
লেখক: নিহাল কিদিয়ুর
মাওলানা সৈয়দ আবুল আ’লা মওদুদী রহ: বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী পণ্ডিত—যে শতাব্দীটি সমাজে বড় ধরনের বিপর্যয় এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিকতার বিস্তার এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বিশ্বকে সভ্য করার নামে শ্বেতাঙ্গদের চাপিয়ে দেওয়া বোঝা (white man’s burden) সমাজের মূল কাঠামোতে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছিল।
উদারপন্থী জীবনযাত্রার সাথে শাসনের একটি নতুন রূপ হিসেবে ‘জাতি-রাষ্ট্র’ (Nation-state)-এর উত্থান মানুষকে এক নতুন জীবনব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করেছিল। বিশেষ করে, যে দেশগুলো ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল, তারা তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল; তাদের শিক্ষা, পরিচয় এবং সভ্যতা মানসিক ও শারীরিক দাসত্বের শিকার হয়েছিল। এই নতুন পরিস্থিতি মানুষের মনে নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। ধর্মের ধারণাকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ (secular) ফ্রেমে বন্দি করা হয়েছিল, উদীয়মান বিজ্ঞান ঐশ্বরিক জ্ঞানের স্থান দখল করেছিল এবং পশ্চিমা জীবনযাত্রাই হয়ে উঠেছিল আধুনিকতার নতুন মাপকাঠি।
এমন এক পরিস্থিতিতে মওদুদী বিষয়গুলোকে দেখার একটি সম্পূর্ণ নতুন পথ দেখান। তখন মূলত দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল: হয় নতুন সব ধারণাকে সম্পূর্ণ বর্জন করা, অথবা পশ্চিমা আদর্শকে অন্ধভাবে গ্রহণ করা। মওদুদী উদীয়মান আধুনিক ধারণার সামনে apologetic (ক্ষমা প্রার্থনাকারী বা হীনম্মন্য) ছিলেন না, আবার সবকিছুকে সরাসরি খারিজও করে দেননি। তিনি ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে সমসাময়িক যুগের গতিশীলতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি শক্তিশালী জবাব তৈরি করেছিলেন এবং এভাবে ‘একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে ইসলাম’-এর ধারণাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এটিই ছিল সেই বিপ্লবী স্লোগান যা গত শতাব্দীতে ইসলামের পুনরুত্থানকে ত্বরান্বিত করেছিল। ইসলামের এই মহান তত্ত্বের রূপরেখা ও বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়াই ছিল তাঁর সামগ্রিক সাহিত্য ও কর্মের মূল প্রচেষ্টা।
আজকের দিনে, বিনিবেশিত জ্ঞান ও জ্ঞানতত্ত্বকে (decolonial knowledge and episteme) সামগ্রিক জ্ঞান ও সত্যকে বোঝার জন্য একটি আদর্শ মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের সাথে মাওলানা মওদুদীর সম্পৃক্ততা তাঁর মৌলিকত্বকে প্রমাণ করে। তিনি কীভাবে ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক মডেলের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করেছেন এবং ইসলামকে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, তা প্রশংসনীয়। তিনি বিশ্বকে দেখিয়েছেন যে, বর্ণবাদী এবং বস্তুবাদী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা দরকার এবং তা কীভাবে করতে হয়। মওদুদীর ভেতরের এই চিন্তাশীল মেধার মূল্যায়ন আজ পুরোপুরি করা হয় না। নিচে আলোচনা করা হলো কীভাবে মওদুদী আধুনিকতার ভিত্তিগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন এবং এরপর ঐশ্বরিক ওহীর আলোতে যুক্তি, ধারাবাহিকতা ও বিচারবুদ্ধির ওপর ভিত্তি করে একটি বিকল্প আলোচনা উপস্থাপন করেছিলেন।
আধুনিক আদর্শের সাথে সম্পৃক্ততা (Engagement with modern ideals)
আধুনিক আলোচনার তিনটি মূল স্তম্ভ বলা হয়—যুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব (supremacy of reason), অতি-ব্যক্তিতন্ত্র (individualization) এবং ধর্মনিরপেক্ষতা (secularism)। এই তিনটি স্তম্ভ যেকোনো ব্যবস্থায় প্রকাশ পায়, তা পুঁজিবাদ (capitalism), উদারতাবাদ (liberalism) বা সমাজতন্ত্র (socialism) যাই হোক না কেন। এর মূল রহস্য উন্মোচন না করে এই ধারণাগুলোকে বোঝা বা মোকাবেলা করা অসম্ভব। তাই মাওলানা মওদুদী তাঁর সমস্ত লেখায় কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে আসা ঐশ্বরিক প্রজ্ঞার শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন।
এমন এক যুগে যখন নিটশে (Nietzsche) ঘোষণা করেছিলেন, “ঈশ্বর মৃত,” এবং দেকার্তে (Descartes) বলেছিলেন, “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি,” মওদুদী অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, জ্ঞান যদি ঐশ্বরিক প্রজ্ঞার আলোয় বিকশিত না হয়, তবে তা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে এবং অচল হয়ে পড়বে। তাঁর ছোট পুস্তিকা ‘ইসলাম ও জাহেলিয়াত’ থেকে শুরু করে তাঁর ম্যাগনাম ওপাস (শ্রেষ্ঠ কর্ম) ‘তাফহীমুল কুরআন’ পর্যন্ত এই থিমটি সর্বদা বিদ্যমান ছিল। উম্মাহর মধ্যকার হীনম্মন্যতার প্রবণতার মাঝেও এটিই ছিল তাঁর ভাবনার মূল চালিকাশক্তি।
তিনি সেই অতি-ব্যক্তিতন্ত্রকে (hyper-individualization) চ্যালেঞ্জ করেছিলেন যা সমাজকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়, যেখানে ব্যক্তিকে মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে জন লকের (John Locke) ধারণার মতো একটি ঘুঁটিতে পরিণত করা হয়। মওদুদীর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল সমাজ, ‘শুরাইয়াত’ (পরামর্শভিত্তিক ব্যবস্থা) এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য যৌথ জীবনযাপন। এবং পরিশেষে, ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা—অর্থাৎ ধর্মকে কেবল ব্যক্তিগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখার যে নীতি—তার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। একে মুসলিম উম্মাহর মাদরাসা বনাম আলীগড় মডেল শিক্ষার দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটেও পড়া উচিত। তিনি তাঁর বক্তব্যে অটল ছিলেন যে, ধর্মকে জীবনের সব ক্ষেত্রে নির্দেশনা দিতে হবে এবং রাষ্ট্রপ্রধান ও ধর্মগুরুর (emperor and pope) মধ্যে কোনো বিভাজন থাকতে পারে না—যা ছিল মূলত ইহুদি-খ্রিস্টান জীবনযাত্রার একটি প্রভাব। জাতি-রাষ্ট্র গঠনের যুগে পশ্চিমা, উদার ও পুঁজিবাদী জীবন ব্যবস্থার একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে ইসলামের যে একটি নিজস্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনব্যবস্থা রয়েছে, তা তিনি জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন।
ইসলামি জীবনব্যবস্থা (Islamic system of life)
তাঁর চিন্তার মূল দিকগুলো যখন আমরা বিভিন্ন শাখা ও জীবনব্যবস্থায় প্রয়োগ করি, তখন আমরা একটি সুনির্দিষ্ট, সুসংগত এবং যৌক্তিক চিন্তাধারা দেখতে পাই। এটি আমাদের ঈমান, ন্যায়বিচার ও শান্তির ওপর ভিত্তি করে সমাজ গঠনের একটি রোডম্যাপ দেয়। ইসলামি রাজনৈতিক ইতিহাসের ওপর তাঁর অন্যতম সেরা গ্রন্থ ‘খিলাফত ও মুলুকিয়াত’ (Khilafat-o-Mulukiyat)-এর কথা ধরা যাক। এতে তিনি অতীতের হাজার বছরের একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন এবং ইসলামি রাজনৈতিক কল্পনার একটি সূত্র তৈরি করেছেন। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, কোথায় খিলাফতের প্রতিষ্ঠানটি ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার দ্বারা হাইজ্যাক হয়েছিল এবং ‘মুলুকিয়াত’ (রাজতন্ত্রে) রূপান্তরিত হয়েছিল। অথচ খিলাফত ব্যবস্থা ছিল শুরাইয়াত, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যেখানে সার্বভৌমত্ব ছিল একমাত্র আল্লাহর এবং শাসক ছিলেন তাঁর প্রতিনিধি (খলিফা)। ‘হাকমিয়াত’ বা চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ছিল আল্লাহর, শাসকের নয়—এই নীতিটি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
তিনি তাঁর ‘তেহরিক-ই-আজাদি-ই-হিন্দ অউর মুসলমান’ গ্রন্থে আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে উৎপন্ন সার্বভৌমত্ব ও আইন কীভাবে ব্যর্থ হতে বাধ্য। তিনি উদারনৈতিক গণতন্ত্রের (liberal democracy) ব্যর্থতার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে একটি প্রজাতন্ত্রে সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘুদের গ্রাস করবে—যা আজ বিশ্বজুড়ে ঘটছে। ট্রাম্পের মতো নির্বাচিত নেতাদের উত্থানও এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দেখায়, যেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হাইজ্যাক হতে পারে। ফিলিস্তিন গণহত্যার মুখে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার আইন ও শৃঙ্খলার সংকট উদারপন্থী গণতন্ত্রের ব্যর্থতাকেই উন্মোচিত করে। রাজনীতিতে যে নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা থাকা আবশ্যক, পুঁজিবাদী অর্থনীতি দ্বারা চালিত আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
একইভাবে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন শিল্পায়নের ফলে নতুন অর্থনৈতিক মডেলের জন্ম হলো, পুঁজিবাদ মঞ্চ দখল করল এবং অর্থই নতুন ঈশ্বরে পরিণত হলো; অন্যদিকে সাম্যবাদ (communism) উৎপাদন ও শ্রমের সংকটের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামনে এলো। মাওলানা মওদুদী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সুদ’ (Sood)-এ দেখিয়েছেন কেন সুদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ব্যবস্থা শোষনমূলক এবং বিপর্যয় ডেকে আনতে বাধ্য—যা আজ আমরা আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে ভারতের দালাল স্ট্রিট পর্যন্ত প্রত্যক্ষ করছি। পুঁজিবাদ যেখানে বাজারের অদৃশ্য হাতের ওপর নির্ভর করে পুঁজি দিয়ে ব্যক্তিকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিল, আর সাম্যবাদ চেয়েছিল রাষ্ট্রের লোহার হাত দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করতে; মওদুদী চিহ্নিত করেছিলেন যে, আসল সংকট লুকিয়ে আছে মানুষকে একটি “স্বার্থপর” জীব হিসেবে বিবেচনা করার ভুল ধারণার মধ্যে।
তিনি মানুষের আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হওয়ার ধারণার ওপর ভিত্তি করে একটি ইসলামি মডেল উপস্থাপন করেন: যেখানে সম্পদ মানুষের কাছে একটি আমানত বা দায়িত্ব এবং তার অর্জনের স্বাধীনতা থাকবে, তবে সামগ্রিকভাবে মানবতার কল্যাণ সাধন হতে হবে এবং সুদের অভিশাপ দূর করতে হবে। তাই আজকের এই ক্রনি ক্যাপিটালিজমের (স্বজনতোষী পুঁজিবাদ) যুগে মওদুদীর ইসলামি অর্থনীতির আদর্শ মানবতার আত্মদর্শনের জন্য একটি আশার আলো। শিক্ষা, আইন, শিল্প ও সংস্কৃতি এবং আরও অনেক ক্ষেত্রে মওদুদী বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, তবে এখানে উদ্দেশ্য হলো তাঁর চিন্তাভাবনার একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়া।
উপসংহার
উপরের আলোচনা থেকে আমরা পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই যে, জীবনবিধান হিসেবে ইসলামের ধারণার ওপর ভিত্তি করে মওদুদী একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। এই আদর্শগুলোর নৈতিক ভিত্তি ও নীতিমালা রয়েছে যা একটি পরিবর্তনশীল মানব সমাজে প্রয়োগ করা সম্ভব। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সপ্তম শতকের আরবের একটি সামন্ততান্ত্রিক সমাজে বাস করতেন; মওদুদীর দর্শনের মূল কথা হলো ইসলামের আদর্শগুলো কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থবির নয়, বরং এর মধ্যে স্থান ও কাল ছাড়িয়ে আলো ছড়ানোর গতিশীলতা রয়েছে। মওদুদীর সাফল্য এখানেই: তিনি ইসলামকে একটি গতিশীল চিন্তাধারা ও আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন যা নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে একটি মানবিক সমাজ গঠনে সফলভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
সামন্তবাদী সমাজ থেকে জটিল জাতি-রাষ্ট্র, কিংবা সরল গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে আজকের এই হাইপার-কানেক্টেড বিশ্ব—সবখানেই ইসলামের এই গতিশীল নীতিগুলোই এগিয়ে যাওয়ার পথ। এটি কোনো পুরনো ব্যবস্থাকে হুবহু অনুকরণ করা বা হারিয়ে যাওয়া সোনালী ইতিহাসের গল্পে বন্দি থাকা নয়; বরং মাওলানা মওদুদী তাঁর ‘খিলাফত ও মুলুকিয়াত’ গ্রন্থে চমৎকারভাবে যেভাবে দেখিয়েছেন—ইতিহাস থেকে মুক্তা সংগ্রহ করে একটি প্রাণবন্ত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই হলো আসল কাজ। আর এখানেই মাওলানা মওদুদীর মেধার অনন্য প্রকাশ।





