
লিখেছেন: মাহমুদুল হাসান
স্কুল জীবনের কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, পরিমাপ করা রুটিন আর অভিভাবকদের সার্বক্ষণিক কড়া নজরদারি পেরিয়ে কলেজের সবুজ প্রাঙ্গণে পা রাখা একজন তরুণের জীবনে এক যুগান্তকারী মোড়। এই নতুন পরিবেশ তাকে এক অদ্ভুত উন্মুক্ত আকাশের স্বাদ দেয়। এখানে নেই প্রতি পদে জবাবদিহিতার ভয়, নেই বাঁধাধরা প্রথা। চারপাশের বৈচিত্র্যময় পরিবেশ, নতুন সহপাঠী, নতুন আদর্শ আর উন্মুক্ত সুযোগ তরুণ মনকে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। আপাতদৃষ্টিতে এই সময়টিকে মনে হয় সীমা ভাঙার সুবর্ণ সুযোগ, যেখানে নিজের ইচ্ছেমতো জীবনকে চালনা করাই মূল আকর্ষণ।
তবে স্বাধীনতার এই সুবাতাস কেবল উৎসবের আমেজ বয়ে আনে না; এর ঠিক পেছনেই জমা হয়ে থাকে আত্মিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার এক অদেখা পর্বত। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারার ওপরই নির্ভর করে তরুণের জীবন কোন খাতে বইবে—সফলতার শীর্ষছোঁয়ায়, নাকি নৈতিকতার চরম ধসে। একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর কাছে কলেজ জীবন কেবল উচ্চমাধ্যমিকের সনদ বা সেরা ফল অর্জনের সিঁড়ি নয়; এটি তার সততা, চরিত্র, ঈমান এবং সর্বোপরি আত্মসংযমের সবচেয়ে বড় প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার ক্ষেত্র।
এখানেই সামনে আসে জীবনের সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন—যে স্বাধীনতা চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়, তা যেন আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতার ফাঁদে পড়ে রূপ না নেয় এক অদৃশ্য বন্দিদশায়। নিত্যনতুন আকর্ষণ, বিনোদনের প্রলোভন, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং দ্বীনবিমুখ পরিবেশের ভিড়ে নিজেকে আঁকড়ে রাখা সত্যিই এক জটিল রূপান্তর। তবে একজন সচেতন মুসলিমের চোখে স্বাধীনতা মানে অবাধ উচ্ছৃঙ্খলতা নয়; বরং নিজের খারাপ প্রবৃত্তি ও দুনিয়ার যাবতীয় অন্যায়ের দাসত্ব ছিন্ন করে পরম রবের আনুগত্যে নিজের ব্যক্তিত্বকে সুন্দরভাবে বিকশিত করা। এই সত্যটি অনুধাবন করলে আধুনিক গতিশীল শিক্ষাঙ্গনে থেকেও ঈমান ও চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব।
কলেজ জীবন: স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব
শিক্ষাঙ্গনের এই মুক্ত পরিবেশ তরুণদের স্বাধীন চিন্তার অধিকার দেয়, স্বাবলম্বী হওয়ার অনুভূতি এনে দেয়। অভিভাবক ও শিক্ষকের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ যখন শিথিল হয়ে আসে, তখন অনেকেই মনে করেন—এখন নিজের ভালো-মন্দ দেখার মালিক শুধুই সে নিজে, তাকে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। কিন্তু ইসলামী জীবনদর্শনে স্বাধীনতার অস্তিত্ব দায়িত্বশীলতার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। মুক্ত আকাশের পাখির ওড়ার স্বাধীনতা যেমন তার ডানার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, মানুষের স্বাধীনতার সৌন্দর্যও প্রকাশ পায় তার নৈতিক সীমানার ভেতর।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিবেক, মেধা ও সত্য-মিথ্যা পরখ করার স্বাধীন ইচ্ছা দিয়েই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। অতএব, কলেজে প্রাপ্ত স্বাধীনতা আসলে এক অমূল্য আমানত। এই স্বাধীনতাকে কাজে লাগিয়ে একজন শিক্ষার্থী নিজের জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে পারে, কল্যাণকর কাজের মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিত্বকে সুগঠিত করতে পারে; আবার ভুল পথে চালিত হয়ে নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে ধ্বংসের মুখেও ফেলতে পারে। কোরআনে কারীমে মানুষের এই আমানতদারিতা ও স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে: “তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আল-আনআম, ৬:১৬৫)
প্রতিনিধি বা খলিফা কখনো অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধিকারী হয় না, সে তার মালিকের নির্ধারিত নীতিমালার ভেতরে থেকেই কাজ করে। সে কারণে একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত স্বাধীনতা হলো সঠিক জীবনদর্শন বেছে নেওয়ার সক্ষমতা, যা তাকে সাময়িক আনন্দের অন্ধ প্রলোভন থেকে বাঁচিয়ে চিরন্তন কল্যাণের দিকে নিয়ে যায়।
নামাজ: ঈমানের মজবুত নোঙর
কলেজ জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবিক বাস্তবতা হলো গতিশীল ব্যস্ততা। একের পর এক ক্লাস, লেকচার, ল্যাব রিপোর্ট, মিডটার্ম আর অ্যাসাইনমেন্টের তোড়জোড়, তার সঙ্গে দীর্ঘ যাতায়াতের ক্লান্তি—সব মিলিয়ে সারাদিন এক নিরবচ্ছিন্ন মানসিক ও দৈহিক দৌড়ের মধ্যে কাটায় একজন শিক্ষার্থী। আর এই বিশাল ব্যস্ততার জাঁতাকলে পড়ে যে জিনিসটি সবচেয়ে সহজে প্রথম হারিয়ে যায়, তা হলো আমাদের সালাত বা নামাজ। ‘আজ খুব চাপ’, ‘পরের ওয়াক্তে পড়ে নেব’ কিংবা ‘বাড়ি গিয়ে কাজা সারব’—এমন সব অজুহাতে সালাতকে পেছনের সারিতে ঠেলে দেওয়া খুব সাধারণ একটি অভ্যাসে পরিণত হয়।
অথচ সালাত কেবলই দৈনিক কিছু আচার-অনুষ্ঠান বা শারীরিক রুটিন নয়; এটি মানুষের আত্মিক জীবনের সবচেয়ে বড় জ্বালানি ও প্রশান্তি। উত্তাল সাগরে ভাসতে থাকা কোনো জাহাজকে যেমন একটি শক্তিশালী নোঙর স্থানচ্যুত হওয়া থেকে বাঁচায়, তেমনি শত প্রলোভন ও ব্যস্ততার ঘূর্ণাবর্তে সালাতই একজন তরুণের নৈতিকতাকে ঠিক জায়গায় ধরে রাখে। আল্লাহর সাথে এই দৈনিক ৫ বার সংযোগ জীবনের সমস্ত মানসিক চাপকে এক নিমেষে হালকা করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সালাতের গুরুত্ব স্পষ্ট করে হাদীসে ইরশাদ করেছেন: “আমাদের এবং তাদের (অমুসলিমদের) মধ্যে মূল চুক্তি বা ব্যবধান হলো সালাত; সুতরাং যে সালাত বর্জন করল, সে কুফরী করল।” (জামে আত-তিরমিজি: ২৬২১)
বাস্তব জীবনের একটি সুন্দর দৃশ্য দেখা যায় সেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে, যারা নতুন সেমিস্টারের রুটিন হাতে পাওয়ার পরপরই সালাতের ওয়াক্তগুলোর কথা মাথায় রেখে নিজেদের পরিকল্পনা সাজিয়ে নেয়। জোহর বা আসরের ওয়াক্তে যখন ক্লাসের বিরতি থাকে, তখন বন্ধুরা যখন মেফেটেরিয়া বা আড্ডায় অলস সময় কাটায়, তখন তারা ধীরস্থিরভাবে ওজু করে কলেজের নির্দিষ্ট সালাত কক্ষে বা কোনো নিভৃত কোণে রবের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সামান্য ১০-১৫ মিনিটের এই বিরতি তাদের পড়ালেখার মানসিক ক্লান্তি দূর করে দ্বিগুণ মনোযোগ ফিরিয়ে আনে। সময় তৈরি করতে হয় না, বরং সালাতকে অগ্রাধিকার দিলে সময়ের ভেতর অলৌকিক বরকত তৈরি হয়।
আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক কেন জরুরি
নামাজের আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও পরম করুণাময়ের সাথে এক নিবিড়, ব্যক্তিগত ও আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা কলেজ জীবনের ফিতনা থেকে বাঁচার অন্যতম বড় ঢাল। যখন কোনো তরুণের অন্তরে এই অনুভূতি জাগে যে সে জনমানবহীন কোনো রুমে একা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে নিঃসঙ্গ নয়, তার ওপর সদা জাগ্রত এক সত্তার দৃষ্টি রয়েছে, তখন তার চরিত্র এক অন্যরকম উচ্চতা লাভ করে।
এই আত্মিক বন্ধন গভীর হয় নিয়মিত কুরআন পাঠ, অর্থ অনুধাবন, প্রতিদিনের তাসবিহ-জিকির এবং একান্তে দোয়ার মাধ্যমে। পথচলা বা যাতায়াতের সময়গুলোতে অনর্থক চিন্তা না করে অন্তরে আল্লাহর স্মরণ জিইয়ে রাখা মনকে পাপাচারের প্রলোভন থেকে মুক্ত রাখে। রাতে পড়ালেখার পর কিংবা সেজদায় গিয়ে নিজের যাবতীয় দুর্বলতা, ভয়, হতাশা আর পড়াশোনার চাপ নিয়ে কোনো আড়ম্বর ছাড়াই নিজের ভাষায় আল্লাহর সাথে কথা বলা মানুষের অন্তরকে এক অপার প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: “যাঁরা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়ে থাকে।” (সূরা আর-রাঅদ, ১৩:২৮)
আল্লাহর নজরদারির এই গভীর বোধ—যাকে ইসলাম ‘এহসান’ বলে অভিহিত করে—একজন তরুণকে আড়ালেও ভালো মানুষ হিসেবে টিকিয়ে রাখে। নির্জন মেসে বা হোস্টেলের রুমে যখন অনায়াসে প্রযুক্তির অপব্যবহার বা গোপনে কোনো অন্যায় করার শতভাগ সুযোগ থাকে, তখন ‘আমার পরম রব আমাকে দেখছেন’—এই একটি চিন্তা তাকে অপরাধ থেকে ফিরিয়ে এনে নৈতিক বিজয়ী করে তোলে।
বন্ধুত্ব ও সঙ্গ: চরিত্র গঠনের শক্তি
তরুণ বয়সে মানুষের ভাবনা, পছন্দ, জীবনধারা ও মূল্যবোধের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে তার বন্ধু ও সঙ্গীরা। সহপাঠীদের সান্নিধ্য এতটাই সূক্ষ্মভাবে কাজ করে যে অজান্তেই মানুষ তার বন্ধুর অভ্যাস ও চালচলন আপন করে নেয়। সেই কারণেই বন্ধুত্ব কেবল সমমনা হওয়ার বিষয় নয়, এটি নৈতিকতা সুরক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
সৎ ও অসৎ সঙ্গের চমৎকার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদিসে বর্ণনা করেছেন: “ভালো ও খারাপ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো কস্তুরী (আতর) বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো। আতর বিক্রেতার কাছ থেকে তুমি হয়তো আতর কিনবে, না হয় তার সুবাস পাবে। আর কামারের হাপর হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় তার দুর্গন্ধ তোমার শরীরে লাগবে।” (সহিহ বুখারি: ২১০১, সহিহ মুসলিম: ২৬২৮)
ক্যাম্পাস জীবনে একজন শিক্ষার্থী এমন বন্ধু পেতে পারে, যে পরীক্ষার নোটে সাহায্য করার পাশাপাশি আজান হলেই তাগিদ দেয় সালাত আদায়ে, পড়াশোনায় ফাঁকি না দেওয়ার পরামর্শ দেয় এবং সৎ পথে চলতে উৎসাহ জোগায়। আবার এমন বন্ধুও মিলতে পারে, যে ধীরে ধীরে ধূমপান, অনর্থক রাতজাগা, কটু কথা বলা কিংবা পড়ালেখায় চরম অবহেলার দিকে টেনে নিয়ে যায়। বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে যখন কোনো শিক্ষার্থী বুঝতে পারে তার বিদ্যমান আড্ডা বা পরিবেশ তাকে পাপ বা অলসতার দিকে ঠেলছে, তখন কোনো রকম খারাপ আচরণ না করে অত্যন্ত মার্জিত ও বিনয়ী উপায়ে নিজের কাজে ব্যস্ততা দেখিয়ে সেই সঙ্গ থেকে দূরত্ব বজায় রাখাটাই আত্মসংযমের বুদ্ধিমান কৌশল।
ডিজিটাল যুগের ফিতনা ও আত্মসংযম
বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি আমাদের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে জ্ঞানের অসীম দুয়ার। কিন্তু একই সঙ্গে এই স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে উঠেছে আত্মসংযম বিনষ্টকারী এক বিশাল ফিতনা। বিনোদন ও যোগাযোগের নামে যে অবিরাম স্ক্রোলিং, রিলস দেখা কিংবা ভিডিও দেখার প্রবৃত্তি আমাদের তৈরি হয়েছে, তা একজন তরুণের মেধা, মনোযোগ ও সময়কে নিঃশব্দে চুষে নেয়।
অন্যের সাজানো বা কৃত্রিম জীবন দেখে নিজের বাস্তব জীবনের সাথে তুলনা করে মানসিক হতাশায় ভোগা, ট্রোলিং করা, কমেন্ট বক্সে অহেতুক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং চোখকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে অশালীন কনটেন্টে নিমজ্জিত হওয়া আজকের কলেজ শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় মানসিক ও নৈতিক ব্যাধি। কিন্তু আধুনিক যুগে প্রযুক্তি পুরোপুরি বর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়, এর সমাধান নিহিত রয়েছে এর ‘সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহারে’।
সময় হলো একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় মূলধন বা আমানত। কিয়ামতের ময়দানে তরুণ বয়সের এই সময়টি সম্পর্কে বিশেষ জবাবদিহিতা করতে হবে। এই বিষয়ে সতর্ক করে প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: “দুটি নিয়ামতের বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ চরম ধোঁকা ও ক্ষতির মধ্যে রয়েছে; তা হলো সুস্থতা এবং অবসর সময়।” (সহিহ বুখারি: ৬৪৬৪)
স্ক্রিন টাইম কমানো, সোশ্যাল মিডিয়ার অপ্রয়োজনীয় পেজ আনফলো করা, পড়াশোনা ও ইবাদতের নির্দিষ্ট সময়ে ফোন দূরে রাখা এবং নিজের দৃষ্টির হেফাজত করার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী ডিজিটালি নিজেকে স্বাধীন ও সুশৃঙ্খল রাখতে পারে।
চোখ, জিহ্বা ও চরিত্রের হেফাজত
একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রকৃত শোভা ফুটে ওঠে তার চরিত্র ও অভ্যাসের পরিচ্ছন্নতায়। ক্যাম্পাস জীবনে অবাধ মেলামেশা ও উন্মুক্ত পরিবেশের কারণে দৃষ্টি, মুখের ভাষা ও আচরণকে সংযত রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
দৃষ্টির হেফাজত মানে শুধু চোখ বন্ধ রাখা নয়, বরং যা দেখা অনুচিত বা ক্ষতিকর, তা থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের মনোযোগকে সরিয়ে নেওয়া। মুখের ভাষা ব্যবহারে সংযমী হওয়া, আড্ডার ছলে কোনো সহপাঠীকে নিয়ে ট্রোল বা গীবত না করা, কারো অনুপস্থিতিতে তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সমালোচনা না করা একজন আদর্শ মুসলিমের মূল বৈশিষ্ট্য। চালচলনে আত্মঅহংকার পরিহার করে বিনয় ও শালীনতা রক্ষা করা কেবল ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, এটি একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিত্বের আসল সৌন্দর্য।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে শালীনতা ও সীমারেখা
শিক্ষাঙ্গনে নারী-পুরুষের উপস্থিতি এক স্বাভাবিক সামাজিক বাস্তবতা। গ্রূপ স্টাডি, প্রেজেন্টেশন, প্রজেক্টের কাজ বা ক্লাসরুমের প্রয়োজনীয় কাজে সহপাঠীদের সাথে যোগাযোগ হতেই পারে। ইসলাম কখনোই যুক্তিযুক্ত সামাজিক মেলামেশা বা শিক্ষাগত প্রয়োজনকে রুদ্ধ করে না, তবে এর জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে অতি সুন্দর কিছু শালীন নীতি ও সীমারেখা।
যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে সহপাঠীদের সাথে যোগাযোগ হতে হবে অত্যন্ত পেশাদার, সম্মানজনক ও সংসংক্ষিপ্ত। কিন্তু প্রজেক্টের অজুহাতে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যক্তিগত চ্যাটিং, অহেতুক আবেগভিত্তিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া কিংবা নির্জন স্থানে মেলামেশা একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, মনোযোগ এবং নৈতিকতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। আবেগীয় সাময়িক ভালোলাগা অনেক সময় এতদূর গড়ায় যে তা তরুণের ক্যারিয়ার ও আত্মসম্মানকে ধূলিসাৎ করে দেয়। তাই নিজেকে ও অন্যকে সম্মান জানিয়ে নির্দিষ্ট সীমানা বজায় রাখাই একজন পরিণত প্রজ্ঞাবান তরুণের কাজ।
ভুলের পর ফিরে আসার পথ
পাপমুক্ত বা নিখুঁত কোনো মানুষ হতে পারে না। মুক্ত জীবনের মোহ, পরিবেশের প্রভাব বা শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে কোনো শিক্ষার্থী ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে, কোনো পাপে জড়িয়ে যেতে পারে বা পড়ালেখা ও সালাতে চরম অলস হয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ক্ষতিকর চিন্তা হলো হতাশাগ্রস্ত হয়ে যাওয়া এবং ভাবা—‘আমার তো সব শেষ, আমি আর ভালো হতে পারব না।’
ইসলাম মানুষকে হতাশায় ডুবতে দেয় না; বরং ইসলাম শেখায় অনুশোচনা ও ফিরে আসার পথ। মহান আল্লাহ তায়ালা পরম মমতায় তাঁর বান্দাদের আশ্বস্ত করে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন: “বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আজ-ঝুমার, ৩৯:৫৩)
ভুল হওয়া মাত্রই অহংকার ছেড়ে দিয়ে বিনীতভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হওয়া, চোখের পানি ফেলে তাওবা করা এবং দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ভালো অভ্যাসে ফিরে আসাই হলো প্রকৃত ঈমানদারের পরিচয়। একটি সাময়িক ভুল পুরো জীবনের চূড়ান্ত চিত্র হতে পারে না, যদি সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করা যায়।
নিজেকে গড়ার বাস্তব নীতি
কলেজ জীবনের এই পুরো যাত্রাকে একটি সুনির্দিষ্ট সুসংগঠিত রূপ দিতে একজন শিক্ষার্থী নিজের জীবনে কিছু স্থায়ী নীতি বা গোল্ডেন রুলস বাস্তবায়ন করতে পারে:
সালাত কেন্দ্রিক জীবন: প্রতিদিনের পড়ালেখা, আড্ডা ও কাজের সময়সূচি নির্ধারিত হবে সালাতের ওয়াক্তকে অগ্রাধিকার দিয়ে।
সৃজনশীল সঙ্গ নির্বাচন: এমন বন্ধুদের সাথেই গভীর সখ্যতা তৈরি করা, যারা পড়ালেখা, চিন্তাভাবনা ও ঈমানের দিক থেকে জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
প্রযুক্তির ওপর স্বনিয়ন্ত্রণ: বিনোদনের জন্য অনর্থক স্ক্রোলিং না করে প্রযুক্তিকে কেবল জ্ঞানার্জন ও দরকারী যোগাযোগের মাধ্যমে পরিণত করা।
দৈনিক স্বল্প সময়ের আমানত: প্রতিদিন অল্প হলেও অন্তত ১০ মিনিট কুরআন তিলওয়াত করা এবং সকাল-সন্ধ্যার জিকির ও দোয়ার অভ্যাস ধরে রাখা।
দিনশেষে আত্মপর্যালোচনা: রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ৫ মিনিট নিজের সারাদিনের কাজ পর্যালোচনা করা, ভুলের জন্য ইস্তিগফার করা এবং নতুন ভোরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।
আলোর পথে তরুণ মন
কলেজ জীবন জীবনের কোনো অস্থায়ী বিনোদন কেন্দ্র নয়; এটি হলো সম্ভাবনা, জ্ঞান এবং নিজের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করার এক উর্বর ক্ষেত্র। এই বয়সে যে অমিত তেজ, শক্তি ও মেধা একজন শিক্ষার্থীর ভেতরে থাকে, তা সঠিক দিশায় প্রবাহিত করতে পারলে সে কেবল নিজের ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করে না, বরং সমাজ ও জাতির জন্য এক বড় শক্তিতে পরিণত হয়।
অনেকেই মনে করেন, আধুনিক শিক্ষাঙ্গনের রীতিনীতির ভিড়ে ইসলাম মেনে চলা হয়তো বড্ড কঠিন বা নিজেকে অসামাজিক বানিয়ে ফেলে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো—ঈমান ও ইসলামী মূল্যবোধ কখনো মানুষকে পিছিয়ে দেয় না; বরং তা তরুণকে করে তোলে আরও বেশি সুশৃঙ্খল, মার্জিত, দায়িত্বশীল ও রুচিশীল।
স্বাধীনতার উন্মুক্ত অঙ্গনে দাঁড়িয়ে যে তরুণ নিজের মন ও আবেগকে জয় করতে পারে, সেই তো আসল বিজয়ী। কলেজ জীবন ঈমান বা নৈতিকতা হারানোর সময় নয়; বরং জ্ঞান, চরিত্র, ইবাদত ও দায়িত্বশীলতা দিয়ে নিজেকে এক পূর্ণাঙ্গ আলোকিত মানুষ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করার সুবর্ণ সুযোগ। স্বাধীনতা আমাদের সামনে হাজারও দরজা খুলে দেয়, আর ঈমান ও দায়িত্ববোধ আমাদের দেখিয়ে দেয় কোনো দরজা দিয়ে প্রবেশ করলে আমরা চিরন্তন সফলতার দেখা পাব।




