
লেখক: সেখ আনিসুর
বিশ্বায়ন-পরবর্তী পৃথিবীতে পশ্চিমা বিশ্বের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রমাগত ডিজিটালাইজেশন, ব্যক্তির স্বাধীনতার প্রাধান্য এবং স্বেচ্ছাচারিতা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি মানুষ, বিশেষ করে যুবসমাজ, ক্রমশ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মসমূহ এক নতুন জগতের সৃষ্টি করেছে, যেখানে মানুষ আপাতদৃষ্টিতে অনেক বেশি সংযুক্ত মনে হলেও বাস্তব জীবনে তারা ভীষণভাবে একাকী। এই একাকীত্বে ভুগতে ভুগতে মানুষ ধীরে ধীরে নিরাপত্তাহীনতায় আক্রান্ত হয়। এই নিরাপত্তাহীনতা শুধু দৈহিক নয়, বরং মানসিকও।
অপরদিকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ক্যারিয়ার, পড়াশোনা এবং দীর্ঘমেয়াদি জীবনরূপরেখা–এসব বিষয় যুবসমাজের মধ্যে এক ধরনের অস্তিত্বগত নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাদের মনে প্রশ্ন জাগে–“আমার কী হবে?”, “আমি কি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব?”–এ ধরনের প্রশ্নগুলো তাদের মানসিকভাবে অস্থির করে তোলে। দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের চিন্তাভাবনা লালন করতে করতে একসময় মানুষ নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন ধরনের অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার তাদের পুরো জীবনকে গ্রাস করতে শুরু করে।
এই সমস্ত সমস্যার জন্য যেমন আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামো দায়ী, তেমনি সমানভাবে দায়ী আধ্যাত্মিক চর্চার ক্রমাগত অধঃপতন। আমরা দেহের চাহিদা পূরণ করতে করতে রূহের কথা ভুলে যাচ্ছি। অথচ রূহের চর্চা ও তার সঠিক বিকাশ আমাদের বাস্তব জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। রূহানিয়াতের উন্মেষের মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধানে আল্লাহ তা’আলার সাহায্য লাভের জন্য অধিকতর যোগ্য হয়ে উঠতে পারি। আর এই আধ্যাত্মিক চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো সকাল-সন্ধ্যার যিকির।
সকাল ও সন্ধ্যার যিকির (আযকার) সম্পর্কে কুরআনে একাধিক আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর স্মরণে নিয়োজিত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা কুরআনের মধ্যে বলছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
অর্থ:“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো, এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করো।”(আল কুরআন)
وَاذْكُرْ رَّبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُوْنَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُوِّ وَالْأَصَالِ وَلَا تَكُنْ مِنَ الْغَفِلِينَ
“আর আপনি আপনার রব্বকে স্মরণ করুন মনে মনে, মিনতি ও ভীতিসহকারে, অনুচ্চস্বরে; সকালে ও সন্ধ্যায়। আর উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।”(আল কুরআন)
এই আয়াতের দ্বারা এই কথায় প্রমাণ হয় যে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের খাঁটি বান্দা যারা তারা জিকিরের মধ্যে নিজেদেরকে আবদ্ধ থাকার প্রচেষ্টা চালায়। এবং তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জিকিরের ক্ষেত্রে উদাসীন নয়। আর যারা উদাসীন হয় তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের খাঁটি বান্দা হওয়ার প্রচেষ্টার পথ থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করছে।
তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি তার রবের যিকির (স্মরণ) করে, আর যে ব্যক্তি তার রবের যিকির করে না- তারা যেন জীবিত আর মৃত।”(বুখারী, ফাতহুল বারীসহ ১১/২০৮)
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, “আমি কি তোমাদেরকে তা জানাবো না- আমলের মধ্যে যা সর্বোত্তম, তোমাদের মালিক (আল্লাহর) কাছে যা অত্যন্ত পবিত্র, তোমাদের জন্য যা অধিক মর্যাদা বৃদ্ধিকারী, (আল্লাহর পথে) সোনা-রূপা ব্যয় করার তুলনায় যা তোমাদের জন্য উত্তম এবং তোমরা তোমাদের শত্রুদের মুখোমুখি হয়ে তাদেরকে হত্যা এবং তারা তোমাদের হত্যা করার চাইতেও অধিকতর শ্রেষ্ঠ?” সাহাবীগণ বললেন, অবশ্যই হ্যাঁ। তিনি বললেন, “আল্লাহ্ তা’আলার জিকির।”(তিরমিযী ৫/৪৫৯, নং ৩৩৭৭)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, “আল্লাহ তা’আলা বলেন: আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেরূপ ধারণা করে, আমাকে সে তদ্রূপই পাবে, আর যখন সে আমাকে স্মরণ করে, তখন আমি তার সাথে থাকি। সুতরাং যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে, আমিও আমার মনে তাকে স্মরণ করি। আর যদি সে কোনো সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তাহলে আমি তাকে এর চাইতে উত্তম সমাবেশে স্মরণ করি। আর সে যদি আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ নিকটবর্তী হয়, তাহলে আমি তার দিকে এক হাত পরিমাণ নিকটবর্তী হই। সে এক হাত পরিমাণ নিকটবর্তী হলে আমি তার দিকে এক বাহু পরিমাণ নিকটবর্তী হই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দ্রুতবেগে যাই।”(বুখারী ৮/১৭১, নং ৭৪০৫)
দৈনন্দিন জিকির গুলো শুধু আমল নয়–এগুলো একজন মুমিনের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এক ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা (protection system)। এই বাস্তবতাকে আরও সহজভাবে বোঝার জন্য আমরা একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করতে পারি। একটি দেশ বা রাষ্ট্র তখনই তার জনগণের জন্য নিরাপদ হয়, যখন সেই দেশের সরকার দেশকে অভ্যন্তরীণভাবে বিপদমুক্ত রাখে এবং বাহ্যিক শত্রুদের হাত থেকে দেশকে সুরক্ষিত করে। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে যেমন সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করতে হয়, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনিক কাঠামোকেও মজবুত করতে হয়। আমাদের সমগ্র অস্তিত্বকেও আমরা এভাবে দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। আমাদের একটি অভ্যন্তরীণ দিক রয়েছে এবং একটি বাহ্যিক দিক রয়েছে। অভ্যন্তরীণ দিকটিকে আমরা আধ্যাত্মিক সত্তা বলতে পারি, আর বাহ্যিক দিক থেকে আমরা নিজেদের রক্ত-মাংসের শরীর হিসেবে দেখতে পারি।
এই দুই ধরনের অস্তিত্ব নিয়ে গঠিত মানুষের বিভিন্ন ধরনের শত্রু রয়েছে। কিছু শত্রু মানুষের আধ্যাত্মিক সত্তার ক্ষতি করে, আবার কিছু শত্রু মানুষের শারীরিক ক্ষতি সাধন করে। এ ধরনের শত্রুদের তালিকায় সর্বপ্রথম শয়তানকে রাখতে হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শয়তানকে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এছাড়াও বদনজর, হিংসুকের কুদৃষ্টি এবং প্রতিটি পাপকর্ম মানুষের জন্য এক একটি শত্রু হিসেবে বিবেচিত।
প্রত্যেকটি পাপকর্মের মাধ্যমে মানুষের হয় তার শরীর, নয়তো তার আধ্যাত্মিক সত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আধ্যাত্মিক ও শারীরিক–এই দুই সত্তা পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। আমাদের আধ্যাত্মিক সত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শরীরের ওপর পড়ে, আবার শরীর যদি সতেজ ও সুস্থ না থাকে, তাহলে আমাদের আধ্যাত্মিক সত্তাও দুর্বল হয়ে পড়ে। আর এই উভয় প্রকার ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে আমাদের, বিশেষ করে তরুণ বয়সে, সকাল-সন্ধ্যার যিকিরে অভ্যস্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বলেছেন–
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
“তুমি নিজেকে তাদের সঙ্গেই দৃঢ় রাখো, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে ডাকে, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। আর তুমি দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিও না। আর তুমি এমন ব্যক্তির আনুগত্য করো না, যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করেছে।”(আল কুরআন)
এই আয়াতের মাধ্যমে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা শুধু যিকিরের দিকেই আমাদের মনোনিবেশ করতে বলেননি, বরং একই সঙ্গে আমাদের সঙ্গী বা বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
সকাল-সন্ধ্যার যিকিরের উপকারিতা ও আমল
সকাল-সন্ধ্যার যিকিরের মধ্যে মূলত আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তাঁর নাম স্মরণ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পেশ করা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দরুদ পাঠ করা শুধুমাত্র সকাল-সন্ধ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং একজন মুসলমান হিসেবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। বর্তমানের এই বিশৃঙ্খল পরিবেশে, যেখানে প্রায় সব কাজকর্মই একপ্রকার ইঁদুর দৌড়ে পরিণত হয়েছে, সেখানে দৈনন্দিন নির্দিষ্ট একটি সময়ে কিছু পরিমাণ দরুদ পাঠ করা আমাদের জীবনে প্রশান্তি এনে দিতে পারে।
দৈনন্দিন যিকিরের তালিকায় সর্বপ্রথম গুরুত্ব পায় আয়াতুল কুরসি। হাদিসে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে: “যে ব্যক্তি সকালে তা পাঠ করবে, সে বিকাল পর্যন্ত জিন-শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয়ে থাকবে; আর যে ব্যক্তি বিকালে তা পাঠ করবে, সে সকাল পর্যন্ত জিন-শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয়ে থাকবে।”
সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি সকাল ও সন্ধ্যায় এই তিনটি সূরা পাঠ করবে, তার জন্য তা সব কিছুর নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে।”
সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি সকাল বা সন্ধ্যায় এটি (সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার) অর্থ বুঝে দৃঢ় বিশ্বাসসহকারে পাঠ করবে, আর সে ঐ দিন বা রাতে মৃত্যুবরণ করে–তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে সকাল-সন্ধ্যার যিকিরের মাধ্যমে আমরা পুরো দিনের জন্য বরকত, হিদায়াত ও কল্যাণ প্রার্থনা করতে পারি। যেমন–
أَمْسَيْنَا وَأَمْسَى الْمُلْكُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَ هَذِهِ اللَّيْلَةِ: فَتْحَهَا، وَنَصْرَهَا، وَنُورَهَا، وَبَرَكَتَهَا، وَهُدَاهَا، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا بَعْدَهَا
অর্থ: “আমরা সন্ধ্যায় উপনীত হয়েছি, এবং সমগ্র রাজত্বও আল্লাহর জন্য সন্ধ্যায় উপনীত হয়েছে, যিনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এ রাতের কল্যাণ কামনা করি–এর বিজয়, সাহায্য, নূর, বরকত ও হিদায়াত। আর আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই এ রাতের অকল্যাণ এবং এর পরবর্তী অকল্যাণ থেকে।”
একই সঙ্গে আমরা আমাদের পরিবার, সম্পদ ও দেহের সুরক্ষাও তাঁর কাছে চাইতে পারি। বিশেষ করে, আমাদের যে ভালো গুণাবলী রয়েছে, সেগুলো যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়–তার জন্যও আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারি। জ্ঞান, সুন্দর আচরণসহ নানা ধরনের উত্তম গুণাবলী মানুষের হিংসা ও কুদৃষ্টির কারণে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি বদনজর মানুষকে চরম ক্ষতির সম্মুখীন করতে পারে। এসব বিষয় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমরা সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করতে পারি। যার একটি নমুনা হলো–
اللَّهُمَّ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ، فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، رَبَّ كُلِّ شَيْءٍ وَمَلِيكَهُ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ نَفْسِي، وَمِنْ شَرِّ الشَّيْطَانِ وَشِرْكِهِ، وَأَنْ أَقْتَرِفَ عَلَى نَفْسِي سُوءًا، أَوْ أَجُرَّهُ إِلَى مُسْلِمٍ
অর্থ: “হে আল্লাহ! হে গায়েব ও উপস্থিতের জ্ঞানী, হে আসমানসমূহ ও জমিনের স্রষ্টা, হে সব কিছুর রব ও মালিক! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া কোনো হক ইলাহ নেই। আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই আমার নফসের অনিষ্ট থেকে, শয়তানের অনিষ্ট ও তার শির্ক থেকে, এবং এ থেকেও যে আমি নিজের ওপর কোনো অন্যায় করি অথবা তা কোনো মুসলিমের দিকে টেনে নিয়ে যাই।”
এছাড়াও চোখের হেফাজত, কানের হেফাজত, শরীরের হেফাজত, ইসলামের উপর অটল থাকার তাওফিক লাভ এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য বিভিন্ন দোয়া ও কুরআনের আয়াত এই সময় তিলাওয়াত করা যেতে পারে। বিশেষভাবে আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস; “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি” ১০০ বার, “আস্তাগফিরুল্লাহ” ১০০ বার–এবং হিসনুল মুসলিম-এ বর্ণিত দোয়াগুলো আমরা এ সময় পাঠ করতে পারি।
সকাল-সন্ধ্যার যিকিরের সময়
আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি হাদীসটিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মারফু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, “কোনো গোষ্ঠী যারা যিকির করছে, তাদের সাথে ফজরের সালাতের পরে সূর্য উঠা পর্যন্ত সময় বসা আমার কাছে ইসমাঈলের বংশধরদের চার জন দাস মুক্তির থেকেও বেশি প্রিয়। অনুরূপভাবে কোনো গোষ্ঠী যারা যিকির করছে, তাদের সাথে আসরের সালাতের পরে সূর্য ডুবা পর্যন্ত সময় বসা আমার কাছে চার জন দাস মুক্তির থেকেও বেশি প্রিয়।”(আবু দাউদ, নং ৩৬৬৭)।
সকাল-সন্ধ্যার যিকিরের একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। আমরা সকালে যিকিরগুলো ফজরের নামাজের পর থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত সম্পন্ন করতে পারি, এবং এ বিষয়ে আলেমদের বিশেষ তাগিদ রয়েছে। এর পরে পড়া যাবে না–এমনটি নয়, এক্ষেত্রে আলেমদের মতামত–পড়া যাবে। তবে এই সময়টিই যিকিরের জন্য সর্বোত্তম।
সন্ধ্যার যিকির আমরা আসরের ওয়াক্তের পর থেকে মাগরিবের ওয়াক্তের আগে পর্যন্ত আদায় করতে পারি। এখানে নামাজের সময়ের চেয়ে ওয়াক্ত অনুযায়ী চলা আরও উত্তম। অর্থাৎ, আসরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর থেকে মাগরিবের ওয়াক্ত প্রবেশের আগ পর্যন্ত আমরা সন্ধ্যার আযকার পড়তে পারি। অন্যান্য দোয়ার তুলনায় এই দোয়াগুলোর নির্দিষ্ট সময় কিছুটা আলাদা। তবে যদি আমরা নির্দিষ্ট সময়ে সবসময় পড়তে সক্ষম না-ও হই, তবুও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে–অন্যান্য সময়েও যিকিরকে আঁকড়ে ধরার।
পরিশেষে
বর্তমান তরুণ প্রজন্মের নানাবিধ সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে সহবত (সৎ সঙ্গ) ও যিকির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অধিকাংশ আলেমের মতামত হলো–যারা নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার যিকিরে অভ্যস্ত, তাদের জীবনের মানসিক ও গভীর সমস্যাগুলোর সমাধান তুলনামূলক দ্রুত হয়ে যায়। পাশাপাশি তারা অন্যান্য মানুষের তুলনায় আল্লাহর প্রতি অধিক ভরসাশীল হয়ে ওঠে।





