
লিখেছেন: স্বামীনাথন এ আয়ার
অক্টোবর মাসের গোড়ায় দ্বিতীয় বারের জন্য উজবেকিস্তান গেলাম। উদ্দেশ্য ছিল সমরকন্দ, বুখারা এবং খিভা-র বিস্ময়কর স্থাপত্য দর্শন। এর মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত সমরকন্দ-এর রেগিস্তান স্কোয়ার। এই খোলা চত্বরের তিন দিকে তিনটি বিশাল অট্টালিকা, আর তাদের মিনারের শীর্ষ থেকে ঝলসে উঠছে নীল, কমলা, সবুজ, ফিরোজা, বহুবর্ণের টাইলস।
সৌন্দর্য তো আছেই, কিন্তু যা সব থেকে নাড়া দিয়েছিল তা হল, এই তিনটি চোখ ঝলসানো ভবনের সবগুলিই প্রাচীন মাদ্রাসা। আজকের ভারতে সাধারণত ভেবে নেওয়া হয়, মাদ্রাসা মানেই এমন কিছু জায়গা যেখানে মুসলমানরা শুধু পবিত্র কুরআন ছাড়া আর কিছুই শেখে না এবং সেই শিক্ষা কোনও রকম চাকরির নিরিখে নিষ্ফলা। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে বেশ কিছু মাদ্রাসা ‘মৌলবাদের’ সঙ্গে যুক্ত, এমন অভিযোগও রয়েছে।
সমরকন্দ, বুখারা এবং খিভা-র সুপ্রাচীন মাদ্রাসাগুলি ছিল বিশ্ববিশ্রুত শিক্ষাকেন্দ্র। সেখানে শুধু বাচ্চাদের পড়ানো হত না। মাদ্রাসাগুলি ছিল একাধারে ধর্মীয় চর্চাকেন্দ্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়। পড়ানো হত গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা এবং বিজ্ঞান। পড়াতেন সেই সময়ের বিশ্বখ্যাত সব বিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং গণিতজ্ঞরা। উলুঘ বেগ হলেন এর অন্যতম। এছাড়া তারও আগে বাগদাদ ও পারস্যে আল-খোয়ারিজমি এবং ইবন সিনা গবেষণায় নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
ভারতে মাদ্রাসাগুলির এখন যে ‘ইমেজ’, তাতে বদল আনা দরকার। তার জন্য মুসলিম শিল্পপতি-উদ্যোগপতিরা এবং ওয়াকফ বোর্ডগুলো নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করুন, যেখানে সর্বোচ্চ মানের বিজ্ঞানচর্চা হবে, এবং তাদের নাম দেওয়া হোক মাদ্রাসা। ‘মাদ্রাসা’ শধটিকে এই মুহূর্তে যেমন তাচ্ছিল্য করা হয়, সেই কালিমা দূর হবে এর ফলে। একদা মাদ্রাসাগুলি আইআইটি বা আইআইএসসি-র মতোই যে সেরা কারিগরি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ছিল, সেই ঐতিহাটিও ফিরে আসবে। নতুন মাদ্রাসাগুলির নাম দেওয়া যেতে পারে সেই যুগের মধ্য এশিয়ায় সেরা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাতাদের নামে। তৈমুর লংয়ের নাতি এবং একদা প্রায় পুরো মধ্য এশিয়ার অধিপতি ছিলেন উলুঘ বেগ (১৩৯৪-১৪৪৯)। তিনি তিনটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন, যার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠটি বর্তমান রেগিস্তান স্কোয়ারে অবস্থিত। কিন্তু তিনি শুধু এক খ্যাতনামা নির্মাতাই ছিলেন না। তিনি সেই যুগের সেরা জ্যোতির্বিজ্ঞানীও বটে। তিনি বিখ্যাত ছিলেন তাঁর নক্ষত্র-মানচিত্র এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনার জন্য। এই উলুগ বেগ সমরকন্দে তাঁর মানমন্দিরে একত্র করেছিলেন এক ঝাঁক বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদকে। ওমর খৈয়াম-এর রুবাইয়াত পড়তে খুব ভালো লাগে। কিন্তু তিনি শুধু কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমরকন্দ-এর এক শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী-দার্শনিকদের অন্যতম।
খিভা মুহাম্মদ আল-খোয়ারিজমি-র জন্মস্থান, অনেক সময় যাঁকে বলা হয় আল-খোয়ারিজম। তাঁর নাম থেকেই পেয়েছি আজকের একটি শধ, ‘অ্যালগরিদম’। অ্যালজেব্রা এসেছে আল-জবর থেকে, যা দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানের জন্য আল-খোয়ারিজমি-র অন্যতম পদ্ধতি। তিনি দশমিক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পথিকৃৎ। ইবন সিনা, যাঁকে ইউরোপে অ্যাভিসেনা বলা হত, তাঁর সময়ের এক অগ্রণী চিকিৎসাবিজ্ঞানী তো বটেই, এছাড়াও ছিলেন একজন দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ।
বুখারা এবং খিভা-র মাদ্রাসাগুলিতে তিনি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, উভয় ভূমিকাই পালন করেছেন। পরে তিনি গ্রিসে (হিন্দিতে ‘ইউনান’) কাজ করতে করতে বিখ্যাত হন, এবং তাঁর প্রবর্তিত চিকিৎসা পদ্ধতি ইউনানি হিসেবে পরিচিত, যা এখনও ভারতে, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান প্রভৃতি দেশে অনুসৃত।
মধ্য এশিয়ার শ্রেষ্ঠ মাদ্রাসাগুলো ছিল বৃহদাকার, তাদের কারুকার্য যে-কোনও প্রাসাদের সমতুল্য। তা থেকেই বোঝা যায় সেই যুগে বিজ্ঞান এবং শিক্ষার উপর কতটা জোর দেওয়া হয়েছিল। এখনকার ভারতীয় মাদ্রাসাগুলিতে তার সমতুল্য কিছুই নেই। ভারতে প্রায় ৩০ হাজার মাদ্রাসায় পবিত্র কুরআন ও ধর্মতত্ত্ব পড়ানো হয়। এ ছাড়া আর তেমন কিছুই গুরুত্ব পায় না। ভারত সরকার মাদ্রাসাগুলির আধুনিকীকরণ চায়, যেখানে স্কুলগুলির পাঠ্যসূচির বিষয়গুলো পড়ানো হবে। কিছু আধুনিকমনস্ক মুসলিম সেই পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু বাকিরা এতে ক্ষুব্ধ। তাঁরা মনে করেন এটি তাঁদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সরকারি হস্তক্ষেপ। কাজেই সার্বিকভাবে পরিবর্তনের গতিও শ্লথ।
সাচার কমিটির মতে, মাদ্রাসা সংস্কার নয়, মুসলিমদের মধ্যে সাক্ষরতার নিম্ন হার এবং স্কুলছুটের সমাধান হল মুসলিম-প্রধান এলাকায় আরও বেশি উচ্চমানের সরকারি স্কুল স্থাপন। সাচার কমিটির পর্যবেক্ষণ ছিল, মুসলমান শিশুদের মধ্যে মাত্র ৩-৪ শতাংশ পুরোপুরি মাদ্রাসা-শিক্ষিত। তারা একে মূলত ধর্মীয় শিক্ষা হিসেবেই দেখে এবং মনে করে না যে, এটা স্কুলের পঠন-পাঠনের কোনও বিকল্প। নিঃসন্দেহে আরও ভালো সরকারি স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু মাদ্রাসা পাঠ্যসূচির ঐচ্ছিক সংস্কারও এক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু উজবেকিস্তান আর একটি পথের খোঁজ দিয়েছে। তাদের মডেলে মাদ্রাসাগুলি ছিল কুরআন অধ্যয়ন, ধর্মচর্চা এবং বিজ্ঞান ও দর্শনের শিক্ষালয় এবং গবেষণা কেন্দ্র।
মুসলমান এবং অন্যান্য অর্থদাতাদের উৎসাহ দেওয়া হোক আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে যাদের নাম হবে অতীতের ইসলামি পণ্ডিতদের নামে। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে ‘মাদ্রাসা’ই বলা হোক, যেমন ইসলামি স্বর্ণযুগে বলা হত। মাদ্রাসা যে মহৎ ইসলামি স্কলারদের উত্তরাধিকার, সেটা বলা দরকার। এই নতুন মাদ্রাসাগুলো হয়ে উঠুক একাধারে ধর্মচর্চার কেন্দ্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন প্রাচীন সমরকন্দ বা বুখারায় ছিল। নালন্দা, তক্ষশীলা, অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ-এর মতো প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও এক সঙ্গে ধর্মচর্চা এবং বিজ্ঞানের পঠনপাঠন চলত। শুধু মাদ্রাসার আধুনিকীকরণের উপর জোর না দিয়ে, তাদের গৌরবোজ্জ্বল বিজ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন হোক।
ওয়াকফ বোর্ডগুলোর সম্পদের অভাব নেই। কিন্তু তারা আধুনিকীকরণে উৎসাহ দেখায়নি, ফলে মানসিকতার পরিবর্তনের জন্য মুসলমান উচ্চবর্গকেই (এলিট) অগ্রণী হতে হবে। ভারতে বেশ কিছু কোটিপতি মুসলমান আছেন, কিন্তু বেঙ্গালুরু ও ভোপালে আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সেক্যুলার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনেই তাঁদের আগ্রহ। আমার ইচ্ছে, তাঁরাও অন্যান্য ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের সহায়তায় সেরা মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলুন, যাদের নাম হতে পারে উলুঘ বেগ মাদ্রাসা বা ইবনে সিনা মাদ্রাসা।
(লেখক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ)