
লিখেছেন: ড. রিজওয়ান রফিকী
মানবজীবনের প্রকৃত সফলতা কিসে? ধন-সম্পদের প্রাচুর্য, ক্ষমতার দাপট, নাকি বাহ্যিক ইবাদতের আড়ম্বর? ইসলামের দৃষ্টিতে সফলতার সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক জুমার খুতবায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি ঐতিহাসিক হাদিসের আলোকে মানবচরিত্রের পরিশুদ্ধি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য রূপরেখা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
একদা আল্লাহর রাসুল (সা.) মসজিদে নববীতে সাহাবাদের মাঝে উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি সাহাবীদের সম্বোধন করে বললেন, “আমার কাছে পাঁচটি কথা আছে। তোমাদের মধ্যে কে এই কথাগুলো নিজের জীবনে আমল করবে এবং অন্যদের কাছে পৌঁছে দেবে?” হযরত আবু হুরায়রা (রা.) অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে নিজেকে পেশ করলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) পরম মমতায় তাঁর হাতটি নিজের হাতের মধ্যে নিলেন এবং আঙুলে গুনে গুনে মানবজাতির কল্যাণে পাঁচটি অমূল্য উপদেশ দিলেন। বর্তমান ঘুণে ধরা সমাজের অবক্ষয় রোধে এই উপদেশগুলো আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
১. হারাম বর্জন: প্রকৃত ইবাদতের মূল ভিত্তি
আমাদের সমাজে অনেক সময় ‘আবিদ’ বা ‘জাহিদ’ বলতে কেবল তাকেই ভাবা হয়, যিনি দিন-রাত তাসবীহ জপেন বা নফল ইবাদতে মগ্ন থাকেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম উপদেশ ছিল—সমস্ত হারাম ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখা। এটিই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইবাদত।
নির্জনে বা একাকীত্বে গুনাহ বর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। হাদিসের সতর্কবাণী অনুযায়ী, কেয়ামতের দিন বহু মানুষ ওহুদ পাহাড় সমপরিমাণ নেকি নিয়ে হাজির হবে, যারা রাতে নফল নামাজও পড়ত। কিন্তু নির্জনে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে গোপনে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে তাদের সমস্ত আমল ধূলিকণার মতো উড়ে যাবে।
তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ফরায়েজের পাশাপাশি দৃষ্টির হেফাজত ও আত্মশুদ্ধি অর্জন করা জরুরি।
২. অল্পে তুষ্টি: মানসিক সমৃদ্ধির আসল চাবিকাঠি
আজকের পুঁজিবাদী বিশ্বে মানুষ সম্পদের পেছনে অন্ধের মতো ছুটছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ যা বণ্টন করেছেন, তার ওপর সন্তুষ্ট থাকাই হলো প্রকৃত ধনী বা অভাবহীন হওয়ার উপায়। সম্পদ বা আসবাবপত্রের আধিক্য আসল ধন নয়, মনের সচ্ছলতাই আসল ধন।
বিশ্বনবীর (সা.) নিজের জীবনই ছিল এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। খসখসে চাটাইয়ে শোয়ার কারণে তাঁর পিঠে দাগ বসে যেত। হযরত ওমর (রা.) তা দেখে কেঁদে ফেললে নবীজি বলেছিলেন, “এই দুনিয়াতে আমাদের উদাহরণ তো সেই মুসাফিরের মতো, যে ক্ষণিকের জন্য গাছের ছায়ায় বসে আবার পথ চলা শুরু করে।”
জাগতিক বিষয়ে সর্বদা নিজের চেয়ে নিচের স্তরের মানুষের দিকে তাকালে আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা বাড়ে এবং অন্তরে শান্তি আসে।
৩. প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা: ঈমানের কষ্টিপাথর
ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তৃতীয় উপদেশ ছিল প্রতিবেশীর সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা। যার আচরণ বা অন্যায় থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, সে কখনো পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারে না।
ওহীর ফেরেশতা হযরত জিবরাইল (আ.) প্রতিবেশীর অধিকারের ব্যাপারে রাসুল (সা.)-কে এত বেশি জোর দিতেন যে, সাহাবারা মনে করতেন, হয়তো প্রতিবেশীকে সম্পত্তির অংশীদার বা ওয়ারিশ বানিয়ে দেওয়া হবে।
আজকের শহুরে সমাজব্যবস্থায় যেখানে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের খবর নেওয়ার ফুসরত কারও নেই, সেখানে এই শিক্ষাটি পুনরুজ্জীবিত করা ভীষণ প্রয়োজন।
৪. পরার্থপরতা: আদর্শ সমাজের রূপরেখা
একজন মানুষ তখনই কামিল বা পূর্ণাঙ্গ মুসলমান হতে পারে, যখন সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অন্য মানুষের জন্যও তা-ই পছন্দ করে। এই পরার্থপরতা ও ভ্রাতৃত্ববোধই একটি অহিংস ও সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণ করতে পারে। অন্যের ভালো দেখে ঈর্ষান্বিত না হয়ে, মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করাই ইসলামের মূল চেতনা।
৫. পরিমিত আচরণ: অন্তরের সজীবতা রক্ষা
জীবনকে উপভোগ করার জন্য আনন্দ-রসিকতা বা মৃদু হাস্যের অবকাশ ইসলামে রয়েছে। স্বয়ং নবীজি (সা.) সাহাবাদের সঙ্গে মৃদু ও মার্জিত কৌতুক করতেন। কিন্তু অনর্থক ও অতিরিক্ত অট্টহাসি, ঠাট্টা-বিদ্রূপ মানুষের অন্তরের সজীবতাকে মেরে ফেলে এবং হৃদয়কে মৃত বা নিষ্ক্রিয় করে দেয়। তাই মানুষের সঙ্গে আচার-আচরণে পরিমিতিবোধ ও গাম্ভীর্য বজায় রাখা উচিত।
উপসংহার
বিশ্বনবী (সা.)-এর এই পাঁচটি উপদেশ কেবল তাত্ত্বিক কোনো দর্শন নয়, বরং বাস্তব জীবনে প্রয়োগের এক অনন্য পথনির্দেশিকা। আজকের যুবসমাজকে অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে হলে যেমন একদিকে বিবাহ সহজ করার মাধ্যমে দৃষ্টির হেফাজত নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি গুনাহ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে।
ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত এই কালজয়ী শিক্ষাগুলো ধারণ করতে পারলেই মানবজাতি ইহকালের শান্তি ও পরকালের পরম মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হবে।





