
মাফিকুল ইসলাম
তেহেরানের এক স্কুলে সাম্প্রতিক হামলায় যখন নিষ্পাপ শিশুদের রক্তে শ্রেণিকক্ষ ভেসে গেল, তখন প্রশ্নটা নতুন করে সামনে এলো-এই রক্ত কি শিয়া না সুন্নির? গত এক দশকে শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সিরিয়ার সংঘাতে প্রাণ গেছে ৫ লক্ষের বেশি মানুষের। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরাক-ইরান যুদ্ধেই নিহত হয়েছিল আনুমানিক ৫ থেকে ১০ লাখ মানুষ। এসব সংখ্যার পেছনে যে কান্না, তা কোনো মাজহাবের নয়, তা মুসলমানের। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই-শিয়া-সুন্নি বিভাজন কি সত্যিই আকিদার প্রশ্ন, নাকি এটি ক্ষমতার রাজনীতির নির্মম ব্যবহার? আকিদাগত পার্থক্য যে নেই, তা নয়। কিন্তু সেই পার্থক্যকে চিরস্থায়ী ঘৃণায় রূপ দেওয়া কি কোরআনের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আরও বিস্ময় জাগে যখন দেখি, মুসলিম বিশ্বের বহু রাষ্ট্র নির্দ্বিধায় আমেরিকা ও রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলে-যাদের সঙ্গে আকিদাগত দূরত্ব অসীম, কিন্তু নিজেদের ঘরের ভেতর শিয়াদের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করে। ইতিহাস সাক্ষী-কারবালার বেদনা থেকে শুরু করে আধুনিক ভূরাজনীতি, অধিকাংশ সংঘাতের মূলে ছিল রাষ্ট্রীয় আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারের লড়াই। যদি তা-ই সত্য হয়, তবে মুসলিম উম্মাহ কি চিরকাল এই রাজনৈতিক ব্যবহারের শিকার হয়ে বিভক্ত থাকবে? নাকি আমরা ঘৃণার বদলে শর্তসাপেক্ষ ঐক্য, ইস্যুভিত্তিক সহযোগিতা এবং কৌশলগত সমন্বয়ের পথ বেছে নেব? যেখানে আকিদা থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়; মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রক্তপাত নয়।
আকিদাগত পার্থক্য: বাস্তব স্বীকৃতি, অন্ধ ঘৃণা নয়
শিয়া ও সুন্নির মধ্যে ইমামত, খিলাফত, কিছু ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ও ফিকহি পদ্ধতি নিয়ে মৌলিক আকিদাগত পার্থক্য আছে-এ সত্য অস্বীকারের উপায় নেই। বিশ্ব মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ সুন্নি এবং ১০-১৫ শতাংশ শিয়া। অর্থাৎ প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি শিয়া মুসলমান এই উম্মাহরই অংশ। মতভেদ থাকবে, তর্ক থাকবে; কিন্তু পার্থক্য মানেই কি চিরস্থায়ী ঘৃণা? ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক বা কৌশলগত সম্পর্ক রাখলেই তা আকিদা বিসর্জন-এমন সরল সমীকরণ বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। আশ্চর্যের বিষয়, মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক সুন্নি রাষ্ট্র প্রতিবছর বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি করে আমেরিকার সঙ্গে, একই সঙ্গে জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় ঘনিষ্ঠ থাকে রাশিয়ার সঙ্গেও। যাদের সঙ্গে ধর্মীয় দূরত্ব অসীম, তাদের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বৈধ-কিন্তু মুসলিম প্রতিবেশীর ক্ষেত্রে কেন শুধু বিদ্বেষের ভাষা? আকিদার পার্থক্য স্বীকার করেও কি শর্তসাপেক্ষ সহযোগিতা সম্ভব নয়? ঘৃণার বদলে বাস্তববাদী সমন্বয়ই কি আজকের সময়ের দাবি নয়?
রাজনৈতিক বাস্তবতা বনাম ধর্মীয় আবেগ
মুসলিম বিশ্বের রাজনীতির দিকে তাকালে বোঝা যায়, অনেক সময় আকিদার আড়ালে আসলে কৌশলগত শক্তির লড়াইই কাজ করে। ইতিহাসের কারবালার বেদনা আমাদের আবেগকে নাড়া দেয়, কিন্তু আধুনিক কালে ইরাক-ইরান সংঘাতের পেছনে তেল, সীমান্ত ও আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নটাই মুখ্য ছিল। একইভাবে ২০১৫ সালের ইয়েমেন গৃহযুদ্ধে কয়েক কোটি মানুষ মানবিক সংকটে পড়েছে। এটি কেবল মাযহাবি বিরোধ নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল। অন্যদিকে, সুন্নি-প্রধান কিছু আরব রাষ্ট্র ২০১৭ সালে আমেরিকার সঙ্গে প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি করেছে। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার সঙ্গে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্প্রসারণ করেছে। যখন আদর্শগত দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগুলো কৌশলগত স্বার্থে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তখন শুধুমাত্র শিয়া পরিচয়ের ভিত্তিতে চরম বিদ্বেষ পোষণ কতটা যৌক্তিক-সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে।
বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতি স্বার্থের সমীকরণে চলে। তাই ঘৃণা নয়, ইস্যুভিত্তিক সহযোগিতাই হতে পারে পথ। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন দেখিয়েছে-প্রয়োজনে সংলাপের দরজা খোলা যায়। একইভাবে অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপেরেশন (ওআইসি)-এর মতো মঞ্চে ফিলিস্তিনসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সমন্বিত অবস্থান নেওয়া সম্ভব। অতএব, আবেগকে অস্বীকার নয়, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বুঝে শর্তসাপেক্ষ ঐক্যের পথে এগোনোই আজ সময়ের দাবি। ঐক্য মানে অভিন্ন আকিদা নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান ও কৌশলগত সহযোগিতা। তবেই বিভাজন নয়, শক্তিই হবে মুসলিম বিশ্বের পরিচয়।
ঘৃণার উৎস: আকিদা নাকি অন্তরের রোগ?
কোরআন স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দেয়, “তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না” (সূরা আল ইমরান ১০৩)। তাহলে প্রশ্ন জাগে, আজ যে শিয়া-সুন্নি বিদ্বেষ আমাদের সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে, তার উৎস কোথায়? বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটিরও বেশি মুসলমান, অথচ নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে গত কয়েক দশকে লক্ষ লক্ষ প্রাণ হারিয়েছে। পাকিস্তানেও গত দুই দশকে শিয়া-সুন্নি সহিংসতায় হাজারের বেশি প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়। এই রক্তপাত কি আকিদার স্বাভাবিক ফল, নাকি অন্তরের রোগ-অহংকার, গোঁড়ামি ও ক্ষমতার লোভের বহিঃপ্রকাশ? সূরা মায়েদা ও সূরা বনী ইসরাইলে ইবলিশের যে কৌশলের কথা বলা হয়েছে-মানুষের মাঝে শত্রুতা ও বিভেদ ছড়িয়ে দেওয়া-তা আজও যেন নতুন রূপে সক্রিয়। আকিদা তখনই অস্ত্র হয়ে ওঠে, যখন তা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। ইসলামের শিক্ষা বিভাজন নয়, বরং অন্তর পরিশুদ্ধ করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করা।
ইতিহাসের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
কারবালার ট্র্যাজেডি মুসলিম ইতিহাসের এক গভীর বেদনার নাম। কিন্তু সেটি শুধু ধর্মীয় আবেগের সংঘাত ছিল না; বরং ক্ষমতা ও নেতৃত্বের প্রশ্নে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৫০১ সালের আগে ইরানে শিয়াবাদ রাষ্ট্রীয় মতবাদ ছিল না। সাফাভি শাসনামলে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ আকিদা ও রাজনীতি তখন একে অপরকে ব্যবহার করেছে। আধুনিক যুগে ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধও ছিল আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই, নিছক মাজহাবি দ্বন্দ্ব নয়। একইভাবে ইয়েমেনের চলমান সংঘাতও মূলত আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে-রাজনীতি যখন ধর্মকে হাতিয়ার বানায়, বিভাজন তখন রক্তাক্ত হয়।
সাধারণ মুসলমানদের বাস্তবতা
বাস্তবতা হলো, বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটির বেশি মুসলমানের অধিকাংশই আকিদার জটিল তাত্ত্বিক বিতর্কে প্রবেশ করেন না। তারা জীবনের সংগ্রাম, রুজি-রুটি ও ইবাদতের সরল পথেই চলেন। ইন্দোনেশিয়া থেকে ভারত, তুরস্ক থেকে মরক্কো-মসজিদে দাঁড়ালে কাতার একটাই, কিবলা একটাই, কোরআন একটাই। রমজানে সারা পৃথিবীর মুসলমান একই মাসে সিয়াম পালন করেন। ঈদের তাকবিরেও বিভাজনের ভাষা শোনা যায় না। সাধারণ মানুষের কাছে শিয়া না সুন্নি-তার চেয়ে বড় পরিচয় তারা মুসলমান। অথচ আলেমদের তাত্ত্বিক মতভেদ যখন রাজনীতির মঞ্চে ছুড়ে দেওয়া হয়, তখন তা সাধারণ মানুষের জীবনে অবিশ্বাস ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। ইতিহাস দেখিয়েছে, ধর্মীয় বিতর্ককে জনজীবনের সংঘাতে রূপ দিলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজই।
মাযহাবী বিভাজন: আত্মসমালোচনা
শিয়া-সুন্নি বিভাজন নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের প্রথমেই আত্মসমালোচনার আয়নায় দাঁড়াতে হয়। বিশ্ব মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৮৫-৯০% সুন্নি এবং ১০-১৫% শিয়া-এই পরিসংখ্যানকে ঘিরে আমরা যেন সংখ্যার অহংকার বা সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাহীনতার রাজনীতি তৈরি করেছি। অথচ বিভাজন শুধু শিয়া-সুন্নিতে সীমাবদ্ধ নয়। সুন্নিদের ভেতরেই আশআরী, আহলে হাদিস, চার মাযহাব বনাম লা-মাযহাবি বিতর্ক-এমনকি তুচ্ছ ফিকহি মতভেদের কারণেও একে অন্যকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। “তাকফির” বা অন্যকে কাফের আখ্যা দেওয়ার সংস্কৃতি আজ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মসজিদের মিম্বর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিহাসে কারবালার বেদনা যেমন রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইকে ধর্মীয় রূপ দিয়েছিল, তেমনি আধুনিক কালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের লক্ষাধিক মৃত্যু প্রমাণ করে-আকিদা নয়, ভূরাজনীতি ও ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতাই আগুন জ্বালিয়েছে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এই মাযহাবী পরিচয়কে অনেক সময় আঞ্চলিক শক্তি ও বৈশ্বিক শক্তির কূটনৈতিক খেলায় হাতিয়ার বানানো হয়েছে। ইসলামের শিক্ষা যেখানে “উম্মাহ”-র ঐক্য, সেখানে আমরা কি বিভাজনকে রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত করে নিজেদের ভবিষ্যৎই দুর্বল করে দিচ্ছি না?
উপসংহারে এসে সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে-শিয়া বা সুন্নি পরিচয়ের চেয়ে বড় আমাদের পরিচয় মুসলমান। গত কয়েক দশকের রক্তাক্ত ইতিহাস-ইরাক-ইরান যুদ্ধ থেকে সিরিয়া কিংবা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ-প্রমাণ করেছে, বিভাজনের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত উম্মাহকেই দুর্বল করেছে। অথচ কোরআনের আহ্বান স্পষ্ট-বিভক্ত হয়ো না। তাই সময় এসেছে আত্মসমালোচনার সাহস দেখানোর। আকিদাগত মতভেদ থাকবে, কিন্তু তা যেন বিদ্বেষে রূপ না নেয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু তা যেন রক্তপাতের কারণ না হয়। শর্তসাপেক্ষ ঐক্য, ইস্যুভিত্তিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সম্মানই হতে পারে আগামী দিনের পথনির্দেশ। আমাদের শক্তি সংখ্যার অহংকারে নয়, অন্তরের ঐক্যে; স্লোগানে নয়, সমন্বিত কৌশলে। যদি আমরা ঘৃণার বদলে ভ্রাতৃত্ব বেছে নিতে পারি, তবে বিভক্ত উম্মাহ আবারও ইতিহাসে ইতিবাচক শক্তি হয়ে উঠতে সক্ষম হবে।




