
ভারতবর্ষের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে স্বীকৃত ২২টি ভাষার মধ্যে অন্যতম ‘বাংলা’ ভাষা। অন্যদিকে, গতবছর অক্টোবর মাসে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের পক্ষ থেকে দেশের ১১তম ভাষা রূপে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা লাভ করেছে আমাদের এই বাংলা ভাষা। অন্য একটি পরিসংখ্যান অনুসারে, সারা বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৯০ মিলিয়ন মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। ব্যবহারের নিরিখে বিশ্বে বাংলা ভাষার অবস্থান সপ্তম। উল্লেখিত ঘটনাপ্রবাহ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আত্মশ্লাঘার। তবে স্বাধীনতার সাড়ে সাত দশক পেরিয়ে, এই আত্মশ্লাঘা নিদারুণ আত্মগ্লানিতে রূপায়িত হয়েছে বাংলার লাখো লাখো পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনে। একটু ভালো থাকার জন্য, পরিবারের সদস্যদের ভালো রাখার জন্য যারা মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ভিন রাজ্যের অস্থায়ী আস্তানায় মানবেতর জীবন যাপন করে শত শত মাইল দূরে থাকা আত্মীয়, পরিজন, সন্তান, সন্ততিদের মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে তোলে, আভিধানিক অর্থে তারাই পরিযায়ী শ্রমিক। এদের কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন ভিন্ন হলেও, সকাল সাঁঝ এদের জীবনের ললাট লিখন চরম অনিশ্চয়তার পেন্ডুলামে দুলতে থাকে।
বিগত কয়েক বছর ধরে ভিন রাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি ধারাবাহিক কিছু ঘটনাক্রম প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতার সাড়ে সাত দশক পরেও বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা ভাষার প্রশ্নে, ধর্মের প্রশ্নে প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হচ্ছে। এই বিদ্বেষের বলি কখনো মহারাষ্ট্রে কাজে যাওয়া মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার পরিযায়ী শ্রমিক নাজিমউদ্দিন মন্ডল কখনো আবার দেবাশিস দাস, উত্তম ব্রজবাসী, সামিম খান। তারা সকলেই আজ খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে। মালদার পরিযায়ী শ্রমিক আমির শেখ কে তো পে-লোডার দিয়ে সীমান্তের কাঁটাতারের ওপারে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ!
ভারতীয় সংবিধানের ১৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দেশের যে কোনো নাগরিকের রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে কোনও একটি অঞ্চল থেকে অপর কোনো একটি অঞ্চলে বিচরণ করার, বসবাস করার এবং জীবনজীবিকা নির্বাহ করার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। সেই সাথে সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ অনুচ্ছেদে ৫৫ নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার সংক্রান্ত বিষয় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এই অধিকার নাগরিকদের তাদের পছন্দসই ধর্ম অনুসরণ, প্রচার এবং অনুশীলন করার স্বাধীনতা দেয়। অথচ আমরা দেখছি, বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যগুলোতে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের ভাষা এবং ধর্মের প্রশ্নে কী নিদারুন অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। কয়েকমাস পূর্বে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীর পরিযায়ী শ্রমিক আবির মল্লিককে কথিত গোমাংস খাওয়ায় সন্দেহে হরিয়ানার অঘোধিত গোরক্ষক বাহিনী নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। অথচ, একজন নাগরিকের খাদ্যাভ্যাস তার সংবিধান স্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার। একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্যি যে, যে রাজ্যে শ্রমশক্তি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল, সেখানে শ্রমিক জনতার চাহিদা স্বভাবতই উধুমুখী। ফলে, উক্ত রাজ্যগুলোতে শ্রমিকের দৈনিক মুজরিও বেশ চড়া। সঙ্গতকারণেই, রুটি রুজির টানে কর্মহীন জনতা ছুটে যায় সেই সকল ভিন রাজ্যে। কখনো সখনো সেই পরিযাণ দেশের গন্ডি পেরিয়ে যায়। কেরল, অস্ত্রপ্রদেশের মতো রাজ্য থেকে অনেকেই পশ্চিম এশিয়ার উপসাগরীয় দেশসমূহে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমান। এরফলে, সেই রাজাগুলোতে শ্রমিকের সেই শূন্যতা পূরণ করে দেশীয় পরিযায়ী শ্রমিকরা। ভারতবর্ষের মতো জনবহুল দেশে এই স্থানান্তর খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। সঙ্গতকারণেই কৃষি, নির্মাণ, তৈরি পোশাক শিল্পে দেশজুড়ে পরিযায়ী শ্রমিকরা কাজ করে চলেছে। এই বঙ্গে ও ভিন রাজ্যের অনেক পরিযায়ী শ্রমিকরা দীর্ঘদিন যাবৎ সসম্মানে কাজ করে চলেছে। তাদের সাথে অপ্রীতিকর ঘটনার ঘটনার নজির নেই বললেই চলে। একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্যি যে, দেশের অন্যান্য যে কোন রাজ্য থেকে বাঙালি জনমানসে জাতিভেদ লিঙ্গভেদ প্রথা কখনোই সেইভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেনি। তবে, ইদানিং রাজ্যের বিশেষ বিশেষ মহল থেকে সম্প্রীতির বাংলায় তাদের ঘৃণ্য উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমার দেখছি, অধিকাংশ বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিক যারা ঘটনাচক্রে সিংহভাগ মুসলমান তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিরূপ আচরণ করা হচ্ছে। অনেক পরিযায়ী মুসলমান শ্রমিকদের কখনো গোহত্যা, কখনো গোমাংস খাওয়ার প্রচলিত সন্দেহের বশবর্তী হয়ে পিটিয়ে মারা হচ্ছে। পাশাপাশি দাঁড়ি, টুপি, নামাজের মতো একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অনুশীলন করতে গিয়ে তাদের পদে পদে হেনস্থা, নির্যাতন এমনকি উগ্রবাদীদের হাতে প্রাণ পর্যন্ত হারাতে হচ্ছে। এই বঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের মতো আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলো থেকে লাখো লাখো মানুষ ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে জীবন-জীবিকার সন্ধানে নিত্যদিন পাড়ি জমান। এই পরিযায়ী শ্রমিকরা দেশের বিভিন্ন শহরে নির্মাণশ্রমিক, কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন, ফেরিওয়ালা হিসেবে রাতদিন কঠোর পরিশ্রম করেন। অথচ, তাদের জীবনযাত্রার মান তলানিতে। শ্রমের বিনিময়ে তাদের মজুরি ফোটে ন্যূনতম। অন্যদিকে, স্থানীয় জনগণ ও পুলিশের বৈষম্য তাঁদের নিয়ত ভীত সন্ত্রস্ত করে রাখে। তবু তারা দিন বদলের স্বপ্ন দেখে। তাদের সন্তান সন্ততিদের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায়। তাদের মেখে দু’বেলা অন্ন তুলে দিতে চায়। তাই তারা এই সংগ্রাম চালিয়ে যান।
দেশজুড়ে মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের বিদ্বেষের নেপথ্যে ‘অনুপ্রবেশ’, ‘মুসলিম তোষণ’ শব্দগুলোর অলিখিত প্রভার রয়েছে। অথচ, কেন্দ্রীয় নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট অনুসারে, দেশজুড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জাতীয় গড় যখন ০.৯ শতাংশ, সেখানে বাংলায় এই গড় ০.৫ শতাংশ। কিন্তু বিজেপি এবং তার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন তৎসহ অন্যান্য ডানপন্থী রাজনৈতিক দল এই মর্মে নিরন্তর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গতকারনেই, দেশের বৃহৎ অংশের জনসাধারণের মধ্যে তৈরি হচ্ছে সারবত্তাহীন মুসলিম বিদ্বেষ। ২০০৬ সালে প্রকাশিত সাচার কমিটির রিপোর্ট মুসলিম তোষণের’ ‘খেয়ালি পোলাও’ যে ভিত্তিহীন সেই মর্মে সত্যতা তুলে ধরেছে। এই রিপোর্টটি নিঃসন্দেহে দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের দুঃসময়ের যাপননামার দলিল। তাছাড়াও, সরকারের বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, সিংহভাগ মুসলমান এই দেশে নিরন্তর ন্যূনতম সুবিধা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে চলেছে। অল ইন্ডিয়া ডেট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট সার্ভে (এআইডিআইএস) এবং পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (পিএলএফএস) এর সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট যে, ভারতবর্ষের প্রধান প্রধান ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে মুসলমানদের সম্পদ এবং খরচের মাত্রা সর্বনিম্ন। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে অবস্থ্য অনন্যা অনগ্রসর শ্রেনীর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের থেকে শোচনীয়। মান্থলি পার ক্যাপিটা কনজামশান এক্সপেন্ডিচার (এমপিসিই) মুসলিমদের ২১৭০ টাকা, অন্যদিকে হিন্দুদের ক্ষেত্রে সেটা ২৪৭০ টাকা। আবার গড় পারিবারিক সম্পদের নিরিখে এই পরিসংখ্যান যথাক্রমে মুসলিম পরিবারের ক্ষেত্রে ১,৫৫৭,৬৩৮ টাকা এবং হিন্দু পরিবারের ক্ষেত্রে তা ১,৯৬৪,১৪৯ টাকা (সূত্র: পিএলএফএস ২০২১-২২, এআইডিআইএস ২০১৯)। এইমুহুর্তে জনসংখ্যার নিরিখে ভারতীয় মুসলিমরা দেশের জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ। অথচ দেশের ভিক্ষুকের মধ্যে ২৫ শতাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ের। বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে কারাগারে রয়েছেন প্রায় ২০ শতাংশ মুসলিম কয়েদি। আদতে, সরকারি পরিসংখ্যানেই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দৈন্যতা স্পষ্টতই প্রতীয়মান। ১৮৮৮ সালে ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার লিখেছিলেন,-অতীতে একজন সম্ভ্রান্ত মুসলমানের দরিদ্র হওয়া ছিল কল্পনাতীত বিষয়। এখন তাদের সম্মানজনক জীবন জীবিকা নিয়ে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব।
দেশজুড়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি রয়েছে খাদ্য সংক্রান্ত নিরাপত্তাহীনতা। এই পরিযায়ী শ্রমিকরা ভিন রাজ্যে বিনামূল্যে খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় না। যেহেতু সরকার প্রদত্ত রেশন কার্ডের সুবিধা তাদের পরিবার পরিজন ভোগ করে থাকে। বেশ কয়েকবছর পূর্বে ভারতের কয়েক মিলিয়ন গ্রামীণ পরিযায়ী শ্রমিক এবং তাদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠন আজিভিকা ব্যুরো একটি সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনে দেখা যায়, পরিযায়ী শ্রমিকদের স্থানীয় অঞ্চলে বসবাসের আইনি কাগজপত্র না থাকার ফলে তারা ভর্তুকি মূল্যে গ্যাসের সংযোগ থেকে বঞ্চিত হন, ফলে তারা রান্নার জন্য অনেক চড়া দামে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হয়। অনেকেই এই অতিরিক্ত খরচ করতে অসামর্থ্য হলে, তারা রান্নার জন্য তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে। দেশের অধিকাংশ শহরে ন্যূনতম জীবনধারণের খরচ বেশি হবার দরুন, তারা অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এরফলে অনেকেই ফুটপাত, স্টেশন বা বাস ডিপোগুলিতে রাত কাটান। এই সকল পরিযায়ী শ্রমিকদের অনেকেই দেনার দায়ে আর ঘরে ফিরতে পারে না। দেশজুড়ে পুরুষ পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশাপাশি একটি বৃহৎ অংশ মহিলা পরিযায়ী শ্রমিক। তারা ঋতুচক্র কিংবা গর্ভকালীন সময়ে ভীষন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনধারণ করে থাকেন। কর্মক্ষেত্রে তারা স্বাস্থ্যসম্মত শৌচালয় কিংবা সন্তানকে দূধ পান করানোর মতো উপযুক্ত পরিসর থেকে বঞ্চিত থাকেন। তাছাড়া এই মহিলারা অনেকেই যৌন নির্যাতন ও পারিবারিক হিংসার শিকার হন। আসলে, নারী-পুরুষ উভয় পরিযায়ী শ্রমিকের জীবনজীবিকা অতীব যন্ত্রণার মধ্যে অতিবাহিত হয়। কেন্দ্রের শ্রম মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী শোভা কারান্দালাজের সাম্প্রতিক একটি বয়ানানুসারে, ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রকের ই-শ্রম পোর্টালে নথিভুক্ত দেশে অসংগঠিত শ্রমিকের সংখ্যা ৩০ কোটি ৯৪ লক্ষ। এই পরিসংখ্যান অনুসারে, ই-শ্রম পোর্টালে নথিভুক্ত অসংগঠিত শ্রমিকের মধ্যে ৪৭.১৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৫২.৮৩ শতাংশ মহিলা। অন্য আর একটি তথ্যানুসারে, শহুরে জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ এবং গ্রামীণ জনপদের ২৮ শতাংশ পরিযায়ী শ্রমিক। নিদারুন আক্ষেপের বিষয় এই যে, একদিকে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্রের বর্তমান শাসকদল নিরন্তর ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ বুলি কপচিয়ে ফালাফালা করে দিচ্ছে। অন্যদিকে, একশো দিনের কাজের প্রকল্পে নিরন্তর বরাদ্দ সংকুচিত করে চলেছে কেন্দ্রের বর্তমান সরকার। সঙ্গতকারণেই, ছলছল চোখে ভালোবাসার ভিটে মাটি ছেড়ে অনেকেই পাড়ি দিচ্ছেন তিন রাজ্যে। বিগত ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে কেন্দ্রের বরাদ্দ ছিল ৭৩ হাজার কোটি টাকা। অদ্ভুতভাবে যা ২০২১-২২ অর্থবর্ষের তুলনায় ২৫.৫১ শতাংশ কম। করোনা কালে কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রকল্পে খরচ করে ৯৮ হাজার কোটি টাকা। অথচ ২০২০-২১ অর্থবর্ষে এই প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ১১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। উক্ত পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার গ্রামীণ ভারতের কর্মসংস্থান প্রশ্নে কতটা আন্তরিক। পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ‘ইন্টার স্টেট মাইগ্র্যান্ট ওয়র্কমেন (রেগুলেশন অফ এমপ্লয়মেন্ট অ্যাক্ট কন্ডিশনস অফ সার্ভিস) (১৯৭৯) নামে একটি গালভরা আইন আছে। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষা, অধিকার ও মজুরি নিশ্চিত করা। তবে, এই মর্মে আজকের বাস্তবতা প্রমাণ করে এই আইন কেবলই একটি ‘আবরণ। সাম্প্রতিক কালে। ‘অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড ওয়র্কিং কন্ডিশনস কোড ২০২০’-র অন্তর্ভুক্ত করা হয় উক্ত আইনকে। যদিও এখনো পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।
সম্প্রতি ভারতবর্ষের পরিযায়ী শ্রমিকদের মানবাধিকার প্রশ্নে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর জুলাই ২০২৫-এর একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ১৫ জুনের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে- বিশেষত আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ এবং দিল্লি থেকে ১,৫০০-এর বেশি বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুকে যথাযথ কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে জোরপূর্বক ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে। সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হতভাগ্য এই নর-নারীরা আদতে বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে ভিন রাজ্যে খাটতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিক। এদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীও রয়েছেন, যারা মিয়ানমারে সংঘবদ্ধ নিপীড়ন থেকে রক্ষা পেতে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এইচ, আর.ডব্লিউ-এর ভাষ্যমতে, বিতাড়িতদের অধিকাংশই ভারতীয়। নাগরিক, তাদের কাছে ভোটার আইডি, জন্ম সনদ শংসাপত্র ছাড়াও অন্যান্য পরিচয়পত্র ছিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ-বিশেষ করে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বি. এস.এফ)-এই নথিগুলো উপেক্ষা করেছে। বিতাড়িত ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাই, শুনানির সুযোগ বা আইনি সহায়তার কোনো অধিকার দেওয়া হয়নি। আসলে, পরিযায়ী শ্রমিকরা প্রায় সকলেই নিম্ন বর্ণের হিন্দু বা মুসলমান। পাশাপাশি পরিযায়ী শ্রমিকরা বেশিরভাগই অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করে। ফলে, দেশের তথাকথিত এলিট’ সম্প্রদায়ের কাছে এদের ব্রান্ডভ্যালু শূন্য। তাই, এদের নিয়ে না হয় প্রাইম টাইমে ঘন্টাখানেক আলোচনা, না হয় পাতা ভর্তি উত্তর সম্পাদকীয় লেখালেখি। অন্যদিকে, এদের ভোটে নির্বাচিত কেন্দ্র, রাজ্য এবং স্থানীয় সরকারও এদেরকে উপেক্ষা করে চলেছে। অথচ, ভারতীয় সংবিধানের ২১ এবং ৩৯ নম্বর ধারা অনুসারে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিকের জীবন জীবিকার প্রশ্নে সুরক্ষা প্রদান। দেশের নাগরিক হিসাবে সংবিধান প্রদত্ত এইটুকু সুরক্ষা কবচ পরিযায়ী শ্রমিকদের অবশ্যই প্রাপ্য। দেশের কেন্দ্র-রাজ্য উভয় সরকারের এই মর্মে নজর দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।




