
লেখক: মীরাতুন নাহার
যুক্তিবাদী লেখিকা সুকুমারী ভট্টাচার্য তাঁর যুক্তি তরবারি আমৃত্যু উদ্যত রেখেছিলেন সরল ধর্মবিশ্বাসীদের ভাবনাকে ব্যবহার করে, সাম্প্রদায়িকতার দ্বারা দূষিত করবার চেষ্টা করে যে মানব গোষ্ঠী, তাদের প্রতি। তিনি দেশবাসীকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, সাম্প্রদায়িকতার সংক্রমণ দ্বারা ধার্মিক মানুষদের ‘ধর্মবিশ্বাসের অন্তর্নিহিত মানবিকতা’ দূষিত না হলে বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষরা তাদের ‘ধর্মবিশ্বাসের কারণেই শত্রুপক্ষ হয়ে ওঠে না’। ধর্মবিশ্বাসকে সাম্প্রদায়িক করে তোলার উদগ্র প্রচেষ্টাকে তিনি তীক্ষ যুক্তি দ্বারা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছেন এবং সেভাবে ‘সাম্প্রদায়িকতার সম্ভাব্য শক্তি’কে খর্ব করতে চেয়েছিলেন।
ধার্মিক মানুষদের ধর্মবিশ্বাসের দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি এক বৃদ্ধার উক্তিকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেন, যিনি বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সখেদে বলেছিলেন, ‘হায় রাম, তোমার শেষে এই দশা হল যে, অন্যের বাড়ি ভেঙে তোমায় বাস করতে হয়?’ এইপ্রকার ধর্মবিশ্বাসকে তিনি ‘উদার’, ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে ‘জীবনের অবলম্বন’ এবং ‘মারণের হাতিয়ার নয়’ বলে উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু যারা এদের ‘কানে বিষ ঢেলে এদের সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে হিংসায় উদ্দীপিত’ করতে সচেষ্ট তাদের তিনি মানুষের শত্রু জ্ঞান করেছিলেন এবং তাদের হাত থেকে দেশবাসীদের রক্ষা করার উপায়াদি নির্দেশ করেছেন।
‘সাম্প্রদায়িকতা মানুষের তৈরি বিষ’ যা বহুকাল ধরে নানাভাবে মানবসমাজের ক্ষতিসাধন করে চলেছে- একথা বোঝাতে চেয়েছিলেন সুকুমারী ভট্টাচার্য বেদ বিশেষজ্ঞ, সংস্কৃতজ্ঞ, সুপণ্ডিত এক বাঙালি চিন্তাবিদ। সুস্থ জীবনযাত্রায় বিপর্যয় ঘটায় যে বিভেদাত্মক সাম্প্রদায়িক চেতনা সে সম্পর্কে তিনি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন- ‘১. সাম্প্রদায়িক চেতনা ধর্মকে পুষ্ট করে না, ২. ধর্ম থেকে উদ্ভুতও নয়, ৩. মুখ্যত এর যোগ রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে এবং ৪. সেটি করায়ত্ব করার জন্যই এ চেতনা দায়বদ্ধ।’ সেই দায়বদ্ধতা যে কতখানি ধ্বংসাত্মক তা তিনি নিজে সম্যক অনুধাবন করে দেশবাসীকে বোঝাতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল ও রক্ষা করার জন্য সাম্প্রদায়িকতা নামক বিষের ব্যবহার আজ আমাদেব, দেশে দেশবাসীর মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে চলেছে। নিত্যদিন বাড়ছে সেই উদ্বেগ-সংকট। সুকুমারী ভট্টাচার্যের সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কিত বিশ্লেষণমূলক ভাবনা-চিন্তা সেক্ষেত্রে সমূহ সহায়তা দিতে পারে বিভ্রান্ত দেশবাসীকে।
হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়ত্বের সমর্থক ও সাধকরা যেসকল অভিমত তাঁদের বক্তব্যের পক্ষে উত্থাপন করেন সে সবের ভ্রান্তি উদঘাটন করেছেন সুকুমারী ভট্টাচার্য। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘ভুলগুলোকে ভুল আর ঠিকগুলোকে ঠিক বলব।’ তিনি যথার্থই তা সম্ভব করেছিলেন। হিন্দুত্বের চশমা পরে যারা ভারতীয়ত্বের নতুন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে দেশবাসীকে তা মেনে নিতে বাধ্য করতে চেয়েছেন তাদের ভ্রান্তি কোথায় তিনি তা চিনিয়ে দিয়েছেন এবং সেইসঙ্গে ভারতীয় সভ্যতাকে শ্রদ্ধা করার মতো বিষয়গুলিকেও স্পষ্ট ভাষায় চিহ্নিত করে দিয়েছেন।
তিনি বললেন, ১. হিন্দু সভ্যতা শ্রেষ্ঠতম সভ্যতা নয় এবং প্রাচীনতম সভ্যতাও নয়। অথচ হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়ত্বের দাবিদারগণ এটিকেই সত্য বলে বিপুল দাপটে ঘোষণা করে। এটি ভুল। ‘শ্রেষ্ঠ মানে ভালো, আরও ভালো, সবচেয়ে ভালো। একথা বলতে গেলে তাবৎ ধর্ম সম্বন্ধে জানতে হয়।’ একথা বলে তিনি যে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন সেটি হল, ‘ভারতবর্ষে কম লোকেরই, খুব কম ঐতিহাসিকেরই এ নিয়ে চর্চা করার, আপেক্ষিকতা বিচার করার ক্ষমতা আছে। তাঁদের আঙুলে গোনা যায়।’ অতঃপরে বলা যায়, যারা এমন দাবি করে তারা প্রকৃতপক্ষে মিথ্যাভাষণ করে। হিন্দু সভ্যতাকে প্রাচীনতম সভ্যতা বললে সেটিও মিথ্যাকথন। আর্যসভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে কনিষ্ঠতম। বহু পুরনো সভ্যতা হল আসিরিয়া, ব্যবলনীয়া, মিশর, চিন, গ্রিস, রোম-এর সভ্যতা।
২. বেদকে প্রাচীনতম গ্রন্থ বলা হচ্ছে। এটিও ভুল। দ্বাদশ শতকের আগে বেদেনর কোনও চিহ্ন ছিল না। মিথ্যা হলেও এটি প্রচার করা হচ্ছে কেননা, ‘প্রাচীন’ বললে মানুষের মনে সম্ভ্রমবোধ জাগে এবং ‘প্রাচীনতম’ বললে তা আরও তীব্র হয়।
৩. সংস্কৃত ভাষাকে বলা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ, প্রাচীনতম এংব ‘জীবিত ভাষা’। এই ভাষাকে সে কারণে সকলের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু সংস্কৃতকে জীবিত ভাষা বলা যায় না। জীবিত ভাষা হল সেই ভাষা যে ভাষায় মানুষ দৈনন্দিন কাজ চালায়, প্রয়োজন মেটায় প্রতিদিনের। সংস্কৃত সেই ভাষা নয়।
৪. সংস্কৃত ভাষা নাকি ধর্মের বাহন-এমন দাবিও করা হচ্ছে। এই দাবি যথার্থ নয়। প্রথমত, সংস্কৃত ভাষায়, নাস্তিকতাবিষয়ক গ্রন্থও রয়েছে। বৌদ্ধ, জৈন যারা বেদ মানে না তাদের অভিনতও এই ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় বহু ধর্মগ্রন্থ সংস্কৃতভাষা ভিন্ন অন্য ভাষাতেও আছে এবং এখনও লেখা হচ্ছে। সেগুলির গুরুত্ব কিছুমাত্র কম নয়। তদুপরি, সংস্কৃত ভাষায় ধর্ম ছাড়াও অভিধান, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য সবই লেখা হয়েছে। ফলে এই ভাষাকে ধর্মের বাহনমাত্র বললে, ভাষাটির অমর্যাদা করা হয় এবং সেই সঙ্গে ধর্মেরও। এভাবে হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা অপচেষ্টা ভিন্ন কিছু নয়।
৫. যজ্ঞ প্রথা ফিরিয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই দাবিরও মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট স্ববিরোধিতা ও সত্য গোপন করা নামক অনেকিতা। যজ্ঞে তো গো হত্যা করা হয় এবং ‘শয়ে শয়ে গো-হত্যা করতে হবে। যজ্ঞের ফিরে আসা যারা চায় তারা তো গো-হত্যার বিরোধী। তাহলে? তাদের যজ্ঞে গো-হত্যা করার কথা অস্বীকার করতে হবে এবং তা করতে গেলে মিথ্যাচার করতে হয়। প্রকৃত সত্য হল, বেদের কালে মানুষ গোরু ছাড়া কিছু খেতেই জানতো না’।
৬. বলা হচ্ছে, বেদচর্চা করতে হবে। প্রশ্ন হল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভিনব উন্নতির এই কালে বেদের চর্চা কতখানি বাঞ্ছনীয়? বেদে বলা হয়েছে, ক) পুরুষ খেয়ে নিয়ে এঁটো স্ত্রীকে দেবে। খ) ব্যবহারের অযোগ্য জামা, জুতো, ছাতা ভৃত্যদের দিতে হবে। গ) যে কোনও নারীর পক্ষে একজন পুরুষই যথেষ্ট আর একটি পুরুষের জন্য অন্তত দু’জন নারীর প্রয়োজন। ঘ) ছুঁচো, পেঁচা, কালো সাপ, শকুন, নারী এবং শূদ্র একই রকমের অশুচি, এদের দেখলেও পাপ হয়। ৫) শিক্ষিত বা ধনবতী নারী পুরুষের সমান। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আজকের সমাজ কি এসব ধ্যানধারণা মানবে? অসম্ভব সে কল্পনা!
অন্যদিকে, বেদে বহু ভাল কথাও বলা হয়েছে। যেমন, অথর্ববেদে বলা হয়েছে… ‘যে আমার প্রতি বিদ্বিষ্ট, যে বাইরের থেকে এসেছে, যে আমাকে গ্রহণ করে না তাকে গ্রহণ করে আমি যেন শোভনভাবে বাস করতে পারি।’ প্রশ্ন হল, হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়ত্বের দাবিদারগণ কি এই নির্দেশ মানবে?
সুকুমারী ভট্টাচার্য তাই বলে বেদকে বাতিল করার কথা বলেননি। তিনি বলেছেন, ‘খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের বড়ো সাহিত্য হল বেদ। … বেদেই প্রথম ভারতীয় ভাষায় সাহিত্য চিন্তাধারার বিকাশ। এক কথায় বেদ এক অপরিহার্য উত্ত রাধিকার। … বেদের সাহিত্যমূল্য, সমাজ-বৈজ্ঞানিক মূল্য, ঐতিহাসিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও নানাপ্রকারের মূল্য একে একটি দ্ধ সাহিত্যের স্থান দিয়েছে…।’
৭. রামকে নিয়ে কত গর্ব হিন্দুত্ববাদীদের। অথচ কেমন ছিল রামরাজ্য তা বর্ণনা করেছেন সুকুমারী ভট্টাচার্য। সাধ্বী সীতাকে তাঁর নিজের চরিত্রের শুচিতা প্রমাণ করার জন্য তিনবার পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। শঙ্কায়, নির্বাসনে এবং তৃতীয়বার আবারও যখন পরীক্ষা দিতে বলা হয় তখন তিনি অসম্মত হয়ে মায়ের কাছে ফিরে যান। দেখা যায় ক) রামরাজ্যে শুচি হলেও নারীকে বিশ্বাস করা হত না। খ) চণ্ডাল বন্ধুর গৃহে অন্নগ্রহণ কর যেত না। গ) নিম্নজাতের ছেলে তপস্যা করলে ব্রাহ্মণ বালকের মৃত্যু ঘটে এবং তার জন্য তপস্যারত ছেলেটির শিরচ্ছেদ করা হয়। এই প্রকার রামরাজ্য এখনকার মানুষজন কি চাইবেন?
তিনি হিন্দুত্ববাদীরা যে প্রকৃতপক্ষে বেদ-বিরোধিতা তথা আত্মবিরোধিতা করছেন তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ঋগ্বেদের শেষ সূক্তে পড়ি, ‘প্রাচীনেরা যেমন ভোগ্যসমূহের সমবণ্টন করেছিলেন, আমরাও যেন তেমন করতে পারি। বাক্যে এবং চিত্তে আমরা যেন সমভাবাপন্ন হই। আমাদের মন্ত্র, আমাদের চলাফেরা যেন ঐক্যবোধযুক্ত হয়; আমাদের হৃদয় ও বুদ্ধি যেন এদের সঙ্গে ঐক্যে সংহত হয়। আমাদের কামনা, বাসনা, হৃদয় ও সত্তা যেন একীভূত হয়। আমরা যেন তাদের প্রতি সহিষ্ণুতায় সৌম্য হয়ে উঠতে পারি।’
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আর সেই বেদ-নির্দেশিত সহিষ্ণুতা বেদ-মানা হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে কোথায়? তিনি অকৃত্রিম প্রেমে ভারতবাসীকে বলেছেন, ‘সাধারণ ভারতীয় তো জানে ভারতের পূর্বসাধনা ভেদের মধ্যে সংহতির, ঐক্যের, মৈত্রীর; তারা কি আজকের দানবীয় ধ্বংসযজ্ঞের সামনে দাঁড়িয়ে বলবে না, ‘স নো বুদ্ধ্যা শুভয়া সংযুনজু।’ শুভবুদ্ধির বিকাশে ও সহজ প্রকাশে এই ধ্বংসলীলাকে ঠেকাবেই সংহতিকামী ভারতবাসী। আমরাও আজ তাঁর সুরে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাই, দেশের বৃহৎ ঐক্যবদ্ধ কল্যাণবুদ্ধির কাছে ফুৎকারে নিভে যাবে অশুভশক্তির যাবতীয় আস্ফালন ও ধ্বংসকামিতা।
(লেখক বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক)





