর কলেজে তাঁর আবক্ষ মূর্তি ভাঙার ঘটনা বাংলার সাম্প্রতিক রাজনীতির অন্যতম বিতর্কিত ছবি হয়ে রয়েছে। ঘটনার দায় কার ছিল, তা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছিল। কিন্তু এর প্রতীকী গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহ নেই।
যে সমাজসংস্কারক বিধবা বিবাহ, নারীশিক্ষা এবং ধর্মীয় শাস্ত্রের অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে বিবেকের স্বাধীনতাকে সমর্থন করেছিলেন, তাঁর মূর্তিই তখন রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে। Zee5-এর ‘Abhay 2’ সিরিজে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুকে “অপরাধী” হিসেবে দেখানো হয়েছিল বলে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদ করে বাংলা পক্ষের মতো বাঙালি সংগঠনগুলো। মাত্র আঠারো বছর বয়সে ফাঁসিতে ঝোলা ক্ষুদিরামকে কোনো জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্যের পক্ষেই অপমান করা সহজ হওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে, আইআইটি খড়গপুরের কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন যে, স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ক্যাম্পাস প্রদর্শনীতে রাখা হয়নি। অথচ তিনিই একদা আনুষ্ঠানিকভাবে ওই প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন করেছিলেন।
উপরের একটি ঘটনা হয়তো বিচ্ছিন্ন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সবগুলো ঘটনাকে একসঙ্গে দেখলে একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা চোখে পড়ে—বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারনৈতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের গুরুত্ব কতটা কমিয়ে দেওয়া যায়, তা যেন ধীরে ধীরে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে এবং কতদূর পর্যন্ত গেলে মানুষ জোরালোভাবে প্রতিবাদ করবে, সেটিও যেন বোঝার চেষ্টা চলছে।
বিশেষভাবে লক্ষ করার বিষয় হলো, বিজেপি তার নিজের দলের একজন সাংসদ কেন বাংলার সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় জাতীয়তাবাদী নেতাদের একজনকে বারবার অবমাননা করছেন, তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা এখনও পর্যন্ত দেয়নি। এই ধরনের সেনসিটিভ বিষয়ে নীরবতা এবং একটি বিতর্ক শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী বিতর্কে চলে যাওয়া—যাঁরা বাংলার এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে মূল্য দেন, তাঁদের জন্য সেটিই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত।
বাংলা ঐতিহ্যবাহী বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ধারক, বাহক
আধুনিক ভারত গঠনে বাংলার অবদানকে কোনো একটি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। বাংলার অবদান ছড়িয়ে আছে— ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদে, সমাজসংস্কারে, ধর্মীয় বহুত্ববাদে, সাহিত্যিক আধুনিকতায় এবং গণতান্ত্রিক বিতর্কের ঐতিহ্যে।
বাংলার মহান ব্যক্তিত্বরা বিভিন্ন সময়ে একে অপরের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধে জড়িয়েছেন। কিন্তু সেই মতপার্থক্যই ছিল বাংলার শক্তি। সেটিই ছিল এর বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এখন যা ঘটছে, তা সরাসরি ইতিহাস মুছে ফেলার চেয়ে কিছুটা সূক্ষ্ম। এখানে মুছে ফেলার পরিবর্তে একজনের জায়গায় অন্যজনকে বসানোর চেষ্টা চলছে। এমনকি ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’, যা প্রতি বছর ২০ জুন পালিত হয়, সেটিকেও এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই দিবসের অনুষ্ঠানে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যিনি নাকি “বাংলাকে ভারতের জন্য রক্ষা করেছিলেন”।
এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে এমন একজন নেতার ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হচ্ছে, যিনি বাংলার বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করতেন না। শেষ পর্যন্ত দেখলে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে এই লড়াই শুধু মূর্তি, ছবি বা বিচ্ছিন্ন মন্তব্যের লড়াই নয়। এটি আরও গভীর একটি প্রশ্নকে ঘিরে লড়াই—ভারতের অতীত কী ছিল, তা নির্ধারণ করার অধিকার কার? আর তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ভারত ভবিষ্যতে কী হতে পারবে, আর কী হতে পারবে না, সেটি নির্ধারণ করার অধিকারই বা কার?





