
লেখক: মুসান্না মুত্তাকী
ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলরেখা বরাবর ছোট্ট এক জনপদ – গাজা উপত্যকা। হাজার হাজার বছর ধরে মাথা উঁচিয়ে থাকা এই অঞ্চলকে দেখলে মনে হবে প্রকৃতি তার নিকৃষ্টতম রূপ নিয়ে অবলীলায় তাণ্ডব চালিয়েছে গোটা উপত্যকাজুড়ে। কিন্তু মানবসভ্যতার একটি ক্ষুদ্র অংশ এতটা নিষ্ঠুর প্রকৃতির হতে পারে তা উপত্যকার গাছপালা, জলপাইয়ের চারাগাছ থেকে তরমুজের বাগান, পশুপাখি, মাটি, বাতাস ও আবহাওয়া – সবাই টের পেয়েছে। বহিরাগত এক মহাদানবের নিঃশ্বাসে ঝলসে গেছে এই নগরী। সুন্দর, প্রাচুর্যময় ও সমৃদ্ধশালী জনপদ নিমেষেই পরিণত হয়েছে মৃত্যু উপত্যকায়।
কিন্তু এই উপত্যকা কখনো হার মানতে শেখেনি। এখানকার মানুষ অজেয় – তাদের ডিএনএ ও অস্থিমজ্জায় রয়েছে ইন্তিফাদার বীজ, নাড়িতে রয়েছে বিপ্লবের ঢেউ। প্রতিটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে তারা পুনর্জন্ম লাভ করে, আবারও আবির্ভূত হয়; নিমিষেই অদৃশ্য হয়ে পুনরায় দৃশ্যমান হয়। এ যেন রূপকথার ফিনিক্স পাখিদেরও হার মানাবে।
একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় গণহত্যা বা বলা ভালো, লাইভ স্ট্রিমিং হওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণহত্যা হল গাজার গণহত্যা। পৃথিবী অসংখ্য যুদ্ধ ও সংঘাত দেখেছে, কিন্তু এই গণহত্যা কোনো বিধানের তোয়াক্কা করেনি। যুদ্ধের সাধারণত কিছু নিয়ম রয়েছে – যার প্যাঁচেই বিশ্বযুদ্ধগুলো পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের আগ্রাসী মনোভাব আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আবাসিক ভবন থেকে কনসুলেট, স্কুল, লাইব্রেরি, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, গির্জা কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা শরণার্থী শিবির কোনোকিছুই ছাড়েনি।
গাজার গণহত্যা পরিবর্তন করেছে বিশ্বমত, নাড়া দিয়েছে বিশ্ববিবেক, প্রভাবিত করেছে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব গাজার গণহত্যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে:
গণহত্যার পটভূমি
আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে ইসরায়েল নামক কোনো রাষ্ট্র পৃথিবীর মানচিত্রে ছিল না। উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা ফিলিস্তিন অঞ্চল ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ জনপদ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয়দের পতন ঘটে, তারপর ফিলিস্তিনের মালিকানা চলে যায় ব্রিটেনের হাতে। সেই সময় সারা ইউরোপ জুড়ে চরম ইহুদি বিদ্বেষ এবং কোনঠাসা ইহুদি জাতির ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয়।
সুপরিকল্পিতভাবে শরণার্থীদের নিয়ে আসা হয় ফিলিস্তিনে। ধীরে ধীরে জনবিন্যাসের পরিবর্তন হতে থাকে। ইহুদিরা গোপন সন্ত্রাসী সংগঠন ইরগুন ও হাগানাহ গড়ে তোলে, যাদের প্রধান কাজ ছিল আরবদের ভীতসন্ত্রস্ত করা ও বসতি উচ্ছেদ করা। এরপর তৎকালীন সুপার পাওয়ার রাষ্ট্রগুলোর মদদে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয় এবং কয়েক লক্ষ ফিলিস্তিনিকে বিতাড়িত করে ‘নাকবা’র সূচনা ঘটে।
তারপর দিন যত গড়িয়েছে, ফিলিস্তিনিরা প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছে, স্বাধীনতার দাবি আরও জোরালো হয়েছে। দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে চলমান ইসরায়েল রাষ্ট্রের নিপীড়ন ও গণহত্যা, ফিলিস্তিনের মানচিত্র গ্রাস করা, নিয়মমাফিক রমজান মাসে পবিত্র আল-আকসা মসজিদে ধারাবাহিক আক্রমণের প্রতিবাদে এবং নিরীহ ফিলিস্তিনিদের মুক্তির দাবিতে ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর গাজার সেনাবাহিনী ‘তুফান আল-আকসা’ অভিযান শুরু করে। এরপরই ফিলিস্তিনিদের গণতান্ত্রিক ভোটে নির্বাচিত বৈধ সরকারকে নির্মূলের নামে ‘অপারেশন জেনোসাইড’ শুরু করে ইসরায়েল।
ফিলিস্তিনময় পৃথিবী
পশ্চিম এশিয়ার আঞ্চলিক সমস্যার গণ্ডি পেরিয়ে ফিলিস্তিন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গণহত্যার স্পনসরশিপ নেওয়া খোদ আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজপথ থেকে শুরু করে সংসদ পর্যন্ত কম্পিত হয়েছে মুক্তিকামী মিছিলের পদচারণায়। ক্রমেই জলপাই গাছের শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, পৃথিবী তরমুজের রঙ ধারণ করে ওঠে।
গাজার গণহত্যার আগে জাতিপুঞ্জের সদস্যভুক্ত ১৩৮টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল; বর্তমানে সেই সংখ্যা ১৪৭-এ এসে পৌঁছেছে। নতুন করে অনেক দেশ ফিলিস্তিনের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সূচনা করেছে এবং বেশ কয়েকটি দেশ আগ্রাসী ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।
ফিলিস্তিনিদের মহানুভবতা ও আতিথেয়তা
ইসরায়েলি বন্দীদের অবস্থা দেখে সহজেই অনুমেয়। ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের কোনো ক্ষোভ বা অভিমান নেই। বিদায় বেলায় ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল ইসরায়েলি বন্দীদের করমর্দন ও চুম্বনের দৃশ্য সারা বিশ্বকে অবাক করেছে। ফিলিস্তিনি মায়েরা বন্দীদের নিজের সন্তানদের মতো দেখভাল করেছে, যাবতীয় প্রয়োজন মিটিয়েছে, এমনকি তাদের ধর্ম পালনেরও সুযোগ দিয়েছে।
যে দেশ তাদের ভূমি দখল করেছে, বসতি উচ্ছেদ করেছে, প্রিয়জনদের গণহত্যা করেছে। সেই দেশের বন্দীদের প্রতি সমস্ত প্রতিশোধস্পৃহা দমন করে এমন আচরণ করে ফিলিস্তিনিরা প্রমাণ করেছে, তারা সত্যিই মহান।
গাজাবাসীর ধৈর্য ও অবিচলতা
নিজেদের সব হারিয়েও গাজাবাসীরা হতাশ হয়নি; বরং হৃদয় জুড়ে একরাশ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পৃথিবীর সাধারণ মানুষের মতো একটি ভালো দিনের অপেক্ষায় আছে। যেখানে নেই বিদ্যুৎ, পানীয় জলের অভাব, খাবারের সংকট, মাথার উপর কোনো ছাদ নেই; যত্রতত্র পড়ে আছে মৃতদেহ, মাটিতে লেগে আছে রক্তের ছোপ, বাতাস ভারী হয়েছে বারুদের গন্ধে, আকাশজুড়ে বোমারু বিমান আর বিস্ফোরক ড্রোন। ভাবুন, এমন মৃত উপত্যকায় মানবজাতির বেঁচে থাকা কি আদৌ সম্ভব?
কিন্তু সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা উপত্যকা ত্যাগ করেনি। রিভেরিয়া বা রিসোর্টের প্রলোভন কিংবা উন্নত জীবনযাত্রার লোভে দেশ ছাড়েনি; বরং নিজেদের মাটিকে আরও আঁকড়ে ধরেছে। দেড় বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরেও, এত হিংস্রতা ও বর্বরতার পরেও ইসরায়েল তাদের দেশছাড়া করতে পারেনি।
ইসরায়েলিদের নৈতিক অধঃপতন ও বর্বরতা
গাজাবাসীদের পশুর সাথে তুলনা করে, আরবদের মৃত্যু চেয়ে ইসরায়েলি মন্ত্রী ও নাগরিকদের বিদ্বেষ গণহত্যাকে উসকে দিয়েছে। একটি জাতি, যারা নিজেরাই গণহত্যার শিকার হয়েছিল, শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল অটোমানদের দেশে। খোদ তারাই যে রক্তের উৎসবে মেতে উঠবে, তা কল্পনা করাও কঠিন ছিল।
আহতদের উপর বুলডোজার চালানো, হিংস্র পশুদের লেলিয়ে দেওয়া, আকাশচুম্বী ভবনগুলো উড়িয়ে উল্লাস, ফিলিস্তিনি নারীদের ব্যক্তিগত পোশাক পরে নগ্ন উল্লাস, শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংস, শরণার্থী শিবিরে আগুন, হাসপাতালে বোমা, শিশুদের গুলি, ত্রাণ আটকে দেওয়া, ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস, স্বেচ্ছাসেবক, ডাক্তার, সাংবাদিকদের হত্যা – এমন কোনো নৃশংসতা নেই যা তারা করেনি। এ যেন কোনো দূর গ্রহ থেকে আগত এলিয়েনদের দল—যারা অবলীলায় একটি সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করেছে।
দুমুখো বিশ্বব্যবস্থা
গাজার শিশুদের শৈশব আর মাত্র কয়েকশ মাইল দূরের তেল আবিবের শিশুদের শৈশব – আকাশ-পাতাল তফাৎ। একদিকে বোমা-বুলেটের আঘাতে পিষ্ট ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ জীবন। মাত্র কয়েকশ ইসরায়েলি বন্দীর জন্য নিউ ইয়র্ক থেকে লন্ডনের ঘুম ছুটে যায়, অথচ বিনা অপরাধে বন্দী ফিলিস্তিনিদের খবর কেউ রাখে না।
ইরানে এক মহিলার মৃত্যুর জন্য বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠেছিল, কিন্তু ক্যামেরার সামনে পঁচিশ হাজারেরও বেশি নারীকে হত্যা, তা জায়নবাদী চশমা ভেদ করতে পারেনি। উল্টে ‘আত্মরক্ষার অধিকার’-এর মোড়ক লাগিয়ে গণহত্যার স্পনসরশিপ চলতে থেকেছে।
ভূরাজনীতির নয়া সমীকরণ
পশ্চিম এশিয়ায় অনেক রক্ত ঝরেছে। ইসরায়েল দ্বিরাষ্ট্র ভিত্তিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ধারণা বিসর্জন দিয়ে পুরো ফিলিস্তিনি জাতিকে বিলীন করতে চায়। আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা ভেস্তে গেছে।
অন্যদিকে আরব ভূমিপুত্ররা ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে সম্মিলিত প্রতিরোধে নেমেছে। ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও গাজা উপত্যকার প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো একযোগে কাজ করছে। দীর্ঘদিন অবরোধের পরেও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে গাজার সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে।
‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ – এই স্লোগানকে সামনে রেখে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রাম সারা বিশ্বের মজলুমদের শক্তি জুগিয়েছে। মহাত্মা, নেতাজি, আজাদের ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিদের সালাম জানাই – আগামীর স্বাধীনতা আপনাদের হোক, ইন্তিফাদা দীর্ঘজীবী হোক!
(লেখকের ব্যক্তিগত অভিমত)