
লিখেছেন: আয়েশা খাতুন
“ও ভাই দেখো তো, আজ কত চাঁদ?”
ছেলেটি এক বুড়ি নানির নাতি। সে মোবাইল চালাতে চালাতে হেসে উঠল- “আজ কত চাঁদ মানে? চাঁদ আজই হোক আর কালই হোক, একটাই চাঁদ। সত্যি নানি, তোমরা কি মানুষ গো? কিছুই মনে রাখতে পারো না। আজ কত চাঁদ? ওই তো একটাই চাঁদ।”
বুড়ি খিলখিল করে হাসতে চায় নাতির কথা শুনে, কিন্তু দাঁত না থাকার জন্য ‘হিস হিস’ শব্দে হাসে। তার হাসির শব্দ কেবল বাতাস বয়ে আনে। এই হাসি শুনে নাতি এক আধুনিক হাসি হাসে- ঠোঁট দুটো শুয়োরের মতো উঁচু করে গোল্লা পাকায়, তারপর ‘হে’ শব্দে দাঁতগুলো বেরিয়ে এলে দেখা যায় দাঁতে বিশ্রী সব দাগ আর ঠোঁটের তলায় খৈনি গোঁজা। যেখানে বসে, তার চারিপাশে থুতু ছড়ায়। এখানে পোকা নেই মাকড় নেই, তবে ড্রেনের দুর্গন্ধ আছে। নানি তার নাতিকে নিয়ে আর হাঁটাচলা করেনি বা দূর গ্রামে খালাতো বোনের ঘরে বেড়াতে যায়নি। আত্মীয় চেনানো আগের নানিদের একটা দায়িত্ব ছিল। এখন নাতিদের সময় নেই- সারাদিন বই আর বইভরা ব্যাগের সঙ্গেই কাটে তাদের সময়।
কিন্তু সে তো নানি; মাটির তলায় তার বাস, কাণ্ড তার মেয়ে, সে মাঝে দাঁড়িয়ে; আর পাতা হয়ে নাতি-নাতনিরা কত উপরে, একেবারে মগডালে। বুঝি ওরাই তো দেখতে পাবে চাঁদের রকমফের। ক-দিনের চাঁদ, সে কথা চাঁদ দেখেই বলে দেবে। তাই নানি জিজ্ঞাসা করেছিল- “ভাই, আজ কত চাঁদ?” নানি তার নাতির জবাবে বুঝল- “শেখে তো নাতি আমার, কত পুরনো দিনের মুখ্যু কথা কি আর বুঝতে পারে?” নানি বোঝাবার চেষ্টা করে- “ভাই, কটা চাঁদ বলিনি রে? বলি আগকার চাঁদে তো খোদার রোজা ছিল, এই চাঁদে শবে বরাত, লফুল আছে, তাই শুধিয়েছি রে- যে আজ কত দিনের চাঁদ হলো?”
একথা শুনে হাসিতে খৈনিমাখা থুতু গলায় আটকে গিয়ে ছেলেটি খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠল। একটু জিরিয়ে বলে উঠল- “বুড়ি মরতে যাচ্ছে তো সারে না, যত সব শেরেকি এই বুড়ির কাছে আছে। ওসব করতে নাই নানি- গুনাহ হবে,” বলেই সে মোবাইল নিয়ে আবার ব্যস্ত হয়ে হিন্দি সিনেমা নাকি বোঝা যায় না- এক উলঙ্গ নাচ দেখতে থাকল। নানি বোকার মতো নাতির মুখের দিকে ড্যাব ড্যাব করে ক্ষণকাল চেয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল।
এই নানির একটাই মেয়ে। চারদিকে তেমন আত্মীয় না থাকায় গ্রামেই মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। নেই নেই করে মেয়ের দুটো ছেলে। একটা মেয়ে আর নেওয়া হয়নি। “দুটো ছেলেই নাকি ধ্যাঁক ছেলে! কি আতাঁন্দার (বিপদ) কথা গো! বলি হ্যা রে নিলুফা, আর একটা বিটিমাটি নিলি না? কত বলেছি যে, ‘যে দিবে ছিঁড়া রুটি তার হবে কানা বিটি’- আচ্ছা গোটা গোটা রুটি দিলে তো দুটো চোখের বিটি হতো। খানিক মানুন-জুনুন করলে হতো না নিলু?”
জামাই বাবাজীবন এই অশিক্ষিত শাশুড়িকে সহ্য করতে পারে না। সে ভিন্ন দেশে কাজ করতে যায়। সোনার গয়না বানানোর কাজ করে। সারাবছর ঘরে থাকতে পায় না, বছরে দুবার বাড়ি আসে। ছেলেদের ‘মিশন’ স্কুলে পড়ায়। সরকারি স্কুলে পড়া হয় না, তাই এখন মিশন স্কুল উঠেছে। ছেলেরা পড়াশোনায় খুব ভালো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। বড়টি ডাক্তার হচ্ছে, কিন্তু ছোটটি? কে জানে সে কী হবে! বারবারই মিশন থেকে পাঁচিল টপকে পালিয়ে আসে। মোবাইলে খুব নেশা তার! বাপের খুব আহ্লাদে। যা চাবে ব্যাটাতে, তাই কিনে দিবে। ওর প্রশ্রয়েই তো ছেলে আমার বশের বাইরে চলে যাচ্ছে। “বলি হ্যাঁ রে, মিশন যে আজ পাঁচ দিন খুলেছে তো কি হোস্টেলে যাবি না নাকি? রোজ একশ টাকা করে জরিমানা লাগবে! আমার একটা বিটি থাকলে কি এত চিল্লাইতে হতো?” ছেলেটির মা এবার মোবাইল চালাতে চালাতে চিৎকার করে উঠল।
“মা, ও মা, চলে গেলি নাকি? দুটো কিছু খেয়ে গেলি না!” ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলে- “এত রোদ উঠেছে, বলি নানিকে দুটো খাবার দিলি না। আমার একটা বিটি থাকলে কিছু বলতে হতো না। কি খাবি খা কেন রে! না হলে ফাস্টফুড খাবি তো অর্ডার করে দে বাপ। তোর নানি কি চলে গেল ঘরে?” ছেলেটি অমনি করেই বসে থাকলো আর মোবাইল চালাতে চালাতে বলল- “বিটি তোর কপালে নাই গো মা।”
বুড়ি ততক্ষণে তার লম্বা লম্বা পা বের করে তিন-চারটে পুকুর পাড়, একটা নিম আর তেঁতুল তলা পেরিয়ে পাঁচপীরের আস্তানাকে ডান দিকে রেখে বাঁয়ে মোড় নিয়ে সালামদের খামারে উঠেছে। সালামদের খামারে এসে দাঁড়ালে এ বুড়ির দিক ঠিক হয়। সে মনে মনে ভাবে- কী রাত আর কী দিন, এই খামারের চারদিকে গাছপালা আর আকাশের চাঁদটা একই রকম আছে। নিমগাছের ফাঁকে আর পাকুড় গাছের ডালের আড়ালে চাঁদ ওঠা সে একই রকম দেখে। এই চাঁদ দেখেই সে নিজে ঠিক করে নিতে পারে কোনটা কত দিনের চাঁদ। তার বয়সের মেয়েরা অনেকেই আগের দিনের পাল-পার্বণ ছেড়ে দিয়েছে। শাড়ি পরা ছেড়ে সালোয়ার-কামিজ পরে। জামাতে যায়, চিল্লার পর চিল্লা করে আসে। চোখে সুরমা দিনে পাঁচবার করে লাগায় আর আতরের খুশবুতে মনে হয় বুঝি এই লাশ নিয়ে একদল লোক চলে গেল। এ বুড়ি ভয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
“কারো সঙ্গে কারো দেখা হলে সালাম দিতে হয় তা জানে না। জানিস না তো শিখবি, তা নয়তো হাঁদার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে। ইয়া কি মেয়ে গো, এক্কেবারে হুমসানি ক্ষেপি!” চারবার চিল্লা করে আসা ফারিহা এই কথাগুলো বুড়িকে বুঝিয়ে বলে-“এই দেখ শোন একটা কথা বলি- তুই আর এই গ্রামের কটা ঘর কারো কথা শোনাস না। সেই পুরনো দিনের মূর্খ মানুষগুলোর মতো হিন্দুদের পারা ধূপকাঠি ধরিয়ে কবরে চাদর চাপিয়ে কবর পুজো করতিস, খোদার রোজা, লফুল করতিস, শবে বরাত করতিস, মহরম করতিস, পীর মানত, শেরেকি করতিস- তুই সেই দলে আছিস। আচ্ছা তুই কেন তাদের দলে থাকবি শুনি? তোর জামাই বিরান দেশে থাকে, গালে তার সুন্নতি দাড়ি, মাথা থেকে টুপি খোলে না, সবাইকে সালাম দেয়। আর তুই? তার শাশুড়ি হয়ে কেন শেরেকি করবি? কারোর সঙ্গে দেখা হলেই তাকে সালাম দিতে হবে, বুঝলি?”
একথাগুলো শুনে বুড়ি মাথা নড়িয়ে বলে- “হুঁ।” বুড়ি তার পরেই তার ডান হাতের আঙুল নিজের কপালে ছুঁয়ে বলে- “সালাম বুবু! যাই তাহলে- নিলুফার বাপ মাঠ থেকে আসবে, পেঁয়াজ কুড়োতে গিয়েছে তো।”
জামাতে যাওয়া মহিলা তাকে ছাড়ে না। সে বলে-“সংসারের মায়া এবার ছাড় বোন, বয়স হয়েছে একবার শেরেকিগুলো ছেড়ে আমার সঙ্গে চিল্লাতে যাবি?” বুড়ি বলে- “হুঁ, কেন তোরা চিল্লাতে পারব না গো? গলাতে খুব বাজে আমার। নিলুফার বাপ কালা, ওনাকে সব সময় চিল্লাই চিল্লাই বলতে বলতে আমার গলায় খুব বাজুনি।” জামাতে যাওয়া পরহেজগার নারী রেগে বলে- “বেদাত মাগি, যা আমার সামনে থেকে যা।”
বুড়ি যেন মুক্তি পায়। সালামদের খামার ছেড়ে লম্বা পায়ে হেঁটে সে দক্ষিণ পাড়ার দিকে যায়। সে পাড়াতেই তার ঘরবাড়ি। তার ঘরের দরজায় বাঁশ গাছের জঙ্গল। সারাদিন বাঁশঝাড়ে বাঁশদের কতই না খেলা দেখে। বুড়ি আসলে বেশ রসিক। বাঁশদের মড়মড় আওয়াজ শুনতে পেলেই ভাবে এসব বাঁশদের সেই চিল্লানো। বাঁশদের কঞ্চি দেখে ভাবে বাঁশদের ধুয়া ধরা। বাঁশঝাড়ে কাকদের বাসা দেখলেই ভাবে- কী বোকা, কী বোকা! ঠিক আমার পারা বোকা! কিন্তু সে বাঁশদের এক পীর ‘মাদার সাহেব’কে খুব মানে। বাড়িতে কারো বিয়ে হলে ক্ষীর খাওয়ানোর আয়োজনে মাদার সাহেবের থালা সাজায় ভারি যত্ন করে। পানিতে থাকে ‘খাজা খিজির’ নামে এক পীর, তাকে সে খুব মানে। সে পানি কম খরচ করে এই জন্য যে বেশি খরচ করলে নাকি হিসাব লাগবে। পুকুরের পানিতে প্রস্রাব করে না, শৌচ কাজ করে না। স্নানের সময় সে সাবান দিয়ে পানিকে ঘোলা করে না। কী সাবধানে থাকে! মেপে মেপে পানি নিয়ে যায়।
যাই হোক, তাকে তো বেদাত নারী বলেই মোটামুটি এ গ্রামের মানুষ মনে করে। এ বুড়ি অন্য গ্রামের মেয়ে, বিয়ে হয়ে এসেছে কবে সে বলতে পারে না। কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলে- “তখন এ গাঁয়ে ওলাউঠা (কলেরা)তে অনেক লোক মরে গিয়েছিল। তারপর পানির পীরকে মানুন-জুনুন করে রক্ষা।” দেখলে শেরেকি কাকে বলে! ওলাউঠা হয়েছিল তো পানির পীরকে মানত! সেই হিন্দুদের মতো। ছিঃ, এই গ্রামে এই কটা ঘর আছে বড়ই শেরেকি গো! কিছুতেই শেরেকি করা ছাড়ে না। অন্য নারীর কণ্ঠে প্রতিবাদ শোনা যায়।
এই গ্রামের মানুষ যেমন ভাগ হয়ে গেছে- শেরেকি, বেদাত, অধার্মিক আর বিশুদ্ধ ধার্মিকে; ঠিক যেন তেমনি রাত আর দিন তারাও ভাগ হয়ে গেছে দুটি ঘরে। দিন শেষ হলেই রাত ঘনিয়ে আসে দুটি ঘরে একই ভাবে, কিন্তু এক ঘরে কাকদের ডাক নেই বললেই চলে। শালিকদের ঝগড়া শোনা যায় না। আকাশে পরিযায়ী পাখিদের বিজোড়ে উড়ে যাওয়া নেই। পাশের হিন্দু গ্রাম থেকে ভেসে আসে না নামকীর্তনের খঞ্জনির মিঠে শব্দ। একেবারে মৌলিক আত্মার চলাচল। অন্য ঘরের আঙিনায় বাচ্চারা দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে পরিযায়ী পাখিদের সারি সারি ওড়া দেখে চিৎকার করে- “কুলো হও, চালুন হও।” এই ডাকে না কি কোনো কারণে সন্ধ্যার আকাশে এই পরিযায়ী পাখিরা কখনো গোল কখনো লম্বা আকারে ওড়ে আর তারাও দেশে ফেরার এক কলতান করে ডাকে একে অন্যকে। বাঁশ জঙ্গলে কাক-পাখিদের ঘরে ফেরার উল্লাসিত চিৎকারে সকলেই আশ্বস্ত হয়- যেন সকলেই দিনের শেষে বাসায় ফিরেছে ঠোঁটভরা খাবার নিয়ে।
এইভাবে চলতে ফিরতে দেখা যায় একটি রাত সেজে উঠেছে। সন্ধ্যা কিছুটা কালো মেখে এসেছিল বটে, কিন্তু কিছুটা সময় পেরোতেই পাড়াটার মানুষেরা তাদের বিদ্যুতের বাতি নিভিয়ে দেয়। যেন তারা রাতকে প্রগাঢ় তৃষ্ণায় ভরে দিতে চায়। বলা হয়নি-দিন শুরু হওয়ার আগে সুবেহ সাদিকেই মেয়েরা উঠেছে। স্নান সেরে আতপ চালের গুঁড়ো আটা দিয়ে খুমির (পিঠে) বানিয়েছে। সাদা গোল কাগজের মতো আটার রুটি বানিয়েছে। আটা ভেজেছে গাওয়া ঘি দিয়ে, হালুয়া বানিয়েছে। বাড়ির পোষা দেশি মুরগি জবেহ করে ঝোল বানিয়ে রান্না করেছে। ক্ষেতের সরু চালের পোলাও রান্না করেছে। জি হ্যাঁ, এই সব খাবার মৃতদের নামে সকল গরিব-দুঃখী আর সবার সঙ্গে ভাগ করে খাবে। সারাবছর সেই বুড়ি হুমসানি ক্ষেপি’ থাকলেও এই পরবে, বিশেষ করে শবে বরাতের রাতে সে যেন এক ধীর স্থির ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়; আবেজমজমের পানির স্রোতস্বিনী হয়ে বইতে থাকে। পাগল-ক্ষেপিরা বেশিক্ষণ ধীর থাকতে পারে না বুঝি।
দেখা যায় খুমিরের চেরাগ তৈরি করে সাদা নরম কাপড়ের সলতে পাকায় ঘরে ঘরে নারীরা। সরষের তেলে ভিজিয়ে সারি সারি প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয় আপন আপন ঘরে। রাত কিছুটা বাড়তেই একদল কচিকাঁচা তাদের বাঁশের বোনা চালনিতে কয়েকটা মোমবাতি জ্বালিয়ে গলা মোম দিয়ে আটকে নেয় চালুনির সঙ্গে। কারো হাতে লম্বা টিফিন বাটি, কারো হাতে টিনের কাটোরা। উঠোন থেকে উঠোনে এই দল সুর করে গাইতে থাকে-
“দিল দিল মুহাম্মদ, তক্তে আলী,
যে দিবে হালুয়া তার হবে কালুয়া (পুত্র),
যে দিবে ছিঁড়া রুটি তার হবে কানা বিটি।”
হঠাৎ সুর পাল্টে এক সঙ্গে চিৎকার করে- “এ কোণ ও কোণ করছে গোসের হাঁড়ি, লুকোচ্ছে গোস দেবার ডরে খিল লাগিয়েছে ঘরে।”
এই ছড়া শুনে বাড়ির মেয়েরা হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে আর তাদের চালুনিতে রাখে সেই সাদা সাদা গোল গোল কাগজের মতো নরম রুটি। ঢেলে দেয় টিফিন বাটিতে দেশি মুরগির মাংস আর জাফরানি পোলাও। সেই বুড়ি যেন গোটা রাতকে কিনেছে। তার খুশির অন্ত নেই। আজ যে মৃত আত্মারা আসবে এই মাটির ঘরে! জানো নাকি সারাবছর তাদের ছাড় নাই, শুধু এই শবে বরাতে তাদের ঘরে আসার ছাড় দেয় মালিক খোদা। তারা যেন নিজেদের ঘরকে চিনতে পারে। রাতের বেলায় আকাশে চাঁদ উঠবে। গোল ঢলো ঢলো চাঁদ। আমার আঙিনায় নিমপাতারা চাঁদনি নিয়ে কতো নকশা আঁকবে। চেরাগের আলো-আঁধারিতে আমার মৃত শ্বশুর আর কচি ফেরেশতারা হাত ধরাধরি করে আসবে আর দেখাবে- “ওই দেখো আমার কালা ব্যাটার ক্ষেপি বউ কোরআন পড়ছে। ওই দেখো আমার কালা ব্যাটা সারারাত খোদার ইবাদত করছে ঠিক যেন একটা বহতা নদীর পানির চলন গো! ওই দেখো আমাদের বাঁশগাছেরা আজও অমনি করে দুলে দুলে খোদার জিকির করছে। ওই দেখো আমাদের পেঁয়াজের মাঠে কত ফুল! ওই দেখো ক্ষেতে পানি দেওয়া দুনী। জানো তো ফেরেশতা, খোদা খুব খুশি হলে আসমান থেকে পানি টপকায়, সেই সময় আমরাও খুব উল্লাস করতাম। ওই দেখো আমার নিজের হাতে বোনা খলসে মাছ ধরার ঘুণি, ওই ঘুণি পেতে দিতাম জোয়ারের পানির উল্টো বাগে। আর জালমাছগুলো টুপটাপ টুপটাপ করে ঢুকে পড়ত।”
হুমসানি ক্ষেপি নিজেই নিজেকে গল্পোনায় শোনায় যেন- “আমি সব আড়চোখে দেখতে পাই। ফেরেশতাগুলো কী সোজা, সব দেখে দেখে সব শুনে কথা কয়। বলে- আমাদের আসমানের চেয়ে তোমাদের ঘর বড় সুন্দর! আর বলে খোদা খুব খুশি থাকলে তোমাদের ঘরে ঘরে কন্যাদের জন্ম দেয়।” আমি তখন আমার শাশুড়ির শিখিয়ে দেওয়া সূরা ইয়াসিন পড়তে থাকি- “ইয়া সীন, ওয়াল কুরআনিল হাকিম, ইন্নাকা লামিনাল মুরসালিন…” না না, আমি তখন পড়ি আমার নানির শিখিয়ে দেওয়া সেই সূরা নিসা- না না, তখন আমি পড়ি- “ফাজকুরুনী আজকুরুকুম ওয়াশ কুরু লী অলা তাকফুরুন”- আমাকে পাওয়ার জন্য যদি দু পা ফেলো, আমি তোমাকে গ্রহণ করার জন্য দশ পা এগিয়ে যাব।
হুমসানি ক্ষেপি আর চাঁদ তখন সারা আকাশ পেরিয়ে ভোরের শুকতারাকে ছুঁতে চায়- ওই দেখো গোকে রে? নাতি ছোকরা এসে বলে- “যে দিবে ছিঁড়া রুটি তার হবে কানা বিটি।”




