
সম্পাদকীয়
ইউরোপের দেশ রোমানিয়ার সিকলির জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় আড়াই শতাংশ। এরা জাতিগতভাবে হাঙ্গেরি। হাঙ্গেরি প্রতিবেশী রোমানিয়ার কাছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে গিয়ে খুইয়ে ফেলে কিছু অংশ। তারাই আজ সিকলিতে বসবাস করে সংখ্যালঘু হিসেবে। এখান থেকে দক্ষিণে নেমে এলেই পাওয়া যাবে ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ সিসিলির, সেটি ইতালির অন্তর্গত। কিংবা, এখান থেকে পশ্চিমে দিকে গেলে পাওয়া যাবে স্পেনের বাস্কদের অঞ্চল, যারা স্পেনের মোট জনসংখ্যার ৪.৬ শতাংশ নিয়ে আলাদা হয়ে যেতে চায়। বাস্কভাষাভাষিদের দাবি স্পেনের অপর একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল কাতালোনিয়ার মতোই, স্বাধীনতা কিংবা বেশি শাসনক্ষমতা, যেগুলি ক্রমশ সহিংস হয়ে উঠছে। সারা ইউরোপ জুড়েই এমন বহু উদাহরণ। উদাহরণ হিসেবে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু বিতাড়নের কাহিনিও। মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের বাংলা ভাষাভাষি মানুষরা একদিন ভোরে উঠে জানতে পারলেন এ দেশ তাদের নয়। এখানে তারা সংখ্যালঘুই নয় শুধু, তারা বহিরাগতও বটে! দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে কয়েক বছর আগে তাদের জীবনযন্ত্রণা জারি রয়েছে রয়েছে চিনের উইঘুর মুসলিমদের ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও। চায়নিজ হানদের এনে এখানে বসতি স্থাপন করা হয় সরকারি মদতে। রাষ্ট্রীয় মদদেই বন্ধ উইঘুরদের রমযানের রোযা, নামায। মসজিদ তৈরির অনুমতি দিতে চায় না কর্তৃপক্ষ।
এমন বহু সংখ্যালঘু এবং তাদের দুর্ভাগ্যের কাহিনি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিশ্বজুড়ে। সবাই মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে জন্মেও ভাষা, ধর্ম, জাতি তাদের আলাদা করে দেয়। আর এই ভিন্নতাই ডেকে আনে অধিকারহীনতার গ্লানি। হোক সে ইসলাম কিংবা খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারী, বিভেদের প্রাচীর এমনই ঘৃণ্য যে, একজন রোমান ক্যাথলিক অনায়াসে অর্থোডক্সকে ছুরি চালিয়ে দেয়, কিংবা শিয়া সুন্নির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, উঁচু জাতের সঙ্গে নিচু জাতের বিয়ে হলে অনার কিলিংয়ের আশ্রয় নিতে হয়। এইসব ক্লাসিফিকেশন একবিংশ শতকের আধুনিক গ্লোবালাইজড বিশ্বেও তাই ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি অপরিহার্য করে তোলে। ভুবনগ্রাম ছোট ছোট রেখায় বিভক্ত হয়ে গিয়ে মানবতার মৌলিক অধিকারের উপর আঘাত হানে।
লোকাল যখন গ্লোবালে পরিণত হতে যাচ্ছে, দেশকালের গণ্ডি ঘুচে যাচ্ছে ইন্টারনেটের বিস্তৃত জালে, তখন ক্ষুদ্র পরিচয়ে বেঁচে থাকা বোধহয় আধুনিকতার পরিপন্থী। এখানে একটি প্রশ্ন আসে, একজন সংখ্যালঘু তাহলে কি তার নিজস্ব সংস্কৃতি বিসর্জন দেবে পপুলার কালচারের পায়ের তলায়? না, বিসর্জনের কোনও প্রয়োজন নেই, সে যদি সত্যিসত্যি তার শিকড়ের খবর রাখে, তার অনুশীলন করে। সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার জন্য দেশে দেশে আইন রয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের ২৯ ও ৩০ নম্বর ধারা এই দেশের সংখ্যালঘুদের অধিকার সুনিশ্চিত করে। সেগুলো বুঝে নেওয়ার জন্য শিক্ষিত হওয়া জরুরি। শুধু হর্ষ মান্দার কিংবা তিস্তা শীতলবাদ লড়াই করে সংখ্যালঘু অধিকার পাইয়ে দেবে, সেটা ভাবা ভুল। অধিকার বুঝে নিতে হয়, এমনিতে কেউ হাতে তুলে দেয় না। তাই এই স্বাধীনতার ৮০ বছরে এসে নিজের সংখ্যালঘু পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হিসেবে বিশ্ব নাগরিকতার কথাও মনে রাখা দরকার। একজন মানুষ তো মুসলিম হয়ে, ফারজানার আব্বু হয়ে, স্কুল-শিক্ষকতা করে, সতীনাথ ঠাকুরের প্রতিবেশী হয়ে, ঈদের দিনে গরুর মাংস খেয়ে, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের গান-কবিতা শুনে, কার্ল মার্কসের পাঠক হয়ে, কিউবা ও ফিলিস্তিনকে সমর্থন জানিয়ে, ট্রাম্পের বিরোধিতা করেও আদর্শ বিশ্ব নাগরিক হতে পারে। এই বিশ্বজনীন বোধ এনে দিতে পারে রক্তপাতহীন এক সাদা রঙের ভুবনগ্রাম।


