
লিখেছেন: সাইফুল্লা
কথাটা অপ্রিয় হলেও অনস্বীকার্য যে, আমরা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে অত্যন্ত পিছিয়ে রয়েছি। সাত দশক অতিক্রান্ত হয়েছে সাতচল্লিশ অতীত হয়েছে। এই সাত দশকে বলার মতো সাত জন সাহিত্যিককে আমরা উপহার দিতে পারেনি বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ একালের বাংলা সাহিত্যধারায় নিঃসন্দেহে এক অনন্য সংযোজন। তবে ওই পর্যন্ত। তাঁর উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি দ্বিতীয় কেউ। অবশ্য আবদুল জব্বার, আফসার আমেদ, আবুল বাশার, সোহারাব হোসেন, নিজ নিজ ক্ষেত্রে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আবদুল জব্বারের বাংলার চালচিত্র-র অনন্যতা প্রশ্নাতীত। কিস্সাধর্মী রচনা-ধারায় আফসার আমেদ অদ্যাবধি অদ্বিতীয় নাম। সোহারাব হোসেন এর মহারণ ও সরম আলীর ভুবন উপন্যাস দুটি বাংলা সাহিত্যতের অঙ্গনে স্বকীয়তায় ভাস্বর। আবুল বাশার-এর সৃষ্টিক্ষেত্রে অসুন্দরের ছায়াপাত থাকলেও তথায় শিল্পের ছোঁয়া আছে, তা স্বীকার করতেই হবে। অর্থাৎ চিত্রপটটা একেবারে শূন্য বা ফাঁকা নয়। তবে প্রত্যাশার তুলনায় এর সামান্যতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নেই।
তুলনামূলক বিচারে প্রতিপন্ন হবে, সাহিত্যচর্চার প্রশ্নে স্রষ্টা ও সৃষ্টি উভয় দিক থেকে আমরা আমাদের প্রতিবেশী সমাজের থেকে শত যোজন দূরে অবস্থান করছি। আফসার আমেদ, সোহারাব হোসেন-দের সমতুল স্রষ্টা প্রতিবেশী সমাজে করাঙ্গুলে গণনীয় নয়; সৃষ্টিবৈচিত্র্য ও সংখ্যাধিক্যেও তাঁরা অসামান্য ভূ মিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এখন প্রশ্ন, কেন এই বিভিন্নতা? কেন পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সমাজ সাহিত্যক্ষেত্রে নিজেদের সেভাবে মেলে ধরতে পারছে না। এক্ষেত্রে একটা সহজ উত্তর কারও কারও মনে প্রশ্রয় পারে পারে-সাহিত্যচর্চায় বাঙালি মুসলিমরা প্রথমাবধি পিছিয়ে ছিল এবং এখনও পিছিয়ে আছে; এবং এর কারণ তাদের ধর্মচেতনা; সাহিত্যচর্চাকে মুসলমান সমাজ কখনো মন থেকে সেভাবে গ্রহণ করতে পারেনি; তাদের আত্মিক সম্পৃক্ততা তৈরি হয়নি সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে; ফলত যা হওয়ার তাই হয়েছে।
আমরা অবশ্যই এমন অভিমতের সঙ্গে সহমত পোষণ করি না। প্রথমত, বাঙালি মুসলমান সমাজে সাহিত্যচর্চার বিষয়টি কখনোই সেভাবে প্রশ্রয় পায়নি, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল; দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় চেতনার কারণে মুসলমান সমাজ সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার অঙ্গন থেকে নিজেদের বেশ একটু দু রে সরিয়ে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, এমন কোনো ধারণাও পুরোপুরি সমর্থনযোগ্য নয়। কেন না, পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, প্রাগাধুনিক বাংলা সাহিত্য ক্ষেত্রে মুসলমান সমাজ তাদের প্রতিবেশী সমাজের তুলনায় কোনো অংশে পিছিয়ে ছিল না, বরং স্থানে স্থানে বেশ একটু অগ্রসর অবস্থান নিয়েছিল। দেববাদ ও প্রথাবদ্ধতার ঘোলা জলে সিক্ত সেদিনের বাংলা সাহিত্যের যখন রীতিমতো হতশ্রী অবস্থা তৈরি হয়েছিল তখন মুসলমান কবিরাই প্রণয় উপখ্যান, মসীয়া সাহিত্য এসব রচনা করে বাংলা সাহিত্যের দেহ মনে বিশেষ প্রাণসক্তি সঞ্চার করেছিলেন। প্রাগাধুনিক যুগের শেষ পর্বে বা যুগসন্ধির ক্ষণে যখন মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ধারা মোটের উপর স্তব্ধ হয়ে এসেছিল তখন মুসলমান কবিরাই পুথিসাহিত্য রূপ বিশেষ ধারার সাহিত্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রকে ফলনশীল রেখেছিলেন। আর ইসলাম ধর্ম চেতনার সঙ্গে সাহিত্যচর্চার যদি কোনো মূলগত বিরোধ থাকবে, তবে ওপার বাংলার মুসলমান বাঙালি বাংলা সাহিত্য রচনায় এমন অসামান্য দক্ষতা দেখাচ্ছে কী করে। উত্তর সাতচল্লিশ পর্বে এপার বাংলা ওপার বাংলা মিলিয়ে বাংলা সাহিত্যের যে চর্চা হয়েছে সেখানে ওপার বাংলা কী সৃষ্টি বৈচিত্র্য, কী সংখ্যাধিক্য কোনো দিক থেকে এপার বাংলার তুলনায় কোনো অংশে পিছিয়ে নেই।
আসলে এক্ষেত্রে সমস্যা হয়েছে অন্য জায়গায়। সাহিত্যচর্চা একান্তভাবে পরিবেশ-প্রতিবেশ সাপেক্ষ সত্য। প্রতিবেশ থেকে উপযুক্ত সহায়তা না পেলে কোনো সাহিত্যিকই সেভাবে সপ্রতিভ হতে পারেন না। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানরা সাহিত্যিকরা এখানেই সবচেয়ে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখী হয়েছেন। তাঁরা তাঁদের সমাজের দিক থেকে সেভাবে সহায়তা পাননি। সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান কথা স্বকীয়তা। একজন কৃষক অন্যের জমিতে নিজেকে নিংড়ে দিতে পারেন, ফলাতে পারেন সোনার ফসল। সাহিত্যের ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয় না। নিজের কথা নিজস্ব ঢঙে বলার কোনো বিকল্প থাকে না একজন সাহিত্যক্যের সামনে। আমাদের লেখকরা প্রায়শ তাঁদের নিজেদের কথা নিজেদের মতো করে বলার সুযোগ পাননি। যে সমাজ, যে প্রতিবেশে তিনি লালিত পালিত হয়েছেন, সেই সমাজ-প্রতিবেশকে সৃষ্টির অঙ্গনে ভাস্বর করে তোলার ক্ষেত্রে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা।
কথা প্রসঙ্গে কথাকার আবদুর রাকিব এর কথায় আসা পেরে পারে। উপন্যাস রচনায় তেমন দক্ষতা দেখাতে না পারলেও গল্পকার আবদুর রাকিব এর অনন্যাতা প্রশ্নাতীত। যারা তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে পড়েছেন তারা জানেন, বাংলা গল্পক্ষেত্রে একধারে শিল্প-চেতনা ও শুভ-বোধের যে মেলবন্ধন তিনি ঘটিয়েছেন, তার তুল্য দৃষ্টান্ত এ যুগের বাংলা সাহিত্যে বিরল। এদিকে আমরা তাঁর লেখা পড়া তো দূরের কথা, তাঁর নামও শোনেনি অধিকাংশজন। এই অস্বস্তিকর অপরিচিতির প্রধান কারণ, তাঁর লেখার বিষয়বস্তু। শ্বাশত মানবিকতার সঙ্গে ইসলামি মু ল্যবোধের সংমিশ্রণে গল্পের যে ভুবন তিনি রচনা করেছেন। তা আমাদের অনেকরই নিতান্ত না পছন্দের বিষয়। আমরা এখন সাহিত্যের এমন এক স্কুলের ছাত্র সেখানে ভাবনার একমুখীনতাই শেষ কথা। তথাকথিত প্রভু বা শিক্ষকদের শিখিয়ে দেওয়া বুলির বাইরে আমরা নতুন করে নিজেদের মতো করে কিছু ভাবতে পারিনে, শিখতে চাইনে। আমাদের প্রভুরা বলেছেন দিয়েছেন, একালের গল্পকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে রীরংস বাস্তবতার বেলাভূমিতে। চিরকালীন বাউৎতা, যা কালিক অসুন্দরের দহনে সেভাবে দন্ধ নয় তেমন কোনো বিষয়াশ্রিত গল্প গল্পই নয়; বিশেষত সেখানে ইসলামি মু ল্যবোধের উচ্চারিত বা অনুচ্চারিত উচ্চারণ থাকলে তো কথাই নেই। তেমন হলে, সে রচনাকে প্রথমেই ফেলে দেওয়া হবে ডাস্টবিনে। তোতাপাখি-রূপ আজকের পাঠক আমরা গল্পকার আবদুর রাকিবকে বর্জন করেছি আমাদের তথাকথিত প্রভুদের দেখান পথের পথিক হয়ে। এক্ষেত্রে যদি আমরা মুক্ত বৃদ্ধির ফেরিওয়ালাও হতে পারতাম তবে গল্পকার আবদুর রাকিব আমাদের কাছে অন্য পরিচয়ে ভাস্বর হতেন। তাঁর গল্পের অঙ্গনে ইসলামি মূল্যবোধের প্রগাঢ় ছায়াপাত থাকায় অমুসলমান সমাজ তাঁর প্রীতি কখনো তেমন প্রীতিবোধ করতে পারেনি। এদিকে অবস্থার প্রেক্ষিতে তাঁর গল্পকে বুক দিয়ে আগলে রাখার কথা ছিল যে মুসলমান সমাজের তাদের মধ্যে অদ্যাবধি চেতনার দীপ সেভাবে জ্বলেনি। মুসলমান সমাজের মধ্যে থেকে যে দুই এক জন ব্যক্তি সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে সামান্য দুই এক পা অগ্রসর হতে পেরেছেন, তারা তাদের বিবেক বুদ্ধি বন্ধক দিয়ে ফেলেছেন প্রতিবেশী সমাজের ইচ্ছা অনিচ্ছার সমীপে। ফলত আবদুর রাকিব এর মতো সাহিত্যিকদের কবরের গভীরতা আড়াই হাত থেকে বেড়ে চার হাত হয়েছে।
সমস্যার বীজ উপ্ত হয়েছিল ১৭৫৭ সালে, পলাশির যুদ্ধের অব্যবহিত পরে। পলাশির যুদ্ধের ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলার রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে যে এক বিরাট পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল সে পরিবর্তনের ঝোড়ো হাওয়ায় বিশেষ করে ধ্বস্ত হয়েছিল বাংলার মুসলমান সমাজ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, মুসলমানদের হাত থেকে রাজ ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। এই প্রেক্ষিতে তারা সচেষ্ট হয়েছিল মুসলমান সমাজ যেন আর কখনো মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে; পা না রাখতে পারে প্রত্যাঘাতের পথে। এই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য তাদের দিক থেকে আবশ্যক ছিল এদেশের হিন্দু সমাজের সমর্থন। তাই তারা প্রথমাবধি হিন্দু সমাজের দিকে বিশেষ সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করেছিল এবং উল্টো দিক থেকে এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল যাতে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে মুসলমান সমাজ একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন, আয়মা সম্পত্তি বিলোপ, সরকারি ভাষা হিসাবে ফারসি পরিবর্তে ইংরেজির প্রতিষ্ঠা, এসব ছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তাদের গৃহীত এইসব পদক্ষেপ, একদিকে যেমন মুসলমান সমাজকে ভিতরে বাইরে দুর্বল করে দিয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি হিন্দু সমাজকে অনুপ্রাণিত করেছিল মুসলমান সমাজের থেকে মানসিক দূরত্ব রচনা করতে। এই সময়ে শাসক ইংরেজ এমন করে ভারতীয়, সেইসঙ্গে বাঙালির সমাজেতিহাসের ভাষ্য রচনা করেছিল যাতে প্রতিপন্ন হয়েছিল, প্রাক্ মুসলমান শাসনপর্বে এদেশের মাটিতে সতত সোনা ফলতো, এ দেশের আকাশে বাতাসে নিয়ত ধ্বনিত হত মধুর সংগীত; দীর্ঘ মুসলমান শাসনের প্রকোপে সেসবই বিনষ্ট হয়েছে। তাদের প্রণীত এমন সব মিথ্যা ভাষ্যকে প্রায় দ্রুত সত্য বলে গ্রহণ করে অমুসলমান সমাজ এবং সেই অনুসারে তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করে; মাথাচাড়া দেয় হিন্দু জাতীয়তাবাদ।
উনিশ শতকের ছয়-সাতের দশকে যখন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের যাত্রা শুরু হচ্ছে তখন হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রচার প্রসার পরম মাত্রা পেয়েছে এবং রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে তা চূড়ান্ত ফলিত রূপ লাভ করেছে। তখনকার বাংলা সাহিত্য মানে তা আক্ষরিক অর্থে হিন্দুদের রচিত, হিন্দু ভাবাশ্রিত সাহিত্য। এখানে কোথাও মুসলমান সমাজের জন্য কোনো মানসিক আশ্রয়ের জায়গা তো নেইই, উল্টে মুসলমান ভাবাবেগকে আহত করা হয়েছে পদে পদে। এমন অবস্থায় মুসলমান সমাজ মুখ ফিরিয়ে নেয় আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দিক থেকে। তারা আরও বেশি করে আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করে পুথি সাহিত্যের অঙ্গনে। কিন্তু এই চেষ্টা বিশেষ ফলপ্রসূ হয় না। ঐতিহাসিক কারণে ততদিনে পুথি সাহিত্যের যুগ শেষ হয়ে এসেছিল। তখন নতুন যুগের নতুন পতাকা আকাশে উড্ডীয়মান। মুসলমানরা তাদের মানসিক ও আর্থ-সামাজিক কারণে এই পতাকা তলে সেভাবে আশ্রয় নিতে পারলো না। ফলত দিনে দিনে পিছিয়ে পড়তে শুরু করলো তারা। প্রাগাধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলমান সমাজের যে একটা বিরাট গৌরবময় ক্ষেত্র ছিল তা এখন নিছকই অতীতের ধূসর বাস্তব মাত্র। এমন ধূসর বাস্তবতার অঙ্গনে আধুনিকতার ফসল ফলানো গেল না কিছুতেই।
বাস্তবের অনুপুল্ক পাঠ নিয়ে একটা সময়ের পর অবশ্য মুসলমান সমাজ তাদের ভুল বুঝতে পারলো। তখন তারা সচেষ্ট হল পুথি সাহিত্যের পাতা উল্টে আধুনিক সাহিত্য রচনায় লক্ষ্যে। কিন্তু এই প্রচেষ্টার ফসল ফললো না সেভাবে। সমস্যা দেখা দিল নানা দিক থেকে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা তৈরি হল ভাষার প্রশ্নে; বাংলা ভাষাকে ঘিরে। ততদিনে সাহিত্য ক্ষেত্রে অনেকখানি অগ্রসর অবস্থানে উপনীত হওয়া অমুসলমান সমাজ বাংলা সাহিত্যের বাহন হিসাবে সংস্কৃতময় এমন এক বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যার সঙ্গে মুসলমান সমাজের কোনোরকম প্রাণের যোগ নেই; এ ভাষ তাদের কাছে একেবারেই ‘অপর’ বিষয়। এদিকে এমন অপর ভাষাকেই সাহিত্যচর্চার মাধ্যম করতে বাধ্য হতে হল তাদের। এতে ফল যা হওয়ার তাই হল। তাদের ব্যবহৃত ভাষায় থাকল না কোনো স্বতঃস্ফূর্ততা। আর কে না জানে, ভাষার স্বতঃস্ফুর্ততা ব্যতিরেকে সাহিত্যক্ষেত্রে সাফল্য লাভ করা অসম্ভব।
একটা সময় ছিল বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিকরা সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সংস্কৃতময় বাংলাকে বিশেষ করে আশ্রয় করতো। আমরা সময়ের দিক থেকে প্রাগাধুনিক যুগের ও স্রষ্টা হিসাবে শাহ মুহম্মদ সগীর, মুহম্মদ কবীর, সৈয়দ আলাওল প্রমুখে র কথা বলছি। তখনও পর্যন্ত সাহিত্যের ভাষা হিসাবে বাংলা ভাষার শরীরে মুসলমানিত্বের রঙ সেভাবে লাগেনি। মুসলমান কবি-সাহিত্যিকরা তাই দ্বিধাহীনভাবে প্রচলিত সংস্কৃতময় বাংলা ভাষাকে তাদের নিজেদের ভাষা হিসাবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু পরে অবস্থার পরিবর্তন হয়। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে; বাংলায় মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠার সূত্রে একটা সময়ের পর থেকে মৌখিক বাংলার পাশাপাশি লেখ্য বাংলা ভাষাতেও আরবি, ফারসি ভাষার বিশেষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয় এবং আরবি, ফারসি শব্দ প্রভাবিত এক বিশেষ ধরনের বাংলা ভাষা সাহিত্যক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পায়। সঙ্গতভাবে মুসলমান সমাজ নতুন এই ভাষারীতির সঙ্গে অনুভব করে আত্মার আত্মীয়তা। সেদিনের পুথি সাহিত্যের ভাষায় লক্ষ করা গেছিল সেই আত্মীয়তার ফলিত রূপ।
এমন আত্মীয়তার আবরণ ছিন্ন করে মীর মশাররফ হোসেন, নজিবর রহমান, ইসমাইল হোসেন সিরাজী প্রমুখকে যখন কলম হাতে সাহিত্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতে হলো তখন তাঁরা যে অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়লেন সে অসহায়তা থেকে কিছুতেই আত্মমুক্ত হতে পারলেন না তাঁরা। পাশাপাশি অন্যসব সমস্যাও মাথাচাড়া দিল প্রবল মাত্রায়। অগ্রসর সাহিতিক-মন যুগের দাবি মেনে নিয়ে সংস্কৃতময় বাংলা ভাষার আশ্রয়ে সাহিত্যচর্চার মনোনিবেশ করলেন বটে; কিন্তু সমাজের সাধারণ মানুষের মানসিকতার কোনো পরিবর্তন তখনো সাধিত হয়নি। তারা তখনও মজে ছিল সেই পুথি সাহিত্য ও তার ভাষারীতিতে; এর বাইরেকার আর কোনো সত্যকে গ্রহণ করতে তারা কিছুতেই রাজি নয়। এতে ঘোরতর সমস্যা তৈরি হল। মশাররফ হোসেন বা নজিবর রহমানদের রচনা সমাজের সামান্য একটা অংশকে স্পর্শ করলো মাত্র; অধিকাংশজনই মুখ ফিরিয়ে থাকলো এর থেকে। এমন অবস্থায় যা হওয়ার তাই হল। স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক চাওয়া পাওয়ার দ্বারা পুষ্ট না হওয়ার কারণে একটা সময়ে স্তব্ধ হয়ে এল কথাকারদের রচনাধারা। উদাসীন পথিক মনের কথা-র মতো অসামান্য রচনা দিশা হারালো মরুপথে।
ভাষাগত কারণে মুসলমান সমাজ মুসলমান লেখকদের রচিত আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে সেভাবে গ্রহণ করলো না। এদিকে অমুসলমান সমাজও নজিবর রহমান ও এমদাদুল হকদের সৃষ্টিদা প্রতি তেমন আকর্ষণ বোধ করলো না, এর বিষয়গত কারণে নজিবর রহমানরা তাঁদের রচনায় যে মুসলমান সমাজ-সংস্কৃতির কথা তুলে ধরতে চাইলেন তা একেবারেই উপাদেয় মনে হল না অমুসলমান সমাজের কাছে; ততদিনে অমুসমান জনমনে মুসলমান বিদ্বেষ দৃঢ়ভিত্তি পেয়েছে। তারা আনোয়ারা আবদুল্লাহ এসব পড়ে দেখা তা দূরের কথা এর নাম শুনতেও স্বস্তিবোধ করলো না। সবমিলিয়ে নিজেদের সাহিত্য জীবনে চ ড়ান্ত এক প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে হাঁসফাঁস করতে হল। মুসলমান লেখকদের। স্বসমাজে পাঠক নেই; প্রতিবেশী সমাজ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হতে হচ্ছে পদে পদে। সেদিন এমন অসহায় অবস্থার বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন যে একমাত্র মানুষটি তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যে অসামান্য প্রতিভা। বলে তিনি পদদলিত করেছিলেন বাঁধার প্রাচীর তা আর কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি। এমন কী মীর মশাররফের পক্ষেও নয়। বিষাদসিন্ধু-র বিস্ময়কর সাফল্যের পরেও তাঁকে পুনরায় গলা দিতে হয়েছিল পুথিসাহিত্যের হাড়ি কাঁঠে।
পর্যালোচনা করলে প্রতিপন্ন হয়, প্রাক্ সাতচল্লিশ পর্বের বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ কালসীমায় মুসলমান প্রতিনিধিত্ব যৎসামান্য; প্রথম শ্রেণির সাহিত্য-ব্যক্তিত্ব বলতে সেই মশাররফ, নজরুল এবং জসীমউদ্দিন। আর সকলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির। এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে হতাশাব্যঞ্জক। বঙ্গদেশে এমনিতে মুসলমানরা সংখ্যাগুরু সমাজ। সেই সংখ্যাগুরু সমাজ থেকে উঠে আসা প্রথম শ্রেণির সাহিত্য ব্যক্তিত্ব বলতে সাকুল্যে তিন জন। সংখ্যালঘু সমাজের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা যেখানে কম করে দশ জন। এসব সব দেখে শুনে, বুঝতে এতটুকুও অসুবিধা হয় না যে, কোথায় বিরাট একটা কোনো সমস্যা দানা বেধেছিল।
প্রাক্ সাতচল্লিশ পর্বে এই সমস্যার মূলোৎপাটন করা যায়নি। কিছুতেই। পরে দেশভাগের প্রেক্ষিতে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ভূখণ্ডে বাঙালি মুসলমান সমাজ নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ পায় বিশেষভাবে; এখন তারাই তাদের বিধাতা পুরুষ। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এখন আর কেউ তাদের উপর কোনোরকম খবরদারি করতে পারবে না; এমন উপলব্ধি তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করলো অন্য প্রতীতির মুকুরে অতঃপর মুক্তমন নিয়ে তারা পা রাখলো সহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে। এমন মুক্ত মনের উদ্ভাসন ফলপ্রসূ হওয়া স্বাভাবিক এবং এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। একটি দুটি করে ফু ফুটতে ফুটতে ক্রমশ পূর্ববঙ্গের সাহিত্য অঙ্গন ভরে উঠল সোনার ফসলে। এখানে স্রষ্টারা যেমন তাঁদের সৃষ্টির ডালি উপুড় করে দিতে বদ্ধপরিকর হলেন, তেমনি পাঠকরাও দৃঢ়চিত্ত হলেন তাকে সবর্তোভাবে ধারণ করতে। এতে করে সৃষ্টির সমুদ্রে জোয়ার উঠল। এখন আর শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কারও চোখ রাঙানির ভয় নেই, নেই নিজের মতো করে বলার জন্য পাঠক সমাজ কর্তৃক উপেক্ষিত বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা: যে আশঙ্কা সেদিন রীতিমতো তাড়া করে নিয়ে ফিরতো মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদেরকে। উদাহরণের শেষ নেই। কবিতায় রক্তের বদলে খুন শব্দ ব্যবহার করার জন্য নজরুলের উপর রীতিমতো খঙ্গহস্ত হয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ: এটা তাঁর ‘তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচার’ মতো অবাঞ্ছিত বিষয় বলে মনে হয়েছিল। তারপর রবীন্দ্র যুগ শেষ হয়ে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গন জুড়ে একদিন রীতিমতো আধুনিকতার ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করলো। কিন্তু হায়। মুসলমান কবি-সাহিতিকদের জন্য রক্তচক্ষুর উৎগীরণে কোনোরকম ভাঁটা পড়লো না। কবি জসীমউদ্দিন তাঁর সোজনবাদিয়ার ঘাট কাব্যে ব্যবহার করেছিলেন বেশ কিছু আরবি, ফারসি শব্দটি। এতে ক্ষেপে লাল হয়ে যান নরেন্দ্র দেব নামের বাংলা সাহিত্যের জনৈক রক্ষক। তিনি বিবেকবোধের মাথা খেয়ে কবির উদ্দেশ্য বর্ষণ করেন তাঁর সুধা বাক্য-‘এই পুস্তকে বহু আরবী-ফার্সী শব্দ আছে তাহা প্রয়োগ করিয়া লেখক বাংলা সাহিত্যকে কলঙ্কিত করিয়াছেন।’
আমরা আগেই বলেছি, উদাহরণের শেষ নেই। অনেক দিন আগের কথা। তখন সদ্য প্রকাশিত হয়েছে মীর মশাররফ হোসেন এর বসন্তকুমারী নাটক। এ নাটকের সমালোচনা করতে গিয়ে সোমপ্রকাশ পত্রিকার পক্ষ থেকে বলা হল-‘যাঁহারা বলেন, আমরা যে ভাষায় কথোপথন করি, সেই ভাষায় গ্রন্থ না লিখিলে বাঙ্গানা ভাষার উন্নতি হইবে না। তাঁহারা দেখুন, তাঁহাদিগের সিদ্ধান্ত কেমন অপসিদ্ধান্ত। বসন্তকুমারী নাট্যকার সাধু বাঙ্গালায় গন্থ না লিখিয়া যদি চলতি ভাষায় লিখিতে যাইতেন, তিনি নিঃসংশয় মুসলমান বলিয়া ধরা পড়িতেন, তাঁহার গ্রন্থ অনাদরোপহৃত হইত সন্দেহ নাই।’ (সোমপ্রকাশ, ১৪ ফাল্গুন, ১২৭৯) লক্ষ্যণীয় ‘মুসলমান বলিয়া ধরা পড়িতেন’ শব্দবন্ধটি। বোঝা যায়, মুসলমান লেখকের পক্ষে সেদিন লেখালিখির অঙ্গনে পা রাখার ক্ষেত্রে প্রথম শর্তই ছিল তাঁর মুসলমানিত্বকে জাহির না করা; বিশেষত ভাষার ক্ষেত্রে আরবি, ফারসি শব্দের ব্যবহার সবর্তোভাবে বর্জন করা। এমন কঠিন শর্ত সাপেক্ষে সাহিত্যক্ষেত্রে হাল চালানো, ফসল ফলানো ছিল চরম কঠিন পরীক্ষা। মুসলমান লেখকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তাঁদের মধ্যেকার কারও কারও সাহিত্য-মুকুর ঝরে গিয়েছিল নিতান্ত অকালে: কেউবা শেষাবধি ফুল হয়ে ফুটলেও, সে ফুলে সৌরভ সঞ্চারিত হয়নি সেভাবে।
স্বাধীন দেশ, স্বাধীন জাতিসত্তা; এমন প্রেক্ষিতে পূর্ববঙ্গের মুসলমান সমাজ সাহিত্যক্ষেত্রে যেভাবে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমান সমাজ আজও তা পায়নি। ভাষাগত সমস্যার জাল কালক্রমে অনেকটাই গুটিয়ে গেছে। এখন সাহিত্যক্ষেত্রে মুসলমানি শব্দ ব্যবহারের জন্য একজন মুসলমান লেখক আর সেভাবে ভর্ৎসিত হন না। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ থেকে শুরু করে সোহারাব হোসেন পর্যন্ত সকলেই তাঁদের সৃষ্টির অঙ্গনে আরবি ফারসি শব্দের মালা গাঁথতে পারেন নির্দ্বিধায় ‘নলকুড়ের মৌলবিও যে এতটা ভাল নছিয়ত করতে পারে তা সরমের জানা ছিল না। তাই ঘোরে-বে-ঘোরে যেন ঐ নছিয়তে মজে গেছিল সরম। বিশেষ করে মৌলবি যখন হর-পরীদের কথা বলছিল, তখন নিজের রক্তে ফলজীর তাপ নিতে নিতে সরম মাতাল হয়ে গেছিল। ….’বুঝলি ফজলী, আমার দুটো চিন্তা, খাবা আর শোবা। ও সব শালা দোজোক-বেহেস্তে লে বুড়োবয়েসে ভাববানি।’ (সরম আলির ভুবন, সোহারাব হোসেন) তবে একটা দিকের সমস্যা মিটলেও অন্য অনেক সমস্যা ডালপালা বিস্তার করেছে আরও বেশি করে। সামাজিক আশ্রয়ের প্রশ্নে এবার বাংলার মুসলমান লেখকরা বিপন্ন হচ্ছে বিশেষ ভাবে। বিভাগ উত্তর পর্বে বঙ্গদেশে মুসলমানদের সংখ্যাই ছিল অধিক। এই বিরাট সংখ্যক মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে চেতনার সঞ্চার হচ্ছিল। তারা একটু একটু করে সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী হয়ে উঠছিল; আশ্রয় স্থল হয়ে উঠছিল তাদের কবি-সাহিত্যিকদের জন্য। তাদের সৃষ্ট এই আশ্রয় ভূমিতেই সেদিন লালিত পালিত হয়েছিলেন কবি নজরুল। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, মোসলেম ভারত, সওগাত এসব পত্র-পত্রিকা না থাকলে নজরুল-প্রতিভার বিকাশ কতটা স্বতঃস্ফূর্ত হত তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে।
সেদিন প্রতিভাবান নজরুলকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য মুসলমান সমাজ যেভাবে নিজেদেরকে উৎসর্গ করেছিল আজকের কোনো প্রতিভাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য এপার বাংলার মুসলমান সমাজ সেভাবে প্রস্তুত নয়। সেই অর্থে কোনো ভালমানের সাহিত্য পত্রিকার প্রচলন নেই এই সমাজে। আবদুল আজীজ আল্ আমান সম্পাদিত কাফেলা-র যুগ শেষ হয়েছে তাও আবার তিন দশক হয়ে গেল। এত দিনে দ্বিতীয় কোনো সাহিত্য পত্রিকার উৎসার ঘটলো না মুসলমান সমাজের মধ্যে থেকে। উপযুক্ত সাহিত্য পত্রিকার আশ্রয় ছাড়া একজন নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশের পথ যে কতটা বন্ধুর হয় তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। উত্তর সাতচল্লিশ পর্বে এপার বাংলার মুসলমান সমাজে যে একটু সাহিত্যিক-জাগরণ ঘটেছিল, সে ওই জাগরণ বা কাফেলা-র সূত্রে। কে বলতে পারে, জাগরণ-এর আশ্রয় না পেলেও আব্দুল জব্বার এর ইলিশ মারির চর প্রকাশের মুখ দেখতো। আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস উপযুক্ত সাহিত্য পত্রিকা না থাকায় পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমান সমাজে সাহিত্য-প্রতিভার বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।
অবশ্যই আমাদের এই বিশ্বাসের বিপরীতে অনেক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যেতে পারে। মুসলমান সমাজ সম্পাদিত বা পরিচালিত সাহিত্যপত্রিকা না থাকলেও এমনিতে এপার বাংলায় সাহিত্য পত্রিকার অভাব নেই। মুসলমান লেখকরা চাইলে এইসব পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করতেই পারেন। এমন মনে করা মোটেই অযৌক্তিক কিছু নয়। কিন্তু মনে রাখ তে হবে, যুক্তির পারম্পর্য সত্যের শেষ মাপকাঠি নয়। এর বাইরেও থাকে আরও কোনো সত্য এবং সে সত্যই কার্যক্ষেত্রে প্রায় শেষকথা হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। অমুসলমান সমাজ সম্পাদিত, পরিচালিত পত্র-পত্রিকায় মুসলমান লেখ কদের উপস্থিতি নগণ্য প্রায়। কেন এই স্বল্পতা! একটা সহজ কথা ততোধিক সহজ করে বলা যেতে পারে এবং অনেকেই সেকথা বলতে কলকণ্ঠ হয়েছেন বারেবারে। মুসলমান সমাজের মধ্যে প্রতিভাবান লেখকের স্বল্পতা রয়েছে তাই তাদের লেখা মূল ধারার পত্রিকায় সেভাবে স্থান পায় না। কথাটা কোথাও কোথাও সত্যের অর্ধাংশ মাত্র; স্থানে স্থানে এক তৃতীয়াংশের বেশি নয় কিছুতেই। অর্থাৎ গুণমাণের অভাবের জন্য মুসলমান লেখকদের রচনা অমুসলমান সমাজ সম্পাদিত-পরিচালিত পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না, একথা সর্বাংশে ঠিক নয়। পরিসমখ্যান নিলে দেখা দেখা যাবে, মুসলমান কবি-সাহিত্যিক রচিত এমন অসংখ্য রচনা অবিবেচিত হয়েছে সম্পাদকমণ্ডলী কর্তৃক যেসব রচনার সমতুল বা নিম্নমানের অনেক রচনা প্রকাশের জন্য মনোনীত হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগারে ফেলে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তার মূল্যমান নির্ধারণ করা যাবে, সাহিত্য ঠিক এমন বিষয় নয়। কাজেই এই কবিতাটা অমুক কবিতার থেকে ভাল বা সমমানের এটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করার নয়। তাই অপ্রামাণিত থেকে যায় এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য। তবে এই বক্তব্যের সপক্ষে অন্য একটি উদাহরণ পেশ করা যেতে পারে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে সাহিত্যসাধক চরিতমালা। অদ্যাবদি এই চরিতমালা সিরিজে প্রায় দুই শতের। মতো বাঙালি লেখকের জীবন ও সাহিত্যকৃতির কথা বিধৃত হয়েছে। এদিকে এই দুই শত জনের মধ্যে মুসলমান সমাজের মধ্যে থেকে স্থান হয়নি দশ জনেরও। আমরা আগেই বলেছি, উত্তর সাতচল্লিশ পর্বে বাঙালি মুসলমান সমাজে সাহিত্য ও সাহিত্যিক এর অভাব ছিল। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তাঁদের মধ্যে থেকে বিশ ত্রিশ জনকে বেছে নেওয়া যেত না। সাহিত্যসাধক রচিতমালায় এমন অনেককে স্থান দেওয়া হয়েছে প্রতিভার দিক থেকে যাঁরা চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণির। সাধারণে তাঁদের নাম পর্যন্ত সেভাবে শোনেননি, জানেন না। এঁরা যদি সাহিত্য সাধক রচিতমালায় স্থান পেতে পারেন তবে অনুরূপ নাম মুসলমানদের মধ্যে অজস্র রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বন্দে আলি মিঞা, গোলাম মোস্তফা, ফজলল করিম প্রমুখের নাম করা যায়। এঁরা কেউ কিন্তু স্থান পাননি এখানে; খুবসম্ভব তাঁদের কথা কোনোদিন বিবেচনার মধ্যেও আনা হয়নি। এই না আনাটা কতটা ভুল বা অযৌক্তিক তা নিয়ে অবশ্য কথা চলতে পারে।
আমাদের মতে, এটা নিছকই একটা ভুল। এর উপর অনৈতিকতার চাদর চড়াতে চাওয়া খুব যুক্তিযুক্ত নয়। আসলে মানুষ মাত্রই সীমাবদ্ধতার বাঁধনে আবদ্ধ। এক্ষেত্রে ঐকান্তিক প্রচেষ্টার সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে যে যতটা উপরে উঠতে পারেন তিনি ততটা বড়ো হন। আমরা অধিকাংশজনই এই বড় হওয়ার লক্ষ্যে খুব দক্ষতা দেখাতে পারি না। আমরা মোটের উপর মধ্যমানের মানুষ হয়েই থেকে যাই। সংবাদপত্রের সম্পাদকরাও তার ব্যতিক্রম নন। উদ্ভূত অবস্থার সাপেক্ষে মুসলমান লেখ কদের উপর তাঁদের সহজাত একটু বীতরাগ থেকেই যায়। ফলত, তাদের লেখার প্রতি সবসময় ঠিক সুবিচার করা সম্ভব হয় না তাঁদের পক্ষে। এতে মুসলমান লেখকদের আত্মপ্রকাশে সমস্যা হয়। এক্ষেত্রে কখনো কখনো সমস্যা আবার অন্য দিকেও বাঁক নেয়।
কম বেশি সহস্রাব্যাপী এই বঙ্গে হিন্দু-মুসলমানের পাশাপাশি বাস। দীর্ঘ এই যাপিত জীবনের সিংহভাগ জুড়ে তেমন কোনো সমস্যা দেখা না গেলেও গত আড়াই শত বছরে অর্থাৎ উত্তর পলাশির যুদ্ধপর্বে পরিস্থিতির দারুণ অবনতি হয়েছে। হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় প্রবলভাবে পীড়িত হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার পীড়নে। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের প্রেক্ষিতে এই সাম্প্রদায়িকতার প্রকোপ বেড়েছে বই কমেনি। এমন অবস্থায় এই বঙ্গে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন অমুসলমান সমাজের কেউ কেউ প্রত্যক্ষা বা পরোক্ষভাবে প্রত্যাশা করেছে মুসলমান সমাজকে বেশ একটু অপদস্থ করতে। যে কোনো সমাজেরই কিছু ভাল ও মন্দের দিক থাকে। মুসলমান সমাজের ক্ষেত্রেও তা আছে। মুসলমান সমাজের এই নেতিবাচক দিক সমূহকে সামনে তুলে ধরে আত্মতৃপ্তির অন্য ভুবনে স্বপ্রতিষ্ঠ হতে চেয়েছে তারা। এক্ষেত্রে প্রায়শ তাদের আকাঙ্ক্ষার সীমা প্রসারিত হয়েছে এই বরাবর তারা চেয়েছে মুসলমান লেখকরা তাদের সমাজের বিচ্যুতির দিককে খুব করে তুলে ধরুক। তাদের এই চাওয়া অনুসারে যখন কোনো মুসলমান লেখক তাঁর কলমকে চালনা করেছেন তখন তাঁর লেখা প্রকাশ করা হয়েছে অতি গুরুত্বের সঙ্গে। কখনো কখনো এমনও হয়েছে, সাহিত্যমূল্য যৎসামান্য এমন সব রচনাকে শুধু বিষয়ের সাপেক্ষে ছেপে দেওয়া হয়েছে প্রথম শ্রেণির পত্র-পত্রিকায়। বলা বহুল্য, এর ফল হয়েছে মারাত্মক। বড়ো কাগজে লেখা বার হবে এই প্রলোভনের শিকার হয়ে নিজেদের সমাজ-দেহের উপর পিছন থেকে ছুরি বসিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি কেউ কেউ। অতঃপর এর পরিণতি যতটা খারাপ হওয়ার ততটাই হয়েছে। গুণমানহীন উদ্দেশ্য প্রণোদিত লেখার প্রতি ঝোঁক তৈরি হওয়ায় উদীয়মান লেখ করা সাহিত্যের নিত্য সত্যের অঙ্গন থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন নীরবে। জীবনে আর কখনো নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেনি; বিনষ্ট হয়েছে অসংখ্য প্রতিভা।
এ তো গেল একদিক; অন্যদিকের পরিণতি হয়েছে আরও মারাত্মক। এক সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক বিতর্ক-স্রোত মুসলমান সমাজের ভিতরে বাইরে বহমান রয়েছে প্রথমাবধি। ইসলামকে সংকীর্ণ অর্থে গ্রহণ করে এর ভুল ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইসলামি চেতনা ও বিশুদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চার মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠিত করতে খুবই সচেষ্ট থেকেছ একটা শ্রেণি। তারা তাদের মতাদর্শকে চাউর করে দিতে সমর্থ হয়েছে সমাজ-মনের বেশ অনেকটা অংশ জুড়ে। এতে করে সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে মুসলিম সমাজে বেশ একটা নেতিবাচক বোধ তৈরি হয়ে আছে। এক্ষেত্রে এই নেতিবাচকতার জাগরণে ও প্রসারে বিশেষ সহায়তা করেছে উক্ত সাহিত্যিক ও তাঁদের সৃষ্টি সমূহ। এইসব রচনায় ইসলামের বিকৃত উপস্থাপন দেখে সাহিত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে আরও বিরূপ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে সমাজের একটা অংশের মধ্যে। তারা নিজেরা যেমন এর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলতে চেয়েছে তেমনি অন্যকেও প্রভাবিত করেছে সে ব্যাপারে। এর বিপরীতে যে একটা শ্রেণি, যারা প্রথমাবধি ইসলাম ও সাহিত্য-সংস্কৃতির মধ্যে সুষ্ঠ মেলবন্ধনের লক্ষ্যে যত্নশীল ছিল তাদের চলার পথ অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়েছে এই প্রেক্ষিতে।
আমরা আগেই বলেছি, একজন সাহিত্যিকের আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সামাজিক সহায়তার কোনো বিকল্প নেই। উদ্ভূত পরিস্থিতির সাপেক্ষে মুসলমান লেখকদের জন্য এই সামাজিক সহায়তার আবহ নষ্ট হয়েছে বিশেষ ভাবে। স্বসমাজের লোকজনের কাছে তাঁরা সেভাবে গ্রহণযোগ্য হননি। এই অবস্থায় তাঁদেরকে আশ্রয় খুঁজতে হয়েছে প্রতিবেশী সমাজের কাছে। এই আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে তাঁকে হয়তো স্থানে স্থানে নিজের সঙ্গে সাংঘাতিক রকমের সমঝোতা করতে হয়েছে। নিজস্ব ক্ষেত্র থেকে সরে এসে বিষয় নির্বাচনের প্রশ্নে তাঁকে হয়তো সেই সব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হয়েছে, যা তাঁর সহজাত চেতনায় সিক্ত নয়; প্রতিবেশী সমাজের প্র্যতাশার উপযোগী হবে এমন সব বিষয়েকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। এতে তাঁর রচনার সজীবতা নষ্ট হয়েছে।
ওয়াকিবহাল মহল মাত্র জানেন, এই সমস্যাটা কমবেশি জায়মান রয়েছে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে যখন থেকে মুসলমান লেখকরা রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হয়েছে তখন থেকে। তবে উত্তর সাতচল্লিশ পর্বে বিষয়টা প্রকট রূপ নিয়েছে এই কারণে যে, তখন তঅখণ্ড বঙ্গদেশে আনুপাতিক হারে কম হলেও বিরাট সংখ ্যাধিক্যের সাপেক্ষে মুসলমান সমাজে একটা পাঠক সমাজ তৈরি ছিল। দেশভাগের পরে এই পাঠক সমাজের সিংহভাগটাই অতিক্রম করেছে সীমান্ত রেখা; তারা এখন ওপার বাংলায় স্বপ্রতিষ্ঠ। এপারে যারা রয়ে গেছে তারা ছিল সেদিনকার মুখ্যত কৃষক শ্রেণি। ওই কৃষক শ্রেণি কালে কালে আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নিজেদের কিছুটা সপ্রতিষ্ঠ করলেও এই সক্ষমতা এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। তারা হয়তো বেশ একটু লেখাপড়া শিখেছে, কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠাও পেয়েছে; কিন্তু তাদের সাংস্কৃতিক মননের জাগরণ ঘটেনি সেভাবে। অনুসন্ধান করলে মুসলমান সমাজে এমন হাজার উচ্চশিক্ষিত, কর্মজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত মানুষের দেখা মিলবে যারা হয়তো জীবনে ভালোবেসে একটিও গল্প বা উপন্যাসও পড়েননি; পেশাগত দায়বদ্ধতার নিরপক্ষে একটি বই কেনেনি কখনো। আরও সু ক্ষভাবে অনুসন্ধান করলে প্রতিপন্ন হবে, এই ধরণের মানুষের সংখ্যাই এখন পর্যন্ত সংখ্যায় বেশি। এমন অবস্থায়, এপার বাংলার মুসলমান সমাজে একজন লেখকের বিশেষভাবে ধ্বস্ত হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
কোনো সন্দেহ নেই, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমান সমাজে যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা আছে। এখন প্রশ্ন, এই প্রতিবন্ধকতার বেড়া ডিঙান যেতে পারে কোন পথে? বলা বাহুল্য, পথ এখানে সম্পূর্ণ সুনির্দিষ্ট নয়, আবার পুরোপুরি অনির্দিষ্টও নয়। তাই সম্ভাবনার পথ ধরে হাঁটা যেতে পারে অনেক দূর পর্যন্ত। তবে আমাদের মতে, এই সম্ভাবনা পথের দু পাশে এই মুহুর্তে যে জিনিষটি বিশেষ করে প্রতিস্থাপন করা করা দরকার তা হল উপযুক্ত পাঠক সমাজ গড়ে তোলা। মুসলমান সমাজে প্রতিভার অভাব নেই। উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে অনেকেই নিজেদেরকে দারুণ ভাবে মেলে ধরতে পারেন। পাঠকের দিক থেকে উপযুক্ত সংবেদন সঞ্চারিত হলে মুসলমান লেখকদের কলমে নিশ্চিতভাবে গতি আসবে; তাঁদেরকে তখন আর অন্যের হাল লাঙল ধার করে নিয়ে আর কারও জমিতে চাষ করতে হবে না; নিজস্ব ক্ষেত্রে মনের আনন্দে ফসল ফলাতে পারবেন। তবে মনে রাখ তে হবে, এই পাঠক সমাজ তৈরির বিষয়টা মোটেই সহজ কিছু নয়; এর জন্য প্রয়োজন বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো। মুসলমান সমাজে এখনও পর্যন্ত পকেটের পয়সা খরচা করে উপন্যাস বা গল্পের বই কিনে পড়া লোকের সংখ্যা যৎসামান্য। কাজেই পাঠ অভ্যাস তৈরি করার জন্য বইকে পৌঁছে দিতে হবে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। এর জন্য প্রয়োজন মতো প্রতিষ্ঠা করতে হবে ছোটো বড়ো ধরণের হাজারও লাইব্রেরি। সব লেখা প্রথমেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা যায় না; তার জন্য তাই দরকার অসংখ্য সাহিত্যি পত্রিকা; যেসব পত্রিকার অঙ্গনে উদীয়মান সাহিত্যিকরা নিজেদের মেলে ধরতে পারবেন উত্তমরূপে। মুসলমান সমাজের ব্যবস্থাপনায় এইসময়ে যে কিছু কিছু সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে না তা নয়, তবে গুণগত মানের নিরিখে তা মোটেই সন্তোষজনক নয়। প্রকাশিত ও বহমান এইসব পত্রিকার পাশাপাশি অন্তত একটি উচ্চ গুণমানসম্পন্ন মাসিক পত্রিকা অত্যাবশ্যক। একটা সময়ে কাফেলা যে ভূমিকায়। অবতীর্ণ হয়েছিল তদনুরূপ বা তারও থেকে অগ্রসর ভূমিকায় উপনীত হতে হবে কোনো একটি পত্রিকাকে।
এখন মুসলিম সমাজে এমন অনেক কবি-সাহিত্যিক রয়েছেন যাঁরা স্বসমাজের প্রতি মোটেই আস্থাশীল নন; তাঁরা ধরেই নিয়েছেন তাঁদের সমাজে তাঁদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং আগামী দিনেও তার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না; এমন অবস্থায় স্বসমাজ থেকে মোটের উপর মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের এই অবস্থান এমনিতে অন্যায় বা অযৌক্তিক নয় হয়তো, তবে তা কতটা সত্য-ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। শিল্প সাহিত্যের ইতিহাসে এমন উদাহরণ অজস্র রয়েছে যেখানে একজন স্রষ্টা সরাসরি তাঁর সমাজ-মনের সঙ্গে দ্রোহের সম্পর্কে সম্পৃক্ত হয়েছেন এবং এই দ্রোহের ফল শেষাবধি শুভ হয়েছে। তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যের অভিঘাতে ক্রমে ক্রমে সমাজ-মনে পরিবর্তনের ঢেউ উঠেছে; সূচনা হয়েছে নতুন প্রভাতের। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই যে নতুন প্রভাতের সূচনা হওয়া তাও কিন্তু কার্যকারণ সম্পর্ক নিরপেক্ষ বিষয় নয়। পর্যালোচনা করলে প্রতিপন্ন হবে, এক্ষেত্রে বিদ্রোহী ওই সাহিত্যিক ও তাঁর সৃষ্টিকে গ্রহণ করার জন্য সমাজ-মনের একটা অংশ ভিতরে ভিতরে প্রস্তুত হয়েছিল। ফলত ফল ফলেছিল কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়। আমাদের জ্ঞান-বিশ্বাস মতে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমান সমাজের ক্ষেত্রে এখনও সেই সময় আসেনি। সমাজ-মন এখনও নিতান্ত অপরিপক্ক। তাই এমন অপ্রস্তুত মাটিতে বিদ্রোহের বীজ বপন করা হলে হয় তা পুরোপুরি বিনষ্ট হবে, না হয় তীব্র পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। এমন বিনষ্টি থেকে নিজেদের মন ও মেধাকে হেফাজত করতে হবে উদীয়মান কবি-সাহিত্যিকদের। এমনও হতে পারে, তাঁরা কিছুতেই সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে পারছেন না। সেক্ষেত্রে তাঁদেরকে বেছে নিতে তৃতীয় কোনো পথ। যেখানে সমাজের সঙ্গে কোনো বিরোধ তৈরি হবে না; আবার শৈল্পিক মনের বিচ্ছুরণকেও কাঙ্ক্ষিত নির্মিতি দেওয়া যাবে। চেষ্টা করলে এই অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য খুব বেশি কসরৎ করতে না হওয়ারই নিকটা সম্ভাবনা। মনে রাখতে হবে, সমাজকে সংশোধন করতে হলে সমাজের মধ্যে থেকে, সমাজের ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে তা করতে হবে; বাইরে থেকে মৌচাকে ঢিল মারার মতো করে একটা কিছু ছুঁড়ে দিয়ে লাভের লাভ কিছু হবে না; তাতে বরং তিক্ততা আরও বাড়বে; কাঁটা বিছানো হবে ভবিষ্যৎ সাহিত্য-সংস্কৃতির পথে। এদিকে আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের অনেকের মধ্যেই এই প্রবণতা প্রধান্য পাচ্ছে। ফলত পরিস্থিতি জটিলতর হচ্ছে। সমস্যা আছে; রয়েছে সমাধানের সম্ভাব্য পথও। তবে সে সম্ভাবনা-পথে পথিকের সংখ্যা এখনও পর্যাপ্ত নয়। যে স্বল্প সংখ্যক মানুষ এই পথে পদবিক্ষেপ করার চেষ্টা করছেন তাঁদের ব্যক্তিগত দক্ষতা অনেকক্ষেত্রেই সন্তোষজনক নয়। ফলত তাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাও সেভাবে ফলপ্রসূ হচ্ছে না। এখন তাই ধীরে চল নীতি অনুসরণ করতে হবে। ধীরে ধীরে ভিতর থেকে গঠন করে তুলতে হবে সমাজ-মনকে; অপেক্ষা করতে হবে সেই শুভদিনের জন্য সেদিন আমরা যে কোনো বিরুদ্ধ মতাদর্শকে গ্রহণ ও আত্মস্থ করার জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠবো। যতদিন তা না হচ্ছে ততদিন আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত সত্যের সঙ্গে আপোষ করা বাঞ্ছনীয় বলে মনে হয়।
(লেখক আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক)





