
লিখেছেন: ডা: নূর মহাম্মদ
“গুলাম থে তো হম সব হিন্দুস্থানী থে
আজাদি নে হমকো হিন্দু-মুসলমান বনা দিয়া।”– কবির উক্তি বাস্তবের সার্থক প্রতিরূপ। একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক সোপানে নির্লজ্জভাবে দাঁড়িয়ে উজ্জ্বল পিলসুজ নিয়ে যখন আমরা গর্ব করি তখন কিছু স্বার্থান্বেষী লুম্পেন অশুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ আমাদের শুভবুদ্ধির বিকাশে তাদের বিষাক্ত নখ-দাঁত দিয়ে সম্প্রীতির তনুমনে আঁচড় দিতে উদ্যত। আজ ভারতবর্ষের আকাশে বাতাসে গোলা-বারুদের গন্ধ, আধপোড়া ঝলসানো মাংসের গন্ধ, অজস্র হায়না-শেয়ালের আনাগোনা, অজানা অচেনা বুটের দাপাদাপির শব্দ : যেটা শান্তিকামী মানুষের দু’বেলা পেটপুরে খাবার, রাত্রির আবাস ও লজ্জা নিবারণের সামান্য পোষাকের হাহাকারকে টুটি টিপে ধরে নিজেদের কায়েমী স্বার্থকে অক্ষুন্ন রাখতে বদ্ধ পরিকর। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও ভারতবাসী যথার্থ স্বাধীনতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত, স্বাধীনতা অনেকের কাছে এখনো স্বাদহীন (taste-less)! আমার দেশ অনেকগুলি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা পার করলো কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক বাস্তব প্রয়োগ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে নর্দমার জলে!
আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা অসমভূমি বন্টন ব্যবস্থার কোন ফলপ্রসু অবদান রাখতে ব্যর্থ। এখন রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দম্ভ অহংকার মানুষকে রাজনৈতিক বিমুখ করে তুলছে। রাজনীতি এখন দূর্বৃত্তায়ন, মিথ্যাচার ও দুর্নীতি গ্রস্ত নেতাকর্মীদের আখড়া। Manpower, muscle power এবং cor-ruption নেতাদের একমাত্র যোগ্যতার মাপকাঠি। আমাদেরই নেতা নির্বাচন ও তাদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা কিছু অন্তঃরসারশুন্য নেতারা ব্যাপক রিগিং ছাপ্পাভোট ও মানুষকে ভয় ভীস্থি দেখিয়ে বা টাকা-মদ-মাংসের লোভদেখিয়ে তাদের কাজ খুব সহজেই হাসিল করে নেয়। কিংবা, সামার চাল গম ত্রিপলের আশায় সাধারণ হাভাতে জনগণ নেতাদের পদলেহন করে অহরহ। নেতারাও তাদের দায়িত্ব কর্তব্য ভুলে ক্ষমতার আস্ফালন দেখায় নিরেট জনগণের মাথায়। আর সাধারণ মানুষ নেতাদের মুখের কথায় বুঁদ হয়ে থাকে হিতাহিত জ্ঞানশুন্যতায়!
বর্তমান রাষ্ট্রনেতাদের লাল চোখের ইশারায় সর্ব্বোচ ন্যায়ালয়ও থরহরিকম্প। বিচারপতি লোয়ার মৃত্যু রহস্য আমাদের মনে আরো রহস্য বিচারপতি থেকে রাষ্ট্রের নেতাদের কথা এখন আর বিশ্বাস করে না, বাধ্য হয়ে নীরব দর্শক হয়ে তামাশা দেখে ফ্যালফেলিয়ে। কিছু রাষ্ট্রনেতা রাষ্ট্রযন্ত্রটাকে কুক্ষিগত করে নিজেদের মর্জি মাফিক ত্রিশুল তরোয়ালের আঘাতে মানুষের মনে সাম্প্রদায়িকতার বিষ মিশিয়ে দিতে সচেষ্ট। রাজনীতি এখন আর নীতির লড়াই নয়; এখন কামানোর ধান্দা, সামান্য পুঁজি বা বিনা পয়সার দাদাগিরির ছাড়পত্র। এই ছাড়পত্রের জন্য ভবিষ্যত প্রজন্মের চোখে ঘুমনেই, আমরাও দিশেহারা। রাষ্ট্রের প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ না হয়, তখন দুর্বল অশিক্ষিত বঞ্চিত শোষিত শ্রেণির মানুষ, এমনকি শিশু ভয়ে মাতৃস্তনে মুখ দিয়েও টেনে খেতে ভুলে যাবে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলেও ভয়ে হাড়হিম করা পরিবেশে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে অনাগত ভবিষ্যতের ভাবনায়। একটু বড়ো হলেই মনের মধ্যে কুণ্ঠাবোধ হীনমন্যতা সাবলীলতার পথে অন্তরায় হয়ে উঠবে। একটা বিশেষ সম্প্রদায়/শ্রেণির শিশু দুর্বল অশিক্ষিত হলে আমার দেশের সম্পদ/ভবিষ্যত দুর্বল হতে বাধ্য। আর তার মনে দেশাত্মবোধের গরিমায় একটু সন্দেহের প্রকাশ ঘটবে এতে আর আশ্চর্যের কী আছে!
ফ্যাসিস্ট শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলে বারে বারে ‘জিহাদি সহিংসতা কোর্স, মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ ও গৈরিক সন্ত্রাসের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটিয়ে প্রশাসনিক পক্ষপাত মূলক আচরণ দুর্বল সংখ্যালঘু শ্রেণির মনে এক অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি করে, আর শিশুপাঠে দেশের সঠিক ও সত্য ইতিহাস মুখ লুকিয়ে থাকলে দেশাত্মবোধের অভাব পরিলক্ষিত হতে বাধ্য। ভবিষ্যত প্রজন্ম যদি তার পূর্ব প্রজন্মের সঠিক সংগ্রামী ইতিহাস না জানে (তাকে জানতে না দেওয়া হয়), তার মনে গর্ব করার মতো কিছুই থাকবে না, থাকবে না মিথ্যা মুখোশের একপেশে ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতা।
মানুষ হিসাবে আমাদের প্রধান ধর্ম হওয়া উচিত মনুষ্যত্ব। কিন্তু সব যুগেই পৃথিবীর সব প্রান্তে, সমাজে এক শ্রেণির মানুষ থাকে যাদের অমানবিক আচরণের শিকার হয় দুর্বল শ্রেণির মানুষ। এই অমানবিক জঘন্যতম মুখ সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব আর তার ভয়ঙ্কর রূপটা প্রকাশ পায় প্রশাসনের ন্যক্কারজনক ও নির্মম পক্ষপাতিত্বের মধ্য দিয়ে। ভারতের অধিকাংশ মানুষ শুভবুদ্ধি সম্পন্ন, তারা সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ মনে প্রাণে চায় না। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী শুভপ্রয়াসে ব্যাঘাত ঘটাতে ব্যস্ত।
খাতা কলমে সেকুলার রাজনৈতিক দল হয়েও সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টিতে দলের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মন্দিরে মন্দিরে পুজো দেওয়া বা পুজোর উদ্যোক্তা হয়ে বা উদ্ধোধনের ফিতে কেটে হিন্দুত্ব নিয়ে রাজনীতি করা এখন জলভাত। নরম ও গরম হিন্দুত্ব দেখে মানুষ নির্বাক! আবার কখনও হিন্দুত্ব রাজনীতির ভাষা ধার করে বলছে সীমান্তপার করে সংখ্যালঘু জঙ্গীতে ভরে গেছে দেশ। আদমসুমারি না জেনেই দূরভিসন্ধিমূলক বার্তা: সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগুরুতে পরিণত হতে দেরি নেই। তাই কবির ভাষাতেই বলি: রক্তাক্ত সরাইখানা আমার দেশ না/ জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না।
স্বাধীনতার পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিতে। বিচারপতি রাজেন্দ্র সাচার ২০০৬ সালে ৪০০-র অধিক পাতার বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ পেশ করেন। মুসলিম ভোট ব্যাঙ্কের কথা চিন্তা করে মাঝে মাঝে কমিশন বসিয়ে মুসলিমদের ললিপপ দেখিয়ে প্রতারিত করা হয়। ভারত নামক রাষ্ট্রে থেকে যায় আর্থ-সামাজিক ভাবে দুর্বল মুসলিম জনগোষ্ঠী। যেহেতু মুখোশধারী রাষ্ট্র রাষ্ট্রনেতাদের অশুভ লোভের ভৌগোলিক অপরিহার্যতায় সাধারণ মুসলিমরা একটি পৃথক রাষ্ট্রের মালিক হয়ে ওঠে এবং তারা দেশদ্রোহী তকমার ভয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের জীবন অতিবাহিত করে। দাঙ্গা-ফ্যাসাদে বার বার ছিন্নমূল হয়েও ভারতীয় অখণ্ডতা রক্ষার্থে জীবন-যৌবনের রঙিন স্বপ্নগুলিকে বির্সজন দিয়েছে দেশপ্রেমিক প্রমাণের ব্যর্থ প্রয়াসে। ট্রাজেডি শুরু স্বাধীনতা প্রাপ্তির অল্প কিছু আগে এবং স্বাধীনতার পর। মুসলমানদের অতীত ঐতিহাসিক গৌরব ও মহিমাকে কৌশলে তুচ্ছ করে ভারতের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে যুক্ত করেনি। কতকগুলো বিচ্ছিন্ন, সাজানো ও নগণ্য ঘটনাকে তুলে ধরে আপামর মুসলমান সমাজকে সন্ত্রাসবাদী তকমা দিয়ে মূলস্রোত থেকে সরিয়ে রেখেছে। সমাজ ও রাজনীতিতে তাদের অচ্ছুৎ করে রাখার প্রচেষ্ঠা অব্যাহত। সংখ্যাগুরুর মনে ইসলামোফোবিয়া সৃষ্টি করে মুসলিমদের প্রতি অবিশ্বাস ও ঘৃণা বৃদ্ধির চক্রান্ত দেখা যাচ্ছোমুসলিমরা প্রেরণা ও উৎসাহ না পেয়ে গভীরভাবে হীনমন্যতায় ভুগছে। মুসলিমদের সততা, আবেগ, ধর্মচর্চা, সংস্কৃতি; মুসলমানদের জীবনযাপন সবকিছু আড়চোখে দেখার অভ্যাস বর্তমান রাষ্ট্রের। দরিদ্র, অশিক্ষা, হীনমন্যতায় ভুগে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় নির্বাচনের লেঠেল হিসাবে ব্যবহার করে আসছে রাজনৈতিক দলগুলো।
সংখ্যালঘুদের উপর গণপিটুনি, গেরুয়া উগ্রবাদীদের দাপট দেখে প্রশাসন থেকে সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ও চুপ। ‘দেশ কী গাদ্দারো কো, গুলি মারো সালো কো……’। জয়শ্রীরাম ধ্বনিতে বাধ্য করে এখানে ওখানে মুসলিম ধর্ম-নাম পরিচয়ের মানুষকে আক্রমণের নজির কম নেই। জন প্রতিনিধিরাই যখন আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হিংসাত্মক ঘটনাকে মান্যতা দিয়ে চলেছে, তখন আইনের আর ভরসা কোথায়? এটাই গণতন্ত্র?এটাই আইনের শাসন! আইন আইনের পথে চলবে বাহুবলে আর চোখ রাঙানিতে।
মোঘলদের পতনে বর্ণহিন্দুদের দমিত আকাঙ্ক্ষা ব্রিটিশ সরকারের হাত ধরে একবার উঠছে আবার পড়ছে। ব্রিটিশ ডিভাইড অ্যান্ড রুল সৃষ্টি করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে চিরকালীন দ্বন্দ্বের বীজ রোপণ করেছে। কিন্তু জাতিভেদ প্রথা ইংরেজ সৃষ্ট নয়। গুপ্তযুগে মনুর শাসনে পৃথ্বিরাজ ও জয়চন্দ্রের দ্বন্দ্বসংকট প্রকট ছিল। ওই দ্বন্দ্বমূলত জাতিদাঙ্গা, যার ফলশ্রুতি ভারতে ইসলামি আগমন পৃথ্বিরাজের হাত ধরে। ওই দ্বন্দ্ব সংকট ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়ের লড়াই, যার মূল ছিল বর্ণ। এই বর্ণবাদীরা সমগ্র হিন্দু ভারতবাসীর প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু নিজেদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক সুবিধার জন্য দলিত, আদিবাসী, জনজাতির অন্ত্যজ মানুষকে হিন্দু ধর্মের বলে আখ্যায়িত করতে চাইছে। অথচ সাঁওতাল আদিবাসীরা নিজেদের শারণ ধর্মী বলে। এমন কী বৌদ্ধ, জৈন, পারসিক এবং শিখদের বৃহত্তর হিন্দু সমাজের বলে দাবি করে। এই ব্রাহ্মণ্যবাদের নির্যাতনের জন্য অব্রাহ্মণ মানুষের মনে ক্ষোভ এবং বৌদ্ধ জৈনধর্মে মানুষ দীক্ষা নিতে থাকে। এদের অস্পৃশ্য নির্যাতন থেকে বাঁচতে মানুষ মানবতাবাদী হয়েছে এবং ভক্তিবাদ ও সুফিবাদ আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। এই আন্দোলনকে রাষ্ট্রের সহায়তাই কিছু হিন্দুত্ববাদী ‘শুদ্ধিকরণে’-র ব্যর্থ প্রয়াস করে বালখিল্যতার পরিচয় দিচ্ছে। তাই উত্তরপ্রদেশের কাশিরাম-মায়াবতির বহুজন সমাজ পার্টির সাথে সাথে বিহারের নিতিশ কুমার জাতভিত্তিক জনগণনার পক্ষে। সওয়াল করছেন। ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষ রুখে দাঁড়িয়ে দেখতে চাইছে ক্ষমতা ও সম্পদের অধিকার কেবলমাত্র মুষ্টিমেয় উচ্চবর্ণের মানুষের হাতে থাকবে কেন?
মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ, ‘জিহাদ সহিংসতা’ কোর্স এবং শিক্ষা গৈরিকীকরণের মাধ্যমে সংখ্যালঘু মানুষের মনে ভীতির বাতাবরণে সচেষ্ট। আসলে এরা নাথুরামকে দেশপ্রেমিক ভাবে এবং বিদ্বেষমূলক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য সাভারকারের হিন্দু হু ইজ এ হিন্দু’, গোলওয়ালকারের ‘বাঞ্চ অব থটস, দীন দয়ালের ‘ইন্টিগ্রাল হিউম্যানিজম -কে বেদ বাক্য মনে করে। ইসলামিক ফোবিয়ায় এরা বিভ্রান্ত! লাভ জিহাদের ভাইরাশে অস্পৃশ্য! তাই মুসলমানও মানেই দেশদ্রোহী, পাকিস্থানের সমর্থক বলে মনে করে। আর সাধারণ সংখ্যালঘু মানুষ রাষ্ট্রের লাল চোখের ইশারায় ভয়ে ভীত হয়ে প্রতি পদক্ষেপে নিজেকে দেশপ্রেমিক দেখানোর ব্যর্থ প্রয়াস করে চলেছে।





