
লেখক: ডাঃ মসিহুর রহমান
পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসকে মোটামুটি তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা যায়-১) প্রাচীন বা গ্রীক যুগ, ২) মধ্যযুগ এবং ৩) আধুনিক যুগ।
দর্শনের প্রাচীন যুগ বা গ্রীকযুগের উৎপত্তি খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম বা যষ্ঠ শতাব্দীতে। মনে রাখতে হবে, এই যুগটি ছিল ভারতবর্ষে গৌতম বুদ্ধ এবং মহাবীরের সমসাময়িক। যদিও বৈদিক দর্শনের উৎপত্তি এর থেকে অনেক বেশি প্রাচীন। বেদ ভিত্তিক উপনিষদে বিবিধ দার্শনিক বিচার রয়েছে। সৃষ্টিতত্ত্ব, স্রষ্টার অস্তিত্ব, জড়জগৎ, দ্রব্য ও দেহ সম্পর্কিত বিষয়াবলী সেখানে চর্চিত হয়েছে।
গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটলের দার্শনিক বিচারধারা বিশ্বময় চর্চিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। এই তিনজন দার্শনিকের জীবনকাল খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম ও চতুর্থ শতাব্দী। সক্রেটিস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০-৩৯৯) প্লেটোর শিক্ষক ছিলেন। প্লেটোর ছাত্র ছিলেন অ্যারিস্টটল। অ্যারিস্টটল আলেকজান্ডারের শিক্ষক ছিলেন।
সক্রেটিস সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি আল্লাহর প্রেরিত একজন নবী ছিলেন। তিনি নবী ছিলেন কি-না তা নিশ্চিত করে বলার মত কোন সূত্র পাওয়া দুষ্কর। যেমন গৌতম বুদ্ধকে অনেকেই নবী যুলকিফল বলে থাকেন। যুলকিফল শব্দটিকে কপিলাবস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত করে থাকেন। কিন্তু যুলকিফল কথার মানে হল ‘ভাগ্যবান’। জোর করে কপিলাবস্তু বলার কোনো হেতু নেই। ডা. হামিদুল্লাহ, মানাজির আহসান গিলানী -এঁরা গৌতম বুদ্ধ নবী হতে পারেন এ কথা না-কি বলেছেন।
মাওলানা মওদূদী (রহ.) সূরা আম্বিয়ার ৮১ নং টীকায় (তাফহীমুল কুরআন) যুলকিফল শব্দের অর্থ ‘ভাগ্যবান’ বলে লিখেছেন। এর অর্থ হচ্ছে নৈতিক মাহাত্ম্য ও পরকালীন সওয়াবের দৃষ্টিতে ভাগ্যবান, পার্থিব স্বার্থ ও লাভের দৃষ্টিতে নয়।
যুলকিফল এর আসল নাম বিশ্ব। আল্লামা আলুসী তার রুহুল মা’আনী গ্রন্থে লিখেছেন ইহুদিদের দাবি হচ্ছে, তিনি হিযকিইল (যিহিস্কেল) নবী। বনি ইসরাইলদের পরাধীনতার (৫৯৭ খ্রিস্টপূর্ব) যুগে তিনি নবুওয়াতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। এবং খামুর নদীর তীরে একটি জনপদে নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করেন। খামুর নদী তুরস্ক, ইরাক ও সিরিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
৫৯৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যুলকিফল নবুওয়াতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। তখন তার বয়স ছিল ৩০ বছর। অবিশ্রান্তভাবে ২২ বছর ধরে তিনি একদিকে বিপদগ্রস্ত ইসরাইলিদের এবং অন্যদিকে জেরুজালেমের আত্মভোলা এবং অস্থির বিহ্বল অধিবাসী ও শাসকদের সজাগ করার দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
উল্লেখ্য, ব্যাবিলনের শাসক বখতে নসর জেরুজালেম ধ্বংস সাধন করে। ইসরায়েলিদের কয়েদ করে নিয়ে যায়। খামুর নদীর তীরে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করে বখতে নসর। সেখানে কয়েদিদের রাখা হয়। যুলকিফলও গ্রেফতার হন বখতে নসরের হতে। বনি ইসরাইলিরা আল্লাহর কেতাব ও দ্বীন থেকে গাফেল হওয়ার জন্য আল্লাহর ঐরূপ শাস্তির কবলে পড়ে।
সক্রেটিস এক স্রষ্টা, এক আল্লাহর ধারণাকে উপস্থাপন করেন, প্রত্যাদেশ (ওহী) ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত করেন। সৎকর্মের প্রচার করেন।
প্লেটো খ্রিস্টপূর্ব ৪২৮/৪২৭ অথবা ৪২৪/৪২৩ সনে জন্ম নেন। তাকে পাশ্চাত্য দর্শনের জনক বলা হয়। অ্যারিস্টটলের ৩৮৪ খ্রিস্টপূর্ব সনে গ্রীস দেশে জন্ম হয়। প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের দর্শন চিন্তার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বহির্জগতের তত্ত্ব সম্বন্ধে জ্ঞানার্জনের প্রচেষ্টা, আর এই তথ্য নির্ণয়ের জন্য তারা যে উপায় অবলম্বন করতেন, তা হচ্ছে প্রধানত তাদের নিজ নিজ স্বাধীন চিন্তা, বিচার ও কল্পনা।
মধ্যযুগে গ্রীক ভাষায় লিখিত দর্শন ও সাহিত্যের অধ্যয়ন সারা ইউরোপজুড়ে প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল। মুসলমানরা যখন পঞ্চদশ শতাব্দীতে তুরস্কের কনস্টান্টিনোপল অধিকার করে বসে, সেই সময় গ্রীসদেশীয় বিদ্বান লোকেরা তাদের গ্রন্থাদি সহ ইতালি দেশে চলে আসেন, এবং এদের প্রভাবে ইউরোপের ভূ-খন্ডে আবার গ্রীক সাহিত্য চর্চার পুনরুজ্জীবন ঘটে। এই সময়ে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল আর মুদ্রণালয়ে গ্রীক বই ছাপা হওয়ায় বিদ্যোৎসাহী লোকেরা এ নিয়ে পড়াশোনা করতে থাকলেন। দেশের শিক্ষিত সমাজে গ্রীক জাতির উন্মুক্ত স্বাধীন চিন্তার প্রসার হল। তবে এই কথাটি পুরো ঠিক নয়। আব্বাসীয় যুগে গ্রীক সাহিত্য, গ্রীকদর্শন নিয়ে মুসলিম বিদ্বানরা পড়াশোনা শুরু করেন। ইউরোপ গ্রীক দর্শন, সাহিত্য ভুলে গিয়েছিল। মুসলিম শাসকদের বদান্যতায় এবং বিদ্বানদের জ্ঞানচর্চার ফলে গ্রীক দর্শন, সাহিত্য সুরিয়ানী ভাষা থেকে ল্যাটিন ভাষায় সেগুলির ভাষান্তর হয়। তারপরের ল্যাটিন ভাষা থেকে ইউরোপের ভূখণ্ডে বিভিন্ন ভাষায় ভাষান্তরিত হওয়ার দরুন গ্রীক দার্শনিকদের লেখাগুলি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। ইউরোপ তার ভুলে যাওয়া জ্ঞান-সম্পদকে উদ্ধার করে মুসলমানদের জ্ঞান চর্চার জন্য। বিখ্যাত দার্শনিক আল কিন্দী, আল ফারাবী, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ গ্রীক দর্শন নিয়ে ব্যাপক জ্ঞান চর্চা করেন। তাদের লেখাগুলি সম্পর্কে অবগত হয় ইউরোপ। শুধু দর্শনশাস্ত্র নয়, জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় মুসলমানদের গবেষণা ও মৌলিক রচনা জগৎকে সমৃদ্ধ করে। মধ্যযুগের ইউরোপ জ্ঞানের জগতে একরকম অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে থাকে। মুসলমানরাই ইউরোপকে আলোকিত করেন। এই সত্যটি যদিও ইউরোপ স্বীকার করতে কার্পণ্য করে থাকে, তবে আধুনিক গবেষণায় তা স্বীকার্য হয়ে উঠেছে।
গ্রীক জাতির উন্মুক্ত স্বাধীন চিন্তার ফলে জার্মানিতে লুথার প্রমুখ ধর্মনেতারা যীশু খ্রীষ্টের বাণী জানার জন্য গীর্জার পাদ্রী ও সন্ন্যাসী পন্ডিতীয়দের ওপর আস্থা না রেখে সরাসরি বাইবেল পাঠের পরামর্শ দিতে থাকলেন। এর ফলে ধর্মসংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। প্রচার পেল প্রকৃত ধর্মের সার কথা হল হৃদয় মনের পরিশুদ্ধি, আত্মিক উন্নতি, বিবাহিত জীবন। সাংসারিক ও সামাজিক কর্তব্য পালনকে স্বাভাবিক ও পবিত্র রশ্বর নির্দিষ্ট বলে মনে করা হল। ধর্ম সংস্কারের আন্দোলনের ফলে ইউরোপের বিচারশীল মানুষের মনে স্বকীয় চিন্তা ও পর্যবেক্ষণে বিশ্বের অন্ত্যঃ তত্ত্বনির্ধারণে উৎসাহ দিয়েছিল।
আধুনিক প্রাকৃত বিজ্ঞানের উদ্ভব ও বিকাশে ইউরোপের কয়েকজন বিদ্বান মানুষের আবির্ভাব হয়। কোপার্নিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও- এঁদের ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে আবির্ভাব হয়। ইংল্যান্ডের দার্শনিক রোজার বেকন (জন্ম ১৫৬১) ও ফরাসী দেশীয় দেকার্ত (জন্ম ১৫৯৬) খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। বিজ্ঞান নির্ভর চিন্তাধারার উন্মেষ ঘটে। দুটি শর্তে বৈজ্ঞানিক বিচারে কার্যকর করে তোলা হয়। বিষয়-সম্বন্ধী শর্ত ও জ্ঞাতৃ-সম্বন্ধী শর্ত। প্রথম শর্তটি হচ্ছে এই যে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও তারই সাক্ষাৎ অনুভবের ওপর দাঁড়িয়ে তার থেকে অজেবাজে জিনিস ঝেড়ে ফেলতে হবে। দ্বিতীয় হচ্ছে পূর্বে গৃহীত পরস্পরাগত ধারণা এবং অতীব নিকৃষ্ট মতবাদগুলোকে মন থেকে সরিয়ে দিয়ে তার শুদ্ধি সম্পাদন। এই চিন্তাধারার ফলে ইউরোপে পরবর্তীতে বিজ্ঞান ও ধর্মের পৃথক যাত্রা শুরু হয়। কোনো অতীন্দ্রিয় বিষয়কে বিজ্ঞানবাদীরা মানতে নারাজ। এখান থেকেই সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতি-সর্বত্র ধর্মনিরপেক্ষতা তথা ধর্মহীনতা-সেক্যুলারিজম-এর চিন্তার উদ্ভব হয়। যা আজও অব্যাহত রয়েছে।
ইসলামি দর্শন
ইসলামী দর্শনের মৌলিক তত্ত্ব হল বিশ্বের একজন স্রষ্টা আছেন যিনি সমস্ত কিছুই সৃষ্টি করেছেন। বিভিন্ন জাতির লোকেরা স্রষ্টাকে বিভিন্ন নামে ডেকে এসেছে। কোরআনে আল্লাহ এই নামে নিজের সত্তাকে তুলে ধরেছেন।
স্থাপন আল্লাহর সত্তা (যতে) এবং গুণবাচক (সিফাত) নামের সঙ্গে কারোর অংশীদারিত্ব ইসলামের দৃষ্টিতে অংশীবাদ বা শিরক। বস্তুতপক্ষে আল্লাহ এক ও একক। চিরকাল আছেন এবং চিরকাল থাকেন। তাঁর আগে কেউ আল্লাহ হবে না এবং তাঁর পরেও কেউ আল্লাহ হবে না। তাঁর সমগোত্রীয় ও সমজাতীয় কেউ নেই। তাঁর সত্তা নিছক এক (ওয়াহেদ), যেখানে কোন দিক দিয়ে একাধিক্যের সামান্যতম স্পর্শও নেই।
রেনে দেকার্তকে আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের পিতা বলা হয়। ১৫৯৬ সালে তার জন্ম হয়, ১৬৫০-এ মৃত্যু হয়। ফ্রান্সে তার জন্ম হয়। ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি কি বলেছেন দেখা যাক।
স্বাধীন, সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, “ঈশ্বরের সম্পর্কে আমাদের ধারণা এই যে, উনি হচ্ছেন অনন্ত, জগতের স্রষ্টা, সর্বকল্যাণ গুণান্বিত, সর্বশ্রেষ্ঠ ঈশ্বরের এই ধারণা বাহ্য জগৎ থেকে ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে আমরা পাই না, অথবা স্বেচ্ছায় নির্মাণ করি না, করতেও পারি না। আমাদের থেকে অধিক সত্তাবান ব্যক্তিই এইরূপ ধারণা নির্মাণ করতে সমর্থ। আর অসীম বস্তু যে সীমিত বস্তু থেকে অধিক সত্তাবান, এটা সুনিশ্চিত। সুতরাং সীমিত বস্তুর ধারণাকে কল্পনায় বাড়িয়ে, অথবা সীমিতের নিষেধ কিংবা অভাব রূপে, আমরা অনন্তের ধারণায় পৌঁছতে পারি না। অনন্তের ধারণাকে সান্তের পূর্ববর্তী বলতে হবে। কারণ, অনন্তের ধারণা মনের সামনে রাখ লে, আমি নিজের অপূর্ণতা, দোষ-ত্রুটি, পরিচ্ছিন্নতা (finitude) প্রভৃতি উপলব্ধি করতে পারতাম না। সুতরাং, ঈশ্বরের ধারণা স্বয়ং ঈশ্বরই আমার মনে রোপণ করেছেন। এটাই বিচার-বুদ্ধির সিদ্ধান্ত। ঈশ্বরের ধারণা প্রথম থেকেই আমার মনে নিহিত রয়েছে। তা আমার ‘আমি’ বিষয়ক ধারণার মতই স্বভাবসিদ্ধ বা ঈশ্বর প্রদত্ত। অবশ্য, আমাদের ঈশ্বর-বিষয়ক ধারণা অনেকাংশে অপূর্ণ- এর দ্বারা ঈশ্বর সম্বন্ধে সম্পূর্ণ জ্ঞানলাভ করা অসম্ভব। তবু ঈশ্বরের অস্তিত্ব জানার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট।”
লাইনিজ লাইপজিক শহরে ১৬৪৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন, ১৭১৬ সালে তার মৃত্যু হয়। তিনি লিখেছেন, “ঈশ্বর জগতের কারণ, অধিষ্ঠান ও লক্ষ্য। সকল জীব তাঁর থেকেই এসেছে, আবার তাঁর দিকেই যাওয়ার চেষ্টা করছে। জীব-জগতের এই সাধারণ ঈশ-প্রবণতা মানুষের ভেতর সচেতন ভগবৎ প্রেমের স্তরে উন্নীত হয়। ঈশ্বর বিষয়ক জ্ঞান এই প্রেমের নিয়ামক এবং সৎ আচরণ এর ফল। জ্ঞানের জ্যোতি এবং নৈতিক সদ্গুণ বা সচ্চরিত্র, এ দুটি হচ্ছে ধর্মের স্বরূপগত উপাদান। মানুষ মাত্রেই একটি নৈসর্গিক ধর্মবোধ আছে। তদুপরি, স্বয়ং ঈশ্বরও মানুষের কল্যাণার্থ কত ধর্মতত্ত্ব কোনও কোনও মহাপুরুষের কাছে প্রকাশ করেন। এসকল তত্ত্ব আমাদের বুদ্ধি সম্পূর্ণ আকলন না করতে পারলেও, এরা যে বিচার-বুদ্ধির বিরুদ্ধে, এমন নয়।”
দেকার্ত এবং লাইবনিজের ধর্মত্ত্বের কথা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর সত্তাকে জানার জন্য ওহীর প্রতি আমাদের বিশ্বাস আনতেই হবে।
দেকার্ত বলেছেন, ‘ঈশ্বর-বিষয়ক ধারণা অনেকাংশে অপূর্ণ এর দ্বারা ঈশ্বর সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞানলাভ করা অসম্ভব।’ তাই স্রষ্টা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করার জন্যই আল্লাহ ওহীর বা প্রত্যাদেশের ব্যবস্থা করেছেন। ওহী আসে আল্লাহর তরফ থেকে মহাপুরুষদের কাছে।
লাইবনিজ বলেছেন, ‘ধর্মতত্ত্ব কোন কোন মহাপুরুষদের কাছে প্রকাশ করেন।’ এই মহাপুরুষগণ হলেন নবী-রাসূল; নবী মানে হল সংবাদ বাহক আর রাসূল মানে হল দূত। নবী ও রাসুলগণ আল্লাহর প্রেরিত দূত বা বাণীবাহক। আল্লাহর সম্পর্কে সুধারণা লাভ করতে হলে জীব-জগৎ সম্পর্কে এবং এর রহস্য উদ্ঘাটন করতে হলে, অদৃশ্য বিষয়াবলী সম্পর্কে জ্ঞানলাভকরতে হলে নবী ও রাসূলদের প্রতি ঈমান আনা ছাড়া কোন দ্বিতীয় বিকল্প পথ নেই। নবী ও রাসূলগণ শুধু ধর্মবোধকে জাগ্রত করেন না, ধর্মের পথে সুন্দরভাবে পরিচালিত করেন। সমস্ত প্রকার সৎ আচরণ, সমুন্নত নৈতিক চরিত্র গঠনের জন্য নবী ও রাসূলগণ আল্লাহর কাছ থেকে যে বাণী, কথামৃত লাভকরেছেন, একমাত্র সেগুলিকেই গ্রহণ করতে হবে।
মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠন, মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় আল্লাহর প্রদত্ত জীবনবোধ, জীবন দর্শন ও নীতিমালাকে আশ্রয় করতে হবে। দার্শনিকদের অনুমান নির্ভর চিন্তা-ভাবনায় বিশ্বাসী হলে বিপথগামী হতে মানুষ বাধ্য। বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আজ একযুগে ঠিক, তো আগামী দিনে ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত। সুতরাং বৈজ্ঞানিক নির্ভর তত্ত্বে বিশ্বাস স্থাপন সঠিক অর্থে সত্য নাও হতে পারে। বিজ্ঞান হল বিশেষ জ্ঞান। আর ওহী হল আল্লাহ প্রদত্ত সত্যজ্ঞান। ওহী বা প্রত্যাদেশ নির্ভুল। অবশ্য এটাও ঠিক যে বিজ্ঞান যে তত্ত্বকে ফ্যাক্টে উপনীত করে তা সঠিক। যেমন পৃথিবীর আহ্নিক গতি বা বার্ষিক গতি হল ফ্যাক্ট-এর এই ধারণায় কোনও ত্রুটি নেই। এই জায়গায় বিজ্ঞানের সঙ্গে ইসলামের কোনো বিরোধ নেই। কোরআন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান-গবেষণায় উৎসাহিত করেছে, অনুৎসাহিত করেনি। এইজন্য বিজ্ঞান ও ধর্মের সঙ্গে বিরোধ ইসলামে নেই। আর মুসলিম দুনিয়ায় মধ্যযুগে কোনও বিজ্ঞানীকে এজন্য পুড়িয়ে মারা হয়নি। গীর্জার যাজকতন্ত্র যেভাবে মধ্যযুগে বিদ্বান ব্যক্তি ও বিজ্ঞানীদের উপর ধর্মের নামে অত্যাচার করেছে। ইসলামের ইতিহাসে তেমনটি দেখা যায় নি। ইনকুইজিশন করে খ্রীষ্টান দুনিয়ায় কত বিদ্যোৎসাহীদের মারা হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। কিন্তু মুসলিম দুনিয়ায় তা ঘটেনি।
কোরআনে জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা এসেছে। জ্ঞানতত্ত্ব আল্লাহর দেওয়া মানব কল্যাণার্থক হয়ে উঠেছে। কোরআনে জ্ঞানতত্ত্বতাওহীদ (একত্ববাদ), রেসালত (নবীতত্ত্ব) এবং পরকাল কেন্দ্রীক যেমন, তেমনি মানুষের বৈষয়িক কার্যকলাপকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। ভ্রূণতত্ত্ব, ইতিহাসবিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান, ভূগোল, জীববিদ্যা, প্রকৃতিবিজ্ঞান, সমুদ্রবিজ্ঞানের বিষয়গুলি কোরআনে আলোচিত হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে যে, কোরআন বিজ্ঞানের কিতাব নয়। আল্লাহর একত্ব এবং তাঁর সৃষ্টিকৌশলকে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর জন্য ঐসব বিষয়গুলি আলোচিত হযেছে। প্রকৃতিতে কোন জিনিসের আচ্ছাদনকে সরিয়ে উন্মুক্ত করার নাম হল আবিষ্কার বা ডিসকভার। এর দায়িত্ব আল্লাহ মানুষদের দিয়েছেন যাতে মনুষ্য সমাজ সভ্যতার দিকে ক্রমান্বয়ে উন্নত হতে পারে। মানুষের জীবন স্বাচ্ছন্দ্যময় হতে পারে। এর জন্য যে মেধার প্রয়োজন তা মানুষকে তিনি দিয়েছেন। এজন্য মানুষকে সৃষ্টির সেরা-‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বলা হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও তার প্রয়োগ পদ্ধতি কিরূপ হবে তার জন্য আল্লাহ নীতিমালা দিয়েছেন। তাঁর বাণীবাহক নবীগণ মৌলিক নীতিমালার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেই ব্যাখ্যা মানুষদের শুধু গ্রহণ করা উচিতই নয়, এতেই তাদের দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
ইসলামী দর্শনে ইবাদত ও আখেরাতে বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইবাদত তথা আল্লাহর আনুগত্য, পূজা-উপাসনা, স্তব-স্তুতি করতে হবে নিষ্ঠা সহকারে। আল্লাহর নৈকট্য পেতে কোনও মধ্যসত্তার প্রয়োজন নেই। পোপ-পাদ্রী, যাজক, পুরোহিত, দরবেশ, সাধকদের ধরে আল্লাহর নিকট মুক্তি পেতে হবে-এমন ধারণাতে সমূলে কুঠারাঘাত করা হয়েছে। কেননা এরাই আল্লাহর জায়গায় যুগে যুগে উপাস্যরূপে মানুষের কাছে নিজেদের অস্তিত্বের কোথাও কোথাও জানান দিয়ে থাকে। ধর্মীয় কুসংস্কার, শোষণ, ধর্মীয় ব্যবসা এর ফলে যুগে যুগে গড়ে উঠেছে। আর নব নব ধর্মমতের উদ্ভব হয়েছে।
আল্লাহর নিকট একটাই দ্বীন, জীবন বিধান, ধর্ম হল ইসলাম। ইসলাম হল স্বভাবের ধর্ম। বিশ্বপ্রকৃতি এই ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত। অংশীবাদ, পৌত্তলিকতা হল বিশ্ব প্রকৃতি বিরুদ্ধ, মানুষের স্বভাব বিরুদ্ধ বিশ্বাস। মানুষের নৈতিক চরিত্রকে সমুন্নত করতে হলে পরকাল বিশ্বাস ছাড়া সম্ভব নয়। আল্লাহর কাছে পরকালে নিজ নিজ জীবনের সকল কাজের হিসাব দিতে হবে-এই প্রত্যয় ছাড়া মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠন হতে পারে না। যারা বলে মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি হলে, রুটি-রুজির সমস্যার সমাধান করে দিলে, অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করে দিলে সমাজে খারাবী থাকবে না, এমন মতবাদ আশ্রিত চিন্তা-ভাবনা বাস্তবে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে তা স্বতঃসিদ্ধ।
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ভয়, তাঁর প্রতি প্রেম, আর তাঁর কাছে জবাবদিহীর তীব্র চেতনা মানুষকে নৈতিক চরিত্রে উন্নত করে দেয়। আর যদি মানুষ সাময়িক মানবীয় দুর্বলতাবশত ভুল করে বসে, অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, তখন সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে যায়। অবশ্য শর্ত হল খাঁটি হৃদয়ে তওবা করতে হবে। আর ভুল, অন্যায় না করার দৃঢ় সংকল্প নিতে হবে। ইসলামী দর্শনে বিচার-বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে বলা হয় নি এমন নয়। তবে তাকে ওহীর অধীন হতে হবে। স্বাধীন চিন্তা লাগামহীন ঘোড়ার মতো যেদিকে পারে নিয়ে যাবে। আর পৌরাণিক কাহিনী, দার্শনিকদের অনুমান নির্ভর কথা মানুষদের গোমরাহ-পথভ্রষ্ট করেই ছাড়ে।
লেখক সাপ্তাহিক ‘মীযান পত্রিকার’ সম্পাদক