Literature

গ্রন্থ পর্যালোচনা: “ভারতের মুক্তি সংগ্রাম ও বাংলার মুসলমান”

143views

“ইতিহাস কেবল রাজাদের গাথা নয়, ইতিহাস হচ্ছে সেইসব মানুষের কথা, যাঁরা রক্ত, ঘাম, স্বপ্ন আর ত্যাগ দিয়ে এক জাতির আত্মপরিচয় গড়ে তোলেন – অথচ অনেক সময় তাঁদের নামটুকুও ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেখা থাকে না।”

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস যেন অনেকটা একপাক্ষিক স্মৃতিচারণ, যেখানে কংগ্রেস নেতৃত্ব, হিন্দু ভদ্রসমাজ, শহুরে বুদ্ধিজীবীদের কথা যতটা উচ্চারিত, ততটাই নীরব বাংলার কৃষক, শ্রমিক, সংখ্যালঘু মুসলমান জনগণের অবদান। এই একচোখা ইতিহাসচর্চার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সৌম বসু তাঁর বই “ভারতের মুক্তি সংগ্রাম ও বাংলার মুসলমান”-এ তুলে ধরেছেন এক বিকল্প ইতিহাস – যা অনেকদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা, উপেক্ষিত, বা ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা গল্পগুলোর কথা বলে।

এই বই একদিকে যেমন ঐতিহাসিক দলিল, তেমনই অন্যদিকে এক ধরণের ন্যায়বিচারের চেষ্টা—যেখানে বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক, সামাজিক, এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। এই গ্রন্থ পাঠককে শুধুমাত্র অতীত জানতে সাহায্য করে না, বরং আমাদের আজকের সমাজ-রাজনীতিকে বুঝতেও এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।

বইয়ের প্রারম্ভেই যেন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন লেখক—”যাঁরা লড়েছিলেন, যাঁরা বলেছিলেন না, যাঁরা মাথা নত করেননি, অথচ মুসলমান ছিলেন বলে যাঁদের ভূমিকা অস্বীকার করা হয়েছে—তাঁদের জায়গা কোথায় আমাদের ইতিহাসে?” সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতেই সৌম বসুর এই গবেষণাগ্রন্থ, যেখানে তিনি দেখান—মুসলমান হওয়া মানেই সাম্প্রদায়িক হওয়া নয়; আর মুসলমানদের অবদান মানেই কেবল খিলাফত আন্দোলন নয়। তাদের রয়েছে একটি সুদীর্ঘ সংগ্রামী ইতিহাস, যা এই বইয়ে প্রথমবারের মতো পূর্ণতা পায়।

বইয়ের মূল বিষয়বস্তু

এই গ্রন্থে লেখক দেখাতে চেষ্টা করেছেন কেন আব্দুর রসুল, মৌলবী মুজিবুর রহমান, আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, রেজাউল করিম, আজাহার আলী খান, আব্দুস সাত্তার, আবুল হায়াত, নাসির সরকার, নওশের আলী ও আরো অগণিত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আমরা ভুলে যাই?
মুসলমান রাজনীতি মানেই স্বতন্ত্রবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি—এমন অর্ধসত্য কেন আমরা সত্য হিসেবে মেনে নিতে শুরু করি? কেন এখন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঠিক মূল্যায়ন হলো না? কেন আজও আমরা সঠিক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে উঠতে পারিনি?

এমন এক সময়, যখন অর্ধসত্য, এমনকি সম্পূর্ণ মিথ্যা সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে। জাতির ইতিহাসকে প্রতিদিন বিকৃত করা হচ্ছে, আর মানুষ সেটাও মেনে নিচ্ছে। যে ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলেন এদেশের ক্রান্তদর্শীরা, তা আজ ভুলুণ্ঠিত।

আজ এ দেশে যেভাবে পরিকল্পিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মৌলবাদী শক্তি সংখ্যালঘুদের নানাভাবে অত্যাচার শুরু করেছে এবং ইতিহাস বিকৃত করে সংখ্যালঘুদের এমন এক চিত্র রচনা করার চেষ্টা করছে, যা ঘৃণা ও অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়।

শুধু আজ নয়, আমরা যদি ১৮ শতকের দিকে যাই, তাহলে দেখতে পাবো ক্ষমতার লোভে কিছু স্বার্থপর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধানোর চেষ্টা চালিয়েছে। সেইসব ব্যক্তিত্ব আজ ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয়। কিন্তু যারা আগাগোড়া চাইছিলেন ভারতবর্ষ একদিন ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হবে—তাঁদেরকে আর ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যায় না।

একটি বিশেষ উদাহরণ

১৯২৮ সালে বাংলা স্বরাজ্য দল আরও একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে যা কৃষকদের স্বার্থহীন করে। এ বছর বাংলার আইনসভায় বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব (সংশোধনী) আইন পাস করা হয়।

এই আইন অনুযায়ী বাংলার প্রজাসাধারণের সামান্যতম অধিকারটুকুও কেড়ে নেবার ব্যবস্থা করা হয়। দরিদ্র কৃষকের জমি বিক্রয়, হস্তান্তর, দান বা উপঢৌকনের সময় জমিদারকে উচ্চ হারে সেলামি দেবার ব্যবস্থা চালু করা হয়। শুধু তাই নয়, সেলামির টাকা জমিদারের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার খরচও প্রজাকে দিতে বাধ্য করা হয়।

এমন একটি সর্বনাশা আইন, যার দ্বারা বাংলার কৃষকের স্বার্থ সবদিক থেকে খর্ব হবে, সেদিন আইনসভাতে পাশ হতে পেরেছিল, তার একটি কারণ—বাংলার আইনসভার স্বরাজ্য দলের সদস্যরা আইনের বিরোধিতা না করে সরকারের পক্ষেই ভোট দিয়েছিলেন।

সেদিন আইনসভায় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, শরৎ বসু, এমনকি সুভাষচন্দ্র বসুও (সুভাষচন্দ্র ১৯২৮ সালে প্রথমবার বাংলার আইনসভায় নির্বাচিত হন) আইন পাশের পক্ষে ভোট দিয়ে বাংলার কৃষকের সঙ্গে ঘোরতর অবিচার করেছিলেন।

হিন্দু কংগ্রেসীদের মধ্যে একমাত্র এই আইনের বিরোধিতা করেন বীরভূমের অধ্যাপক জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।

এই কৃষকশ্রেণীর স্বার্থে সেদিন আইনসভায় সোচ্চার হন স্যার আব্দুর রহিম, খান বাহাদুর আজিজুল হক, ফজলুল হক প্রমুখ মুসলিম সদস্যরা। কিন্তু সরকারের তাবেদার দল ও স্বরাজ্যদলের মিলিত শক্তির কাছে তারা পরাজিত হন।

আজকের আত্মবন্ধী বাঙালির কাছে এই মুসলিম স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বিস্মৃত চরিত্র। তাছাড়া মুসলমান বলতে যে চিত্র জোর করে অমুসলিমদের মাথায় ঠেসে দেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে এই মানুষগুলোকে মেলানো যায় না। যারা ঢাকঢোল পিটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রচার করে, তাদের অন্তত এদের মনে রাখা উচিত ছিল।

কারণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এত বলিষ্ঠ প্রবক্তা সহজে মেলে না। অতলান্ত দুঃখ-বঞ্চনা-হতাশা যারা হাসিমুখে জীবনে ধারণ করেছিলেন, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে যারা জীবন সংগ্রাম চালিয়েছিলেন, দেশভাগের নিদারুণ আশাভঙ্গ যাদের গ্রাস করতে পারেনি—এইসব মহাজনদের আমরা এত সহজে ভুলে যাই কী করে?

কেন পড়তে হবে এই বইটি?

১. অন্ধকারে ঢাকা সত্যকে জানার জন্য
আমাদের ইতিহাস বইগুলো বারবার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বে কংগ্রেস, গান্ধী, নেহরু বা জিন্নাহর নাম করে—কিন্তু বাংলার হাজার হাজার মুসলমান কৃষক, তাঁতি, শ্রমিক, শিক্ষক যাঁরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, তাঁদের কথা প্রায় উধাও।
এই বই সেই বিস্মৃত বীরদের ইতিহাস সামনে আনে—যেখানে উঠে আসে ‘নিম্নবর্গের মুসলমান’, যাঁরা আজও পরিচয় সংকটে ভোগেন।

২. সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা
আজ যখন সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ইতিহাসকে নিজের মত সাজাতে চায়, তখন এই বই দাঁড়ায় প্রতিরোধের এক মূল্যবান অস্ত্র হয়ে।

৩. শ্রেণিচেতনা ও গ্রামীণ বাস্তবতার ইতিহাস
গ্রামীণ কৃষক, দরিদ্র মুসলমান, মাদ্রাসা-শিক্ষিত ছাত্রদের ভূমিকাও গুরুত্বের সঙ্গে এনেছেন, যাঁদের কথা সাধারণত ইতিহাস ভুলে যায়।

৪. সাহসী ও সুসংবদ্ধ গবেষণা
এই বই নথিপত্রে ভরপুর, অথচ ভাষা একেবারে পাঠযোগ্য, স্পষ্ট এবং দার্শনিকভাবে প্রশ্নমুখর।

৫. ধর্ম নয়, মানুষ হিসেবে মুসলমানদের ভূমিকা জানার জন্য
আজকের সমাজে মুসলমান মানেই যেন রাজনৈতিক টার্গেট, সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এই বই পড়ে বোঝা যায়—বাংলার মুসলমানরা কেবল ধর্মের পরিচয় নয়, বরং ভারতের স্বাধীনতা ও সাম্যবাদী রাজনীতির সাহসী অংশীদার ছিলেন।

৬. ঐতিহাসিক একপাক্ষিকতার বিরুদ্ধে জবাব দেওয়ার জন্য
স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলধারায় মুসলমানদের প্রায় অনুপস্থিত দেখানো হয়—এটা শুধু ভুল নয়, ইচ্ছাকৃত বর্জন। এই বই সেই অন্যায় ইতিহাসবোধকে চ্যালেঞ্জ করে, প্রমাণের ভিত্তিতে।

ভাষা ও শৈলী

বইটির ভাষা একদিকে যেমন সুবিন্যস্ত ও প্রাঞ্জল, অন্যদিকে তেমনি বিনীত কিন্তু দৃঢ়। কোথাও আবেগের স্রোত, কোথাও তথ্যের কাঁটাতার—এই দুইয়ের মেলবন্ধন বইটিকে করে তুলেছে এক অভিনব পাঠ-অভিজ্ঞতা।

সৌম বসুর কলমে কখনও আক্ষেপ আছে, কখনও আহ্বান, আবার কখনও প্রতিরোধের সুর। পাঠক হিসেবে তুমি অনুভব করবে—এই বই পড়ে তুমি কেবল তথ্য জানছো না, বরং একটি ভুলে যাওয়া জাতিগত আত্মপরিচয়কে নতুন করে চিনে নিচ্ছো।

পাঠ-প্রতিক্রিয়া (ব্যক্তিগত অনুভব)

এই বইটি পড়তে পড়তে যেন আমি প্রবেশ করলাম এমন এক ইতিহাসের ঘরে, যেখানে আলো ছিল না, ছিল না জানলার হাওয়া—শুধু ছিল কান্না ও কণ্ঠরোধের নিঃশব্দ আর্তনাদ। সৌম বসুর লেখা সে ঘরে আলো জ্বালায়।

আমি বুঝতে পারি—যখন কেউ ‘মৌলবাদী’ শব্দটি নির্বিচারে মুসলমানদের দিকে ছুঁড়ে দেয়, তখন তাদের এই বইটি পড়া উচিত। তারা বুঝবে—বাংলার মুসলমানরা কেবল ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং ঔপনিবেশিক বিরোধিতা, শ্রেণিচেতনা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক ছিলেন।

এই বই আমাকে একটি আত্মবিস্মৃত ইতিহাসের সামনে দাঁড় করিয়েছে—চোখে চোখ রেখে বলেছে,
“তোমার পূর্বপুরুষেরা কেবল প্রার্থনা করতেন না, লড়েও গেছেন। তাঁদের কথা ভুলে যেও না।”

“ভারতের মুক্তি সংগ্রাম ও বাংলার মুসলমান” বইটি কেবল অতীতে লুকিয়ে থাকা গৌরবময় অধ্যায় উদ্ঘাটন করছে না, বরং বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে বোঝার জন্য নতুন আলো তৈরি করছে। ইতিহাসের নামুক না নামুক, সত্যগুলোকে তুলে আনার এই প্রয়াসে এটি পাঠককে উদারচিন্তা, পারদর্শিতা ও অনুপ্রেরণার পথ দেখায়।

যে সমস্ত মুসলিম নেতারা সাম্প্রদায়িকতা, বঞ্চনা, এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন—তাঁদের চিন্তা, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ আজকের বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের প্রজন্ম জানে না। তাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় নেই, কারণ তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনীতির ছকে মেলে না।
এই বই আমাদের সেই ভুলে যাওয়া ইতিহাস স্মরণ করায়—একটি ন্যায়ভিত্তিক, সর্বজনীন, এবং ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের স্বপ্নে যারা আস্থা রেখেছিলেন, তাঁদের সম্মানে।

তথ্যসূত্র

বসু, সৌম। ভারতের মুক্তি সংগ্রাম ও বাংলার মুসলমান। যৌথ পরিবেশক: এডুকেশন ফোরাম, দেশ প্রকাশন। ডিসেম্বর ২০১৮।

লিখেছেন: রাকিন আখতাব

Leave a Response