
সম্পাদকীয়
আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যেখানে মানুষ প্রযুক্তিগতভাবে যত উন্নত হচ্ছে, মানসিক ও আত্মিকভাবে ততটাই ভেঙে পড়ছে। চারপাশে অভূতপূর্ব সুযোগ, অসংখ্য সংযোগ, সীমাহীন ভোগের আয়োজন, তবুও মানুষের হৃদয়ে শান্তি নেই। মানুষ হাসছে, কথা বলছে, স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে; অথচ ভিতরে ভিতরে এক গভীর শূন্যতা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। আধুনিক সভ্যতা মানুষকে অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে হৃদয়ের প্রশান্তি, আত্মার স্থিরতা এবং সৃষ্টিকর্তার সাথে জীবন্ত সম্পর্কের অনুভূতি।
আজকের পৃথিবীতে অস্বাভাবিক জিনিসগুলোই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে- ভোগবাদ, পর্নোগ্রাফির স্বাভাবিকীকরণ, অনলাইন হিংসা, রাজনৈতিক বিদ্বেষ, পরিবার বিচ্ছিন্নতা, ডোপামিন-নির্ভর জীবন ইত্যাদি। অন্যায় দেখে আমরা আর বিচলিত হই না, অবিচার আমাদের আর নাড়া দেয় না, অনৈতিকতা এখন বিনোদনের অংশ হয়ে গেছে। আজকের সভ্যতা মানুষকে অভূতপূর্ব সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তাকে ভোগবাদী করে তুলছে। ধীরে ধীরে মানুষ নিজেই এক ভোগের যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, রাষ্ট্র-সবকিছু যেন মানুষকে তার প্রকৃত পরিচয় ভুলিয়ে দিতে ব্যস্ত। মানুষ এখন আর “আমি কে?”- এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে না; বরং “আমি কীভাবে আরও বেশি অর্জন করতে পারি?”-এই প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
মানুষ মূলত এক নৈতিক সত্তা সম্বলিত সৃষ্টি। এই নৈতিক দিককে অবহেলা করে মানুষ না নিজে ভালো হতে পারে আর না গড়তে পারে শান্তিপূর্ণ সমাজ। আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষকে স্বাধীন করে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এই স্বাধীনতা মূলতা এক মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আর তা হলো- মানুষকে পরীক্ষা করা। এই জন্য তাকে জোর করে আল্লাহতে বিশ্বাসী করা যায় না। সে চাইলে আল্লাহ্ তবে বিশ্বাস করবে, চাইলে অন্য কিছুতে করবে বা কিছুতেই করবে না। এসবগুলো তার এক্তিয়ারের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, এই স্বাধীনতা পরিণামহীন স্বাধীনতা নয়। মানুষ যা এখতিয়ার করবে তার পরিণতি তাকে ভোগ করতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ কোনো ভোগকারী সত্তা নয়, বরং সে পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা, নৈতিক দায়িত্ববাহী এক সত্তা।
ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনার ছাড়িয়ে গিয়ে সামগ্রিকভাবে মানুষের মাঝে রয়েছে এক সামাজিক বোধের ধারণা। এর জন্য প্রয়োজন একে-অপরকে জানা। একটা সমাজের মৌলিকভাবে ভালো এবং মন্দের ব্যাপারে সামগ্রিক বোঝাপড়া নিয়ে খুব একটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। শাখা-প্রশাখাগত বিষয়গুলোতে ভিন্নতা থাকতেই পারে, বরং বলা ভালো যে, এই ভিন্নতা মানবীয় সত্তার সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ। এটাকে ভালোভাবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। মুসলিম সমাজের মাঝেই এই ভিন্নতা প্রথমে বুঝে নিতে পারলে, বৃহত্তর সমাজের সাথে আলাপে যেতে সুবিধা হবে। এবং এই আলাপ আজকের দিনে অত্যান্য জরুরি হয়ে পড়েছে। সহিংস-বিদ্বেষ, এবং বিভিন্ন অনৈতিক কার্যক্রমের মোকাবেলায় এই আলাপ নৈতিক সংলাপ, আন্তঃসম্প্রদায়িক সহযোগিতা, মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সামাজিক ঐক্য- ছাড়া খুব বেশি দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়ে উঠবে না। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো এমন একটি নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে তরুণরা কুরআনিক মূল্যবোধের আলোকে নিজেদের গড়ে তুলবে, পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি করবে এবং সমাজে ন্যায়, সংযম ও মানবিকতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
আমাদের সামনে যখন এটা দিনদিন প্রকট হয়ে উঠছে যে, নৈতিকতার গন্ডি পেরিয়ে মানুষ সব ধরনের অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে এবং এ নিয়ে কেউ যেন সিরিয়াস হতে চাইছে না, তখন একজন মুসলিম হিসেবে আমাদেরকে কুরআনের আহবানের দিকে ফিরে যেতে হবে। আমাদের কার্যক্রম অন্য কোনো মানুষের আচরণ দ্বারা যেন প্রভাবিত না হয়ে যায়। পবিত্র কুরআন যে নীতিমালা আমাদেরকে দেয় এবং নবীজি মুহাম্মাদ (সাঃ) যেভাবে সেই নীতিমালা অনুসরণ করে আমাদের সামনে যে উৎকৃষ্ট উদাহরণ রেখে গেছেন সেই পথেই আমাদের মুক্তি লুকিয়ে রয়েছে।
দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতই আমাদের রাজ্যেও রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় আদর্শগত বিভাজন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এমন সময়ে মুসলিমদের জন্য নিজেদের নৈতিক অবস্থান ও কুরআনিক মূলনীতি আরও গভীরভাবে বোঝা জরুরি। আদর্শগত দ্বন্দ্ব থাকার ফলে আমাদের জন্য এটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা এই বিষয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস হয়ে আমাদের মূলনীতি বুঝবো। এই মূলনীতির আলোকে নিজেদেরকে ঢেলে সাজাতে হবে। পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লেই বোঝা যায় যে, আমাদের অবস্থান কত স্পষ্ট। পবিত্র কুরআন মুসলিমদের নৈতিক অবস্থানকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে:
“হে ঈমানদারগণ!……..আর দেখো, একটি দল তোমাদের জন্য মসজিদুল হারামের পথ বন্ধ করে দিয়েছে, এ জন্য তোমাদের ক্রোধ যেন তোমাদেরকে এতখানি উত্তেজিত না করে যে, তাদের বিরুদ্ধে তোমরা অবৈধ বাড়াবাড়ি করতে শুরু কর। নেকী ও আল্লাহভীতির সমস্ত কাজে সবার সাথে সহযোগিতা করো এবং গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে কাউকে সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে ভয় করো। তাঁর শাস্তি বড়োই কঠোর।” (আল-কুরআন, ৫: ২)
এই আয়াত আমাদেরকে শেখায় যে, একজন মুসলিমের নৈতিক অবস্থান প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং নীতিনিষ্ঠ। অন্যের অন্যায় আমাদেরকে সীমালঙ্ঘনের অনুমতি দেয় না। বরং ন্যায়, সংযম ও সহযোগিতাই ইসলামের পথ।
‘আদল’ ইসলামী নৈতিকতার কেন্দ্রীয় ভিত্তিগুলোর একটি। ইসলাম শুধু ব্যক্তির মাঝে নয়, বরং ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সহ জীবনের সব পরিসরে এই আদর বা সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এর জন্য অন্য কারো ভুলকে আরেক ভুলের মাধ্যম দিয়ে ন্যায়সংগত প্রমাণ করার ইসলামের নীতি নয়। কারো ভুল আচরণ যেন আমাকে অবিচার করার জন্য উদ্বুদ্ধ না করে।
বিবেক সম্পন্ন মানুষ প্রতিটি সমাজে আছে। সমস্যা হলো, তাঁরা একে-অপরের সাথে জুড়ে নেই বা থাকলেও তা দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। কুরআন আমাদেরকে সৎকাজে এবং আত্ম-সংযমের কাজে একে-অপরকে সাহায্য এবং সহযোগিতার জন্য উদ্বুদ্ধ করে।
আজ প্রয়োজন এমন এক নৈতিক জাগরণ, যেখানে বিবেকবান মানুষ একে-অপরের সাথে যুক্ত হবে, যেখানে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা, বিদ্বেষের পরিবর্তে ন্যায় এবং ভোগবাদের পরিবর্তে তাকওয়া সমাজের ভিত্তি হয়ে উঠবে। কোরানের আহ্বান আমাদেরকে সেই পথেই ডাকছে–সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো।





