
লিখেছেন: সৈকত বন্দোপাধ্যায়
অনেকে এখনও জানতে চাইছেন, বারুইপুরে কী হয়েছে? কী অভিযোগ? তাঁদের জন্য সংক্ষেপে পুরোটা লিখে দিই। দয়া করে কপি করে লোকজনকে পাঠান, কারণ মিডিয়ায় তেমন কিছু নেই, ফলে অনেকেই পুরোটা জানেন না।
বারুইপুরে একটি ছোট্টো বছর দশেকের মেয়ে, ধরা যাক তার নাম হাস্নুহানা, হঠাৎই “হারিয়ে” যায়। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, হাস্নুহানার নামে মিসিং কমপ্লেন্ট করার পরেও পুলিশ কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি । নানা স্থানীয় চ্যানেলে তাঁরা বলেছেন, যে, পুলিশকে নিষ্ক্রিয় দেখার পরে স্থানীয় মানুষই সন্ধানের কাজে নেমে পড়েন। প্রথমে সারা রাত খোঁজা হয়। তারপর সকাল হলে, যে কাজ গোয়েন্দার, সেটাই তাঁরা করতে থাকেন। বিভিন্ন দোকানের সিসিটিভি খতিয়ে দেখে মেয়েটির অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয়।
অনুসন্ধানের কাজ খুব দ্রুতগতিতে এগোয়। দুপুরের দিকে এক বস্তার মধ্যে ছোট্ট মেয়েটার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় । ধর্ষণ ও খুন করে পুকুরে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। স্থানীয় মানুষ শুধু মৃতদেহ উদ্ধার করেন নয়, সম্ভাব্য অপরাধীদের চিহ্নিত করেন। তাদের জেরা করেন এবং ৪ জন অভিযুক্তকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। অভিযোগ, এই অনুসন্ধান এবং দেহ উদ্ধারের সময় থানার কোনো পুলিশকর্মীর টিকি দেখা যায়নি। শুধু স্থানীয় ক্যাম্পের এক কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
এর পর ঘটনা মারাত্মক দিকে ঘোরে। পুলিশ ওই ৪ জনকেই ছেড়ে দেয়। অভিযোগ, ওই ৪ জন অভিযুক্তই RSS কর্মী। এবং আরও অভিযোগ, যে, স্থানীয় বিজেপি নেতা শান্তনু মণ্ডল থানায় প্রভাব খাটিয়ে ওই ৪ অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে আনেন। বলাবাহুল্য, জনরোষ এরপর বাড়তে থাকে। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামে । পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়, এবং পুলিশের ওপর আস্থা না রেখে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় অভিযুক্তকে।
পুরো ঘটনা সারাদিন ধরে দফায় দফায় ঘটতে থাকলেও, মূলধারার মিডিয়া, যাকে ডিম্মিডিয়া বলা হয়, সন্ধ্যের আগে এক লাইনও সম্প্রচারের সময় পায়নি। সন্ধ্যের পর থেকে যৎসামান্য দেখানো শুরু হয়। রিপাবলিকের ময়ূখরঞ্জন রাত থেকে অবস্থা সামাল দিতে সারারাত ফেসবুকে পোস্ট করতে থাকেন। “বারুইপুরে খরচা হোক”, জাতীয় ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা লিখতে থাকেন। “বিজেপি-নেতার কথায় পুলিশ অভিযুক্তদের ছেড়ে দিয়েছে” – এই অভিযোগ নিয়ে একটি বাক্যও বলেননি।
এর মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী হাস্নুহানার বাবাকেই পুলিশের বড় দপ্তর, ভবানীভবনে তলব করেন। আর কালীঘাটে নেমে যায় পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যেন কিছুতেই বারুইপুরে পৌঁছতে না পারেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, তাঁকে কার্যত গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। প্রসঙ্গত এর কয়েকদিন আগেই গোটা কলকাতার বিরাট অংশ জুড়ে মিটিং-মিছিলে নিষেধাজ্ঞা জারী হয়েছে।
পুরো ঘটনা নিয়ে শমীক ভট্টাচার্য বা অগ্নিমিত্রা পাল, যাঁরা এই জমনার ব্যতিক্রমী ‘ভব্য’ মুখ বলে পরিচিত, তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। লকেট বলেছেন তিনি শোনেনই নি। বাকিরা কোথায় কেউ জানেনা, সম্ভবত ডিম্মিডিয়া তাঁদের বিব্রত করেনি। তবে গভীর রাতে শ্রদ্ধেয়া কাকীমা রত্না দেবনাথ একটি ফেসবুক পোস্ট করে জানিয়েছেন, মা-বাবার কোল খালি করল যারা তাদের কড়া শাস্তি পাওয়া উচিত। দলীয় নেতার হস্তক্ষেপেই অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে আনার অভিযোগ নিয়ে তিনি রা কাড়েননি।
এই নিয়ে এখনও কোনো আন্দোলনের ডাক পাওয়া যায়নি। রাত-দখলের কৃতিত্ব নিয়ে যাঁরা কাড়াকাড়ি করছিলেন, তাঁরা মোটের উপর নিশ্চুপ, কিংবা মৃদু সমীরণের মতো বক্তব্য রাখছেন। ঐঅভয়া মঞ্চের পক্ষ থেকে লাইভ করে সরকারের প্রতি আস্থাজ্ঞাপন করা হয়েছে। সুবিচারের জন্য আবেদন করেছেন শ্রী পুণ্যব্রত গুণ এবং মানুষকে আইন হাতে তুলে নিতে বারণ করেছেন।
সব মিলিয়ে যা বোঝা যাচ্ছে, বিরোধীদের জন্য বারুইপুর অবরুদ্ধ। কিছু হলেও ডিম্মিডিয়া দেখাবেনা। মোটের উপর ব্ল্যাক আউট চলছে। পোস্ট মর্টেম কী হয়েছে কেউ জানেনা। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, যে বস্তায় দেহ ছিল, সেটা এখনও পড়ে। এভিডেন্স আদৌ সংগ্রহ করা হয়েছে কিনা জানা নেই। এবং ময়ূখের বক্তব্যের পর সন্দেহ হচ্ছে, একমাত্র সাক্ষী বলে যাঁর কথা শোনা যাচ্ছে, তাঁকেই “খরচা” করে দেওয়া হতে পারে। পরপর অনেকগুলো ধর্ষণ বা লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটল নতুন জমানায়। চন্দ্রনাথের খুনের কোনো কিনারা হয়নি। ইভিএম পুড়ে গেল এবং ডিম-ছোঁড়া জাতীয় গণহিংসায় কার্যত উৎসাহ দেওয়া চলছে।
এই হল অবস্থা। এখানে দুটো কথা বলতে পারি। এক, ডিম্মিডিয়ার উপর কোনো আস্থা রাখবেন না। অনেকেই অভ্যাসবশত ওখানেই খবর খোঁজেন, দেখন, অভ্যাস কাটানো সহজ না। কিন্তু অভ্যাসটা ছাড়তে হবে। এমনকি শেয়ার করার অভ্যাসও। পরিবর্তে ছোটো মিডিয়া দেখুন। তাতে অনেক জল থাকে, কিন্তু শুধুই ভূষিমাল থাকেনা। আমি এই খবরগুলো পেলাম জি-আই, বেঙ্গল-নিউজ এবং নিউজ-ওয়ান বলে তিনটে চ্যানেল থেকে। যা যা চ্যানেল দেখি, ইউটিউবে এবং ফেসবুকে, তার একটা তালিকা বানিয়ে একটা পাতা বানাব ঠিক করেছি। আপনারাও যা দেখেন, মন্তব্যে যোগ করতে থাকুন।
আর দুই হল, ডিম্মিডিয়াকে মহিমান্বিত করার কাজটা এখনও বিজেমূল এবং রাম্বামরা করে চলবেন। বিজেমূলরা পরিদৃশ্যমান, রাম্বামরা অনেকেই গা ঢাকা দিয়ে আছেন। চিহ্নিত করুন। অন্য কোনো কারণে না, এঁদের কথা আর শুনবেন না বলে।
আন্দোলন কে কবে করবেন, সেসব অ্যাকটিভিস্টরা বলবেন। সাধারণ মানুষ বলবেন। দলগুলো বলবে। কিন্তু এইটুকু আমরাই করতে পারি।




