
লিখেছেন: গোলাম রাশিদ
কলকাতায় যে এত যানজট ঘরের মধ্যে থেকে তা বোঝাই মুশকিল। গাড়িগুলো প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জিয়া অটোতে বসে উসখুশ করে। পার্ক সার্কাস ময়দানে কী একটা উৎসব হচ্ছে। ইলিশ, মাংস, মিষ্টি বিভিন্ন খাবারের সমারোহ। পকেটে অবশ্য কুড়ি টাকা। ভরসা বালিগঞ্জের বন্ধু সাইমের ওপর। ও আসবে বলেছে। আজকের উৎসবের খরচ ওর উপর দিয়েই উসুল হবে। যদি না আসে? জিয়াকে চরম বিরক্তি ঘিরে ধরে। অটো থেকে নেমে পড়ে। অটোওয়ালাকে ভাড়া জিজ্ঞাসা করবে। পুরো পথ গেলে ৮ টাকা। জিয়া অর্ধেক পথ এসেছে। সুতরাং ৪ বা ৬ টাকা। কিন্তু জিয়া নিশ্চিত অটোওয়ালা ৮ টাকাই চাইবে। আট টাকা দিলে জিয়ার কাছে থাকবে বারো টাকা। আজকের বিকেলটা তবে খুব একটা সুখকর নয়।
জিয়া চারটে টাকা গুঁজে দিল অটোওয়ালার হাতে। ফুটপাতে নেমে আসার পর পিছন থেকে চিৎকার শুনতে পেল: ‘এ ভাই, এ ভাই, শুনিয়ে।’
জিয়া সামনে একটা বড় গেট দেখতে পেল। গির্জা-টির্জা হবে বোধহয়। জিয়া টুক করে ভেতরে ঢুকে গেল। পিছন ফিরে একবার দেখে নিল অটোওয়ালা আসছে কি না। না আসছে না। যাক বাঁচা গেল। কিন্তু এ কি! সে কোথায় এসে পড়ল। চারিদিকে শুধু কবর আর কবর। খ্রিস্টানদের সমাধি। আচ্ছা দেখাই যাক। গেট থেকে দশ হাত ভেতরে একজন লোক বসে আছে। পরনে খাঁকি পোশাক। এখানকার গার্ড বোধহয়।
জিয়া এগিয়ে যায়। খাঁকি পোশাক পরা লোকেরা সাধারণ মানুষকে দেখলেই সাধারণত প্রশ্ন করে, ‘কী চাই এখানে?’ যেন এর পিতৃদত্ত সম্পত্তিতে কেউ অনধিকার হস্তক্ষেপ করেছে। জিয়া সুযোগ দিল না। বলল, ‘এই একটু ঘুরে দেখব।’ গার্ডবাবু মনে মনে রেগে গেলেন বোধহয়। ‘ঘুরবেন সে তো দেখেই বুঝতে পারছি। নিন, সই করুন,’ বলে গার্ডবাবু সামনে রাখা পাতা-পেনের দিকে ইঙ্গিত করলেন।
(২)
প্রথমেই প্রধান রাস্তা ভাগ হয়ে দু’দিকে চলে গিয়েছে। জিয়া ঠিক করতে পারে না কোন পথে যাবে। তার থেকে সোজা এগিয়ে হওয়াই ভালো। বিশ-ত্রিশ ধাপ হাঁটার পর আর একটা শাখা রাস্তা দেখা যায়। বামদিক দিয়ে রাস্তাটি চলে গেছে। কোথায় যাচ্ছে তা বোঝা মুশকিল। এরিয়াটা এত বড় যে শেষ কোথায় তা বোঝা যায় না। জিয়া বামদিকের পথটা ধরে হাঁটতে থাকে। অপ্রশস্ত পথ। দু’ধারে সাদা সাদা সমাধিসৌধ। মাথার কাছে উঁচু করে পোঁতা সাদা ক্রস। ক্রসে জন্ম-মৃত্যুর সাল-তারিখ লেখা। উঁচু উঁচু সমাধিগুলোর মাঝখানটা খুব সুন্দর। ছোট ছোট ক্যাকটাস জাতীয় লতা লাগানো।
মিনিটখানেক হাঁটার পর জিয়া থমকে দাঁড়ায়। চারদিকে তাকায়। কবর আর কবর। ক্রসগুলোকে এক-একটা মানুষ মনে হয়। মনে হয় যেন ‘শেষ বিচার দিবস’, হাশরের ময়দান! সবাই জড়ো হয়েছে কাফনের সাদা কাপড় জড়িয়ে।
জিয়ার বুকটা ধক করে ওঠে। চোখ দুটো রগড়ে নেয়। ভুল কিছু দেখছে না তো। পথের ঠিক বাম পাশে একটা আট-নয় বছরের মেয়ে ফুল কুড়োচ্ছে। পাশের উঁচু গাছটি থেকে ছোট ছোট সুগন্ধি ফুল পড়ছে। বাতাসে হালকা সৌরভ। মেয়েটি ফুলগুলো কুড়ানোর জন্য ফুলে হাত দিতেই চারদিকটা আবার যেন ঘন সুবাসে ভরে যাচ্ছে।
মেয়েটি সাদা ফ্রক পরে আছে। চোখে-মুখে নিষ্পাপ কোমলতা এবং সঙ্গে বিষণ্ণতা বিরাজ করছে, গায়ের রং বিদেশিদের মতো ফরসা হলেও চোখ গভীর ও কালো।
মেয়েটি ফুল কুড়িয়ে দু’হাত ভর্তি করে। তারপর আবার পথের পাশেই ছোট্ট একটা কবরের সামনে বসে। কবরটার কোনও সিমেন্ট ধাঁধানো সৌধ নেই। একটি একটি করে ইট পুঁতে চৌকো মতো ঘেরা জায়গা। মাথার কাছে একটি বেশ বড় ক্রস। কবরজুড়ে ফুল। কোণের একটি দিক শুধু ফাঁকা। সেখানে হাতের ফুলগুলো পরম মমতায় নামিয়ে দেয় মেয়েটি। কবরটিকে এখন অসম্ভব সুন্দর লাগছে। মেয়েটি প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাঁটু গেড়ে বসে। সমস্ত কিছু জিয়ার কাছে অলৌকিক মনে হয়।
তারপর প্রায় দশ মিনিট হয়ে গেছে। মেয়েটি স্থির হয়ে চোখ বুজে বসে রয়েছে। চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে ফরসা গালে জমা হয়েছে। জিয়া নিশ্চিন্ত হয়। মানুষই হবে। পরি-টরি হলে নিশ্চয় কাঁদত না। পরিদের দুঃখ বলে কিছু আছে নাকি? আরও মিনিট পাঁচেক পর মেয়েটি চোখ খোলে। হাতের তালু দিয়ে চোখ মোছে। তারপর গুনে গুনে ঠিক দুটো ফুল তুলে নেয় কবর থেকে। এরপর উঠে পা বাড়ায়। জিয়াকে সামনে দেখে চমকে
ওঠে। তার এই একান্ত প্রার্থনা যে একজন নিরীক্ষণ করছে, তা সে বুঝতে পারেনি। কিন্তু তৎক্ষণাৎ সে হতচকিত ভাব সামলে নিয়ে আবার স্বাভাবিক হয়ে হাঁটতে শুরু করে। জিয়ার কাছে আসতেই জিয়া জিজ্ঞাসা করে-
‘কবরটা কার?’
মেয়েটি থমকে দাঁড়ায়। জিয়ার দিকে সম্পূর্ণ দৃষ্টি মেলে ধরে। তারপর পাশ কাটিয়ে দ্রুত দৌড় মারে।
‘এই শুনে যাও’ বলে ডেকে উঠতে গিয়েও জিয়া চেঁচায় না। ওর দৌড়ে যাওয়া পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। কবরটির দিকে এগিয়ে যায়। ক্রসের ওপরের লেখাগুলো পড়তে শুরু করে। লেখা আছে-
Rest in Peace
Christopher Charles Joseph
Birth: 3rd January, 1996
Death: 7th December, 2005
জিয়া পরম আদরে কবর থেকে একটি ফুল তুলে নেয়।
নাম-না-জানা ফুলটি নাকে ও গালে স্পর্শ করে রেখে দেয় কবরেই।
‘কে তুমি ভাই!’ জিয়ার মনটা কেমন করে ওঠে। এত অল্প বয়সেই চলে গিয়েছে। আহারে। নতুন কবর। নিশ্চয় বেশিদিন হয়নি। জিয়া মনে মনে ভাবে।
জিয়া পথ থেকে একটা ফুল কুড়িয়ে সামনের দিকে পা বাড়ায়। মিনিট দশেক ঘোরাঘুরি করে। কবরখানার অর্ধেকটা ঘোরা হয়। আর এগোতে ইচ্ছা করে না। কেমন গা ছমছম করে!
মূল দরজার কাছে এসে গেটম্যানকে জিজ্ঞাসা করে, ‘এটা কী ফুল?’
‘মাধবীলতা।’
‘আপনি কি ভাবছেন আমি মাধবীলতা ফুল চিনি না?’
‘আপনার সম্বন্ধে আমি কিছুই ভাবছি না। সইটা করে যেতে পারেন।’
জিয়া সই করতে করতে কী মনে করে জিজ্ঞাসা করে, ‘এখানে কি একটা বাচ্চা মেয়ে কবরে ফুল দিতে আসে?’ জিয়ার কথা শুনে দারোয়ানের মুখখানি ম্লান হয়ে ওঠে। ‘আপনি এমিলির কথা বলছেন?
‘হ্যাঁ, একটু আগে যে ফুল দিতে এসেছিল।’
‘হ্যাঁ, ওরই নাম এমিলি। ও রোজ বিকেলেই আসে।’
‘যার কবরে ফুল দেয় সে ওর কে?’
‘কে আবার, কেউ না। আচ্ছা, আপনি কে বলুন তো? এতকিছু জানতে চাইছেন কেন।’
‘আমি প্রেসিডেন্সিতে ভূগোলে অনার্স পড়ি।’ প্রেসিডেন্সির নাম শুনে গার্ডটির মনে সমীহর ভাব ফুটে ওঠে। শুধু মনে নয়, কথাতেও।
ওরা দু’জনেই অনাথ। খুব ছোটবেলা থেকেই ওরা জোড়া-গির্জার ফাদারের কাছে ছিল। অনেকেই থাকে। তবে এই দুটি ছেলেমেয়ের উপর ফাদারের স্নেহ একটু বেশিই ছিল। ফলস্বরূপ ওরা দু’জন স্বাধীনতাও বেশি ভোগ করত। দু’জন একসঙ্গে খেলত, গাইত। কিন্তু হঠাৎ করে এই ৮-৯ মাস আগে যোসেফের প্রচণ্ড জ্বর এল। জ্বর আসার সাত দিনের মাথায় এমিলি আর যোসেফ সারা বাগানে জল দিল। সন্ধের প্রার্থনাও করল একসঙ্গে। তারপর আটটা বাজতেই ফের জ্বর বাড়তে শুরু করল। রাত ন’টায় যোসেফ হঠাৎ করেই মারা গেল। এ পর্যন্ত বলেই গার্ডটি থামল। তার চোখ দুটো ভিজে উঠেছে। খাঁকি পোশাক পরা গার্ডদের এটা সাজে না।
সন্ধে হয়ে গিয়েছে। সিমেট্রির শ্বেতাভ অন্ধকার, ফুলের সুবাস, গাছে পাখিদের কলকাকলি ছেড়ে জিয়া বেরিয়ে আসে। আজ আর উৎসবে যাওয়া হল না।
(৩)
কয়েকদিন পর জিয়া পার্ক সার্কাস ময়দানের উৎসব থেকে ফিরছে। সেই কবরখানার সামনে এসে জিয়া চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওকে ওকে, স্টপ স্টপ।’
এরপর ভাড়া মিটিয়ে কবরখানায় ঢুকে পড়ে। গার্ড ওকে দেখেই চিনতে পারে। তবে কিছু বলে না। সই করে জিয়া বাম দিকের সেই পথটা ধরে যোসেফের কবরের দিকে এগিয়ে যায়।
আশ্চর্য! মেয়েটি আজও সারা কবরে ফুল ছড়িয়ে দিয়ে বসে আছে। চোখে সেদিনের মতোই টসটসে অশ্রু।
জিয়া ভেবে পায় না, ন’মাস পরেও এত টসটসে জল চোখে আসে কী করে!
প্রায় পাঁচ মিনিট পর মেয়েটি চোখ খোলে। অশ্রুভেজা চোখে উঠে দাঁড়ায়। হাতে দুটি ফুল। জিয়া দু’পা এগিয়ে যায়।
‘কেমন আছো এমিলি?’
একজন অপরিচিতের মুখ থেকে নিজের নাম শুনে একটুও আশ্চর্য হয় না মেয়েটি।
‘বলছি কেমন আছো?’ জিয়া আবার জিজ্ঞাসা করে।
‘এখানে তুমি কেন আস? তোমার কেউ আছে?’ এমিলি প্রথম কথা বলে।
‘কেউ নেই, আবার সবাই আছে।’
‘তার মানে?’
‘মৃত্যুর পর সবাই এক হয়ে যায়, সবাই সবার বন্ধু হয়ে যায়।’
‘তাই নাকি? তুমি তাহলে ভূত?’
‘আরে আমি ভূত হতে যাব কেন? আমি মানুষ।’
এমিলি যেন একটু নিরাশ হয়।
কেন, ভূত হলে কি তোমার কাজে দিত?’
‘হ্যাঁ…।’ এমিলি বালিকাসুলভ টান দেয়। ‘আমি তোমাকে যোসেফের খবর জিজ্ঞেস করতাম।’
‘যোসেফ ভালো আছে।’
‘কী করে বুঝলে?’
‘তুমি প্রতিদিন আসো। ফুল সাজিয়ে দাও। ও তো ভালো থাকবেই।’
জিয়া খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলে ওঠে, ‘তুমি কবরে গোলাপ দাও না কেন?’
‘গোলাপ ফুল কবরে দিতে আছে? পাগল কোথাকার!’
কেন, দিতে নেই কেন?’
‘ গোলাপের বেশি গন্ধ নেই তো। গন্ধই যদি না থাকে তবে ও বুঝবে কী করে যে আমি এসেছি।’ কথা বলতে বলতে এমিলির চোখ থেকে দু’ফোঁটা জল ঝরে পড়ল গালের উপর। সেই অশ্রুবিন্দুর উপর সূর্যাস্তের ম্লান আলো পড়ে অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করছে। এমিলি গালটা মুছল। কয়েক মিনিট কথা বলেই জিয়া বুঝেছে মেয়েটি খুব বুদ্ধিমতী। সে কী বলে এত বুদ্ধিমতী মেয়েকে সান্ত্বনা দেবে ভেবে পেল না।
(8)
তিন-চার মাস পর।
আজ যোসেফের জন্মদিন। এমিলি কবরে যথারীতি সেই অচেনা ফুলগুলো সাজিয়ে দিয়েছে। ও একটা গোলাপি রঙের জামা এবং স্কার্ফ পরেছে। সোনালি চুলে এতে তাকে খুব ভালো মানিয়েছে।
জিয়া এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আসে সিমেট্রিতে। আজও এসেছে।
জিয়া একগুচ্ছ রজনীগন্ধার স্টিক কবরে রাখে। এমিলি চোখ খুলে দেখে। আবার বন্ধ করে নেয়। কয়েক মিনিট নীরবতার পর জিয়া বলে, ‘আমাদের বাড়ি যাবে? সেখানে তোমার মতো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আছে।’
এমিলি কোনও উত্তর দেয় না। বিকেলের সোনালি রোদ তার মুখের উপর খেলা করে।
জিয়ার মনে হয়, যোসেফ খুব ভাগ্যবান। মানুষের মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে জীবিত মানুষদের আবেগ নষ্ট হয়ে যায় দ্রুত। কিন্তু এই মেয়ে তার বাল্যবন্ধু যোসেফকে হারিয়ে যেন আরও বেশি ভালোবাসাপ্রবণ হয়ে পড়েছে তার প্রতি। এত ভালোবাসা, মায়া-মমতা, অনুরাগ খুব কম ভাগ্যবানই লাভ করে।
জিয়া এমিলির সোনালি চুলে হাত রাখে। এমিলি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। জিয়া নিজেকে অবাক করে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে বুঝতে পারে না এক অচেনা ছেলের জন্য সে কেন কাঁদছে? নাকি এমিলির কষ্ট তার মধ্যেও ঢুকে গেছে ফুলের সৌরভের মতো!
মানুষের বেঁচে থাকা যে কী আশ্চর্যের বিষয়, তা না ভাবলে বোঝা যায় না। এবং বেঁচে থাকা যে কোনও সত্য নয়, মরণই ধ্রুব, অচিরেই তা বোঝা যায়। একটার পর একটা ইট সাজিয়ে একটি ঘর তৈরি সম্পূর্ণ হলে সেই ঘরের জীবন শুরু হয়। অথচ বয়সের পর বয়স সাজালে কী তৈরি হয়? বয়স সাজানো সম্পূর্ণ হলে কী আসে মানুষের জীবনে?
মৃত্যু অবধারিত জেনেও মানুষের মৃত্যুভয় প্রবল। জীবনকে আঁকড়ে ধরতে চায় সে। পবিত্র কুরআনে আছে, ‘আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। (বাকারা-১৫৬)
তারপরও মানুষ মায়ার বাঁধনে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়ে। তার কাছে এসে সকলে পরাজিত হয়। এই যে মানুষ মারা গেলে আত্মীয়স্বজনরা শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ে, প্রিয়জনের চির অন্তর্ধান সময়কে থামিয়ে দেবে তাই মনে হয়। কিন্তু আসলেই কি সেটা হয়? মানুষের যে শোক, তা তো স্মৃতির শোক। মানুষ শোক পালন করার সময় প্রবলভাবে স্মৃতি হাতড়িয়ে বেড়ায়। সময়ের স্মৃতি, ভালোবাসার স্মৃতি। সি জি রসেটির কবিতার কথা মনে পড়ে যায় জিয়ার।
Love, strong as death, is dead Come, let us make his bed Among the dying flowers A green turf at his head; And a stone at his feet, Whereon we may sit In the quiet evening hours.
(৫)
বছর ঘুরতে শুরু করে। নতুন পাতা পুরনো হয়। এর মাঝে জিয়া ও এমিলি বহুদিন এসে বসে থেকেছে এই সিমেট্রিতে। গড়ে উঠেছে এক অসমবয়সী বন্ধুত্ব ও স্নেহের সম্পর্ক।
সেদিন কী একটা কাজে পার্ক স্ট্রিটের এশিয়াটিক সোসাইটিতে এসেছিল জিয়া। ভাবল, একবার ঘুরে যাই। জিয়া গেট দিয়ে ঢোকার সময় অভ্যেসমতো গার্ডকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কেমন আছেন। বেশ কিছুদিন আসতে পারিনি। পরীক্ষা চলছিল। এমিলি চলে এসেছে তো?’
‘হ্যাঁ, এমিলি চলে এসেছে।’ গার্ড নির্লিপ্তভাবে উত্তর দেয়।
জিয়া যোসেফের কবরের কাছে এসেও এমিলিকে দেখতে পায় না। তাহলে এমিলি কি আসেনি? না তো, ওই যে এসেছে। যোসেফের কবরের পাশে একইরকম আর একটা কবর। ক্রসে লেখা-
Rest in Peace Christiana Emili
Birth: 3rd January, 1996
Death: 7th December, 2007
জিয়ার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মনে ভেসে ওঠে রসেটির কবিতা, মৃত্যুর মতো প্রগাঢ় প্রেম কিন্তু মৃত। এসো সেই শবদেহের জন্যে একটা বিছানা করি। ছড়িয়ে দিই কিছু ফুলের পাপড়ি; একটা সবুজ চাদর থাকুক তার মাথার পাশে আর পায়ের কাছে একটা প্রস্তরখণ্ড। আমরা দু’জন বসব সেই পাথরে, কাটিয়ে দেব অলস সন্ধ্যার শান্ত সময়। যোসেফ ও এমিলি দু’জনে এখন গল্প করতে করতে অলস বিকেলের শান্ত সময় পার করবে।
জিয়া এখনও প্রায়ই আসে সিমেট্রিতে। নাম-না-জানা ফুলগুলো দিয়ে কবর দু’টো সাজায়। তারপর একটি করে ফুল কবর দু’টি থেকে তুলে নেয়। পকেটে রেখে দেয়। যখনই বের করে, মনে হয় যেন সদ্য তোলা। চারিদিক সুগন্ধে ভরে ওঠে।
(লেখক পিএইচডি গবেষক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)





