
লেখক: সেখ আনিসুর
সৃষ্টিজগতের মধ্যে মানুষ অন্যান্য সকল সৃষ্টির তুলনায় সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ। তার থেকেও বেশি বৈচিত্র্যময় হলো মানুষের মন। কথায় আছে, মানুষ যদি তার অবচেতন মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে সে নিজের জীবনকেও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। চেতন মনে জমতে থাকা চিন্তা, কল্পনা ও অনুভূতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী হলে একসময় তা অবচেতন মনের স্তরে পৌঁছে যায়। এসব চিন্তা যদি ইতিবাচক ও সহায়ক হয়, তাহলে মানুষ তার সুফল ভোগ করে এবং জীবনের পথকে অনেক সহজ করে তুলতে পারে। কিন্তু চেতন মনে জমতে থাকা চিন্তাভাবনা যদি নেতিবাচক হয় কিংবা একটি সুস্থ জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে ওঠে, তাহলে তা একসময় মানুষের জন্য বড় ধরনের মানসিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
জীবন নির্বাহ এবং জীবনের যাত্রাপথকে মসৃণ করার স্বার্থে মানুষের মনের স্বাভাবিক প্রবণতা মূলত ক্ষুধা ও যৌনতাড়নার দিকে অগ্রসর হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ যদি এই দুই প্রবণতাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে তাকে অনেক সময় ভুল পথে পা বাড়াতে হয়। মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলোর চাহিদার তত্ত্ব অনুযায়ী খাদ্য ও যৌনতা মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। এসব চাহিদা পূরণ না হলে বা ভুলভাবে পূরণ করা হলে তা মানুষের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পেটের চাহিদা (শাহওয়াতুল বাতন) এবং যৌন কামনা (শাহওয়াতুল ফারজ) স্বাভাবিক বিষয় হলেও, বর্তমান বিশ্বে এই দুই চাহিদাকে পূরণ করার জন্য যে সমস্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, তা আপাতদৃষ্টিতে আনন্দদায়ক হলেও ব্যক্তি ও সামাজিক অবকাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যৌন কামনা পূরণের বৈধ ও সুন্দর পন্থা হিসেবে বিবাহের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু মানুষ সেই ব্যবস্থাকে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে না পারার ফলে সমাজে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে যৌনতা-সংক্রান্ত অপরাধ ও অনৈতিকতা।
মানুষের দ্বারা সংঘটিত পাপাচারকে বিশ্লেষণের সুবিধার্থে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি–মুনকার এবং ফাহিশাহ। সাধারণ নিন্দনীয় ও অন্যায় কাজগুলোকে আমরা মুনকারের অন্তর্ভুক্ত করব এবং যৌন অশ্লীলতা ও অবৈধ যৌনাচারসংক্রান্ত কাজগুলোকে ফাহিশাহ হিসেবে বিবেচনা করব। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, মানুষ কেন তার এই স্বাভাবিক চাহিদাগুলোকে অস্বাভাবিক উপায়ে পূরণ করতে চায়?
নীল-নকশা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর বুকে পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার উত্থান ঘটে। এরপর পশ্চিমা সমাজে এমন এক নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে, যাদের জীবনদর্শন, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ পূর্ববর্তী প্রজন্মের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক ছিল। এই সাংস্কৃতিক ব্যবধানের অন্যতম প্রকাশ ঘটে ১৯৬০-এর দশকের যৌন বিপ্লব বা সেক্সুয়াল রেভল্যুশনের মাধ্যমে।
তবে এই পরিবর্তনের বীজ বোনা হয়েছিল আরও আগে। ১৯০০ সালে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘The Interpretation of Dreams’ এবং ১৯০৫ সালে প্রকাশিত ‘Three Essays on the Theory of Sexuality’ পশ্চিমা মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। একই সময়ে কার্ল মার্কসের ‘Communist Manifesto’ ও ‘Das Kapital’ পশ্চিমা সমাজে নতুন ধরনের চিন্তার জন্ম দেয় এবং প্রচলিত মূল্যবোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
জার্মান মনোসমীক্ষক ভিলহেম রাইখ যৌন বিপ্লবের ধারণাকে তাত্ত্বিক রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে ফ্রয়েডের তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের চিন্তাজগতে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছিলেন আলফ্রেড কিনসি। তার দুটি বই–‘Sexual Behavior in the Human Male’ এবং ‘Sexual Behavior in the Human Female’–পশ্চিমা বিশ্বের বিশেষত শিক্ষিত শ্রেণির যৌনতা-সংক্রান্ত চিন্তাভাবনায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তার কিছু মতামত ও গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত পরবর্তীকালে ব্যাপক বিতর্কেরও জন্ম দেয়। এসব ধারণাকে সামনে রেখে পশ্চিমা বিশ্বে নারী স্বাধীনতা, সমকামিতা, উভকামিতা, পর্ণোগ্রাফি, অবাধ যৌনাচারসহ নানা ধরনের মতাদর্শ নতুনভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে। যা মানুষের যৌন নিবারনের স্বাভাবিক পন্থা বিবাহকে চ্যালেঞ্জ করে। এবং যৌন অনৈতিকতাকে সহজ করার মধ্য দিয়ে বিবাহকে কঠিন করে তোলে। পরিফলে নৈতিক সত্তা (রূহ) সম্বলিত মানুষ ধীরে ধীরে মানসিক বিকারগ্রস্ত এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে।
বর্তমান যুব সমাজের যৌনতা সংক্রান্ত তিনটি বড় সমস্যা
১) পর্ণোগ্রাফি: মানুষের জীবনে এমন কিছু অনৈতিক অভ্যাস রয়েছে, যা প্রথমে ক্ষণিকের আনন্দের উৎস বলে মনে হলেও ধীরে ধীরে তা ব্যক্তিত্ব, চিন্তা, সম্পর্ক এবং আত্মিক জগতকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়। পর্নোগ্রাফি তেমনই একটি নীরব ব্যাধি। এটি কেবল ব্যক্তির যৌন আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয় বরং মানুষের মনোজগৎ, সামাজিক সম্পর্ক এবং নৈতিক বোধের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। পর্নোগ্রাফির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষের মস্তিষ্ককে ক্রমাগত উত্তেজনার প্রতি নির্ভরশীল করে তোলে, ফলে বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক আনন্দগুলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। মনোযোগ কমে, পড়াশোনা ও কর্মজীবনে অনীহা সৃষ্টি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি অপরাধবোধ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়। একই সঙ্গে মানুষ বাস্তব সম্পর্কের সৌন্দর্য ও গভীরতাকে হারিয়ে ফেলে। ভালোবাসা, দাম্পত্য কিংবা মানবিক সম্পর্ককে সে অবচেতনভাবে ভোগের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে আন্তরিকতা, বিশ্বাস ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পর্নোগ্রাফির আরেকটি বড় ক্ষতি হলো এটি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। মানুষ অনেক সময় বুঝতে পারে যে এই অভ্যাস তার সময়, মনোযোগ ও ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করছে, তবুও সে এর বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। একসময় তার আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং নিজের ওপর আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে। সামাজিক ও পেশাগত জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি ঘটে, উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং জীবনের মূল্যবান সময় অনর্থক ব্যয় হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে পর্নোগ্রাফির ক্ষতি আরও গভীর। কারণ ইসলাম মানুষকে কেবল বাহ্যিক আচরণে নয়, অন্তরের পবিত্রতায়ও উন্নত হতে শিক্ষা দেয়। পর্নোগ্রাফি মানুষের দৃষ্টিকে কলুষিত করে, অন্তরে অশ্লীল চিন্তার জন্ম দেয় এবং ধীরে ধীরে ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণ থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। এ কারণেই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, “মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।” (সূরা আন-নূর: ৩০)।
২) হস্তমৈথুন: পর্নোগ্রাফি ও হস্তমৈথুন–দুটি বিষয়ই প্রায়শই পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অনেক ক্ষেত্রেই একটিকে অন্যটি থেকে আলাদা করে দেখা কঠিন। পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত কিন্তু হস্তমৈথুনে জড়ায়নি–এমন উদাহরণ খুবই বিরল। ইসলাম এই ধরনের আচরণকে ফাহিশা বা অশ্লীলতার অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচনা করেছে এবং হস্তমৈথুনের প্রতিও নিরুৎসাহিত করেছে। পীর জুলফিকার আহমেদ নকশবন্দী (রহ.) বলেন, “এই পাপের শারীরিক ক্ষতি অনেক বেশি। কিন্তু যেহেতু বান্দা নিজের হাতেই নিজের ক্ষতি করেছে, নিজেই নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে, তাই আন্তরিক তওবা, ইস্তিগফার, লজ্জা ও অনুতাপের মাধ্যমে এই গোনাহ খুব দ্রুতই আল্লাহ মাফ করে দেন।”
৩) সমকামিতা: যৌন অনৈতিকতা-সংক্রান্ত অপরাধসমূহের মধ্যে সমকামিতা অন্যতম, এমনকি সর্ববৃহৎ বললেও ভুল হবে না। মানুষের স্বাভাবিক জীবনাচরণের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সমলিঙ্গের প্রতি যৌন তৃপ্তি হাসিল করাকেই মূলত সমকামিতা বলা হয়। হজরত লুত (আ.)-এর যুগ থেকেই এই পাপের উৎপত্তি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই পাপগ্রস্ত জাতিকে সমকামিতার অপরাধে ধ্বংস করেছেন, তাদের ঘরবাড়ি উল্টে দিয়েছেন, তাদের ওপর পাথরবৃষ্টি বর্ষণ করেছেন, তাদের মাটিতে ধসিয়ে দিয়েছেন এবং অপদস্ত ও লাঞ্ছিত করেছেন।
সমকামিতার ফলে মানুষের চিন্তাভাবনায় দ্রুত পরিবর্তন আসে এবং তা বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে তার মধ্যে নারীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয়, সে স্নায়বিক দুর্বলতায় ভুগতে থাকে, স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা তাকে গ্রাস করতে শুরু করে এবং সে জৈবিক প্রশান্তি থেকে বঞ্চিত হয়। তার মধ্যে এক ধরনের ওষুধহীন অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।
উপরোক্ত এই তিন প্রকার অনৈতিক প্রবণতা আমাদের যুবসমাজের মধ্যে অত্যন্ত প্রবলভাবে বিদ্যমান। এই ধরনের কাজে সম্পৃক্ত মানুষদের মোটামুটি কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়–
১) যারা এ ধরনের কাজে কোনো দিনই জড়িত হয়নি। ২) যারা একসময় এই অশ্লীল কাজে জড়িত ছিল, কিন্তু বর্তমানে তা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ৩) যারা এখনো এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে, তবে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই অশ্লীলতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। ৪) যারা এ ধরনের কাজে জড়িত রয়েছে এবং তা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে হাল ছেড়ে দিয়েছে; বরং এই অনৈতিক কর্মকেই জীবনের মূল স্রোতে স্থান দিয়ে, নৈতিকতার তকমা লাগিয়ে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করতে শুরু করেছে।
প্রথম শ্রেণিতে যারা অবস্থান করছেন, তাদের সমাজের অন্যতম নৈতিক চালিকাশক্তি বলা যেতে পারে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অবস্থানকারীদেরও সেই কাতারে রাখা যায়–কারণ তারা একসময় বিচ্যুত হলেও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সঠিক পথে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণিতে যারা অবস্থান করছেন, তারা এমন এক ধরনের চিন্তাধারায় আচ্ছন্ন, যা সমাজের নৈতিক ভিত্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। এই ধরনের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো না গেলে সমাজের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা।
তবে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ ও সহানুভূতির দাবিদার তৃতীয় শ্রেণির মানুষগুলো। তারা এখনো এই মানসিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তাদের উত্তরণের জন্য সমাজের নৈতিক সংগঠন, পরিবার এবং সচেতন মানুষের এগিয়ে আসা উচিত। তাদেরকে এই সংকট থেকে বের করে আনতে সব ধরনের মানসিক, নৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতা প্রদান করা প্রয়োজন।
অশ্লীল কাজে যুক্ত হওয়ার কারণ এবং এখান থেকে উত্তরণের উপায়
১) একাকীত্ব: বর্তমান বিশ্বের বহুল প্রচলিত ভার্চুয়াল জগৎ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে এমনভাবে সংযুক্ত করে রেখেছে যে অনেক সময় মনে হয়, মানুষের পর আর কেউ নেই–সবাই যেন আপন। একটি মাত্র বার্তার মাধ্যমে একজন মানুষ আলীগড় কিংবা দিল্লির কোনো ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু বাস্তব জীবনের প্রয়োজনে সেই বন্ধু কিংবা ভার্চুয়াল জগতের নাগরিকদের সে তার পাশে পায় না। তার চিন্তা, অনুভূতি ও সহানুভূতির যথার্থ মূল্যায়ন ডিজিটাল জগতে সবসময় সম্ভব হয় না।
মানুষ তার আবেগ, আনন্দ, বেদনা ও অনুভূতিগুলোকে কোনো দিনই সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে না। এর ফলে সে ধীরে ধীরে আবেগগতভাবে বিচ্ছিন্ন (Emotionally Disconnected) হয়ে পড়তে শুরু করে। অন্যদিকে, ডিজিটাল জগতে সে নিজেকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে (Intellectually) অনেক বেশি সংযুক্ত অনুভব করে। কিন্তু মানুষ কেবল বুদ্ধিভিত্তিক সত্তা নয়, তার আবেগ, অনুভূতি ও আত্মিক চাহিদাও রয়েছে। তাই একসময় সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং তার জীবন একাকীত্বে ভরে ওঠে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সোহবত ও সৎসঙ্গের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমানে সোহবত ও সৎসঙ্গও অনেকাংশে ডিজিটালাইজড হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসাও জরুরি। প্রত্যেক মানুষের একজন আধ্যাত্মিক শিক্ষক বা মুরব্বি থাকা প্রয়োজন, যার কাছে অন্তত মাসে একবার হলেও গিয়ে সে আত্মিক অনুশীলনের সুযোগ পেতে পারে। এর মাধ্যমে তার রুহানি সত্তা ও আবেগিক কার্যক্রম স্থিতিশীলতা লাভ করতে পারে।
সোহবতের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনে বলেন–“তুমি নিজেকে তাদের সঙ্গেই আবদ্ধ রাখো, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের রবকে আহ্বান করে তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। আর পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তুমি তোমার দৃষ্টি তাদের থেকে ফিরিয়ে নিও না। আর তুমি এমন ব্যক্তির অনুসরণ করো না, যার হৃদয়কে আমি আমার স্মরণ থেকে গাফিল করে দিয়েছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কাজকর্ম সীমালঙ্ঘনমূলক।”
২) অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি: কোনো মানুষ যদি নিজেকে বিপথের দিকে পরিচালিত করতে চায়, তবে তার জন্য চোখকে যথেচ্ছ উন্মুক্ত করে ফেলাই যথেষ্ট। চোখকে একদিক থেকে বলা যেতে পারে শয়তানের দরজা। বর্তমান পৃথিবীতে অশ্লীলতার বিস্তার এবং এর অবাধ বিচরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মানুষের বাস্তব জীবনের প্রায় প্রতিটি স্তরেই তাকে কোনো না কোনোভাবে এর সম্মুখীন হতে হয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি, রাস্তাঘাট, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন কিংবা কোলের ওপর রাখা ল্যাপটপ–সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে মানুষের চোখকে আকর্ষণ করে নিতে সক্ষম।
আসলে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম একটি এজেন্ডাই হলো মানুষকে আকর্ষণ করা। আকর্ষণের বিষয়বস্তু নৈতিক হবে নাকি অনৈতিক, সেটি বড় বিষয় নয়। মুখ্য বিষয় হলো মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নেওয়া। আর যেহেতু যৌন আকাঙ্ক্ষা মানুষের একটি সহজাত ও জাগ্রত চাহিদা, তাই মানুষ খুব সহজেই এ ধরনের বিষয়বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
গ্লোবালাইজেশন-পরবর্তী সময়ে টেলিভিশন ও ইন্টারনেট সুবিধা মানুষের বুকপকেটে থাকা মোবাইল ফোন পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বের নানা অশ্লীল কনসেপ্টকে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। অহরহ প্রচারিত পর্নোগ্রাফি, সেমি-পর্নোগ্রাফি, পর্নোগ্রাফিমূলক বিজ্ঞাপন, হায়াহীন পোশাক-আশাক এবং সবসময় ট্রেন্ডিংয়ে থাকার প্রবণতা মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বিগ্ন ও স্নায়বিক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। আর এই সংকটের সূচনা ঘটে মূলত চোখের মাধ্যমে।
তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পুরুষদের দৃষ্টিকে সংযত রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন–“মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।” (সূরা আন-নূর, আয়াত : ৩০)
৩) মানসিক চাপ: মানসিক চাপ মানুষের স্বাভাবিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই মানসিক চাপকে আপাতদৃষ্টিতে কোনো রোগ বা অস্বাভাবিক অবস্থা বলা যায় না। কারও ক্ষেত্রে এই চাপ দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে, আবার ব্যক্তিভেদে স্বল্প সময়ের জন্যও থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে।
মানসিক চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে মানুষ অনেক সময় ডোপামিননির্ভর আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যৌন চাহিদা পূরণের মাধ্যমে ডোপামিন তুলনামূলকভাবে সহজে নিঃসৃত হয়, যার ফলে মানসিক চাপ সম্পূর্ণভাবে দূর না হলেও সাময়িকভাবে কিছুটা কমে গেছে বলে মনে হতে পারে। এ কারণে মানুষের অস্বাভাবিক যৌন জীবনের পেছনে মানসিক চাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের জন্য যে মৌলিক ইবাদতসমূহ নির্ধারণ করেছেন, সেগুলোর মধ্য দিয়েই মানসিক চাপ, ক্লান্তি এবং অন্তর্দহন অনেকাংশে দূর হতে পারে। বিশেষ করে যিকির, আজকার, দোয়া এবং সর্বোপরি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা মানুষের মানসিক প্রশান্তি অর্জন ও চাপ নিরসনের জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
পরিশেষে
কখনো কখনো যৌন অনৈতিকতার আসক্তিতে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজ প্রচেষ্টায় এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস একেবারে শেষ হয়ে গেলে মানুষ অসহায়ের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করে। ঠিক এই সময়ে সমাজের চিন্তাশীল ও দায়িত্বশীল মানুষদের উচিত এ ধরনের ব্যক্তিদের মানসিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা।
যারা এই ধরনের ফাহিশা ও অনৈতিক কাজ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তাদেরকে সাহায্য করা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম একটি মাধ্যম হতে পারে। কারণ, একজন মানুষকে গোনাহ থেকে ফিরে আসার পথে সহায়তা করা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ কাজ।
যারা এই ধরনের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন এবং পেশাদার বা পরামর্শমূলক সহায়তা নিতে চান, তাদের জন্য সর্বভারতীয় ও পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক দুটি হেল্প সেন্টারের সন্ধান দেওয়া যেতে পারে-
১. রেহমা কেয়ার (Rehma Care) – Students Islamic Organisation of India কর্তৃক পরিচালিত। যোগাযোগ: +91 95688 77662
২. প্রেরণা কেয়ার (Prerana Care) – Students Islamic Organisation of India West Bengal zone কর্তৃক পরিচালিত। যোগাযোগ: +91 94327 18439
আল্লাহ আমাদের সকলকে এ ধরনের অনৈতিকতা ও আসক্তি থেকে মুক্ত থাকার তাওফিক দান ক
রুন, যারা মুক্তির জন্য সংগ্রাম করছেন তাদেরকে সহজ পথ দেখিয়ে দিন এবং আমাদের সবাইকে আন্তরিক তওবা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
This article draws inspiration from the lecture titled “Sexual Morality and Psychological Wellbeing: Challenge and Hope” by the renowned scholar Shadab Masum.






Audience অনুযায়ী লেখাটি অত্যন্ত সুন্দর ও প্রাসঙ্গিক হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, উপস্থাপনাটি পাঠকের চাহিদা ও প্রত্যাশার সঙ্গে খুব ভালোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।