
লিখেছেন: সুমন কল্যাণ মৌলিক
ভোটার তালিকায় সংশোধন যে কোন গণতন্ত্রে একটি স্বাভাবিক বিষয়। ভারতবর্ষ কখনো তার ব্যতিক্রম ছিল না। মৃতদের তালিকা থেকে বিয়োজন, নতুনদের সংযোজন, স্থানান্তরিত মানুষদের এক তালিকা থেকে অন্য তালিকায় নাম ওঠানো এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত বুথ লেভেল অফিসাররা বছরের পর বছর ধরে অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পাদন করছেন। কিন্ত এবার বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ২৪ জুন (২০২৫) কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বিহারে যে নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন শুরু করেছিল এবং বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে চলমান, তা শুধু বিতর্ক তৈরি করেনি, দেশের একটা বড় অংশের মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। প্রক্রিয়ার প্রাথমিক অভিঘাত থেকে এটা স্পষ্ট যদি কার্যকর প্রতিরোধ ও আদালতের দায়বদ্ধ হস্তক্ষেপ না হয় তবে এক বিরাট সংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ হয়ে যাবে। আবার সংখ্যাতত্ত্ব বলছে, এই বাদ হওয়া মানুষদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন গরীব ও প্রান্তিক মানুষ। সবচেয়ে বড় কথা হল এই বিতর্ক এমন সময়ে হচ্ছে যখন খোদ নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মের নিরপেক্ষতা নিয়ে একাধিক প্রশ্নচিহ্ন উঠে গেছে এবং বিভিন্ন প্রতিবেদন, নির্বাচনী কাগজ থেকে এটা স্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছে। অতি সম্প্রতি রাহুল গান্ধীর বহুল আলোচিত ‘Democracy Destroyed’ শীর্ষক সাংবাদিক সম্মেলনে একাধিক তথ্য প্রমাণ এসেছে। কিন্তু তথ্যের খাতিরে একথাও মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে বিগত লোকসভা নির্বাচনের সময় কত ভোট পড়েছে সে সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিটি (১৭সি) নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছিল। বিশেষ করে ভোট শেষ হয়ে যাওয়ার পর ভোটের শতাংশের হার এবং তার দুদিন পরে চূড়ান্ত ভোটের হারের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে এখনো পর্যন্ত কমিশন যথাযথ জবাব দিতে পারেনি, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে বারানসী কেন্দ্রে যেখানে খোদ নরেন্দ্র মোদি ভোটপ্রার্থী ছিলেন, সেখানে একাধিক অভিযোগ উঠেছিল। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত একাধিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে করা একাধিক মামলা তার প্রমাণ।
ভোটার তালিকা সংশোধন বলতে যে কাজগুলো বোঝায় তা হল মৃত ব্যক্তিদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া, যে সমস্ত ভোটাররা স্থায়ী ভাবে অন্য জায়গায় চলে গেছেন তাদের নাম বাদ দেওয়া, যাদের আঠারো বছর বয়স হয়ে গেছে তাদের নাম ভোটার তালিকায় সংযোজন করা। কিন্তু এসআইআরের ক্ষেত্রে যাদের নাম ভোটার তালিকায় আছে তাদেরকেও ফর্ম ভর্তি করতে বলা হচ্ছে। এ কথা কারও অজানা নয় যে কোন তালিকায় নাম তুলতে বা রাখতে গেলে অবশ্যই ভোটারদের কিছু নথি জমা দিতে হয়। এই একই কথা ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সব জায়গায় এসআইআরের ক্ষেত্রে মানুষের কাছে যে তিনটি নথি সহজলভ্য অর্থাৎ আধার কার্ড, সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র এবং প্যান কার্ডকে অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের বিরোধিতা ও আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও সমস্ত সরকারি কাজে আধার সংযুক্তি আবশ্যিক করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে আজকে সরকারের ক্রমাগত প্রচারের কারণে আধার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসাবে প্রচারিত। সেটিকে বাতিল করা হয়েছে। একইভাবে খোদ নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ভোটার আইডেন্টিটি কার্ডেরও কোন মূল্য নেই। গ্রামের দিকে আরো দুটো গুরুত্বপূর্ণ নথি হল রেশন কার্ড এবং মনরেগা কার্ড। এগুলোও বাতিল। পরিবর্তে যে সমস্ত নথি গুলোকে (যে কোন একটা) চাওয়া হয়েছে তা বেশিরভাগ মানুষের কাছে সহজলভ্য নয়। বিহারের ক্ষেত্রে যে সমস্ত নথিগুলো চাওয়া হয়েছিল তার মধ্যে রয়েছে ১) পেনশন পেমেন্ট অর্ডার, ২) ১৯৮৭ সালের ১ জুলাই এর আগে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যাঙ্ক, এলআইসি, পোস্ট অফিস কর্তৃক ইসু করা কোন পরিচয় পত্র ৩) জন্ম সার্টিফিকেট ৪) মাধ্যমিক বা সমতুল কোন সার্টিফিকেট ৫) পাসপোর্ট ৬) স্থায়ী বাসস্থানের শংসাপত্র ৭) অরণ্য অধিকার সংক্রান্ত শংসাপত্র ৮) তপশিলি জাতি/উপজাতি/ ওবিসি সার্টিফিকেট ৯) ন্যাশানাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স ১০) ফ্যামিলি রেজিস্টার ১১) জমি বা আবাস যোজনার শংসাপত্র। এই তালিকার নবম ও দশমটা বিহারের জন্য প্রযোজ্য নয়। এগারো নম্বর নথিটা পেতে গেলে আধার কার্ড জমা করতে হয়। ছয় নম্বর নথিটা বেশিরভাগ মানুষের কাছে থাকার কথা নয়। পাসপোর্টতো সারা দেশের এক শতাংশ মানুষের কাছে নেই। আমাদের মত দেশে সবচেয়ে সমস্যা হল অশিক্ষা, দারিদ্র্য। নব্বই এর দশকের আগে সন্তানের জন্ম গ্রামের দিকে মূলত বাড়িতেই হত। কোটি কোটি মানুষের কাছে সেই অর্থে জন্ম ও জন্মস্থানের কোন শংসাপত্র পর্যন্ত নেই। এই অবস্থায় গণতন্ত্রের কাজ হল ভোটার লিস্টে নাম তোলার প্রক্রিয়াটাকে সরল করা। এতদিন তা হয়ে এসেছে কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশন পরিকল্পিত ভাবে প্রক্রিয়াটিকে জটিল করে নাগরিকদের আতঙ্কিত করতে চাইছে। এখানে কেন নির্দিষ্ট ভাবে বিহারে ২০০৩ বা পশ্চিমবঙ্গে ২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে মাপকাঠি মানা হচ্ছে তার কোন যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর নেই। বলা হচ্ছে পূর্ববর্তী এসআইআর ঐসময় হয়েছিল। কিন্তু সেবার এইভাবে কোন প্রক্রিয়া চালানো হয় নি যাতে ভোটার তালিকায় যাদের নাম আছে তাদেরও ফর্ম জমা করতে হয়। এমনকি নির্বাচন কমিশন এমন কোন সার্কুলার দেখাতে পারে নি যাতে এবারে যে নথিগুলো চাওয়া হয়েছে, সেবারও সেগুলোর উল্লেখ ছিল। সর্বোপরি সেবার নির্বাচন কমিশন তার নিজের দেওয়া ভোটার আইডেনটিটি কার্ডকে অস্বীকার করেনি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি ও প্রাবন্ধিক সঞ্জয় হেগড়ে সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে আমাদের সঠিকভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে যখন ভারত একটা প্রজাতন্ত্র হয়েছিল: সাক্ষরতা, আর্থিক রোজগার এবং জাতি বা লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল প্রাপ্তবয়স্ককে ভোটাধিকার দিয়েছিল। সংবিধান সভায় এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। অনেক সদস্য সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে দেশ এর জন্য প্রস্তুত কি না। কিন্তু ড: বি আর আম্বেদকর সহ অন্যান্যরা জোর দিয়েছিলেন যে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা অর্জনের পূর্ব শর্ত হিসেবে রাজনৈতিক সমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই নীতি বাস্তবে রূপান্তরিত করেছিলেন দেশের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন। ১৭৩ মিলিয়ন সম্ভাব্য ভোটারের মুখোমুখি হন তিনি, যাঁদের বেশিরভাগই ছিলেন নিরক্ষর। কিন্তু তিনি উদ্ভাবনের রাস্তায় হেঁটেছিলেন। তিনি প্রতীক চালু করেছিলেন এবং প্রক্রিয়াগুলো এমনভাবে নকশা করেছিলেন যাতে অংশগ্রহণ সহজ হয়, দুরূহ নয়। ভারতের প্রথম নির্বাচন নিখুঁত ছিল না ঠিকই, কিন্তু সেটা ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক। বিপরীতে ভারতের ২৬ তম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার, জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে যে সংশোধন ঠিক তার বিপরীত। জন্ম সনদ এবং পাসপোর্টের মত বিরল নথির দাবি করে- যা জনসংখ্যার একটা ক্ষুদ্র অংশের কাছে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন এমন একটি মানদণ্ড খাড়া করেছে যা লক্ষ লক্ষ মানুষ পার হতে পারবে না। আধার কার্ড ও রেশন কার্ড, যা দরিদ্রদের কাছে ব্যাপকভাবে রয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। দেশে আজ যে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন তার সম্পূর্ণ দায় নির্বাচন কমিশনের।
এই এসআইআর প্রকল্পের স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ পারাকলা প্রভাকর সঠিকভাবে মন্তব্য করেছেন: “SIR of electoral roll means that it is the government choosing the voters instead of the other way round”। এই ভাবনাটা ভারতের সংবিধানে উল্লেখিত সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভাবনার বিরোধী। সরকার যাদের ভোটার তালিকা দেখতে চায় না, তাদের ভোটার তালিকা থেকে এই প্রক্রিয়া বাদ দিতে চায়। ইতিমধ্যে ভাইরাল হওয়া নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিকের বক্তব্য এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন এসআইআর করার সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের নয়। তাহলে প্রশ্ন হল এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞের সিদ্ধান্ত আসলে কার! এই এসআইআরের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে কারণ কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন সরকারের এনআরসি করার পরিকল্পনা বিগত সময়ে গণ আন্দোলনের চাপে সফল হয়নি। এক বিশাল সংখ্যক মানুষকে (যাদের মধ্যে বেশিটাই সংখ্যালঘু, প্রান্তিক ও মহিলা) যদি রাজনৈতিক সমাজ থেকে বহিষ্কার করা যায় তাহলে এদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে রূপান্তরিত করা যাবে। তাই সহজ কথাটা হল এসআইআর ভোটার লিস্টের প্রয়োজনীয় সংশোধনী নয়, আদতে ভোটার লিস্টের পুনর্লিখন।
চলমান এসআইআর প্রক্রিয়া এখনো পর্যন্ত সাংবিধানিক বা আইনি বৈধতার কোন নথি দেখাতে পারেনি। এক্ষেত্রে মূলগত বিষয়টা হল যে এই প্রক্রিয়া সরাসরি ন্যায় বিচারের ধারণাকে অস্বীকার করছে। আমরা জানি একটা মানুষ ততক্ষণ নির্দোষ যতক্ষণ না তিনি আইনের চোখে দোষী সাব্যস্ত হচ্ছেন এবং সেই ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত (এক্ষেত্রে অনাগরিক) করার দায় হল রাষ্ট্রের বা সেই ব্যক্তির যিনি কারো নাগরিকত্ব নিয়ে অভিযোগ দায়ের করেছেন। এখানে ঠিক তার উল্টো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া সমস্ত জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্বের বিষয়ে সন্দেহের চোখে দেখছে এবং নাগরিককে বাধ্য করছে এক কঠিন ও অবাস্তব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নাগরিক প্রমাণ করার। এইজন্য এসআইআর হয়ে উঠেছে গণ হারে ভোটাধিকার বঞ্চিতকরণের এক মহাপ্রকল্প। একই সঙ্গে পরিষ্কার ভাবে মনে রাখা দরকার ভারতীয় সংবিধানের কোথাও নির্বাচন কমিশনকে নাগরিকত্ব যাচাই করার অধিকার দেওয়া হয়নি, সেই দায়িত্ব কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের। অথচ এবার ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের বিষয় দুটোকে একসাথে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
আমরা যদি পর্যায়ক্রমিক ভাবে বাংলার চলমান এসআইআর প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করি তাহলে কিভাবে এই প্রকল্প এই রাজ্যে একটি ফ্যাসিবাদী প্রকল্পের চরিত্র নিচ্ছে তা সহজে বুঝতে পারব। পশ্চিমবঙ্গে গত পাঁচ মাস ধরে চলা এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ ছিল খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ। মানুষ সব কাজ ফেলে তালিকায় নিজের নাম খুঁজছেন। এই তালিকা প্রকাশের আগেই কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপির পক্ষ থেকে এসআইআরের সম্ভাব্য পরিণাম সংক্রান্ত ফলাফল নিয়ে এক আগ্রাসী ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছিল, যা মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার সৌজন্যে সর্বত্র প্রচারিত হয়। এই ন্যারেটিভের প্রচারক ছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এ রাজ্যে বিজেপির সভাপতি, বিরোধী দলনেতা থেকে শুরু করে চার আনা-আট আনার নেতারা। সেই ন্যারেটিভের মূল কথা ছিল পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষ করে বাংলাদেশ সংলগ্ন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলো অবৈধ অনুপ্রবেশকারী/ রোহিঙ্গা/ ঘুসপেটিয়াতে ভরে গেছে। এরা সবাই রাজ্যের সম্পদে ভাগ বসাচ্ছে, এখানে নানান ধরনের অনৈতিক কাজকর্ম করছে সর্বোপরি রাজ্যের শাসকদলের ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করছে। এসআইআরের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রমাণ করতে গিয়ে বলা হয়েছিল এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনী শেষে নিদেনপক্ষে এক কোটি রোহিঙ্গা/ ঘুষপেটিয়া বাদ পড়বে, রাজ্য জঞ্জালমুক্ত হবে এবং বিজেপি নিশ্চিতভাবে ক্ষমতায় আসবে। এই ন্যারেটিভে একটা দুর্বল অংশও ছিল। সেটা ছিল দলিত শরণার্থী হিন্দু যারা মতুয়া সম্প্রদায় নামে পরিচিত। এদের অনেকেই ১৯৭০ পরবর্তী সময়ে এদেশে আসেন এবং তাদের নাগরিকত্বের দাবি ছিল একশ শতাংশ ন্যায্য। বিজেপির এই ঘৃণ্য অনুপ্রবেশ তত্ত্বে এই মতুয়াদের পরিণতি কী হবে তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন প্রথম থেকেই ছিল এবং বিজেপির কাছে তা ছিল অস্বস্তিকর। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল এসআইআরের অসাংবিধানিক গঠন, পরোক্ষে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নীল নকশার বিরুদ্ধে এ রাজ্যে প্রায় কোন সংসদীয় দল বিরোধিতা করেনি। তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস, বামফ্রন্টের শরিক দলগুলির এসআইআর বিরোধিতা ছিল আংশিক ও মূলত প্রয়োগবিধির জটিলতা সম্পর্কিত। তাই বলা যায় কোন কার্যকরী বিরোধিতা ছাড়াই এই রাজ্যে সমীক্ষা শেষ হয়েছে।
খসড়া তালিকা নিয়ে আলোচনায় প্রবেশের আগে ‘নো ম্যাপিং’ ক্যাটাগরির অর্থটা বুঝে নেওয়া দরকার। নির্বাচন কমিশনের ভাষায় তাদের ঐতিহাসিক ডাটাবেস হল ২০০২ সালের ভোটার তালিকা। এই তালিকার সঙ্গে সম্পর্কহীন (প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ) মানুষদের নাম এই তালিকায় নেই। আর ভোটের নিয়ম সম্পর্কে সামান্য ধারণা আছে এমন মানুষরা জানেন যে ভোটার তালিকায় এএসডি ক্যাটাগরি থাকে যাদের মধ্যে আছে অনুপস্থিত/মৃত/ডুপ্লিকেট ভোটারদের নাম। পশ্চিমবঙ্গে খসড়া তালিকা অনুযায়ী ৫৮,২০,৮৯৮ জনের নাম বাদ গেছে। এর মধ্যে মৃত ভোটার ২৪,১৫,৮৫২ জন। স্থানান্তরিত ভোটার ১৯,১৫,৮৫২ জন। নিখোঁজ ভোটার ১২,২০,২৩৮ জন। ডুপ্লিকেট এবং অন্যান্য ভোটার ১,৯৫,৯৩৪ জন।
এই খসড়া তালিকায় প্রথমে আমাদের খোঁজা দরকার ঘৃণার কারবারীদের মুখে বারংবার উচ্চারিত এক কোটি রোহিঙ্গাদের। এই তালিকায় উদাহরণ হিসাবে এমন সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র বেছে নেওয়া হচ্ছে যেখানে ভোটারদের ৭৫% মুসলমান। আমরা এই কেন্দ্রগুলোতে নো ম্যাপিং বা আনম্যাপড ভোটারদের শতাংশগুলো দেখব ডোমকল (০.৪২%), রানীনগর (০.৯১%), হরিহরপাড়া (০.৬%), সুজাপুর (০.৫%), রঘুনাথগঞ্জ (০.৭%), সামসেরগঞ্জ (১%) এবং লালগোলা (১.১%)। এই পরিসংখ্যান শুধু এক কোটি রোহিঙ্গার গাঁজাখুরি তত্ত্বের মুখোশ খুলছে না, একই সঙ্গে বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণের লক্ষ্যকেও উন্মোচিত করছে। কোনরকম তথ্যপ্রমাণ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী রাজ্যের সীমান্ত জেলাগুলিতে জনবিন্যাস পাল্টে যাওয়ার যে অভিযোগ তুলেছিলেন, তার অসারতা প্রমাণ করছে।
এই ভোটার তালিকায় সবচেয়ে বেশি যাদের নাম বাদ পড়েছে তারা হলেন হিন্দু দলিত অর্থাৎ মতুয়া সম্প্রদায়। এক কথায় বলতে গেলে মতুয়ারা বিজেপির নাগরিকত্বের ফাঁদে ধরা পড়লেন। আমরা এবার দেখে নেব মতুয়া অধ্যুষিত বিধানসভা কেন্দ্রগুলোর অবস্থা- গাইঘাটা তপশিলি (১৪.৫১%), বাগদা তপশিলি (১২.৬৯%), কল্যাণী তপশিলি (১১.৯২%), বনগাঁ উত্তর তপশিলি (১১.৩%), রানাঘাট উত্তর পূর্ব তপশিলি (১১.১৯%), বনগাঁ দক্ষিণ তপশিলি (১০.৮৩%), কৃষ্ণনগর তপশিলি (১০.৪৩%), রানাঘাট উত্তর পশ্চিম (১০.৪৮%), রানাঘাট দক্ষিণ তপশিলি (৯.৩২), স্বরূপনগর তপশিলি (৬.৮৭%)। সারা রাজ্যে নো ম্যাপিং এর শতাংশ সেখানে ৩.৯৯% সেখানে মতুয়া প্রভাবিত এলাকায় গড় ৯.৪৩%। এককথায় এই খসড়া তালিকা মতুয়াদের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। খসড়া ভোটার তালিকায় এক কোটি রোহিঙ্গার হদিশ করতে না পেরে জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন উন্মাদের মত আচরণ করছে। এই আচরণের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হল শুনানির প্রয়োজনীয় খসড়া হিসাবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে বাতিল করা (পরে সুপ্রিম কোর্ট গ্রহণযোগ্য বলে)। অথচ একথা সবার জানা যে একটা সময় যখন ছোটবেলায় জন্ম নথিভুক্ত করার রেওয়াজ ছিল না তখন একটা বড় অংশের মানুষের কাছে জন্মের শংসাপত্র বলতে এই মাধ্যমিক কার্ডকেই বোঝাত। কমিশনের নির্দেশিকার নির্বুদ্ধিতা তখনই স্পষ্ট হয় যখন আমরা দেখি মাধ্যমিক পাশের সার্টিফিকেটের গ্রহণযোগ্যতা আছে অথচ সেই সার্টিফিকেটে দেওয়া জন্মতারিখটি যে অ্যাডমিট কার্ডের অনুসারী, তার গ্রহণযোগ্যতা নেই। নির্বাচন কমিশন বোধহয় ভুলে গেছে যে ভারতের ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য মাধ্যমিক পাশ হওয়ার দরকার হয় না, দরকার জন্মতারিখটি যা এই অ্যাডমিট কার্ডে পরিষ্কার ভাবে দর্শানো থাকে। আশঙ্কামত কমিশনের এই তুঘলকি চাল, নিত্য নতুন নিয়ম বদল সাধারণ মানুষের কাছে বলির পাঁঠা করে তুলছে বুথ লেভেল অফিসারদের (বিএলও)। বিভিন্ন জায়গা থেকে বিএলওদের ক্ষোভ ও গণপদত্যাগের খবর সামনে এসেছে। এ রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া চালু হবার পর থেকে বহু মানুষ মারা গেছেন। এই তালিকায় যেমন প্রয়োজনীয় নথি না থাকার ফলে আতঙ্কিত মানুষ আছেন, তেমনি আছেন অসম্ভব মানসিক চাপের শিকার বিএলওরা। ভোটার তালিকা সংশোধনের মত একটি স্বাভাবিক, সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে রক্তাক্ত করে তোলার দায় অবশ্যই নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া দ্বিতীয় পর্বে প্রবেশ করার পর এটা পরিষ্কার যে বাংলায় এসআইআরের নামে এক চক্রান্ত জাল বিস্তার করছে। এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য বিজেপির নির্বাচনী সুবিধা সুনিশ্চিত করা। এই বিষয়টি বুঝতে আমাদের প্রথমেই নজর দিতে হবে পশ্চিমবঙ্গের বিডিও ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (এইআরও) মৌসম সরকারের পদত্যাগ পত্র। এই পদত্যাগ পত্রে স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে যে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির মাধ্যমে এক ত্রুটিপূর্ণ অ্যাপকে কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার মানুষকে ভোটার তালিকার বাইরে করা হচ্ছে। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যে সমস্ত নামের বানান, লিঙ্গ পরিচয় ভুল ছিল, তা ভোটাররা পরবর্তী কালে ফর্ম ৮ এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনে সংশোধন করে। অথচ ২০০২ ও ২০২৫ এর তালিকার তথ্য মিলছে না এই অজুহাতে সেইসমস্ত ভোটারকে শুনানির নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পর্যন্ত স্বীকার করেছেন যে এই অ্যাপ ভুলে ভরা। মৌসম সরকার তার পদত্যাগের শেষ অনুচ্ছেদে যে কয়টি কথা লিখেছেন তা আরেকবার উল্লেখ করা প্রয়োজন: “Therefore I want to tender my resig-nation from the post of AERO so that I would have the consolation that I have not betrayed my countrymen and nations consciously”। (চিঠিটির বিস্তারিত বিবরণের জন্য দি নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস / ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ দ্রষ্টব্য)। একই সঙ্গে ভারতের অন্যতম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘দি রিপোটার্স কালেকটিভ’ (১৪ জানুয়ারি, ২০২৬) এর বিস্তৃত প্রতিবেদনটা উল্লেখ করা দরকার যেখানে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে বলা হয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় অফিসাররা বাংলার জন্য এমন কিছু নির্দেশিকা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দিয়েছেন যার কমিশনের পক্ষ থেকে কোন লিখিত আদেশ নেই।
এমনকি বহু ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সর্বভারতীয় নির্দেশিকার বিরোধী বক্তব্য বাংলায় মৌখিক ভাবে লাগু করার কথা বলা হচ্ছে। প্রথম খসড়া তালিকায় সুবিধা করতে না পেরে নির্বাচন কমিশন এক নতুন অস্ত্র বের করেছে যার নাম’লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ (যৌক্তিক অসঙ্গতি)। এই অস্ত্রকে নতুন বলার কারণ বিহার এসআইআরে এই বিষয়টি ছিল না। আসুন দেখে নেওয়া যাক এই অসঙ্গতি বলতে কি বোঝানো হয়েছে। এক্ষেত্রে পুনরায় উল্লেখ করা প্রয়োজন প্রাথমিক খসড়া তালিকার সময়ে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছিল। সে সময় যাদের নাম তালিকায় উল্লেখ ছিল, সেই অংশের অনেকেই উল্লাসে মেতেছিল। আমাদের আশঙ্কা ছিল দ্বিতীয় পর্বে অনেকের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এখন নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য মোতাবেক বোঝা যাচ্ছে যে ১.৬৭ কোটি মানুষের কাছে শুনানির নোটিশ যাবে। এদের মধ্যে ১.৩৬ লক্ষ হতে চলেছেন এই যৌক্তিক অসঙ্গতির শিকার। কারা থাকছেন এই তালিকায়! সেই মানুষেরা যারা বাবা- মায়ের পরিবর্তে তাদের ঠাকুর্দা ও ঠাকুমার নাম দিয়েছেন। সেই সমস্ত ভোটার যাদের সন্তানের সংখ্যা ৬। এছাড়া বাবা ও ছেলের বয়সের অসঙ্গতি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ২০০২ সালের ভোটার তালিকা ছিল বাংলাতে। অ্যাপের মাধ্যমে সেগুলো ইংরেজি করতে গিয়ে একাধিক অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে যা মূলত অ্যাপের প্রয়োগগত সমস্যা। দু একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। পদবির ক্ষেত্রে এই ভুল সবচেয়ে বেশি। পদবি বণিক (Banik/Vanik), মন্ডল (Mondal/Man-dal)। এছাড়া রয়েছে ব্যানার্জী/ বন্দোপাধ্যায়, চ্যাটার্জী/চট্টোপাধ্যায় যে এক তা বুঝতে না পারার ব্যর্থতা। এই সব অসঙ্গতিকে কেন্দ্র করে পাইকারি হারে অশক্ত, বৃদ্ধ, অসুস্থ, কর্মসূত্রে প্রবাসী মানুষদের নোটিশ ধরানো হচ্ছে। এই ভাবে বাংলায় এক বিশাল সংখ্যক মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে।
এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছি যে এক কোটি রোহিঙ্গা খুঁজে না পেয়ে এবং নির্দিষ্ট করে মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী সাব্যস্ত করতে ব্যর্থ হয়ে বিজেপির স্বার্থ পূরণ করতে এই যৌক্তিক অসঙ্গতির মুখোশে নিশানা করা হচ্ছে মুসলিমদের। দ্য ওয়্যার ওয়েব ম্যাগাজিনে অপর্ণা ভট্টাচার্যের অনবদ্য সমীক্ষা গোটা বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এই সমীক্ষা দেখিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলিতে শুনানির হার অনেক বেশি। যেমন মুর্শিদাবাদ (৬৬% মুসলিম, এসআইআর নোটিশ ৩০.২০%), উত্তর দিনাজপুর (৪৯.৯% মুসলিম, নোটিশ ২৯.৭৫%), মালদা (৫১.৩% মুসলিম, ২৮.৪২% এসআইআর নোটিশ)। কিন্তু যে সমস্ত জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা কম, সেখানে এসআইআর নোটিশের হারও কম। যেমন বাঁকুড়া (৮% মুসলিম, এসআইআর নোটিশ ১১%), পুরুলিয়া (৭.৮% মুসলিম, শুনানির হার ১২%)। আমরা যদি মুসলিম প্রধান কিছু বুথের দিকে তাকাই তাহলে সংখ্যা তত্ত্বটা আরো সহজে বোধগম্য হবে। মালদার হরিশ্চন্দ্রপুর বিধানসভায় পোলিং স্টেশন ৫২, নোটিশ ৫৪০ জন, পিএস ৫৩, নোটিশ ৫৩০, পিএস ৬৩, নোটিশ ৫০৩। আবার হুগলি যেখানে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ট কিন্তু মুসলিমরাও আছেন, সেখানে পঞ্চায়েত ভিত্তিক ছবিটাও একই প্যাটার্নের। মুসলিম প্রধান নবাবপুর, ভগবতীপুর পঞ্চায়েত নোটিশের সংখ্যা যথাক্রমে ৫০০০ ও ৪০০০ কিন্তু হিন্দু প্রধান কৃষ্ণরামপুরে নোটিশের সংখ্যা ১০০০ মাত্র। একথা আর লুকানো যাচ্ছে না যে এই যৌক্তিক অসঙ্গতির গল্পের একটা সাম্প্রদায়িক সূত্র রয়েছে।
এই এসআইআর প্রক্রিয়া সমস্ত দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও এর কাঠামো কিন্তু এক নয়। রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের জন্য এই কাঠামোর নিয়ত পরিবর্তনশীল। বাংলার ক্ষেত্রে প্রথম খসড়া তালিকায় এক কোটি রোহিঙ্গার সন্ধান করতে না পেরে পরের ধাপে নির্বাচন কমিশন কৌশল বদলে ফেলে। যৌক্তিক অসঙ্গতিকে নতুন বলার কারণ বিহার এসআইআরে এই বিষয়টি ছিল না। এক্ষেত্রে বানান ভুল, ছয় সন্তানের পিতা, বাবা ও ছেলের বয়সের অসঙ্গতি, এমনকি ২০০২ এ কোন ভোটারের কার্ডে যদি কোন তথ্যগত বিভ্রান্তি পরে কমিশনের নিয়মে সংশোধন হয় তবে সেই মানুষকেও শুনানির চিঠি ধরানো হয়েছে। জানা গেছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা ১.৬৭ কোটি। এদিকে আমরা দেখলাম নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্ররা ক্যামেরার সামনে স্বীকার করেছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি অ্যাপের প্রয়োগগত সমস্যার কারণে এত অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে। আর এই অসঙ্গতির অজুহাতে কাদের নিশানা করা হচ্ছে সেটাও স্পষ্ট। সাংবাদিক অপর্ণা ভট্টাচার্য ‘দি ওয়ার’ পোর্টালে একের পর এক প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছেন এই রাজ্যে সবচেয়ে বেশি শুনানির চিঠি গেছে সংখ্যালঘু প্রধান জেলাগুলোতে, এমনকি সবচেয়ে বেশি সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে মুসলমানদের নাম। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া কিভাবে নির্বাচন কমিশন চালিয়েছে তা প্রকাশ করে দিয়েছে রিপোটার্স কালেকটিভ (আয়ুশি করের প্রতিবেদন): “In west bengal, the ECI did not run the SIR in a vacuum. Rather, they issued orders one after another that twisted the process to such an extent that even those who were running the process could not keep it straight. None of these intermittent orders were made public. While some changes to the SIR were communicated in writing to local officers, most of the important instruc tions reached the staff through informal chan-nels.”। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ভিডিও কনফারেন্স, মৌখিক ফতোয়ার এক জগত যা বিএলওদের জন্য এক সন্ত্রাসের রাজত্ব বয়ে এনেছিল। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর ৬০ লক্ষ নাগরিককে বিচারাধীন রাখা এক চক্রান্তের অংশ। স্বাভাবিক ভাবেই কেউ জানে না এদের ভবিষ্যত কি!
এসআইআর প্রকল্পের পরতে পরতে রয়েছে ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য। জার্মানিতে ইহুদি নিধন যজ্ঞ শুরু করার আগে ক্রমাগত মিথ্যা প্রচার করে ইহুদিদের বিরুদ্ধে এক ঘৃণার পাঠক্রম তৈরি করা হয়েছিল। এদেশেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে একই ভাবে ঘৃণা ও সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করা হয়েছে। অনুপ্রবেশের জুজু দেখিয়ে এসআইআরের পক্ষে বৈধতা তৈরি করা হচ্ছে। ফ্যাসিবাদ জনগণকে শেখায় রাষ্ট্রের স্বার্থে জনগন বলিপ্রদত্ত। নোটবন্দী যেমন মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়েছিল, এই এসআইআর তেমনি এক তথাকথিত অনুপ্রবেশ মুক্ত শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখিয়ে জনগণের উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে এনেছে। ফ্যাসিবাদের আরেকটি চরিত্র লক্ষণ হল মতপ্রকাশের অধিকারকে, প্রশ্ন করার অধিকারকে রুদ্ধ করা। এসআইআর শুরু করার আগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সহ সমস্ত কমিশনারদের এমনভাবে রক্ষাকবচ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা যাবতীয় প্রশ্ন ও আইন থেকে রক্ষা পান। এই রক্ষাকবচ থেকে সর্বোচ্চ আদালত বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছে যে কমিশনাররা কি আইনের সীমানার বাইরে! ফ্যাসিবাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ সহ সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান শাসকের সুরে কথা বলে। এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক মামলায় বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ থাকলেও আদালত কিন্তু এসআইআরের সাংবিধানিক বৈধতা সংক্রান্ত মামলাটিতে কোন নির্ণায়ক রায় দেয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিচারবিভাগীয় সিদ্ধান্তের যে ধারা লক্ষ্য করা গেছে, তাতে এই বিলম্ব বা পর্যবেক্ষণ সচেতন মহলের নজর কেড়েছে। আশার কথা হলো, এসআইআরের ধারাবাহিক আগ্রাসন ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গে এক অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শিবির বিভাজন স্পষ্ট। একদিকে একমাত্র বিজেপি, যারা এই এসআইআরকে তাদের মেরুকরণের রাজনীতির অন্যতম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। অন্যদিকে রয়েছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন পূর্বতন বামফ্রন্ট, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস, এসইউসিআই, আইএসএফ এবং সিপিআই(এমএল) লিবারেশন। সংসদীয় বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সবাই এসআইআরের প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধিতা রেখেছে, যদিও প্রতিবাদের ভরকেন্দ্রে রয়েছে ষাট লক্ষ বিচারাধীন ভোটার। এই দলগুলো বহুল ব্যবহৃত ধরনা-রাজনীতিকে আশ্রয় করেছে। শুধু পার্থক্যকারী জায়গাটা হলো সিপিআই(এম) বিচারাধীন ভোটারদের দুর্ভোগের জন্য রাজ্য সরকারের প্রশাসন ও তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজেপি-নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে একাসনে বসিয়েছে। এই চালচিত্রে একটি দাবি জনপ্রিয় হয়েছে তা হলো, ষাট লক্ষ মানুষকে বিচারাধীন রেখে নির্বাচনের ঘোষণা করা যাবে না। এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নাগরিক প্রতিবাদের পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজ্যস্তরে বিচারাধীন নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষার জন্য একাধিক ফোরাম তৈরি হচ্ছে। এনআরসি-বিরোধী আন্দোলনের সময়ের মতো পার্ক সার্কাসে অবস্থান চলছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কলকাতা সফরে নানান ধরনের প্রতিবাদ দেখা গেছে, যা কল্লোলিনীর মেজাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই প্রতিবাদ আশু ফল না দিতে পারলেও সর্বোচ্চ আদালত সম্প্রতি যে ট্রাইবুনালের প্রস্তাব করেছে, তা ভবিষ্যতের লড়াইয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হল এই ফ্যাসিবাদী প্রকল্প ভারতীয় জনগণের জন্য কি বিপর্যয় ডেকে আনছে তা অনুভব করতে ব্যর্থ হয়েছে সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। কোনরকম সংবিধান সংশোধন ছাড়া, কোন দেশব্যাপী বিতর্ক ছাড়াই একতরফা ভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে শাসক দলের অঙ্গুলি হেলনে ধ্বংস করে দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। আলোচনার শুরুতেই আমরা উল্লেখ করেছি যে সংসদীয় বিরোধী দলগুলো এসআইআরের প্রায়োগিক সমস্যাগুলোর বিরোধ করে এবং কিছু রিলিফ আদায় করে খুশি থাকছে। এরা ভুলে যাচ্ছে এই অবস্থানের কারণে একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে তারা বৈধতা দিচ্ছে এবং গণ হারে ভোটদানের অধিকার বহিষ্কার করার কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠছে। দাবিটা হওয়া উচিত ছিল এসআইআর প্রক্রিয়াকে বর্জন করার, এই অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে বাদ পড়া সমস্ত নামকে ভোটার তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্তি। বলা উচিত ছিল ভোটার তালিকাকে সংশোধন করার কাজের সঙ্গে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজ যুক্ত করা আইন বিরুদ্ধ, দাবি করতে হত আজ পর্যন্ত যত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোকে জনতার সামনে প্রকাশ করার এবং ভোটার তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট বছরকে মান্যতা দেওয়া যাবে না। সৌভাগ্যের বিষয় হল মুষ্টিমেয় অধিকার সংগঠন তথা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষ একথাগুলো বলেছেন। তবে সেই কথাগুলো যাতে জনতার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারে তার জন্য চেষ্ট। জারি রাখতে হবে।




