
মূল: এস আমিনুল হাসান
জীবন বদলে দেওয়া এক মহাসত্য: তাওহীদ
মানবজীবনের আমূল পরিবর্তন এবং আত্মিক স্বাধীনতার মূল চাবিকাঠি হলো তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। সাধারণত তাওহীদ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তা কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক কিংবা দর্শনশাস্ত্রের জটিল লেকচারে রূপ নেয়। তবে গত শুক্রবার দিল্লির মসজিদ ইশায়াত-ই-ইসলামে প্রদত্ত জুমার খুতবায় জামায়াতে ইসলামী হিন্দের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এস. আমীনুল হাসান অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় তাওহীদের বাস্তবমুখী রূপটি তুলে ধরেন। তাঁর সেই জীবনঘনিষ্ঠ আলোচনার মূল নির্যাস পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
ইমাম গাজালীর দৃষ্টিতে তাওহীদের চার স্তর
ইসলামী দর্শনের মহান ইমাম, ইমাম গাজালী (র.) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘এহিয়াউ উলুমিদ্দীন’-এ তাওহীদের গভীরতাকে বোঝাতে এটিকে চারটি স্তরে বিন্যস্ত করেছেন। প্রথম স্তরটি হলো ‘মুখের তাওহীদ’—যেখানে মানুষ কেবল মুখে ঈমান আনার ঘোষণা দেয়। কিন্তু অন্তরে বিশ্বাস না থাকায় এটি মূলত মুনাফিকদের তাওহীদ হিসেবে গণ্য হয়; ঠিক যেমনটি ফেরাউন ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে ঘোষণা করেছিল। দ্বিতীয়টি হলো ‘আকীদার তাওহীদ’—যা সাধারণ মুসলিমদের বৈশিষ্ট্য, যেখানে মুখের সাথে অন্তরের মিল থাকে এবং মানুষ আল্লাহকেই একমাত্র উপাস্য ও আশ্রয় বলে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে।
তৃতীয় স্তরটি হচ্ছে ‘কাজের তাওহীদ’ (مشاہدہ افعال)—যা একজন মুমিনের যাপিত জীবনের মূল ভিত্তি। এর অর্থ হলো, পৃথিবীর বুকে চলমান প্রতিটি ঘটনা, ভালো-মন্দ পরিস্থিতি, রাজনৈতিক বা সামাজিক উত্থান-পতনের পেছনে একমাত্র ‘মহা-নিয়ন্তা’ বা আল্লাহর কুদরতি হাতকে প্রত্যক্ষ করা। আর চতুর্থ তথা সর্বোচ্চ স্তরটি হলো ‘তাওহীদে নিমগ্নতা’ (استغراق فی التوحید)—যে স্তরে পৌঁছালে মানুষের অন্তর থেকে সৃষ্টির সমস্ত ভয় উবে যায়। জাগতিক কোনো পরাশক্তি, মারণাস্ত্র কিংবা আধুনিক গোয়েন্দা প্রযুক্তি তাকে ভীত করতে পারে না; সে কেবলই আল্লাহর ওপর অবিচল ভরসা রেখে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক টান করে দাঁড়ানোর সাহস পায়।
আখরোটের রূপক ও তাওহীদের গভীরতা
খতিব সাহেব তাওহীদের এই স্তরগুলোকে একটি আখরোটের গঠনের সাথে তুলনা করে এক চমৎকার উদাহরণ দেন। একটি আখরোটের যেমন চারটি অংশ থাকে—বাইরের শক্ত খোসা, ভেতরের পাতলা চামড়া, ভেতরের আসল মগজ এবং সবশেষে মগজ থেকে নিংড়ানো খাঁটি তেল; ঈমানের গভীরতাও ঠিক তেমনই।
বাইরের শক্ত ও স্বাদহীন খোসাটি হলো মুনাফিকদের মৌখিক তাওহীদ। ভেতরের পাতলা চামড়াটি সাধারণ মুসলমানদের ঈমান, যা তাকে আখেরাতে মুক্তির জন্য ন্যূনতম শক্তি জোগায়। কিন্তু ভেতরের আসল মগজটি হলো আল্লাহর অতি নিকটবর্তী বান্দাদের (মুক্বাররাবীন) তাওহীদ, যারা জগতের সবকিছুর মধ্যে আল্লাহর কর্তৃত্ব খুঁজে পান। আর সবশেষে, চরম প্রতিকূলতায় পিষ্ট হওয়ার পর আখরোট থেকে যে সুগন্ধি তেল বের হয়, সেটিই হলো সর্বোচ্চ স্তরের তাওহীদে নিমগ্নতা—যা ফিলিস্তিনের মজলুম কিন্তু অসম সাহসী মানুষের মতো চরম বিপদেও মানুষকে সত্যের পথে অবিচল রাখে।
প্রকৃতি ও জীবজগতে তাওহীদের পাঠশালা
আমরা যদি চোখ মেলে তাকাই, তবে এই বিশাল মহাবিশ্বই আমাদের তাওহীদের সবক দেয়। দিন-রাতের আবর্তন, সময়মতো বৃষ্টিপাত, দিগন্তজোড়া সবুজ শস্যক্ষেত আর আকাশের মুক্ত পাখির ডানা ঝাপটানো—সবকিছুই এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় সুশৃঙ্খলভাবে চলছে। বন্য পশুপাখিদের কোনো গুদাম বা আধুনিক সাপ্লাই চেইন নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস অনুযায়ী, তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেট ভরে বাসায় ফেরে।
খতিব কেনিয়ার বিখ্যাত ‘মাসাই মারা’ অরণ্যের এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, সেখানে বনের হিংস্র সিংহরা শিকারের জন্য হাজার মাইল ভ্রমণ করে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এক অলৌকিক নিয়মে লাখ লাখ তৃণভোজী প্রাণীকে দূর-দূরান্ত থেকে মাইগ্রেশন করিয়ে ঠিক সিংহের সীমানায় এনে হাজির করেন। পশুপাখিদের কোনো ‘হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ’ বা জিপিএস ট্র্যাকার নেই, তবুও এক মহাসত্যের ইশারায় তারা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যায়। এই জীবিকাবণ্টনের নিখুঁত ব্যবস্থাপনাই তাওহীদের জীবন্ত প্রমাণ।
অহংকারী শাসক বনাম আল্লাহর পরিকল্পনা
ইতিহাস ও বর্তমানের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি যুগেই কোনো না কোনো রূপী অহংকারী ‘ফেরাউন’ বা জালিম শাসকের আবির্ভাব ঘটে। তারা মুখে না বললেও নিজেদের কর্মকাণ্ডে ‘আনা রাব্বুকুমুল আলা’ (আমিই তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপালক) ভাব জাহির করে। মিডিয়া ও প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে তারা নিজেদের এমন এক অপরাজেয় ইমেজ তৈরি করে, যা দেখে সাধারণ মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত হয়।
কিন্তু পবিত্র কুরআনের আয়াত মনে করিয়ে দেয়—‘তারাও পরিকল্পনা করে, আর আল্লাহও পরিকল্পনা করেন; এবং আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।’ আল্লাহর সূক্ষ্ম পরিকল্পনার সামনে এই অহংকারীদের ক্ষমতার রাজপ্রাসাদ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। নীল নদের উত্তাল তরঙ্গের সামনে যখন হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর জাতি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, তখন আপাতদৃষ্টিতে কোনো পথ ছিল না। কিন্তু তাওহীদের ওপর অবিচল বিশ্বাস নিয়ে মুসা (আ.) বলেছিলেন, ‘কখনো নয়! আমার সাথে আমার রব আছেন, তিনি অবশ্যই আমাকে পথ দেখাবেন।’ আর আল্লাহ নদের বুক চিরে রাস্তা বানিয়ে দিয়ে ফেরাউনকে সলিল সমাধি দিয়েছিলেন। এই ইতিহাস কেবল গল্প নয়, বরং যেকোনো যুগের মুমিনদের জন্য এক পরম আশার বাণী।
আমাদের দায়িত্ব ও জীবনের অ্যাসাইনমেন্ট
খুতবার শেষাংশে এস. আমীনুল হাসান দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জীবনমুখী পরামর্শ বা ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ দেন, যা আমাদের জীবনকে বদলে দিতে পারে:
১. তাওহীদের ডায়েরি (Journaling): আগামী এক সপ্তাহ আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কখন কোন বন্ধ পথটি হঠাৎ খুলে গেল, কীভাবে অলৌকিকভাবে রোগমুক্তি এলো কিংবা কীভাবে অভাবের দিনে অচিন্তনীয় উৎস থেকে রিযিক এলো—তা লিখে রাখা। এই আত্ম-পর্যবেক্ষণ আমাদের ভেতরের কাজের তাওহীদ বা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
২. নির্ভীক পরিকল্পনা ও ভরসা: জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে বা লক্ষ্য অর্জনে মানুষের সাধ্যমতো নিখুঁত পরিকল্পনা করতে হবে। কিন্তু সেই পরিকল্পনার সাফল্যের জন্য কোনো সৃষ্টি বা মানুষের তোষামোদি না করে, অন্তরের সমস্ত ভয় ও শঙ্কা দূর করে বলতে হবে—‘এটি আমার পরিকল্পনা, আর ইনশাআল্লাহ আমার আল্লাহ এতে বরকত দেবেন ও সফল করবেন।’
আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তা, ফেসবুক বা ইউটিউবে লেখালেখি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উপার্জনকে যখন আমরা এই তাওহীদের কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসব এবং মনে রাখব যে আমাদের প্রতিটি কাজের হিসাব আল্লাহর দাঁড়িপাল্লায় উঠবে—তখনি আমাদের জীবন প্রকৃত অর্থে বদলে যাবে। আল্লাহ আমাদের তাওহীদের এই জীবন্ত চেতনা ধারণ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।




