
মূলঃ সাফিউর রহমান নাবীল (সম্পাদক, মাসিক রফিক-এ-মাঞ্জিল)
অনুবাদঃ মুহাম্মাদ মুরসালিম (গবেষক, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়)
ইসলামী চিন্তায় “ইসলামী” বলতে কী বোঝায়? কোন্ কোন্ ভিত্তির ওপর কোনো চিন্তাকে ইসলামী চিন্তা বলা হয়? ইসলামী চিন্তার এমন কী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা একে অন্যান্য চিন্তাধারা থেকে স্বতন্ত্র করে? ইসলামী চিন্তাও কি অন্যান্য চিন্তাধারা ও মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে? আজ আমরা মূলত এই প্রশ্নগুলো কেই বোঝার চেষ্টা করব।
বিভিন্ন চিন্তাধারা ও মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া বলতে শুধু এটুকুই বোঝায় না যে, আমরা সেগুলোকে প্রকাশ্যভা বে গ্রহণ করলেই কেবল তার প্রভাবে পড়েছি। বরং প্রকৃত প্রভাবটি ঘটে বৌদ্ধিক স্তরে, আমাদের চিন্তা করার পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। অর্থাৎ, আমাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) ও অস্তিত্বতাত্ত্বিক (Ontological) ভিত্তি কী? সেটিই এখানে মুখ্য বিষয়। অন্য কথায়, আমাদের চিন্তার প্রক্রিয়াও কোনো স্বাধীন প্রক্রিয়া নয়। বরং সেই চিন্তাও কীভাবে প্রভাবিত হয়, সেটিকে বিবেচনায় আনলেই কেবল আমরা বিষয়টির বিস্তৃত দিকগুলো যথাযথভাবে বুঝতে সক্ষম হব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা প্রায়ই উপেক্ষিত হয় আর তা হলো এই যে প্রতিটি চিন্তা ধারা ও মতবাদের একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি থাকে, এবং সেই ভিত্তির ওপরই তার ব্যবহারিক রূপ ও পদ্ধতি গড়ে ওঠে। আমরা যখন সমসাময়িক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জকে বুঝতে বা তার সমাধান দিতে এগিয়ে আসি, তখন সেই সমস্যাগুলোর জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো অর্থাৎ কেন এবং কীভাবে সেগুলোর উদ্ভব হয়েছে তা বিশ্লেষণ না করেই আমরা সরাসরি ইসলামী চিন্তার আলোকে ব্যবহারিক সমাধান খুঁজতে শুরু করি। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের মূল প্রচেষ্টা হওয়া উচিত বিষয়গুলো কে তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি থেকে দেখা এবং সমালোচনামূলক পর্যালোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। এই প্রচেষ্টা যেন কেবল বিকল্প খোঁজার মধ্যেই সীমাবদ্ধনা হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে তৃতীয় একটি ভুল ধারণা হলো এই যে, এই ধরনের আলোচনা নাকি কেবল নির্দিষ্ট একাডেমিক পরিসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, এবং মানুষের জীবনের মৌলিক সমস্যার সঙ্গে হয় এর কোনো সম্পর্ক নেই, অথবা থাকলেও তার প্রভাব খুবই সীমিত। এই ধারণার কারণেই চিন্তাশীল মানুষের একটি বড় অংশ জীবনের মৌলিক সমস্যাগুলো কে বিভিন্ন চিন্তাধারা ও মতবাদের প্রভাব থেকে নিরপেক্ষ বলে মনে করে।
এই ধরনের চিন্তার ফলস্বরূপ একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। আমাদের সামনে যে মৌলিক চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলো আদৌ নিরপেক্ষ নয়; বরং সেগুলোর ভিত্তি নিহিত রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ ধর্মতত্ত্বে (Secular Theology), যা আমাদের জীবনযাপন, আচরণ, মানসিকতা ও চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। অথচ এই বাস্তবতার মুখোমুখি থাকা সংখ্যালঘুদের বলা হয় যে, আধুনিক বিশ্বের সমগ্র নির্মাণই না কি ইসলামের সৃষ্টি! অর্থাৎ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক সহ সব ধরনের অগ্রগতিকে ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে দেখা হয়ে থাকে! ফলে সমস্যার মূল কারণ আর জ্ঞানতাত্ত্বিক বলে বিবেচিত হয় না; বরং তাকে কেবল ব্যবহারিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, এবং সেই অনুসারে তার ব্যবহারিক সমাধান খোঁজা শুরু হয়।
এই আলোচনাগুলোর প্রেক্ষাপটে যখন আমরা পাশ্চাত্য উপনিবেশবাদের অধ্যয়ন করি, তখন জ্ঞানের উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রাচ্যবাদী (Orientalist) চিন্তার একটি বয়ান আমাদের সামনে আসে। এই প্রাচ্যবাদী চিন্তা শুধু ইসলামের মৌলিক টেক্সটসমূহকেই (নুসূস) চ্যালেঞ্জই করেনি; বরং সেগুলোর অনুধাবন, ব্যাখ্যা এবং বাস্তব প্রয়োগের ধারণাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে বিংশ শতাব্দীতে কুরআন মাজীদের তাফসির এবং হাদিসের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ নিয়ে ব্যাপক কাজ হয়েছে; কিন্তু এই শিক্ষাগুলোকে নিজ নিজ যুগে কীভাবে বাস্তবায়িত করা হবে- এই দিকটি আমরা অনেকাংশে বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রভাবে এবং কিছুটা এই ধারণার ভিত্তিতে যে, এসব শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ জীবনে সম্ভব নয়- তা উপেক্ষা করেছি। ফলস্বরূপ, আমরা ইসলামী চিন্তার প্রকৃত প্রবক্তা হওয়ার পরিবর্তে ব্যবহারিক ইসলাম-এর প্রচারক হয়ে উঠেছি। এতে করে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে ইসলামী চিন্তার মূল কাজ ছিল প্রশ্ন উত্থাপন করা, বিদ্যমান ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, কিন্তু এর পরিবর্তে কেবল বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগানো এবং রাষ্ট্রের আইনের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতাকে একটি শর্তসাপেক্ষ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করাই মুখ্যহয়ে দাঁড়িয়েছে।
আধুনিকতার যুগে যখন এসব বিষয় আলোচনায় আসে, তখন কিছু ইসলামী চিন্তাবিদ এগুলোকে জীবনদর্শন (তাসাওউর-এ-হায়াত) এবং মেটা-ন্যারেটিভ (Meta-narrative)-এর সমস্যা হিসেবে দেখার চেষ্টা করেন। এর ফলেই ইসলামী জীবনব্যবস্থার (ইসলামী নিযামে জিন্দেগী) ধারণা সামনে আসে । অর্থাৎ জীবনের আংশিক সমস্যাগুলোকেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ত্রুটির আলোকে দেখার চেষ্টা করা হয়। এভাবে বিভিন্ন সমস্যার মূল কারণ হিসেবে জীবনদর্শনের প্রভাবকে চিহ্নিত করা হয় এবং এর বিপরীতে ইসলামী জীবনদর্শনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত জীবনব্যবস্থার দিকে দাওয়াত দেওয়া হয়, যাতে শেষ পর্যন্ত একটি বিকল্প সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করা যায়।
কিন্তু যখন আমরা উত্তর-আধুনিক যুগে প্রবেশ করলাম, তখন জীবনের আংশিক সমস্যাগুলোকে বৃহত্তর মতাদর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিরপেক্ষ মনে করে সেগুলোর সমাধান করা শুরু হলো, যদিও বাস্তবে সেগুলো কখনোই নিরপেক্ষ ছিল না এবং এখনও নয়! এগুলোকে স্বাধীন ও মতাদর্শ-নিরপেক্ষ স্তরে দেখার প্রবণতা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে ইসলামী চিন্তার ক্ষেত্রেও আমাদের চিন্তাবিদরা এসব আংশিক সমস্যাকে আর জীবনদর্শনের আলোকে নয়; বরং মানবিক সমস্যা এবং কার্যকারিতার (Functionality) সমস্যা হিসেবে দেখতে শুরু করেন, এবং বাস্তববাদী (Pragmatic) ভিত্তিতে তার সমাধান খোঁজা শুরু হয়। এর ফলে জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে মূল্যবোধ, জীবনদর্শন এবং ঐশী শিক্ষাগুলো নীতিগতভাবে কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে তাদের কেন্দ্রীয় অবস্থান ক্রমশ হারাতে থাকে। তাই ব্যক্তির ওপর সমাজের অধিকার রক্ষার দায়িত্বের পরিবর্তে সমাজের ওপর ব্যক্তির মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টিকেই অপরিহার্য বলে বিবেচনা করা হয়! এটাই উত্তর-আধুনিক যুগের মানবকেন্দ্রিক (Anthropocentric) দৃষ্টিভঙ্গি।
উত্তর-আধুনিক যুগের এই পরিবর্তনের ফলে ইসলামী চিন্তার যাত্রা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে। তাই একে পুনরায় সরাসরি ইসলামী ভিত্তির ওপর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাড়াহুড়ো না করে, এটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
নিবন্ধটি মাসিক রফিক-এ-মাঞ্জিল (মে, ২০২৬) ‘ফিকরে ইসলামী কা সাফার’ সংখ্যা থেকে নেওয়া হয়েছে।