
লেখক: সেখ আনিসুর
আমি একটি লাল পেন। ব্রহ্মাণ্ডের কলমরাজ্যের এক অবিসংবাদিত সদস্য। নৈরাজ্যে ভরপুর এই পৃথিবীতে যখন হানাহানি আর মৃত্যুমিছিলের সমারোহ, তখন মানুষ অনুধাবন করে কঠোর শাসন আর শাসকের অপরিহার্যতা। আমি আদৌ শাসন করতে পারি কিনা জানি না, তবে কারখানা থেকে পরিপাটি, সুসজ্জিত হয়ে দোকানে পৌঁছে যখন কোনো শিক্ষকের আঙুলের ফাঁকে দৃঢ়ভাবে স্থিত হই, তখন খাতার পাতা যেমন কেঁপে ওঠে, তেমনি ছাত্র-ছাত্রীদের বুকের বাম পাশের ধুকপুকানিও যেন একটু তীব্রতর হয়ে ওঠে।
আমার প্রতিবেশী নীল, গোলাপি, কালো রঙের কলমগুলোর কদর বরাবরই বেশি। চিরকালই পরিবারের শাসনের ভার যার কাঁধে ন্যস্ত থাকে, সে-ই হয়ে ওঠে অপছন্দের পাত্র–এই চিরন্তন সত্য আমার অজানা নয়। তাই গ্রাহকের আঙুলে প্রেমপত্র লিখতে কালো কালি কিংবা নীল কালির পেনই আশ্রয় পায়, লাল কালি দিয়ে আর যায় হোক, প্রেমপত্র লেখা হয় না। বিপদসংকেত আর অশুভ লক্ষণের প্রতীক হয়েই আমি দিব্যি বেঁচে আছি।
ডাই, সলভেন্ট, বাইন্ডারের সম্মিলিত সংযোজনে কারখানার হতদরিদ্র্য শ্রমিকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে জন্ম আমার। শুধু আমারই বা কেন–আমার সমগোত্রীয় প্রতিটি কলম-নাগরিকের জন্মই এভাবেই শ্রমের আঘাতে, অবদমনের ছায়ায়। আমি প্রথম নিজের স্বরূপ অনুধাবন করেছিলাম তখন, যখন উৎপত্তিস্থলের কারখানার মালিক, তার বৃদ্ধ মাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে গিয়ে এক ঘণ্টা দেরিতে পৌঁছানো এক শ্রমিকের মাইনে কেটে নেয়। সেদিন দশটার স্থলে এগারোটায় উপস্থিত হওয়ার অপরাধ লাল কালির দাগে চিহ্নিত করা হয়েছিল–আর সেই দাগ টানার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিলাম আমি।
মালিকের বাম পকেটে তখন নীল এবং কালো কলমও ছিল, তারা নিজেদের অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেছিল, কিন্তু দাগ টানার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল আমাকে। যখন আবার আমাকে পকেটের অন্ধকারে ঠেলে রাখা হলো, তখন অনুভব করলাম বুকের ভেতরে জমে ওঠা বিদ্বেষের অগ্নিশিখা–যা শ্রমিকের মাসশেষের মাইনে পাওয়ার ক্ষীণ আনন্দেও নিভে যায়নি।
রঙিন বাক্সে আমাকে এবং আমার মতো আরও কয়েকটি লাল কলমকে একত্রে ভরে পাঠানো হলো দোকানে। সেখানে দেয়ালে গাঁথা কোনো পেরেকের পাশে বা তাকের এক কোণে পড়ে রইলাম আমি। রংবেরঙের কলমের ভিড়ে মাঝে মাঝে ঘাড় উঁচু করে খরিদ্দারদের দিকে তাকানোর অতৃপ্ত বাসনা জেগে উঠত, আর কখনো সখনো তা পূরণও হতো।
সেদিন রবিবারের রাত্রি। একে একে অনেক কলম দোকান ছেড়ে মানুষের পকেটে স্থান করে নিচ্ছিল। তাদের মালিক হচ্ছিল ছাত্র, অভিভাবক, এমনকি মাতাল থেকে ঘুষখোর–সবাই। রাত্রি প্রায় দশটা। ঠিক সেই সময় এক ব্যক্তি দৌড়াতে দৌড়াতে এসে দোকানদারের কাছ থেকে একটি লাল পেন চাইল। বাক্সের ভেতর থেকে আমি কিংবা আমার সহনাগরিকদের মধ্য থেকে একজন পৌঁছে গেল তার পকেটে। দোকানদার আর ক্রেতার কথোপকথনে জানতে পারলাম–লোকটির ছেলে চাকরি পেয়েছে, এখন সে একজন শিক্ষক। তবে সরকারি নয়–এই কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে দোকানদারের আফসোস যেন কানে বিঁধে গেল। আমি মনে মনে প্রশ্ন করলাম–সরকারি হলেই কি তবে শিক্ষক হওয়া যায়? যারা সাত-আট ঘণ্টা ধরে কলমের নিব দিয়ে খাতার সঙ্গে যুদ্ধ করে, মন্ত্রী-সান্ত্রীদের নম্বরের পাহাড় গড়ে তুলতে গিয়ে নিজেদের নিঃশেষ করে দেয়–তাদের অস্তিত্ব কি তবে কেবল কিছু শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
আমার নামের বিশেষণটি অদ্ভুত–লাল। বঙ্গভূমি চৌত্রিশ বছর লাল শাসনের সাক্ষী। লেডিস ঘড়ি পরা লালে লালেশ্বরী থেকে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, মাতালের রক্তাভ চোখ থেকে রাস্তার রেড সিগন্যাল–সবকিছুর মধ্যেই আমার সেই বিশেষণ অনিবার্যভাবে বিরাজমান।
এই তো সেদিনের কথা–আমার এক বন্ধুর মুখে শোনা, বার্ষিক পরীক্ষার মার্কশিটে এক ছাত্র অঙ্কে পেয়েছে ‘ডি’। বাড়িতে এসে দাদাকে খাতা দেখাতেই দাদা বলল–“ডি?” ভাই মুখের ওপর বললো “তোর মতো তো লাল কালি পাইনি! তুই তো এবার ইলেভেনে লাল কালি পেয়েছিস।” ভীষণ বিদ্রূপে মনে মনে হেসেছিলাম। ভাবছিলাম–যদি কেউ লাল কালিতে ‘A+’ পায়, তবে কি সেটাকে শুভ লক্ষণ বলা হবে, নাকি লাল কালি বলেই সেই ‘A+’ও বাতিলের খাতায় চলে যাবে?
একদিন এক ছাত্র পড়া করে আসেনি। শিক্ষকের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে লাল কালি ডায়েরির পাতার ওপর খসখস শব্দে অভিযোগ লিপিবদ্ধ করে চলেছে। ছাত্রের চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। শিক্ষক ছিলেন অত্যন্ত দরদী–তবে সেই দরদ ফিকে হয়ে গিয়েছিল লাল কালির নিবের গোড়ায়। বাড়িতে সেদিন ছাত্রটি নির্মম প্রহারের শিকার হয়েছিল অভিভাবকের লাঠির দ্বারা।
মাধ্যমিকের পাশ-ফেলের সীমারেখাতেও আমার ক্যারিশমা অত্যন্ত প্রখর। ওই যে–পঁচিশ পেলে পাস, এমন বহু ছাত্র-ছাত্রী আছে, যাদের আমি অঙ্কে পঁচিশ দিই না। আমার মালিক আমার শরীরটাকে শক্ত করে চেপে ধরে একের পর এক ভুল অঙ্ক কেটে দেয়। মানবসমাজের সর্বত্র আমার কদর খুব বেশি নয়, ব্যবহারও সীমিত। তবে ‘শিক্ষক’ নামে এক অদ্ভুত জাতি আছে–যারা আমাদের ছাড়া কার্যত অচল। এখন তো শুনছি, সময়-অসময়ে লাল কালির প্রয়োজন হলে মানুষ দোকানের আগে শিক্ষককেই খোঁজে।
এই তো সেদিনের এক মজার ঘটনা–একজন ছাত্র ইচ্ছাকৃতভাবে প্রজেক্টের ফ্রন্ট পেজে লাল কালির পেন দিয়ে বড় বড় করে নিজের নাম লিখেছিল, চারপাশে সৌখিন নকশা এঁকেছিল। আমার মালিক মহাশয় তার নম্বর কমিয়ে দিলেন। সৌখিনতা আর সৌজন্যতাকে ছাপিয়ে সেদিন আমি তার চোখে এক অদ্ভুত অধিকারবোধের প্রকাশ দেখেছিলাম। নেহাতই শিক্ষক বলে লাল পেন ব্যবহারের অধিকার শুধু তারই থাকবে–এ কেমন যুক্তি! মাঝে মাঝে এইসব উল্টোপাল্টা অনধিকারচর্চা আমার মাথায় ঘুরপাক খায়, আবার নিজেকেই সংযত করি। বাজারদর তেমন নেই, তার মধ্যে আবার রাজনীতিতে জড়ালে যা আছে তাও মাটিচাপা পড়ে যাবে। আমাকে নিয়ে শ্রেণীবিভাজন হয়–বহুমূল্য ঘটনাগুলোই তার প্রমাণ। আমি মশাই শ্রেণীবিভাজন করি কিনা জানি না, তবে আমাকে আঁকড়ে ধরে অনেকেই বিভাজন রচনা করেছে।
কলম বিস্ফোরণ থেকে কলমের ছড়াছড়ির এই যুগেও আমাকে কেনার যোগ্যতা সকলের হয়ে ওঠে না–পয়সা থাকলেও আত্মসম্মান সবসময় অনুমতি দেয় না। এই তো কদিন আগে স্বদেশভূমি বঙ্গরাজ্যে আমার মালিক হবে বলে টাকার প্রবল ছড়াছড়ি দেখলাম। স্যুট-বুট আর ফর্মাল পোশাক পরে শুধু শিক্ষক হওয়া যায় না–শিক্ষক হতে গেলে একটি লাল কালির পেনেরও প্রয়োজন হয়। আর তাই বুঝি আমাকে অর্জন করার জন্য ঘুষ, চাটুকারিতা, পদলেহন–না জানি আর কত কিছুই না ঘটল চোখের সামনে। আমি তখন দোকানের দেওয়ালে ঝুলে, টিভির পর্দায় চোখ রেখে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করছিলাম।
বিচার দেওয়ার ঠিকাদারেরা লাল কালির পেন দিয়েই মুছে দিয়েছিল সেই তথাকথিত অধিকারবোধ–চোরেদের আবার অধিকার কিসের! নেহাতই গুটিকয়েক লাল-দাগি মানুষের জন্য আমার হাজার হাজার যোগ্যতম মালিক তাদের অধিকার হারিয়েছে। আমি মুখ বুজে সব সহ্য করেছি। সময়ের ঘূর্ণিপাকে আমি লাল কালি, কালের হাতেই ছেড়ে দিয়েছি সব হিসেব-নিকেশ।
সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম–আমার যোগ্য মালিকের কাছেই আমি নিজেকে সমর্পণ করব। হয়তো আজ, হয়তো কাল, নতুবা কোনো অদূর ভবিষ্যতে–আমি হবই। আমাকে চিরদিন দাবিয়ে রাখা যাবে না। পৃথিবীর রণ-রক্তময় সাফল্যের ভিড়ে আমি আমার অধিকার প্রতিষ্ঠা করবই।
আমি একটি লাল পেন–ব্রহ্মাণ্ডের প্রেম, দ্বেষ, বিদ্বেষের বুকের মাঝে নীরবে জায়গা করে নেওয়া এক নীরব ঘাতক।





