
লেখক: মিলন দত্ত
নবী মুহাম্মাদকে নিয়ে বিজেপি মুখপাত্রের আলটপকা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে গোটা দেশজুড়ে যে কাণ্ড ঘটেছিল তা এত তাড়াতাড়ি বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। ভারতীয় জনতা পার্টি সব সময়েই কোনো না কোনোভাবে বিভাজনের কৌশল খুঁজতে থাকে। এবার নূপুর শর্মার বাক্যবাণই ছিল সেই অমোঘ কৌশল। মুহাম্মাদকে নিয়ে বিজেপি মুখপাত্রের আলটপকা মন্তব্যে আহত ব্যথিত ক্ষুব্ধ মুসলমানরা কার্যত বিজেপি ও আরএসএস-এর মেরুকরণের কাজটি অনেকটাই সহজ করে দিয়েছিল। এটা ছিল বিভাজনের নতুন কৌশল হিন্দুত্ববাদীদের।
লখনউতে যোগী আদিত্যনাথ যেদিন মুসলমান নারীদের কবর থেকে তুলে ধর্ষণ করার নিদান দিয়েছিলেন, আগেই ধ্বংস করে দেওয়া বাবরি মসজিদের জমি যেদিন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বেহাত হয়ে যায় কিংবা ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গরু সম্পর্কিত মিথ্যাচারে ৩৬ জন মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়- মুসলমান কোথাও কোনও প্রতিবাদ করেনি। নূপুর শর্মার মন্তব্যের পরে ভারতের মুসলমানরা প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজের অজান্তে বিজেপির পাতা ফাঁদেই পা দিয়ে ফেলে। গরুর মাংস রাখার দায়ে পিটিয়ে হত্যা, ‘বন্দে মাতরম’ কিংবা ‘জয়শ্রী রাম’ না বলায় প্রকাশ্যে উঠবোস করানো বা মারধর, বুলডোজার চালিয়ে বাড়ি, মসজিদ বা মাদ্রাসার একাংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া চলছেই- এভাবেই ভারতে আজ মুসলমানকে তার নাগরিক অধিকারগুলো থেকে দূরে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা। বিভাজনের বিষ ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের সংবিধান স্বীকৃত অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই কাজ সরকার ও প্রশাসনের সক্রিয়তা ছাড়া সম্ভব নয়। হচ্ছেও তাই।
আজ এ দেশে মুসলমানের নিশ্চিন্তে নির্ভয়ে বেঁচে থাকাটাই দুঃসহ হয়ে উঠেছে। ২০২০ সালে দিল্লি দাঙ্গায় যারা আক্রান্ত তাদেরই গ্রেফতার করা হয় দাঙ্গা করার দায়ে। তাঁদের অনেকেই এখনও জেলে। কয়েক মাস আগে সেখানে মসজিদের সামনে রামনবমী আর হনুমান জয়ন্তীর মিছিল নিয়ে গিয়ে তাঁদের গালাগালি দিয়ে গণ্ডগোল পাকানোর পরে তাঁদের আস্তানা, মসজিদের গেট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ‘সিএএ’, ‘এনআরসি’ করে দেশের মুসলমানদের অ-নাগরিক করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে। দেশের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগুরু রাজ্য কাশ্মীরের ক্ষেত্রে ৩৭০ ধারা লোপ করে সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জম্মু-কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তর করা হয়েছে। মুসলমানদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে হিন্দুত্বের ক্ষমতা। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সিএএ বা ৩৭০ লোপের সাংবিধানিক বৈধতা বিষয়ে নিশ্চুপ।
বাবরি মসজিদের জমিতে মন্দির তৈরির যে রায় সুপ্রিম কোর্ট দিয়েছিল তা আইন ও যুক্তিকে সরিয়ে রেখে, বিশ্বাসের উপর ভর করে। সেই রায়ে বলা হয় মসজিদ ভাঙা ছিল বেআইনি অপরাধমূলক কাজ। কিন্তু আদালতে কোনও অপরাধীর সাজা হয়নি। বুঝতে অসুবিধা হয় না, বেআইনিভাবে মসজিদ ভাঙা হলেও যে উদ্দেশ্যে তা ভাঙা হয়েছিল তাতে সর্বোচ্চ আদালতের সায় রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইন নস্যাৎ করে জ্ঞানবাপী মসজিদে সমীক্ষা শুরু হয় এবং সেই কাজেও আদালতের সায় ছিল। তারপর থেকে সেখানে এবং দেশের নানা মসজিদে শিবলিঙ্গের সন্ধান পাওয়া বিজেপির মুসলিম বিরোধী দীর্ঘমেয়াদী কৌশলেরই অংশ।
মুসলিমদের কোণঠাসা করতে, আত্মপ্রত্যয় ভেঙে দিতে রাজ্যে রাজ্যে আইন তৈরি হচ্ছে। মুসলিম তরুণদের প্রেম করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তাঁরা হিন্দু তরুণীদের সঙ্গে মেলামেশা করলে বা বিয়ে করতে চাইলে ‘লাভ জিহাদ’-এর আইন দিয়ে তা প্রতিহত করা হবে- জেলেও পাঠানো যাবে। মুসলমানরা সরকারি চাকুরি পরীক্ষায় ভাল ফল করলে তাকে বলা হচ্ছে ‘সিভিল সার্ভিস জিহাদ’। পার্কে বা খোলা জায়গায় নামায পড়ায় বাধা। মন্দিরের উৎসবে মুসলমানদের কেনাবেচায় নিষেধাজ্ঞা। গরিব শ্রমজীবী মুসলমানদের দোকানপাট বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এ ব্যাপারে দেশের সংখ্যাগুরুদের অবস্থান দেখে এটা পরিষ্কার হয়েছে যে, বিভাজন দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। তাতে তারা বিশেষ অনুশি নয়; বরং সন্তুষ্টই বটে। গত কয়েক বছর ধরে মুসলমানদের উপরে যে লাগাতার অত্যাচার হচ্ছে, তাঁদের রুটি-রুজি, পোশাক, খাদ্য, বাসস্থান উপাসনাস্থল কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তাঁদের আতঙ্কিত করা হচ্ছে, তা নিয়ে ভারতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে কোনও প্রতিবাদ নেই; বরং যেন বা সে মর্ষকামী আনন্দে মজে রয়েছে।
উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, দিল্লি বা অসমের মতো বিভিন্ন জায়গায় মুসলমানদের ভীত-ত্রস্ত করার জন্য সরকারের হাতে এখন আরেক হাতিয়ার হল বুলডোজার। এতদিন আমরা হিন্দি সিনেমা বা দক্ষিণী সিনেমায় দেখেছি কোনও ক্ষমতাবান মানুষ কী অনায়াসে বুলডোজার ব্যবহার করে বস্তি গুঁড়িয়ে দিয়ে হাজারো মানুষকে গৃহহীন করছে। বুলডোজার সেখানে ক্ষমতার প্রতীক। সরকার এবং প্রশাসন তা এখন বাস্তবে কাজে লাগাচ্ছে ‘বেয়াদব’ মুসলমানদের ‘শায়েস্তা’ করার জন্য। গত দু’বছর ধরে চলছে- লখনউয়ে স্থানীয় এক নেতা জাভেদ আহমেদ মুহাম্মদকে নিয়ে বিজেপি নেতার মন্তব্যের প্রতিবাদে পথে নামায় তাঁর তিনতলা বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া, আগাম নোটিশ ছাড়া এভাবে কি কারও বাড়ি ভেঙে দেওয়া যায়?
বাড়ি তো কেবল ইট-কাঠ-পাথর-সিমেন্টের একটা কাঠামো নয়। সেখানে রাজমিস্ত্রীর কারুকাজ কিংবা দেওয়ালের মসৃণ চুনকামও তার পুরো কথা বলতে পারে না। একজনের স্বপ্ন ভাবনা সবই ওই বাড়ির অভ্যন্তরে ধারণ করা থাকে। ওই বাড়ি সূর্যের প্রখর তাপ থেকে রক্ষা করে, কঠিন ঠান্ডা থেকে বাঁচায়, যে সমস্ত স্মৃতি নিয়ে এক জন বেঁচে থাকে- ওই বাড়ি সেগুলোকে ধরে রাখে। প্রাসাদ হোক বা কুঁড়ে ঘর, ওই বাড়ির মধ্যে সে তার মতো করে শ্বাস নিতে পারে, হাসতে পারে, কাঁদতে পারে, যাবতীয় আবেগ সে প্রকাশ করতে পারে- বাইরের কেউ তা জানতেও পারে না। সেই কারণে মানুষ তার মতো করে একটা ঘর খোঁজে। সেই বাড়িতে সে একা থাক বা অনেকে মিলে বাস করুক- সেটা তার একান্ত নিজের জায়গা। বুলডোজার চালিয়ে যখন সেই বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় তখন কেবল একটা নির্মাণ ভেঙে পড়ে না- তার যা কিছু, সর্বস্ব গুঁড়িয়ে চুরমার হয়ে যায়। তছনছ হয়ে যায় তার অস্তিত্ব, তার অধিকার বোধ। ঠিক ওই রকম আরেকটা বাড়ি আর গড়ে তোলা যায় না কখনও।
মুসলমানদের উপরে অত্যাচার দেখেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের নিস্পৃহতা বা পরোক্ষে মদত, পুলিশ, মানবাধিকার কমিশন, নারী কমিশন, নিম্ন আদালত থেকে উচ্চতম আদালতের সর্বত্র সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব স্পষ্ট। দেশের কয়েকটি দল বাদ দিলে প্রায় সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ঝোঁক বাড়ছে। তার ফলে দেশের কুড়ি কোটি মুসলমান আজ ভাবতে বাধ্য হচ্ছে যে এদেশে তারা ব্রাত্য দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাদের সংবিধান স্বীকৃত অধিকারও সংখ্যাগরিষ্ঠদের থেকে একটু কম। মানবাধিকারের জরুরি প্রশ্নটা ক্রমেই অলীক হয়ে যাচ্ছে তাদের কাছে। এই পরিস্থিতি মুসলমানদের আজ চরম নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠের মনে সংখ্যালঘুর প্রতি ঘৃণার বিষ ঢুকিয়ে সমাজে বিভাজন সৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ এবং ভারতীয় জনতা পার্টি অনেকটাই সফল। ক্রমাগত মুসলমানদের জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে- আক্রমণ করা হচ্ছে। গরুর মাংস রাখার মিথ্যে অভিযোগে উত্তরপ্রদেশের দাদরিতে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আখলাক হত্যা দিয়ে শুরু হয়েছিল, যার বিচার শুরু হতে সাড়ে পাঁচ বছর লেগেছে। এর পরে প্রতিদিনই মুসলিমদের উপরে অত্যাচার বেড়েছে। একদিকে মারধর, হত্যা অন্যদিকে। অন্যদিকে কোভিড কালে তবলীগ জামাতের জমায়েতকে কেন্দ্র করে ‘করোনা জিহাদ’ বলে তাঁদের দায়ী করা কোভিড সংক্রামক হিসেবে। রটনাগুলি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হিন্দু সংখ্যাগুরুদের স্বঘোষিত প্রতিনিধিত্বকারী আরএসএস-বিজেপি এটাই চেয়েছিল। সে কাজে তারা অনেকটাই সফল।
অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, মুসলমানদের আজ খুব মারা যায়। রাস্তায় কান ধরে উঠবস করানো যায়। বুলডোজার সহজে অপমান করা যায়। যে কোনো মুসলমানকে পিটিয়ে চালিয়ে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। আইন কোনো বাধা হয় না, পুলিশ-প্রশাসন এমনকী আদালতও আপত্তি করে না; জনপরিসরেও তার প্রভাব পড়ে সামান্যই।
ঘৃণা-বিদ্বেষে ভরা এই পরিবেশ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। লালকৃষ্ণ আদবানীর সময়কাল থেকে, আরও ঠিক ঠিক বলতে গেলে নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই ভারতবর্ষের সামাজিক পরিবেশ ঘৃণায় ভরে ওঠে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে মুসলিম জনমানসে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা গ্রাস করে। গত কয়েক বছরে কী ভয়ঙ্কর নির্মম নিষ্ঠুরতা দেশ জুড়ে বিরাজ করছে, কমবেশি সকলেই অবগত। তারপরেও তা নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হেলদোল নেই। সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্ত নিয়ে তারা চিন্তিত নয়। সেই সমস্যা তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় পড়ে না।
সাম্প্রদায়িক বিভাজন, জোর করেই হোক বা অন্যভাবে- তার দরুণ সংখ্যালঘু তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেই। এ রাজ্যের মুসলমানদের অবস্থার ওপর একটু আলোকপাত করলে তা কিছুটা পরিষ্কার হতে পারে।
ভারতে মোট মুসলমান জনসংখ্যার ৩৬% শহরবাসী। পশ্চিমবঙ্গে ১৭%। ভারতে কিন্তু শহরবাসীর জাতীয় গড় ২৮%। এ রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান যে গ্রামে বাস করে তার কতগুলো ঐতিহাসিক কারণ অবশ্যই আছে। ঐতিহাসিক কারণেই শহর কলকাতা কার্যত উর্দুভাষীদের দখলে। স্বাধীনতার আগে কলকাতায় যে বাঙালি মুসলমান বাস করতেন তাঁদের বড় একটা অংশ ছিল সম্পন্ন অভিজাত শিক্ষিত। দেশভাগ এবং তারপরের কয়েকটি দাঙ্গার জেরে তাঁরা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান। পরবর্তীকালে লেখাপড়া এবং চাকরির টানে গ্রাম থেকে যে বাঙালি মুসলমান শহরমুখী হয়েছে তার সংখ্যা এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য নয়। গ্রামে বাস করার ফলে মুসলমানের কৃষির উপর নির্ভরতা, স্বাস্থ্য পরিষেবা আর ব্যাপক নিরক্ষরতার কারণে তাদের অক্ষমত আর বঞ্চনার শিকার হতে হয়। শহরে বাস করলে শিক্ষা, স্বায় এবং অন্যান্য পরিষেবা ছাড়াও চাকরি এবং উপার্জনের ক্ষেত্রে কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়ে স্বচ্ছল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। তা থেকে তারা বঞ্চিত। ফলে রাজ্যের সামাজিক-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের যে আনুপাতিক অংশগ্রহণ থাকার কথা; তা থাকে না। কারণ, সমাজ-রাজনীতির উপরতলায় এই গ্রামীণ বঞ্চিত মানুষদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ প্রায় নেই, তন্ত্র সরকারি নীতিকে নিজেদের অনুকূলে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও তাদের কম।
‘স্ম্যাপ’-এর ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘লিভিং রিয়ালিপ্ত অব মুসলিমস ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’ নামে একটি প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সমাজে শিক্ষার পরিকাঠামো, স্বাস্থ পরিষেবা, গ্রামগুলোর অবস্থা, রাস্তাঘাটের হাল, বিদ্যুতের অবস্থা, পানীয় জল, সেচ ব্যবস্থা এবং পেশাগত অবস্থার বিস্তারিত পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে তার বিশ্লেষণ করা হয়। তার বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। এর আগে সাচার কমিটির রিপোর্ট থেকে রাজ্যের মুসলমানদের যে অবস্থার কথা জেনেছিলাম তার থেকে বিশেষ উন্নতি হয়নি।
‘স্ন্যাপ’-এর প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার মান অত্যন্ত করুণ। যে পরিবারগুলোতে সমীক্ষা চালানো হয়েছে তার প্রতি পাঁচটি পরিবারের একটি পূর্ণবয়স্ক স্বাক্ষর ব্যক্তি পাওয়া যায়নি। শিক্ষার অধিকার আইনে বলা হয়েছে, ৩০ জন ছাত্র পিছু একজন শিক্ষক থাকতে হবে। প্রাথমিক স্তরে এই অনুপাত ৪৬: ১। প্রাথমিক শিক্ষার সর্বনিম্ন স্তর শিশুশিক্ষা কেন্দ্র ও প্রাথমিক স্কুলগুলোতে একটা ঘরে ৭০ জন শিশুকে বসতে হয়। এক হাজার জনসংখ্যার ৩% গ্রামে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পাওয়া যায়নি। মুসলমানদের শিক্ষার অগ্রগতির জন্য সরকারি পরিকাঠামো অপ্রতুল, শিক্ষাদানের মানও আশাব্যঞ্জক নয়। অন্যদিকে গ্রামীণ মুসলমানদের মধ্যে ছাত্র ভর্তির হার রাজ্যের গড়ের থেকে বেশি। বিশেষত মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে মুসলমান ছাত্রীদের হার আশাব্যঞ্জক। মুসলমান মেয়েদের শিক্ষায় আগ্রহ নেই বলে যে প্রচলিত ধারণা রয়েছে তা ভুল। সরকারি চাকরিতেও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানের অবস্থা নিতান্তই খারাপ। সাচার কমিটির রিপোর্ট থেকে জেনেছিলাম, এ রাজ্যে সরকারি চাকরিতে মুসলমান মোটামুটি ২ শতাংশ।
তারপরে মুসলিমদের ওবিসি-ভুক্ত করা সত্ত্বেও উন্নতি হয়েছে সামান্যই। এ রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নিজেকে মুসলমান দরদী দেখানোর যতটা চেষ্টা করেছেন, সংখ্যালঘু ওই সম্প্রদায়ের সার্বিক উন্নতির দিকে তাকানোর ততটা ফুরসত তাঁর হয়নি। ফলে এ রাজ্য রয়ে গেছে খাড়াখাড়ি বিভাজিত একটা সমাজ।
সেখানে মুসলমানের অর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নামে শাসক দল বা সরকারি ঢাকের শব্দে প্রকৃত অবস্থা চাপা পড়ে যায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, বাংলার শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোকেরা কিন্তু সেই ফাঁপানো প্রচার বিশ্বাস করেন এবং ‘মুসলিম তোষণ’-এর একটা ভ্রান্ত তত্ত্বে অগাধ আস্থা রাখেন। ফলে অধিকারের প্রশ্নে এ রাজ্যের মুসলমানরা যে বিশেষ ভাল অবস্থায় আছে এমনটা দাবি করার উপায় নেই।
আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালা এবং কেন্দ্রশাসিত পুদুচেরিতে আইএএনএস-এর পক্ষ থেকে Cvoter-এর করা এক সমীক্ষায় যে তথ্য উঠে এসেছে তা জানাচ্ছে, দেশের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি নিয়ে মানুষ বিশেষ চিন্তিত নয়। সমীক্ষা অনুসারে, এই চার রাজ্য এবং পুদুচেরিতে মূল্যবৃদ্ধিই প্রধান সমস্যা। এরপর আছে বেকারত্ব, দুর্নীতি। উদ্বেগের কারণ হিসেবে সব শেষে স্থান পেয়েছে ধর্মীয় সংঘাত এবং মহিলাদের নিরাপত্তা।
দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার খবর পাওয়া সত্ত্বেও কেরালা ছাড়া সাধারণভাবে অন্যান্য রাজ্যের অধিবাসীরা বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নন। উত্তরদাতাদের মধ্যে মাত্র ১৪.৩৫ শতাংশ একে উদ্বেগের কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তামিলনাড়ুর উত্তরদাতাদের মধ্যে মাত্র ৪.৩৭ শতাংশ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তারপরে পশ্চিমবঙ্গ (৩.৪৭ শতাংশ), আসাম (১.৭৭শতাংশ) এবং পুদুচেরি (০ শতাংশ)। আমাদের চারপাশে ভাল করে তাকালে এই পরিসংখ্যানের সত্যতা নিয়ে সংশয় থাকে না। কিন্তু এর থেকে কি এমন কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, দেশে বিভাজন সম্পূর্ণ হয়েছে, যে বিভাজন মানবাধিকারের বিন্নতাকে নিশ্চিত করছে?
দেশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার একটা হিসেব এখানে দেওয়া যেতে পারে। ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে দেশে ২ হাজার ৯০০ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু মব লিঞ্চিং বা গণ প্রহারে মৃত্যুর কোনও তথ্য সরকারের কাছে নেই। এটি ছিল ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর দেওয়া তথ্য। সেখানে বলা হয়, ২০২১ সালেই দেশে মোট ৩৭৮টি সাম্প্রদায়িক এবং ধর্মীয় দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে। আর ২০২০-তে ৮৫৭ টি, ২০১৯-এ ৪৩৮টি, ২০১৮-য় ৫১২টি এবং ২০১৭ সালে ৭২৩টি দাঙ্গার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। লোকসভায় পেশ করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের আর একটি কথা থেকে জানা যাচ্ছে: ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের সময়কালে ৩ হাজার ৩৯৯টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। যে পক্ষই শুরু করুক; সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিণতি সব সময়েই সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে থাকে। কোনও দেশে এই বিপুল সংখ্যায় দাঙ্গার ঘটনা ঘটলে সে দেশ কি সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে!
আবারও সেই রবীন্দ্রনাথেরই শরণাপন্ন হতে হয় আমাদের। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই মনে করতেন, হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ বা বিভাজন দূর হতে পারে মেলামেশা, চেনাজানার মধ্য দিয়ে। সেটাই একমাত্র পথ। এই লেখা শেষ করব কবির বিশ্বভারতী পরিষদে ১৩৩২ সনে বক্তৃতার একটি উক্তি দিয়ে, ‘যে অন্ধকারে ভারতবর্ষে আমরা পরস্পরকে ভালো দেখতে পাইনে সেইটাই আমাদের সকলের চেয়ে দুর্বলতার কারণ। … ভারতবর্ষের সেই রাত্রি চিরন্তন হয়ে রয়েছে। মুসলমান বলতে কী বোঝায় তা সম্পূর্ণ করে আপনার করে অর্থাৎ রামমোহন রায় যেমন করে জানতেন, তা খুব অল্প হিন্দুই জানেন। হিন্দু বলতে কী বোঝায় তাও বড়ো করে আপনার করে, দারাশিকো একদিন যেমন করে বুঝেছিলেন, অল্প মুসলমানই জানেন। অথচ এই রকম গভীরভাবে জানার ভিতরেই পরস্পরের ভেদ ঘোচে।’ সমস্যার সমাধান নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক ভাবে ভেবেছেন, আমরা হয়ত আজ ভিন্নতর কোনও সমাধানের পথ খুঁজি। কিন্তু সে সমস্যা তো বহমান কবির সময় থেকে আজ পর্যন্ত। চেনাজানা আজও হয়ে ওঠেনি! আজ সমস্যা এতটাই গুঢ় এবং জটিল যে, তা দেশের মুসলমানের মৌলিক অধিকারটুকুও হুমকির মুখে।
১৩৩৯ সনে প্রবাসী পত্রে প্রকাশিত ‘সমস্যা’ নামে একটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘ভারতবর্ষের কল্যাণ যদি চাই হিন্দু-মুসলমানের কেবল যে মিলিত হতে হবে তা নয়, সমকক্ষ হতে হবে। সমকক্ষতা তাল-ঠোকা পালওয়ানি ব্যক্তিগত সমকক্ষতা নয়, উভয় পক্ষের সামাজিক সমকক্ষতা!’ ১০০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে আমাদের আজও সেই কথাই আওড়াতে হচ্ছে। তবু তা সম্ভব হচ্ছে না।
লেখকের নিজস্ব অভিমত





