
মূল: এস. আমিনুল হাসান
মানুষের সমগ্র জীবন আসলে এক অন্তহীন মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ময়দান। ইসলামি মনস্তত্ত্ব ও দর্শনে এই লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘নফস’ বা প্রবৃত্তি। সম্প্রতি এক জুমার খুতবায় জামায়াতে ইসলামী হিন্দের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস. আমীনুল হাসান মানুষের এই অভ্যন্তরীণ প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ ও আত্মশুদ্ধির উপায় সম্পর্কে এক যুগোপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা পেশ করেছেন। বর্তমান আধুনিক যুগে, যেখানে মানুষের বাহ্যিক চাকচিক্য আর ভোগের উপাদান চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে, সেখানে নফসের নিয়ন্ত্রণ কেন এবং কীভাবে করা জরুরি—তা বিশ্লেষণ করাই এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।
মানুষের দুই রূপ: বাহ্যিক বনাম অভ্যন্তরীণ সত্তা
মানব চরিত্রের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। একটি হলো বাহ্যিক অবয়ব (External Dimension) এবং অন্যটি অভ্যন্তরীণ সত্তা (Inner Dimension)। আমাদের এই দৃশ্যমান শরীর, পদমর্যাদা, আলিশান বাড়ি বা দামি গাড়ি—সবই বাহ্যিক পরিচয়ের অংশ, যা মৃত্যুর সাথে সাথেই এই পৃথিবীতে বিলীন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, আমাদের ভেতরের যে আত্মিক রূপ বা রুহানি অস্তিত্ব, তা-ই মানুষের আসল ও প্রাথমিক পরিচয় (Primary Identity)। পরকালে আল্লাহর দরবারে এই অভ্যন্তরীণ সত্তারই হিসাব দিতে হবে এবং এর ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে চিরন্তন শাস্তি কিংবা পুরস্কার। স্রষ্টা মানুষকে সৃষ্টি করে তার ভেতরে ভালো (তাকওয়া) ও মন্দের (ফুচুর) পার্থক্য করার এক সহজাত ক্ষমতা বা ইলহাম দান করেছেন। যে ব্যক্তি তার ভেতরের শুভ শক্তিগুলোকে জাগ্রত করে আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে পারে, সে-ই প্রকৃত সফল; আর যে তার ভেতরের তাকওয়ার সম্ভাবনাকে অবদমিত বা কবর দিয়ে দেয়, তার জন্য অপেক্ষা করছে চরম ব্যর্থতা।
নফসের তিনটি অবস্থা ও আধুনিক জীবনের টানাপোড়েন
কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী মানুষের প্রবৃত্তির তিনটি প্রধান অবস্থা বা পর্যায় রয়েছে, যা প্রতিটি মানুষের ভেতরেই কম-বেশি সক্রিয় থাকে :
১. নফসে আম্মারা (প্ররোচনাকারী প্রবৃত্তি): এটি মানুষকে ক্রমাগত মন্দের দিকে ধাবিত করে। তবে নফসে আম্মারা শুধু যে সরাসরি পাপের কাজের আদেশ দেয় তা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বৈধ ও ভালো কাজের সীমানা লঙ্ঘন করতেও প্ররোচিত করে। যেমন—খাদ্য গ্রহণ করা অপরাধ নয়, কিন্তু সারাক্ষণ খাওয়া নিয়ে মগ্ন থাকা এক ধরনের বিচ্যুতি । বর্তমান যুগের ‘ভোগবাদ’ (Hedonism) এবং ‘অতিরিক্ত কেনাকাটার মানসিকতা’ (Consumerism) এই নফসে আম্মারাকে বহুগুণ উস্কে দিচ্ছে, যেখানে মানুষ শুধু নিজের অন্ধ আনন্দ ও লৌকিক প্রতিযোগিতার পেছনে ছুটছে।
২. নফসে লাউওয়ামা (তিরস্কারকারী প্রবৃত্তি): এটি মানুষের ভেতরের এক জাগ্রত বিবেক বা ‘ইনার ভয়েস’। কোনো ভুল বা অন্যায় কাজ করতে গেলে এই প্রবৃত্তি মানুষকে ভেতর থেকে বারবার বাধা দেয় এবং ভুল হয়ে গেলে তীব্র অনুশোচনার অনুভূতি (Remorse) তৈরি করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানায়।
৩. নফসে মুতমায়িন্নাহ (প্রশান্ত প্রবৃত্তি): এটি প্রবৃত্তির সেই পরম স্তর, যেখানে মানুষ তার ভেতরের নেতিবাচক আকাঙ্ক্ষাগুলোকে জয় করে এক স্বর্গীয় মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি লাভ করে । কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, এই প্রশান্তি অর্জনের প্রধান দুটি চাবিকাঠি হলো—দৃঢ় ঈমান এবং আল্লাহর সার্বক্ষণিক জিকির বা স্মরণ।
মনস্তাত্ত্বিক মেকানিজম: অভ্যাস ও চরিত্র গঠনের ৫টি ধাপ
আমরা কীভাবে কোনো ভালো বা মন্দ অভ্যাসের দিকে ধাবিত হই, তার একটি মনস্তাত্ত্বিক চক্র রয়েছে, যা নফস নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি :
• আকাঙ্ক্ষা (Desire): প্রথমে মনের কোণে কোনো একটি সুপ্ত ইচ্ছা বা লালসা জাগ্রত হয়।
• চিন্তা (Thought): এরপর সেই ইচ্ছাটি কীভাবে পূরণ করা যায়, তা নিয়ে মানুষ পরিকল্পনা বা চিন্তা শুরু করে (23:12)।
• সিদ্ধান্ত (Choice): এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। মানুষের মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ (Prefrontal Cortex) হলো এক ধরনের ‘কন্ট্রোল প্যানেল’, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই স্তরে এসে নফসে লাউওয়ামার (বিবেক) ডাক শুনে যদি মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সে বেঁচে যায়।
• কর্ম (Action): সিদ্ধান্তের পর মানুষ বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং কাজটি সম্পাদন করে।
• চরিত্র (Character): কোনো একটি কাজ যখন মানুষ বারবার (Repeatedly) করতে থাকে, তখন তা আর সাময়িক কোনো কাজ থাকে না, বরং তা মানুষের স্থায়ী চরিত্র বা অভ্যাসে রূপ নেয়।
তরুণ প্রজন্মের জন্য চার দফা পথনির্দেশিকা
বিশেষ করে আজকের আধুনিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর তরুণ প্রজন্মের জন্য নফস নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি সহজ ‘ফোর-পয়েন্ট ফর্মুলা’ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
• ১. আত্ম-সচেতনতা (Self-Awareness): জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আমি কী করছি, কেন করছি এবং এর দূরবর্তী ফলাফল কী হবে—তা নিয়ে সদা জাগ্রত থাকা।
• ২. আত্ম-নিয়ন্ত্রণ (Self-Control): তীব্র ক্ষণস্থায়ী ইচ্ছা বা অন্ধ আবেগকে তাৎক্ষণিকভাবে সংযত করার ক্ষমতা অর্জন করা।
• ৩. আধ্যাত্মিক সংযোগ (Spiritual Connectedness): নামাজ, কুরআনের তিলাওয়াত এবং জিকিরের মাধ্যমে স্রষ্টার সাথে আত্মিক সম্পর্ককে গভীর ও মজবুত করা।
• ৪. আত্ম-পর্যালোচনা (Self-Reflection): প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে কিংবা সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে নিজের কৃতকর্মের একটি নিরপেক্ষ হিসাব নেওয়া যে, প্রবৃত্তি আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে নাকি আপনি প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
পরিশেষে বলা যায়, নফসের এই লাগামহীন দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার মধ্যেই মানুষের ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি নিহিত। বাহ্যিক রূপচর্চা বা জাগতিক সম্পদের প্রতিযোগিতায় মত্ত না হয়ে, আমাদের ফোকাস হওয়া উচিত অভ্যন্তরীণ আত্মশুদ্ধির দিকে। স্রষ্টা আমাদের সবাইকে নফসের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করে এক প্রশান্ত হৃদয়ের (قلب سلیم) অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন।





