
লেখক: মাওলানা ওয়ালিউল্লাহ সাঈদী ফালাহী
ইসলামের জীবনদর্শনের একটি অনন্য এবং প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো পরকাল বা আখিরাতের ধারণা। এটি কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ নয়, বরং মানব চরিত্র গঠন এবং একটি সুশৃঙ্খল, শান্তিময় ও সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণের প্রধান চালিকাশক্তি। পরকালের এই জবাবদিহিতার চেতনা যখন মানুষের মন থেকে মুছে যায়, তখন সে আর মানুষ থাকে না; বরং লাগামহীন ও হিংস্র পশুর রূপ ধারণ করে, যার হাত থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের কেউই নিরাপদ থাকে না।
ইতিহাসের আয়নায় পরকালের প্রভাব: আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগের আরবের জাহেলি সমাজের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই এক চরম অন্ধকার যুগ। সেখানে সবলরা দুর্বলদের ওপর জুলুম করত, এতিম ও বিধবাদের অধিকার খর্ব করা হতো, জোরপূর্বক অন্যের সম্পদ ও জমি দখল করা হতো এবং নারীদের গণ্য করা হতো ভোগের সামগ্রী হিসেবে। সামান্য কারণে একে অপরকে হত্যা করা এবং কাফেলা লুট করা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা,
এমন এক অমানবিক পরিবেশে মানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মদ (সা.) অবতীর্ণ হলেন এবং মানুষের সামনে তুলে ধরলেন পরকালের অবিনশ্বর সত্য। তিনি ঘোষণা করলেন, মানুষের এই ক্ষণস্থায়ী জীবন ও এর ভেতরের যাবতীয় সামর্থ্য আল্লাহর দেওয়া পবিত্র আমানত, পৃথিবীর প্রতিটি অণু পরিমাণ কর্মকাণ্ড ফেরেশতারা লিপিবদ্ধ করছেন এবং একদিন আমাদের সবাইকে সৃষ্টিকর্তার সামনে দাঁড়িয়ে এক-এক করে সব কাজের হিসাব দিতে হবে।
আখিরাতের এই বৈপ্লবিক চিন্তাই আরবের সেই বর্বর সমাজকে আমূল বদলে দিয়েছিল। যারা একসময় দস্যুতা করত, তারা হয়ে উঠল জানমালের রক্ষক; যারা এতিম-বিধবাদের ওপর অত্যাচার করত, তারা হয়ে উঠল তাদের অভিভাবক, সাহাবিদের মনে জান্নাত লাভ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এমন এক ব্যাকুলতা তৈরি হয়েছিল যে, দুনিয়ার লাভ-ক্ষতি তাঁদের কাছে তুচ্ছ হয়ে উঠেছিল।
পার্থিব জীবনের মরিচীকা: আমাদের সৃষ্টিকর্তা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, এই পার্থিব জীবন এক ধোঁকার সামগ্রী এবং খেলাধুলা বৈ আর কিছুই নয়। অথচ আজকের মানুষ এই নশ্বর পৃথিবীর মোহে অন্ধ হয়ে ছুটছে, আমরা যখন বাজার থেকে কোনো দামি ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী কিনি, যার কোনো গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি নেই, তখন আমরা তা কিনতে ভয় পাই। অথচ যে দুনিয়ার কোনো গ্যারান্টি স্বয়ং আল্লাহ দেননি, মানুষ আজ তার পেছনেই জীবনের সব শক্তি ব্যয় করছে, বয়স বৃদ্ধি বা জন্মদিনে মানুষ আনন্দ উৎসব করে, কিন্তু তারা ভুলে যায় যে তারা জীবনের একটি বছর হারিয়ে পরকাল ও মৃত্যুর আরও এক ধাপ কাছে চলে গেছে। দুনিয়াতে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের উপার্জন, পরিবার রক্ষা ও ক্যারিয়ার গঠন করতে হবে, কিন্তু আমাদের মূল লক্ষ্য বা ফোকাস হতে হবে পরকালীন জীবন।
বর্তমান বিশ্ব ও পরকালহীনতার পরিণতি: আজকের আধুনিক বিশ্বে ফিলিস্তিনের গাজাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এবং আমাদের চারপাশের সমাজে যে অবর্ণনীয় জুলুম, অন্যায় ও রক্তপাত আমরা দেখছি, তার মূল কারণ একটিই—মানুষের মন থেকে পরকালের ভয় এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার চেতনা বিলুপ্ত হওয়া, ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ জালিমরা ভাবছে তারা চিরকাল পার পেয়ে যাবে কিন্তু কিয়ামতের কঠিন দিনে ইতিহাসের বড় বড় অহংকারী শাসক ফেরাউন, নমরুদ থেকে শুরু করে বর্তমান যুগের সব অত্যাচারীকেই আল্লাহর আদালতে মাথা নিচু করে দাঁড়াতে হবে সেদিন কোনো অপরাধীই পালিয়ে বাঁচতে পারবে না এবং প্রতিটি মজলুমের অধিকার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
কিয়ামতের ভয়াবহতা ও চরম একাকীত্ব: পবিত্র কোরআন ও হাদিসে কিয়ামতের যে ভয়াবহ দৃশ্য বর্ণনা করা হয়েছে, তা মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট সেদিন মানুষ নিজের আমলের চিন্তায় এতটাই দিশেহারা থাকবে যে, আপন ভাই, পিতা-মাতা, স্ত্রী ও সন্তানদের ছেড়ে পালাবে দুনিয়াতে মানুষ যাদের সুখের জন্য হলাল-হারামের তোয়াক্কা না করে অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন করে, কিয়ামতের ময়দানে সেই আপনজনেরা একটি নেকির জন্যও সাহায্য করবে না সবাই কেবল নিজের মুক্তির চিন্তায় ব্যাকুল থাকবে।
আখিরাত বিশ্বাসীর অনন্য চরিত্র: আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস মানুষের চরিত্রকে মহান করে তোলে পরকাল বিশ্বাসী মানুষ কখনো সমাজে অশান্তি ছড়াতে পারে না তারা মানুষের সাথে সদাচরণ করে, বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করে, নারীদের মর্যাদা রক্ষা করে এবং এতিম, অনাহারী ও প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ায় পক্ষান্তরে, যারা পরকালকে অস্বীকার করে, তাদের চরিত্রে কৃপণতা, স্বার্থপরতা ও অহংকার বাসা বাঁধে, যা সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
প্রকৃত নিঃস্ব কে?: রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের সতর্ক করে বলেছেন, প্রকৃত নিঃস্ব বা দেউলিয়া সে নয় যার ধনসম্পদ নেই; বরং সে ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন পাহাড় পরিমাণ নামাজ, রোজা ও হজের সওয়াব নিয়ে হাজির হবে, কিন্তু দুনিয়াতে সে মানুষের ওপর জুলুম করেছিল, কাউকে গালি দিয়েছিল কিংবা কারও রক্তপাত করেছিল ফলে তার সব নেকি পাওনাদারদের দিয়ে দেওয়া হবে এবং একপর্যায়ে নেকি শেষ হয়ে গেলে মানুষের পাপের বোঝা তার ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, দুনিয়া আমাদের জন্য ত্যাগের ও পরীক্ষার ক্ষেত্র এখানে আমরা ভালো বাড়ি বানাব, সুন্দর ব্যবসা বা চাকরি করব, পরিবারকে সুখী করব—তাতে কোনো ধর্মীয় বাধা নেই কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার প্রতি আমাদের মনোযোগ যদি ৫০ শতাংশ হয়, তবে আখিরাতের প্রতি তা হওয়া উচিত ৫০০ শতাংশ অর্থাৎ, দুনিয়া থাকবে আমাদের পায়ে আর আমাদের মূল লক্ষ্য ও নজর থাকবে আখিরাতের চিরস্থায়ী জান্নাতের দিকে। তবেই একটি শান্তিময়, মানবিক ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।




