
লিখেছেন: রক্তিম ইসলাম
প্রতিদিন মদ্যপান করলে যা হবার তাই হল। বাবাই-এর বাবার সিরোসিম অফ লিভার। নারায়নাতে ভর্তির সময় ডাক্তারবাবু বলেছিলেন এক্সরে না দেখে আমি কিছু বলতে পারছি না। তা আপাতত যা কন্ডিসান এ রোগী ফেরার আশা কম।
বলাই ঘোষ ডি গ্রুপের কর্মী হলেও ব্যাঙ্কের চাকরি, পয়সা যা যাবে গাঁট থেকে না, যথারীতি মেডিক্লেম করা আছে, এক্ষেত্রে ডাক্তারবাবুরা চিকিৎসার স্বাধীনতা পান, রোগ নিশ্চিত করতে ইচ্ছেমতো পরীক্ষা-নীরিক্ষা করতে পারেন। টানা তিন সপ্তাহ পেরিয়ে নার্সিংহোম থেকে ছাড়া পেলেন বলাই ঘোষ। কিছু কঠিন এবং নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে না পারলে আবার অসুস্থ হয়ে পড়বেন।
এর মধ্যে লিভার, কিডনির বারোটা বেজে গেছে, শুধু খাওয়া দাওয়াটা চেক করতে হবে। মশলাদার খাবার একটুও চলবে না। সবই খাবেন, তবে সেদ্ধ কেবল, কিন্তু কড়াকড়ি মদ্যপান ও ধূমপানে। ডাক্তারবাবুর কঠোর নির্দেশ, এক ফোটা লিকার অথবা একটান সিগারেট কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, ঘরে একটানা তিন সপ্তাহ বিশ্রাম, তারপর সুস্থ মনে করলে কাজে যোগ দিতে পারেন।
ডাক্তারবাবুর পরামর্শ মতো তিন সপ্তাহ কাটল, ডাক্তারবাবুর প্রেসক্রিপসন মেনে ওষুধ, খাওয়া, দাওয়া চলেছে। শরীর অনেকখানি সুস্থ, কিন্তু উপসর্গগুলো যায়নি, হাত কাঁপে, পা কাঁপে, দ্বিতীয় ব্যক্তির সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। বাথরুমে গেলেও ধরে নিয়ে যেতে হয়। প্রায় সর্বক্ষণ কাছে থেকে সবটাই সমাল দিচ্ছেন। বাবাই-এর মা কমলাদেবী। বাবাই এর সঙ্গে মায়ের সম্পর্কটা যতখানি খোলামেলা, বাবার সঙ্গে তেমনটি নয়, বাবাই-এর এতটা বয়স পর্যন্ত তার সব দাবি মায়ের কাছে, মাও সেটায় বাবাই-এর সব বায়না।
টোটোয় মিনিট কুড়ি পথ ব্যাঙ্কের শাখা। বাবাই অরা ও মা চলে এল ব্যাঙ্কে। সঙ্গে বলাইবাবু, শরীর অনেকটা ভালো এখন, তাই ব্যাঙ্কে জয়েন করার জন্য নিয়ে আসা। প্রায় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর ম্যানেজারবাবুর ঘরে ঢোকার অনুমতি এল। স্ত্রী আর ছেলে দু’জনে ধরাধরি করে ঢোকালেন বলাইবাবুকে ম্যানেজারবাবুর চোখ এড়াল না। জয়েনিং লেটারটা হাতে নিয়ে পুরো বেঁকে বসলেন ম্যানেজারবাবু। বললেন, ব্যাঙ্কে এখন যা কাজ নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই, উনি জয়েন করে কী করবেন, বর্তমান অবস্থায় ব্যাঙ্কের কোনও কাজে আসবে না। তারপর স্রেফ একটা উপদেশ দিয়ে ছেড়ে দিলেন। যা সম্ভব তাই বলছি। মেডিকেল সার্টিফিকেটের সঙ্গে একটা দরখাস্ত দেবেন, ভলেন্টারি রিটায়ারমেন্টের জন্য একটা ব্যবস্থা নিতে পারি, যদি অথরিটি অনুমোদন করে।
খবরটা মনামীর কানে পৌঁছাতে দেরি হল না। বাবাইদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা অনেক দিনের। বাবাই এর সঙ্গে বারো ক্লাস পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছে। তারপর দু’জন দু’দিকে। বাবাইদের বাড়িতে মনামীর নিয়মিত যাতায়াত। বাবাই-এর মাকে মনামী কাকিমা ডাকে, বাবাকে কাকু। কাকুর অসুস্থতার সব খবর তার জানা, শুধু জানা না এই শহর ছেড়ে কুড়ি কিমি দূরে একটা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা বলে প্রতিদিন না হলেও নিয়মিত মনামী নার্সিংহোমে যাতায়াত করেছে। ডাক্তারবাবুদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ, কথাবার্তা বা পরামর্শ মনামী করেছে। কাকীমার কথা ছেড়ে দিলে সঙ্কটের মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত সেবার মানসিক স্থিতি বাবাই-এর নেই. কাকুর কাজে যোগ দিতে জয়েনিং লেটারটা মনামী লিখেথে। রসিকতা হলেও সত্যি, মনামী বলেছে, জয়েনিং লেটার তো আর ব্যালেন্স শাঁট নয়, যে কমার্সের ছেলের দরকার। দু’কলম ইংরেজি লিখতে আমিই লিখবো।
সেদিন রাতে বাবাই ম্যানেজারবাবুর সঙ্গে কী কী আলোচনা হল মনামীকে সব জানালো। যা পরিস্থিতি ভলেনটিয়ার রিটায়ারমেন্ট ছাড়া বোধ হয় অন্য উপায় নেই। টেলিফোনে সব প্রশ্নের উত্তর অথবা কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলে ভুলের সম্ভাবনা থেকে যায়। মনামী বলল, ঠিক আছে, চিন্তার কারণ নেই, দেখছি, একটা না একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কাকুর এখনও প্রায় দশ বছর চাকরি আছে। দু’এক বছর থাকলে হয়তো ভাবা যেত।
ঠান্ডা মাথায় কথা শোনাতে সকালটাই বেস্ট। বাবুয়াকে সঙ্গে নিয়ে মানিমা দশটাই পরেই ব্যাঙ্কে হাজির হল। ম্যানেজারবাবু গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন। দরজা খুলে আসছি বলে ওরা ঢুকে পড়ল। মুখ খুলল মনামী। উদাহরণ দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করল। দু’তিনটে উদাহরণ তার জানা, অসুস্থ কর্মীর কাজ চালিয়ে দেন তার স্ত্রী, এ ব্যাপারে ম্যানেজারবাবু ইচ্ছে করলে অনুমতি দিতে পারনে কাকুর সঙ্গে কাকিমাকে জয়েন করাতে। ম্যানেজারবাবু প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বললেন, দেখুন সরকারি অফিসে অনেক কিছুই চলে, কাজ না করেও এক তারিখে বেতন মেলে, এই দেখুন, আমাকে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ অনেক কিছুই করতে হয়।
– স্যার, আপনাকে অবগতি করি, কাকিমা মাধ্যমিক পাশ, আপনি ইচ্ছা করলে খাতাপত্রের কাজও করিয়ে নিতে পারেন। তাছাড়া পাশবই আপডেট করতেও তো কর্মীর প্রয়োজন। আপনার অনুমতিতে… তারপর সম্ভবত অনুমতি শব্দটির প্রয়োগ আরও বিনীত গলায় মনামী বলে, আপনার নির্দেশ মতো ব্যাঙ্ক পরিষেবায় অনেক কাজে সাহায্য করবে। তাছাড়া, চা করা মেয়েদের সংসার জীবনে একটা কাজ। অফিসের প্রয়োজনে এ কাজটা কাকিমাকে দিয়ে করাতে পারবেন। একবার স্যার ট্রাই করে দেখুন। প্রিজ, তারপর না হয়…
না তাত নয়… এই ভাঙা মাসের ক’দিন বাদ দিলে এক তারিখেই পাঠিয়ে দেবেন।
কী সহজে মেনে নিলেন ম্যানেজারবাবু আশা করেনি মনামী।
-স্যার, ধন্যবাদ নয়, অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই বলে বাবাইকে নিয়ে বেরিয়ে যাবে, ঠিক এসময়ে ম্যানেজারবাবু ডাক দিলেন, প্লিজ এক মিনিট, আপনি বলাই বলাইবাবুর কে হন।
একটুও বিলম্ব না করে মনামী ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে বলে সম্যার, আমি এই পরিবারের একজন ধরে নিতে পারেন।
ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে মনামী বাবুয়াকে বলল, খুব টেনসড ছিলাম, চলো চা খাবো।
সামনেই থানা, আর সামনে রাস্তার পাশে একটা চালু চা দোকান। চা বানাতে দেরি হল না, দুটো বিস্কিট নিয়ে মনামী বাবুয়ার দিকে হাত বাড়াল। বাবুয়া বলল, খান না।
বাবুয়া এখদম চুপচাপ। খুবই অন্যমনস্ক সে, চায়ের কাপ হাতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে সামনেই সরকারি কলেজ, রাস্তা দিয়ে হাসিখুশিতে হাঁটছে কলেজের ছাত্রছাত্রী। হঠাৎ বাবুয়ার মুড অফ। কিন্তু কেন, আজকের উদ্দেশ্যে সেন্ট পার্সেন সফল, তাহলে। মনামী জিজ্ঞেস করল, কী এত ভাবছো বাবুয়া। অন্যমনস্কতা কাটিয়ে তোতলায় বাবুয়া- কই না তো!
মিনিট পাঁচেক হাঁটালেই টাকি রোড, শেঠপুকুর স্টপে দাঁড়ালেই হাজারো গাড়ি। বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার নীচে দাঁড়িয়ে মনামী আর বাবুয়া এখনই সমস্যার কথাটা না বললে পরে বলার কোনও অর্থ থাকে না।
বাবাই বলল। মা যে কাজটা ব্যাঙ্কে করবে, সেই কাজটা আমি করলে ভাল হত না। অ্যাকাউন্টের কাজ আসার কাছে তেমন কিছু না, পরে যদি আমার একটা সুযোগ হত।
হাসি পেল মনামির। কিন্তু হাসির আগেই তার বাস এসে দাঁড়ালো। বলল, আজ চাই স্কুলে যেতে অনেক দেরি হবে, এখন আসি, রাতে কথা হবে, বলে বাসের পা দানিতে উঠে পড়ল মনামী।
বাবুয়ার অতি আবশ্যক চাকরি একটা চাই। মনামী চাকরি পেল, বাবুয়া বোঝে মাঝে মাঝে বাবুয়া হীনমন্যতায় ভোগে। মনামীর সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু সে সম্পর্কের গভীরতা কতদূর বাবুয়া জানে না আজও। সময় ও পরিস্থিতির চাপে না জানা কিছু কঠিন প্রশ্নের উত্তর মেলে। সম্পর্কের দুরুহ প্রশ্নের উত্তর বাবুয়া চাকরি পেলে হয়তো স্পষ্ট হতো। সেদিনই মনামীর ফোন বেজে উঠল রাত্রি দশটা দশে। এই ফোনটার জন্য অপেক্ষায় ছিল বাবুয়া। বাবুয়া ফোন ধরতেই মনামী ঈগল পাখির গল্প শুরু করল। সবচেয়ে উঁচুতে ওড়া পাখি ঈগল। সঙ্গী নির্বাচন করতে মেয়ে ঈগল একটা অদ্ভুত পদ্ধতি অবলম্বন করে। ডালপালার একটা টুকরো অংশ ঈগলটি মুখে নিয়ে উড়তে উড়তে বহু উঁচুতে ওঠে। পুরুষ ঈগল ও তার পিছু নেয়। এর সময় মেয়ে ঈগলটি মরা ডালের টুকরোটি মুখ থেকে ফেলে দেয়। ডালটা মধ্যাকর্ষণ সূত্র মেনে নীচে পড়তে থাকে। যার পিছনে পুরুষ ঈগল তীরগতিতে নীচে নামে। একসময়
পড়ন্ত ডালটা ধরতে সমর্থ হয়। সাঁই সাঁই বেগে ওপরে উঠে ছেলে ঈগল জালটা মেয়ে ঈগলকে ফিরিয়ে দেয়। মেয়ে ঈগল আবার ড্রপ করে, পুরুষ ঈগল পিছু ছোটে, ডালটা পুরুষ ভগল মেয়েটাকে ফেরৎ দিলে আবার মেয়ে ঈগল ড্রপ করে, পুরুষটি আবার…
এভাবে বারবার যদি পুরুষ সঙ্গীটি কৃতকার্য হয়, তখনই স্ত্রী ঈগল জীবন সঙ্গী বেছে নেয়, তাই না?
মনামী বলল, মূলধন আর মজুদ অর্থের পার্থক্য ছাড়া অ্যাকাউটেন্সির ছাত্ররা আর কিছু বোঝে না। এখন দেখছি আমার ধারণা ভুল, তারপর রাখি এখন বলে হাসতে হাসতে মনামী কেটে দিল ফোন। তার আগে বলল হাঁটতে শিখলে হাঁটো, তারপর দ্রুত হাঁটো, তারপর ছোটো, দ্রুত, আরও দ্রুত, থেমে যেওনা…।
তিন চার মাস হয়ে গেল। সকালসাড়ে ন’টার মধ্যে ঘরের সামনে একটা টোটো এসে দাঁড়ায়। বাবা ততক্ষণে জুতো-জামা পরে রেডি, মা শেষ মুহূর্তে ভ্যানিটি ব্যাগে সেন্ট পাউডার লিপস্টিক চিরুনি ঠিকঠাক নিয়েছে কী না দ্রুত চেক করে। দু’তিন মিনিট বিলম্ব হয়। বাবার শরীরটা কী আগের থেকে ভালো, চোখ মুখ কিছুটা স্বচ্ছ দেখালেও, হাত-পা কাঁপা বা টলোমলো ভাব, কেউ সাহায্য না করলে দু’পা চলার ক্ষমতা নেই, মা বাবাকে ঠিকঠাক ধরে ক’পা এগিয়ে এসে বাবাকে তুলে তারপর মা টোটোতে চেপে বসে। আস্তে করে সামনের দিকে এগোতে থাকে টোটো। টোটো অরা বাবুয়ার দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে।
ঘরের কাজের মহিলা ততক্ষণে চলে যায়। বাবুয়া এখন একান্ত একা। যতদিন যাচ্ছে ততোই বাড়ছে একাকীত্ব। বাবার সঙ্গে দূরত্বটা আগাগোড়া, কিন্তু মা! মা তো এমন ছিল না। প্রথমের দিকে মা টোটোতে চড়ার আগে বলতো বাবু, নিজের মতো করে খেয়ে নিও, বাইরের দিকে বেশি যেও না। যাও যদি ঠিকঠাক তালাবন্ধ করে যেও। তারপর শেষে বলতো তোমার জন্য কী কিছু আনতে হবে।
রাতের বেলা বাবুয়া যেন আরও অসহায়, আগে তবু রাতে খাওয়ার টেবিলে মায়ের সঙ্গে অনেক কথা হত, কোনও বিশেষ ঘটনা, সুখ-দুঃখ এমনকি কত পরচর্চা এখন নেই সেসব। কথাবার্তা প্রায় বন্ধের দিকে, নিয়ম করে মা-বাব আটটার পরে খেতে বসে। খাওয়া শেষে ঘরের দরজা বন্ধ করে, বাবার টিভির নেশা কোনওদিন ছিল না, মা নিয়ম করে অনেক রাত পর্যন্ত। সিরিয়াল দেখে। আজকাল এদিক-ওদিক ঘুরে ফিরে বিদ্রোহী ক্লাবের বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে বাড়ি ফেরে। বাইরে যতক্ষণ ততক্ষণ একরকম। ঘরে ঢুকলেই যেন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়।
যদি একটু চাঙ্গা হওয়া যায়, তখন মনামীকে ফোন লাগায়। যা মনে আসে বলে, যেদিন যেমন নতুন কিছু চোখে পড়ে। মা প্রতিদিন রঙ-বেরঙের শাড়ি পরে, লাল-হলুদ-নীল-সবুজ সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ। মিডিয়াম হিলের জুতো পরে। সে কথা টেনে বাবুয়া বলে জানো মনা, জীবনে মায়ের পায়ে প্লেন স্যান্ডেল ছাড়া দেখিনি। যেদিন মায়ের গলায় চেন হারটা দেখল, চমকে উঠেছিল বাবুয়া। সে কথা মনামীকে জানিয়ে বলেছে, মনে হয় মা ওটা নতুন বানিয়েছে। সব কথার উত্তর মনামী দেয় না, কিন্তু এ কথার উত্তর মনামী দিয়েছে। বলেছে, ‘মনে হয়না, ওটা নতুনই, লক্ষ্য করে দেখো মায়ের কাঁধে নতুন ভ্যানিটি ব্যাগটাও নতুন পুরোট লেদারের।’
অবাক হয়ে বাবুয়া জিজ্ঞেস করে ‘তুমি জানলে কী করে?’ হাসতে হাসতে মনামী বলে- তোমাকে ঈগল পাখির গল্প বলেছিলাম মনে আছে। মেয়ে ঈগল কেন পরীক্ষা করে তার সঙ্গী নির্বাচন করে। এর উত্তর খুঁজে পেলে অনেক কিছুর সমাধান হয়ে যাবে। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, কেন বারবার ব্যাঙ্কের পরীক্ষাটা কেমন হল? বাবুয়া দেয়নি এর উত্তর। আজকাল এ বাড়িতে কম অসে মনামী। এর কারণ জানেনা বাবুয়া। মনামীর ভেতরে অনেক গভীরতা, অত গভীরে ঢোকার ক্ষমতা নেই বাবুয়ার। মনামীকে আগের মতো লাগে না। যখন মন খারাপ হয় বাবুয়া ফোন করে। দু’এক সময় ব্যস্ত আছি বলে রেখে দেয়। অবশ্য সেদিন না হলে দু’চারদিন বা তার পরের দিন ফোন করে জানতে চায়। ক’দিন আগে বাবার সিগারেট খাওয়ার বিষয়টি মনামীকে জানিয়েছি। সিগারেট ধরিয়ে বাবা টোটোয় উঠছেন। বাবুয়ার মাথা গরম হয়ে গেল। সোজা গিয়ে বাবুয়া মাকে চার্জ করল। এটা কী হচ্ছে মা, আশ্চর্য কাণ্ড। মা স্বাভাবিক গলায় উত্তর দেয়। নেশাখোর লোক, দু’একটা খেলে কিছু হবে না ততক্ষণ গতি নিয়েছে টোটো।
সব কথা মনামীকে বলা যায় না। নেট রিচার্জের জন্য চায়ের কাছে পাঁচশো টাকা চেয়েছিল, টাকা দেওয়া তো দূরের কথা, উত্তরে মা বলেছিল দেখছো না, সংসারে কত খরচ বেড়েছে। নতুন একটা রান্নার লোক রাখতে হয়েছে, তারপর গাড়িভাড়া, দুটো লোকের যাতায়াত। দু’জন সারাটা দিন বাইরে থাকি, ওষুধের পেছনেই মাসে চার-পাঁচ হাজার লাগে।ক কিছু একটা করো, না পারলে দু’চারটে টিউশনিও তো জুটিয়ে নিতে পারো।
কথাটি যতখানি না লজ্জার, তার চেয়ে বড় অক্ষমতার। বলেনি মনামীকে। শনিবার কত তখন প্রায় এগারোটা। ক্লাবে ক্যারাম কমপিটিশন ছিল। ফাইনালটা দেখে বাবুয়ার তাই ফিরতে দেরি হল। মা-বাবার ঘরের পাশ দিয়ে যেতোই একটা বোঁচকা চেনা গন্ধে বাবুয়া দাঁড়িয়ে গেল। ঘরের সামান্য খোলা জানালার পাশ দিয়ে বাবুয়ার চোখে পড়ল দুটো মদ্যপকে। দুটো হাতে গ্লাস, টি টেবিলের দু’দিকে দু’জন। টেবিলে আধখালি বোতল, একটা পাত্র ওতে হয়তো কিছু ড্রাইফুড।
নিজের ঘরে এসে বাবুয়া মনামীকে ফোনে ধরতে যাবে, এক সময় উল্টে মনামীর ফোন ঢুকে গেল। মনামী বলল, ঈগলদের চল্লিশ বছর বয়সে ঠোঁট নখ অকেজো হয়ে যায়। শিকার ধরার ক্ষমতা লোপ পায়। যখন সে নিজস্ব শক্তিতে পাহাড়ের পাথরে ঘষে ঘষে নিজের ঠোঁট আর পায়ের নখ পুরো নষ্ট করে, কিছুদিন পরে নতুন ঠোঁট নখ গজায়। আবার ঈগলের নতুন জীবন শুরু হয়, নতুন উদ্যোমে আকাশ চষে বেড়ায় এরপর সে আরও ত্রিশ বছর বাঁচে। এই সত্যিটা তোমার জানা দরকার বাবুয়া। বলে ফোন কেটে দিল মনামী।
(লেখক বিশিষ্ট সাহিত্যিক)


