
সফিকুল ইসলাম মন্ডল
আজকের সমাজের সকল দিকের নৈতিক অধঃপতন নিয়ে সকলেই বেশ চিন্তিত। অথচ এই অধঃপতনের মূল কারণ কিন্তু স্রষ্টার নির্দেশিত পথে না চলে নফসের নির্দেশিত মানবরচিত মতে পথে চলা। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর নির্দেশিত পথে না চলবে সমাজ ততো ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হবে। সেই জন্য মানব সমাজের মুক্তির জন্য, কল্যাণের জন্য অবশ্যই মানব সমাজকে মহান রবের আনুগত্যের দিকে আহ্বান করতে হবে। আর এই মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বানের কাজ বা দায়িত্ব সরাসরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজেই দিয়েছেন। তিনি বলেন- “তোমরা আল্লাহর দিকে মানুষকে হিকমাহ ও সুন্দরতম উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করবে, আর বিতর্ক করবে উত্তম পন্থায়”। (সূরা নাহল: ১২৫) কুরআনের এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা দাওয়াতি কাজের সকল কৌশল ও পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন তিনটি মূলনীতির মধ্যে।
প্রথমত হিকমাহ বিষয়ে বলতে হলে ক্ল্যাসিক্যাল আরবিতে হিকমা অর্থ শত্রুতাকে বন্ধুত্ব দ্বারা জয় করা। এর সহজ সরল বাংলা অর্থ হচ্ছে প্রজ্ঞা, পাণ্ডিত্য, দূরদর্শিতা। দাওয়াতি কাজে হিকমাহ বলতে দায়ীদের এমন কিছু বিশেষ গুণ ও দক্ষতা বোঝায় যা দিয়ে মানুষকে ইসলামের প্রতি সহজে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ করা যায়।
দ্বিতীয় যে গুন এর কথা বলা হয়েছে সেটা হলো সুন্দরতম উপদেশ। একজন দায়ীর কথা বার্তা, আচার ব্যবহারে আন্তরিকতা ও দাওয়াত প্রদান কারি ব্যাক্তির প্রতি প্রকৃত কল্যাণ প্রত্যাশী প্রকাশ পাবে। যুক্তি প্রমাণ এর সাথে সাথে আবেগ ও ভালোবাসা মিশ্রিত কণ্ঠে সত্য দ্বীনের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে নিরেট কল্যাণ কামনা ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আপনি তার সামনে হাজির হননি। এই ক্ষেত্রে রাসূল সা. বলেছেন, দ্বীনের দাওয়াত সহজ করো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, বিতশ্রদ্ধ করো না।
উত্তম পন্থায় বিতর্ক: আমরা যারা ইসলামের দাওয়াত প্রদান করি আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে আমরা যেন কেবল মাত্র যুক্তিতর্কে জয়লাভের জন্য বিতর্কে না লিপ্ত হই, বরং হৃদয়গ্রাহী ভাষায় ন্যায়সঙ্গত পন্থায় সত্য উপস্থাপন করার চেষ্টা করতে হবে। আপনি যার কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে চান তার কথা খুব মনোযোগের সাথে শুনতে হবে এবং যৌক্তিক জবাব দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। উত্তর প্রদানকালে কখনোই গোঁজামিলের আশ্রয় নেওয়া যাবে না। যদি কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারেন তবে বিনয়ের সাথে সময় চেয়ে নিবেন। ব্যক্তিগত আক্রমনে কখনোই যাওয়া যাবে না। এমন কোনো বিতর্কে অংশ গ্রহণ করা যাবে না যেখান থেকে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মনে রাখতে হবে আমাদের দাওয়াতের মূল লক্ষ্য মানুষকে আল্লাহর দিকে নিয়ে আসা, দূরে সরানো না।
ঐশী পথনির্দেশ অনুযায়ী সুন্দর, সুস্থ, সভ্য, মূল্যবোধ যুক্ত একটি সমাজ পুনর্গঠনের জন্য ছাত্র ও যুবদের তৈরি করার জন্য আমাদের সার্বিক কর্ম তৎপরতা। আজকের ছাত্র আগামী দিনের নেতা, সমাজ পরিচালক। অথচ নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষাব্যবস্থা, পাশ্চাত্য অপসংস্কৃতির প্রভাব, ইসলাম ও মুসলিমদের সম্পর্কে মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারনা, আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি, মাদক আসক্তিসহ বিবিধ কারণে ছাত্রসমাজের বৃহত্তর অংশ নৈতিক অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আবার আমাদের সমাজের শিশু কিশোররা কার্টুন ও গেমস আসক্তির কবলে নিমজ্জিত। যার ফলে শিশু-কিশোরদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কার্টুনের চরিত্রই যেনো তাদের আদর্শে পরিণত হচ্ছে। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাপকভিত্তিক দাওয়াতি কাজের কোনো বিকল্প নেই। আসলে দাওয়াতি কাজ হলো মুমিনজীবনের মিশন। সে যেখানেই সুযোগ তৈরি হয়, সেখানেই দ্বীনের দাওয়াত প্রচারের কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়।
সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছাতে আমাদের বিশেষ কিছু কর্মসূচি নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতে হবে। ছাত্রদের মাঝে কাজ করার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রকে ভাগ করে নিয়ে কাজ করা যেতে পারে—
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো ছাত্র-অঙ্গনে দাওয়াতি কাজের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। এখানে পরিকল্পিতভাবে দাওয়াতি কাজ করতে পারলে কম সময়ে অধিক সংখ্যক ছাত্রকে দাওয়াতের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। ক্লাস শুরুর আগে, ক্লাসের শেষে এবং বিশেষভাবে টিফিন পিরিয়ডে পরিকল্পিত ও টার্গেটভিত্তিক দাওয়াতি কাজ করা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে বিভিন্ন দাওয়াতি প্রোগ্রাম আয়োজন করা যায়। ব্যক্তিগত দাওয়াতি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নিয়মিত কিছু দাওয়াতি প্রোগ্রাম আয়োজন করা গেলে বিপুল সংখ্যক ছাত্রকে দাওয়াতের আওতায় আনা সম্ভব হবে। বিভিন্ন খেলাধুলা আয়োজন, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন, বইপাঠ প্রতিযোগিতা, চা-চক্র, সাধারণসভা প্রভৃতি দাওয়াতি প্রোগ্রাম আয়োজন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমাদের কলেজ ইউনিভার্সিটির সাথে সাথে স্কুল গুলোকেতেও কাজ করতে হবে।
ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য প্রথমে ছাত্রদের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। সেই সম্পর্ক তৈরি করতে খেলার মাঠ হতে পারে উপযুক্ত জায়গা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে ছাত্রদের পছন্দের স্থান হলো খেলার মাঠ। প্রভাবশালী ও নেতৃত্বের গুণাবলিসম্পন্ন ছাত্রদের খেলার মাঠে বেশি পাওয়া যায়। কাজেই বিভিন্ন আকর্ষণীয় কর্মসূচি দিয়ে আমাদেরকে খেলার মাঠে দাওয়াত সম্প্রসারণে চেষ্টা চালানো প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে স্পোর্টিং ক্লাব গঠন করে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যায়।
মসজিদ দাওয়াতি কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সহজ ক্ষেত্র। মসজিদে আসা ছাত্ররা সাধারণত ইসলামী অনুশাসন মানার আগ্রহ নিয়েই নিয়মিত মসজিদে আসে। নামাজি এই ছাত্রদের ইসলামী আন্দোলনের প্রতি আগ্রহী করা তুলনামূলক সহজ কাজ। নামাজের আগে-পরে পরিকল্পিতভাবে যোগাযোগ করে দাওয়াত পৌঁছানোর চেষ্টা করা যায়। মসজিদে লাইব্রেরী তৈরি করে, নিয়মিত দারসে কুরআন বা দারসে হাদিসের আসর আয়োজন করতে পারলে দাওয়াতি কাজে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।
আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ দিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। সেটা হচ্ছে নিজের পরিবার, আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশী। আমরা অনেকে ইসলামী আন্দোলন করি অথচ আমাদের পরিবারের সদস্যদের দিকে আমাদের তেমন কোনো চেষ্টা থাকেনা।”তোমরা যারা ঈমান এনেছো, নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার ও সন্তান-সন্ততিকে আগুন থেকে রক্ষা করো”। (সূরা তাহরিম: ৬) স্বজন-পরিজনদের মাঝে দাওয়াতি কাজের জন্য আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে আমরা অনেক সময় ব্যয় করি। ফলে তাদের মাঝে দাওয়াতি কাজের অনুভূতি ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমেই দাওয়াতি কাজ করা যায়। পরিবার আত্মীয়-প্রতিবেশী সবার মাঝেই আমরা দাওয়াতি কাজ করবো। বিশেষত পরবর্তী প্রজন্মের দিকে বিশেষ দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন। আমাদের সহোদর ছোট ভাই ও ছোট বোন, চাচাতো-মামাতো-খালাতো-ফুপাতো ছোট ভাইগণ, প্রতিবেশীদের মাঝেও আমাদের ছোট অনেক শিক্ষার্থী আছে। এদের সবার সাথে আমাদের সম্পর্ক ভালো এবং সবার ওপরই আমাদের পজিটিভ প্রভাব অনেক বেশি। সচেতনতার সাথে একটু প্রচেষ্টা চালালে পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তোলা সম্ভব।
এখন অনলাইনের যুগ। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে শিক্ষার্থীদের অনলাইনে সময় ব্যয়ে আগ্রহ ও প্রয়োজন বাড়ছে দিনে দিনে। শিক্ষার বিষয়বস্তুর ডিজিটালাইজেশন এবং বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য লাভে সহজতা এর অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক সময় ব্যয় করে থাকে। যুগের প্রয়োজনকে সামনে রেখে অনলাইনে সামগ্রিক দাওয়াতি তৎপরতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিভিন্ন অনলাইন কন্টেন্ট প্রস্তুত, প্রস্তুতকৃত কন্টেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালানো দরকার। এর বাইরে অনলাইন ছাত্রদের সাথে পরিচয় হয়ে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে সুন্দর সম্পর্ক স্থাপন করে ধিরে ধিরে নিয়মিত দাওয়াতি কাজ করা প্রয়োজন।
আসলে আমাদের দাওয়াতের কাজ হোক সর্বত্রই। মাঠে-ঘাটে, গ্রামে-শহরে, দূরে-কাছে, অনলাইনে-অফলাইন, যেখানেই ছাত্র, ইসলামের সুমহান আদর্শ নিয়ে সেখানেই আমাদের পৌঁছাতে হবে।





