
লেখক: মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ রহমানী
সম্প্রতি আমাদের অমুসলিম ভাইদের একটি ধর্মীয় উৎসব অতিবাহিত হয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে তাঁদের আরও কিছু উৎসব আসন্ন। এ ধরনের উপলক্ষে আমাদের উচিত তাঁদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আয়োজনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকা এবং তাঁদের জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করা। তবে পারস্পরিক সম্পর্কের সৌহার্দ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার পাশাপাশি নিজেদের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য ও ঈমানি মূল্যবোধ রক্ষার প্রতিও পূর্ণ মনোযোগী হতে হবে। যাতে উত্তম সামাজিক আচরণ এবং দ্বীনের সুরক্ষা—উভয়টির দাবিই যথাযথভাবে পূরণ করা যায়।
এ বিষয়ে মুসলমানদের, বিশেষত আলেম-উলামা, ধর্মীয় সংগঠন ও নেতৃবৃন্দের দায়িত্ব হলো অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গে কাজ করা এবং মুসলিম সমাজকে এ ধরনের ফিতনা থেকে রক্ষা করা। যেভাবে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ এবং জুমা ও ঈদের খুতবায় নেক আমলের প্রতি উৎসাহিত করা হয়, একইভাবে মুসলমানদের সামনে ঈমানের প্রকৃত স্বরূপ ও তার গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। যেমনিভাবে আমলি গুনাহের ভয়াবহতা বর্ণনা করা হয়, তেমনিভাবে কুফর ও শিরকের মন্দ দিকগুলোও তাদের সামনে স্পষ্ট করতে হবে। কুরআন-হাদিসের আলোকে বিষয়গুলো বোঝানোর পাশাপাশি তাওহিদের আকলগত যৌক্তিকতা, সৃষ্টিজগতের স্বাভাবিক প্রকৃতির সঙ্গে তার সামঞ্জস্য এবং শিরকের অযৌক্তিকতাও তুলে ধরতে হবে।
হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) প্রায়ই বলতেন, মানুষকে অজু ও রোজা ভঙ্গের কারণগুলো তো জানানো হয়; কিন্তু ঈমান নষ্ট হওয়ার কারণগুলো জানানো হয় না। অর্থাৎ যেসব কথা ও কাজের কারণে মানুষের ঈমান নষ্ট হয়ে যায়, সেগুলো সম্পর্কেও তাদের অবহিত করা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষকে ঈমান ও হেদায়েতের গুরুত্ব বোঝানো। কেননা, এই নিয়ামত আল্লাহ তাআলার তাওফিক ও বিশেষ অনুগ্রহেই লাভ করা যায়। রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে প্রেরণই করা হয়েছিল মানবজাতির হেদায়েত ও পথনির্দেশনার জন্য। তা সত্ত্বেও তাঁকে বলা হয়েছে, আপনি যাকে ভালোবাসেন, তাকে ইচ্ছা করলেই হেদায়েত দিতে পারবেন না; বরং আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যাকে চান, হেদায়েত দান করেন: إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ يَهْدِي مَنْ يَّشَاءُ
‘নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভালোবাসেন, তাকে হেদায়েত দিতে পারেন না; বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দান করেন।’ (সুরা আল-কাসাস: ৫৬)
সমস্ত সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হলো স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির সম্পর্ক। কিন্তু হজরত নুহ ও হজরত লুত (আ.)-এর স্ত্রী এবং হজরত নুহ (আ.)-এর সন্তানের জন্য হেদায়েত নির্ধারিত হয়নি। (সুরা আত-তাহরিম: ১০; সুরা হুদ: ৪৬)
আবার আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং নবীজি ﷺ তাঁকে ওহি লেখার দায়িত্বও দিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর জন্য হেদায়েতের ওপর অবিচল থাকা নির্ধারিত ছিল না। ফলে তিনি পুনরায় ইসলাম ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ের সময় তিনি তওবা করেন এবং হজরত উসমান গনি (রা.)-এর সুপারিশে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর তওবা কবুল করেন। (মুসনাদে বাযযার, হাদিস নং ১১৫১)
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা আমাদের বিশেষভাবে একটি দোয়া শিখিয়েছেন: رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের হেদায়েত দান করার পর আমাদের অন্তরকে বক্রতার দিকে পরিচালিত করবেন না।’ (সুরা আলে ইমরান: ৮)
ঈমানের এই গুরুত্বের দাবি হলো, ঈমান রক্ষার পথে যেসব পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়, একজন মুমিন যেন সেগুলো ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেন এবং তাঁর অবিচলতায় কোনো ধরনের বিচ্যুতি না আসে।
পবিত্র কুরআনে মুমিনদের সঙ্গে কুফরি শক্তির সংঘাত ও নির্যাতনের বহু ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এসব ঘটনায় কখনো মুমিনরা বিজয়ী হয়েছেন, কখনো এমন মুজিজা প্রকাশিত হয়েছে যে কুফরের শক্তি সম্পূর্ণভাবে পরাভূত হয়েছে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই মুমিনদের ধৈর্য ও পরীক্ষার কঠিন পর্যায় অতিক্রম করতে হয়েছে এবং আপাতদৃষ্টিতে তাঁরা অত্যাচারের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়েছেন।
কুরআনে এসব ঘটনার উল্লেখের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, ঈমান ও নেক আমলের ভিত্তিতে আল্লাহ তাআলা আখিরাতের সফলতা ও মুক্তির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা নিশ্চিত। ইনশাআল্লাহ, আখিরাতে মুমিনরাই সফলকাম হবেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার জীবনে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি যে, সব পরিস্থিতিতেই মুসলমানরা বস্তুগত বিজয় অর্জন করবেন, তাঁদের শত্রুরা অবশ্যই পরাজিত হবে, তাঁদের কোনো কষ্ট বা পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে না কিংবা তাঁদের জীবন সর্বদা ফুলের বিছানায় অতিবাহিত হবে।
বরং কুরআনে মুমিনদের উদ্দেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, তাঁদের জীবন, সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির ক্ষতির মাধ্যমে অবশ্যই পরীক্ষা করা হবে: وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ‘আর অবশ্যই আমি তোমাদের কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধনসম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব।’ (সুরা আল-বাকারা: ১৫৫)
পবিত্র কুরআনে এমন অনেক ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে ঈমানদারদের কোনো কোনো দলের ওপর চরম নির্যাতন চালানো হয়েছিল; কিন্তু তাঁরা কখনো সত্যের দাওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি।
কুরআনে সেই জাদুকরদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের ফেরাউন হজরত মুসা (আ.)-এর মোকাবিলা করার জন্য সমগ্র মিসর থেকে একত্র করেছিল। যখন জাদুকরদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, হজরত মুসা (আ.) কোনো জাদুকর নন; বরং তিনি সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর নবী, তখন তাঁরা ঈমান গ্রহণ করলেন। ফেরাউন তাঁদের হুমকি দিয়ে বলল, ‘আমি তোমাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং তোমাদের শূলে চড়াব।’
কিন্তু তাঁদের উত্তর ছিল, আমাদের তো এমনিতেই আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। এরপর তাঁরা আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ধৈর্যের শক্তি দান করুন এবং মুসলিম অবস্থায় আমাদের মৃত্যু দান করুন।’ رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَّتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ (সুরা আল-আ’রাফ: ১২৬)
কুরআনে আরেকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যা ‘আসহাবে উখদুদ’ নামে পরিচিত। কিছু মানুষ প্রকৃত খ্রিষ্টধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। মুশরিক শাসকরা তাঁদের ধর্ম পরিবর্তন করতে বাধ্য করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে একটি বিশাল গর্ত খনন করে তাতে আগুন প্রজ্বলিত করা হয়। এরপর ঈমানদারদের সবাইকে সেই প্রজ্বলিত আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। তাঁদের সঙ্গে শুধু ঈমান গ্রহণ করার কারণেই এমন আচরণ করা হয়েছিল। وَمَا نَقَمُوا مِنْهُمْ إِلَّا أَنْ يُؤْمِنُوا بِاللّٰهِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ
‘তারা তাদের প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণ করেছিল শুধু এ কারণে যে, তারা পরাক্রমশালী ও প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল।’ (সুরা আল-বুরুজ: ৮)
কিন্তু এত নির্যাতন সত্ত্বেও তাঁরা ঈমানের ওপর অবিচল ছিলেন। তাঁরা আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ করাকে মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু ঈমানের নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হওয়াকে কিছুতেই মেনে নেননি। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) নিজেরাও ঈমানের জন্য কত অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন! সীরাতের পাতায় তাঁদের আত্মত্যাগের অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে রয়েছে।
এই তো উমাইয়া! সে হজরত বিলাল (রা.)-কে দুপুরের প্রচণ্ড রোদে মক্কার পাথুরে উপত্যকায় টেনে নিয়ে যেত এবং তাঁকে টেনে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করত। এরপর তাঁর বুকের ওপর বিশাল পাথরের চাঁই চাপিয়ে দিত, যাতে উত্তপ্ত বালুর ওপর তিনি নড়াচড়া করতে না পারেন, এমনকি পাশও ফিরতে না পারেন। এরপর বলত, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমাকে এভাবেই থাকতে হবে। এ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটিই উপায়—তুমি মুহাম্মদ ﷺ-এর নবুওয়াত অস্বীকার করো এবং লাত-উজ্জার মূর্তিগুলোর উপাসনা করো।
হজরত বিলাল (রা.)-এর প্রতি হাজারো সালাম! এমন পরিস্থিতিতে ঈমানের ওপর অবিচল থাকার পাশাপাশি শুধু মুখে কুফরির কথা উচ্চারণ করারও অবকাশ ছিল। কিন্তু হজরত বিলাল (রা.)-এর ঈমানি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের আবেগের কাছে সেটুকুও গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাঁর জিহ্বায় অবিরাম উচ্চারিত হতো—‘আহাদ, আহাদ’, অর্থাৎ আল্লাহ এক, আল্লাহ এক!
এবার হজরত খুবাইব আনসারি (রা.)-এর কথা বিবেচনা করুন। মক্কার লোকেরা তাঁকে বন্দি করেছিল। বদর যুদ্ধে নিহত কয়েকজন ব্যক্তির প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাঁকে হারাম শরিফের বাইরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর অবিচলতার অবস্থা ছিল এমন যে, তিনি কান্নাকাটি করেননি, আহাজারি করেননি, অস্থিরতা প্রকাশ করেননি, প্রাণভিক্ষা চাননি কিংবা কারও কাছে তোষামোদ করেননি। এমনকি প্রাণ বাঁচানোর জন্য অন্তরের বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রেখে মুখে কুফরির কথা উচ্চারণ করার যে অনুমতি পবিত্র কুরআন দিয়েছে, (সুরা আন-নাহল: ১০৬) সেটিও তিনি গ্রহণ করেননি।
বরং তিনি শুধু দুই রাকাত নামাজ আদায়ের অনুমতি চেয়েছিলেন এবং তা আদায় করেন। এরপর বলেছিলেন, ‘তোমরা যদি মনে না করতে যে, আমি মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে নামাজ দীর্ঘ করছি, তাহলে আমি আরও দীর্ঘ নামাজ আদায় করতাম।’ وَاللّٰهِ لَوْلَا أَنْ تَحْسَبُوا أَنَّ مَا بِي جَزَعٌ لَزِدْتُ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৯৮৯)
এভাবেই হজরত খুবাইব (রা.) আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরবর্তীতে কোনো মুসলমানকে বন্দি করে হত্যা করার জন্য নিয়ে যাওয়া হলে, হত্যার আগে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা মুসলমানদের একটি সুন্নতে পরিণত হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৯৮৯)
সুতরাং মুসলমানদের বোঝানো প্রয়োজন যে, মুসলমান হওয়া মানে প্রেম ও ভালোবাসার এক কঠিন পথে পা বাড়ানো। এ পথে কখনো আগুনের শিখার ওপর দিয়ে হাঁটতে হতে পারে, কখনো কাঁটায় ভরা পথ অতিক্রম করতে হতে পারে। কিন্তু মানুষ যখন নিজের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য এমন কঠিন পরীক্ষাও সহ্য করতে প্রস্তুত থাকে, তখন ঈমানের নিয়ামত তো এসবের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান। সুতরাং ঈমান রক্ষার জন্য এসব ত্যাগ তার কাছে তুচ্ছ হওয়ারই কথা।
তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত আল্লাহর কাছে দোয়া করা, যেন মুসলিম উম্মাহ এ ধরনের কঠিন পরীক্ষা থেকে নিরাপদ থাকে। তবে একই সঙ্গে প্রত্যেকের অন্তরে এই দৃঢ় সংকল্প ও সুদৃঢ় প্রত্যয়ও থাকা প্রয়োজন যে, ধৈর্য ও পরীক্ষার কঠিন সময় উপস্থিত হলেও আমরা আমাদের আনুগত্য ও বিশ্বস্ততায় কোনো আঁচ লাগতে দেব না। কারণ, প্রেমের পূর্ণতা তখনই অর্জিত হয়, যখন তার মধ্যে প্রদীপের শিখায় পুড়ে যাওয়ার মতো নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদনের পূর্ণ আবেগ বিদ্যমান থাকে।
ধর্মত্যাগের ফিতনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে আলেম-উলামার ওপর বিরাট দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমরা ধরে নিয়েছি যে, আমাদের দায়িত্ব কেবল মসজিদ ও মাদরাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর বাইরে যেকোনো বিপর্যয় ঘটুক না কেন, তা মোকাবিলা করা আমাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত নয়; বড়জোর তা নফল বা অতিরিক্ত দায়িত্বের পর্যায়ে পড়ে। এই ধারণা সঠিক নয়। এটি নিজেদের মর্যাদা ও অবস্থানের প্রতি অবিচার এবং উম্মাহর প্রতি জুলুম ও অবিচার। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: عُلَمَاءُ أُمَّتِي كَأَنْبِيَاءِ بَنِي إِسْرَائِيلَ
‘আমার উম্মতের আলেমগণ বনি ইসরাইলের নবীদের মতো।’ (আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, হাদিস নং ৭০২)
বনি ইসরাইলের নবীদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল, প্রত্যেক নবী কোনো একটি জাতিকে তাঁর প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতেন। তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে সেই জাতি হেদায়েত লাভ করত। আলেমদের কর্মপদ্ধতিও এমন হওয়া উচিত। তাঁরা যেন কোনো একটি জনগোষ্ঠী বা সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশকে নিজেদের প্রচেষ্টা ও দাওয়াতি কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেন। সেই জনগোষ্ঠীর প্রতি সার্বক্ষণিক নজর রাখেন, যাতে তাঁদের অজান্তে ও নীরবে ধর্মত্যাগের ফিতনা তাঁদের সমাজে প্রবেশ করতে না পারে।একইভাবে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: إِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ
‘নিশ্চয়ই আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৪১)
এই হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কোনো কোনো ভাষ্যকার একটি সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। নবীগণ নিজেরা প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের কাছে বিনা আহ্বানেই পৌঁছে যেতেন। অতএব, আলেমদেরও উম্মাহর মানুষের কাছে বিনা আহ্বানে পৌঁছানো উচিত। তাহলেই নবীদের উত্তরাধিকারী হওয়ার প্রকৃত অধিকার আদায় হবে।
আজ প্রয়োজন হলো, মাদরাসা, ধর্মীয় সংগঠন, জামাত, আলেম ও মাশায়েখরা যেন নিজেদের সংস্কারমূলক ও সংশোধনমূলক কার্যক্রম মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাহর গণ্ডির বাইরে নিয়ে যান। তাঁরা যেন নিজেরাই উম্মাহর মানুষের দরজায় পৌঁছে যান, মুসলিম সমাজের হৃদয়ে নাড়া দেন এবং তাদের ঈমান ও আমলের সুরক্ষাকে নিজেদের অপরিহার্য দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন।




