
লেখক: খুররম মুরাদ
রিভিউয়ে যাওয়ার আগে, যারা ‘সতলুজ'(পূর্বের নাম ‘পাঞ্জাব ’৯৫’) ছবিটির সেন্সর-সংক্রান্ত ইতিহাস জানেন না, তাদের জন্য কিছু প্রেক্ষাপট রাখা জরুরি। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ছবিটি দেশের সেন্সর বোর্ড (CBFC)-এর সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কারণ, ছবিটি পাঞ্জাবের সশস্ত্র আন্দোলনের সময় পাঞ্জাব পুলিশের হাতে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই অন্ধকার অধ্যায় তুলে ধরার কারণে সেন্সর বোর্ড প্রায় ১২০টি ক্লিপ বাতিলের দাবি তোলে। নির্মাতারা ছবিটি ভারতের বাইরে রিলিজ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেটিও আটকে দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (TIFF) প্রিমিয়ারের উদ্যোগও কূটনৈতিক চাপের মুখে ব্যর্থ হয়। বহু প্রতিকূলতার পর অবশেষে ছবিটি ZEE5-এ সরাসরি মুক্তি পায়। কিন্তু ৫ জুলাই ছবিটি দেখা শেষ করার পরই জানতে পারি, কর্তৃপক্ষ ZEE5-কে ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
‘সতলুজ’ দেখা শেষ হলে দর্শকের মধ্যে এক ধরনের স্তব্ধতা নেমে আসে। কারণ, পর্দায় যা দেখা হলো, তা নিছক কল্পনা নয়–বাস্তব ইতিহাসের নির্মম প্রতিফলন। ছবিটি শুরু থেকেই আবেগের তীব্রতা দর্শককে আচ্ছন্ন করে না; বরং একটি অনুসন্ধানী দলিলের মতো ধীরে ধীরে ঘটনাগুলো উন্মোচিত হয়। কিন্তু শেষের দিকে পরিচালক হানি ত্রেহান সেই দলিলকে এমন দক্ষতায় সিনেমার ভাষায় রূপান্তর করেন যে, সেই অভিঘাত মানসপটে গভীরভাবে আঘাত হানে।
এ ধরনের সত্য ঘটনা ভিত্তিক ছবিতে সাধারণত পুরো কাহিনী কেন্দ্রীয় চরিত্রের চোখ দিয়ে বলা হয়। কিন্তু পাঞ্জাব ’৯৫ সেই প্রচলিত রীতিকে ভেঙে দিয়েছে। আর এই সৃজনশীল সিদ্ধান্তই ছবিটিকে অসাধারণভাবে আকর্ষণীয় ও গভীর করে তুলেছে।
এটি একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র। আপনি যদি জসবন্ত সিং খালরার নাম আগে না শুনে থাকেন, তাহলে ছবির মূল কাহিনিও আপনার কাছে রং চড়ানো মনে হতে পারে। পাঞ্জাবের সশস্ত্র সংঘাতের সময় অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছিল। এক সময় জসবন্ত সিং তাঁর এক প্রয়াত বন্ধুর মায়ের খোঁজ নিতে থানায় যান। সেখানে পুলিশের আচরণ তাঁর মনে সন্দেহের জন্ম দেয়। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে তিনি নিজেই অনুসন্ধান শুরু করেন এবং আবিষ্কার করেন যে, তাঁর চারপাশে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে গণহত্যার মতো এক ভয়াবহ অপরাধযজ্ঞ চলছে।
ছবির দ্বিতীয়ার্ধে দিলজিৎ দোসাঞ্জের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু তিনি যখনই পর্দায় ফিরে আসেন, বিশেষ করে কুলজিৎ চরিত্রের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের দৃশ্যে, তখন তিনি সম্ভবত নিজের ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয়টি উপহার দেন।
সিনিয়র সুপারইন্টেন্ডেট অফ পুলিশ, সুগ্গা চরিত্রে সুভিন্দর ভিকি নির্মম পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকায় অসাধারণ বিশ্বাসযোগ্য। জসবন্ত সিংয়ের স্ত্রী চরিত্রে গীতিকা বিদ্যা ওহলিয়ান সীমিত উপস্থিতিতেই গভীর ছাপ ফেলেছেন। সিবিআই কর্মকর্তা সমুদ্র সিংয়ের ভূমিকায় অর্জুন রামপাল দর্শকের প্রতিনিধি হিসেবে গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যান অত্যন্ত সংযত অভিনয়ের মাধ্যমে। ডিজিপি বিট্টা চরিত্রে কানওয়ালজিৎ সিং অপরাধবোধহীন ক্ষমতার মনস্তত্ত্বকে সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সৌরভ সচদেবা সেই সময়ের অসহায় পুলিশ সদস্যদের অন্তর্দ্বন্দ্বকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরেছেন। আর কুলজিত চরিত্রে জগজিৎ সান্ধু এমন একটি দৃশ্যের অংশ, যা ভবিষ্যতে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে; তাঁর অভিনয়ে চরিত্রটির নৈতিক সংকট অত্যন্ত বাস্তব হয়ে ওঠে।
চিত্রনাট্যে সংলাপের প্রাধান্য কিছুটা বেশি। জসবন্ত সিং কেন এই অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন–তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কিছু দৃশ্যে সংলাপ অতিরিক্ত বর্ণনামূলক হয়ে ওঠে। তবে প্রশংসার বিষয় হলো, পরিচালক হানি ত্রেহান এসব মুহূর্তে আবেগকে জোর করে চাপিয়ে দিতে ভারী আবহসংগীত ব্যবহার করেননি। দিলজিৎের সেরা অভিনয়ের যে দৃশ্যটির কথা আগেই বলেছি, সেটিও কোনো নাটকীয় সংগীতের সহায়তা ছাড়াই নির্মিত। পরিচালক অভিনয়ের শক্তির ওপর আস্থা রেখেছেন, আর সম্পাদক শ্রীকরও ন্যূনতম কাট ব্যবহার করে সেই শক্তিকে অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।
চিত্রগ্রাহক কে. ইউ. মোহনন ছবির আবেগঘন ও অস্বস্তিকর মুহূর্তগুলোতে কালো রং ও ছায়ার ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। ক্যামেরার স্থিরতা দর্শককে বাস্তবতার ভার অনুভব করার সুযোগ দেয়। চিত্রনাট্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো, এটি কেবল অপরাধ দেখায় না; বরং ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে কীভাবে কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ধীরে ধীরে এই নির্মমতার অংশ হয়ে উঠেছিলেন। সুগ্গা ও সিবিআই কর্মকর্তা সমুদ্র সিংয়ের প্রথম মুখোমুখি কথোপকথনে ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৫-এর রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে যে বিতর্ক উঠে আসে, তা স্পষ্ট করে যে রাষ্ট্র কখনো কখনো বিচারবহির্ভূত সহিংসতাকে নীরবে উৎসাহিত করে কিংবা বৈধতা দিয়েছে।
ছবিটির প্রোডাকশন ডিজাইন অত্যন্ত পরিমিত ও বাস্তবসম্মত। আবহসংগীতের সংযত ব্যবহার দর্শকের মনোযোগকে সংলাপ ও নীরবতার দিকে কেন্দ্রীভূত রাখে–যেখানে ছবির প্রকৃত শক্তি নিহিত।
‘সতলুজ’ বা “পাঞ্জাব ’৯৫’ এমন কোনো চলচ্চিত্র নয়, যা শুধু “সত্য ঘটনা অবলম্বনে” নির্মিত–এই আবেগকে বিক্রির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। বরং নির্মাতারা শিল্পমান বজায় রেখে সেই ইতিহাসের ভয়াবহতা দর্শকের অনুভূতিতে পৌঁছে দিতে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হয়েছেন। ইতিহাসের এমন এক অন্ধকার অধ্যায়, যা কখনো প্রাপ্য মনোযোগ পায়নি, তা আপনাকে শীতল আতঙ্কে আচ্ছন্ন করবে।
যদিও ছবির ঘটনাপ্রবাহ এক ভিন্ন রাজনৈতিক সময়কে কেন্দ্র করে, তবুও এটি যে প্রশ্নগুলো তোলে, সেগুলো আজকের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকেও অস্বস্তিতে ফেলে। এই চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ পাওয়া যেন সেই কৃত্রিম বাস্তবতার জগৎ–The Truman Show-এর–বাইরে বেরিয়ে আসার এক বিরল সুযোগ। তাই কেন দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে জয়লাভের পরও এই ছবিকে মানুষের চোখের আড়ালে রাখতে চাওয়া হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত আর বিস্ময়কর মনে হয় না।





