
লিখেছেন: গোলাম রাশিদ
১৯১৭। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ১৮ বছর বয়সি কিশোর নজরুল শিয়ারসোল রাজ স্কুল ছেড়ে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিলেন। করাচি সেনানিবাস থেকেই তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন সমিতির সম্পাদক মুজাফফর আহমেদের মাধ্যমে। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ১৯২০-র মার্চ মাসে কলকাতায় পা রাখেন হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। রবীন্দ্রনাথের শহর তখন জানত না আর কয়েক বছরের মধ্যেই এই শহরের ৩/৪ সি তালতলা লেনে জন্ম হতে চলেছে এক ‘বিদ্রোহী’র (প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি, ১৯২২)। ‘খোদার আসন আরশ ছেদিয়া/ উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!’-দীপ্ত ঘোষণা শুনে চমকে উঠেছিল বাঙালি। স্কুলের পড়াশোনা করেননি, লেটোর দলে গান করেছেন, করেছেন মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ ও মক্তবের শিক্ষকতা। তিনি এমন গনগনে আগুনঝরা কথামালা কোথায় পেলেন? সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে জানতে হবে ১৯২০- র মার্চ মাসে কলকাতায় এসে নজরুল কী করছিলেন সে সম্বন্ধে? সোভিয়েতে রুশ বিপ্লব সম্পন্ন, মন্টেগু-চেমসফোর্ড আইন আসছে, জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড, মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন। পটভূমি প্রস্তুত। হাবিলদার কবি নজরুল পরিণত হলেন সাংবাদিকে। এটাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা। কবি-প্রতিভা নিয়েই তিনি নিশ্চয় জন্মেছিলেন। কিন্তু তাতে শান দিয়ে ধারালো করার কাজটি নিঃসন্দেহে করেছিল এই সাংবাদিকতা পেশাটিই। যেদিন ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না’, সেইদিন যিনি শান্ত হবেন, তিনি যদি সাংবাদিক হয়ে ওঠেন, তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে।
মূলধারার সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা করে প্রথম শ্রেণির সাংবাদিক ও কবি হয়ে দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের জন্য জনগণকে সচেতন ও উদ্দীপিত করে তুলছেন, এমন গুণের যুগপৎ সমাবেশ শুধুমাত্র কাজী নজরুলের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ভাবে ঘটেছে। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গানের কথা যেভাবে আলোচিত হয়, তার সাংবাদিক সত্তা নিয়ে সেই আলোচনা হয় না। অথচ তাঁর যে বিদ্রোহী সত্তা, সেটি সাংবাদিক সত্তারই একটি অঙ্গ বলা যেতে পারে। তাঁর কবিতায় বারবার বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছে, পুরনোকে ভেঙে নতুনের আগমনের গান শোনা গিয়েছে, দিনবদলের গল্প ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায়। এই চেতনা নজরুলের সাংবাদিক চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। কাজী নজরুল প্রথম জীবন থেকেই সাংবাদিকতাকে আশ্রয় করে সাহিত্যের জগতে পা রেখেছেন। কলকাতায় এসে ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে থাকতে শুরু করেন। এই সময় মোসলেম ভারত, সওগাত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা ইত্যাদি পত্রিকায় লিখতে থাকেন। কিন্তু নিখাদ সাহিত্য করে জীবন চালানো এখনকার মতো তখনও কষ্টের বিষয় ছিল। এই সময় নজরুল ও মুজাফফর আহমেদ একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের কথা ভাবেন। তাঁদের সঙ্গী হোন শের-ই বাংলা একে ফজলুল হক, যিনি পরবর্তীতে হয়ে উঠবেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী। মূলত তাঁরই উৎসাহ ও আর্থিক সহযোগিতায় ১৯২০ সালের ১২ জুলাই ‘নবযুগ’ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতে শুরু করে। সম্পাদক হিসেবে ফজলুল হকের নাম ছিল। তবে নজরুল এবং মোজাফফর আহমেদ ছিলেন এই পত্রিকার কাণ্ডারী। সান্ধ্য সংবাদপত্রটি নজরুলের লেখার গুণে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তিনি আগে কখনও সাংবাদিকতার কাজ করেননি। খবর বা নিবন্ধ সম্পাদনারও অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু তাঁর ভাষাগত দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। তার লেখার মধ্যে প্রাঞ্জলতা এবং আবেগ ছিল যা খুব সহজেই পাঠককে নাড়া দিত। গ্রামের মসজিদে আযান দিতেন, মক্তবে পড়েছিলেন কুরআন, হাদিস, ইসলামী দর্শন। চাচা কাজী বজলে করিম আরবি, ফারসি, উর্দু জানতেন। চাচার মতো বালক নজরুলও লেটোর দলে যোগ দেন। সেখানে তিনি পরিচিত হন হিন্দু শাস্ত্র-পুরাণ-সংস্কৃতের সঙ্গে। এই দুই ধারার মিশ্রণ যেমন তাঁর মননকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনই ভাষাকে করে তুলেছিল প্রাণশক্তিপূর্ণ, বঝরঝরে, সহজবোধ্য অথচ চমকপ্রদ। নজরুলের কড়া লেখার জন্য বেশ কয়েকবার ‘নবযুগ’ পত্রিকাকে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তবুও তিনি তাঁর জ্বালাময়ী লেখা থামাননি। নজরুলের সংবাদ লেখার গুণের প্রশংসা করেছেন মোজাফফর আহমেদ। পত্রিকায় স্থানাভাবের জন্য নজরুল খুব ছোট করে খবরকে অল্প কথায় পাঠকের বোঝার মতো করে লিখতে পারতেন। তিনি কৃষক-মজুরদের দাবির কথা এখানে লিখতে শুরু করেন। জনপ্রিয় কবিতা বা গানের লাইন তুলে হেডিং করতেন। এমন ধরনের হেডলাইন মানুষকে সহজে আকৃষ্ট করত। কাগজের সম্পাদকীয় নীতিমালা নিয়ে নজরুলের মতবিরোধ হলে তিনি কাজে ইস্তফা দেন এবং ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটি বন্ধ হয়ে যায় মালিকানা বিতর্কের কারণে। ১৯৪০ সালে ফের একে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় নবপর্যায় নবযুগ প্রকাশ হলে সেখানে তিনি প্রধান সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। লিখেছিলেন ‘পাকিস্তান না ফাঁকিস্তান’ এর মতো লেখা। ব্রিটিশ সরকারের জুলুম, এদেশের মানুষের অসচেতনতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নজরুলের অগ্নি কলমসম লেখা নবযুগে প্রকাশিত হয়েছিল। ‘গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ!’, ‘জুতমার্গ’, ‘জাগরণী’, ‘ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ’, ‘লোকমান্য তিলকের মৃত্যুতে বেদনাতুর কলিকাতার দৃশ্য’, ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ প্রভৃতি শিরোনামের লেখাগুলি পাঠ করলে তার আঁচ অনুভব করা যায়। হিন্দু-মুসলিম সৌহার্দ্যের অন্তরায় তুলে ধরতে গিয়ে ‘দ্ভুতমার্গ’ নিবন্ধে তিনি লিখছেন, “তোমরা রাজনীতিক যুক্তি-তর্কের চটক দেখাইয়া লেখাপড়া-শেখা ভণ্ডদের মুগ্ধ করিতে পার, কিন্তু এমন ডাকটি আর ডাকিতে পারিবে না। আমরা বলি কী, সর্বপ্রথম আমাদের মধ্য হইতে এই ছুতমার্গটাকে দূর করো দেখি, দেখিবে তোমার সকল সাধনা একদিন সফলতার পুষ্পে পুষ্পিত হইয়া উঠিবে। হিন্দু মুসলমানকে ছুঁইলে তাঁহাকে স্নান করিতে হইবে, মুসলমান তাঁহার খাবার ভূঁইয়া দিলে তাহা তখনই অপবিত্র হইয়া যাইবে, তাঁহার ঘরের যেখানে মুসলমান গিয়া পা দিবে সে-স্থান গোবর দিয়া (!) পবিত্র করিতে হইবে, তিনি যে আসনে বসিয়া হুঁকা খাইতেছেন মুসলমান সে আসন ছুঁইলে তখনই হুঁকার জলটা ফেলিয়া দিতে হইবে, মনুষ্যত্বের কী বিপুল অবমাননা! হিংসা, দ্বেষ, জাতিগত রেষারেষির কী সাংঘাতিক বীজ রোপণ করিতেছ তোমরা! অথচ মঞ্চে দাঁড়াইয়া বলিতেছ, ‘ভাই মুসলমান এসো, ভাই ভাই এই ঠাঁই, ভেদ নাই ভেদ নাই।’ কী ভীষণ প্রতারণা! মিথ্যার কী বিশ্রী মোহজাল!”
এরপর নজরুল ‘নওরোজ’, ‘সেবক’, ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় স্বল্পকালীন কাজ করেন। কোথাও বেশিদিন স্থায়ী হননি। অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও অন্যায়ের সঙ্গে আপোসহীন নজরুল ১৯২২ সালের আগস্টে নিজ সম্পাদনায় শুরু করেন অর্ধ সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’। এই পত্রিকাটি প্রকাশ শুরু হতেই চারদিকে সাড়া পড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ ধূমকেতুর পথচলার শুরুতে লিখেছিলেন, ‘আয় চলে আয়রে ধূমকেতু আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/… জাগিয়ে দেরে চমক মেরে,/ আছে যারা অর্ধচেতন।’ বিদ্রূপাত্মক কবিতা, সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য নানা নজরুলীয়-নিবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে যা শৃঙ্খলিত ও অত্যাচারিত মানুষকে সংগ্রামের পথ দেখায়। ব্রিটিশদের পদতল থেকে নজরুলই সর্বপ্রথম পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলেন এই পত্রিকার পাতায়। তিনি লেখেন, “…. সর্বপ্রথম, ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।
স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা, ও-কথাটার মানে এক এক মহারথি এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে। তাতে কোনও বিদেশির মোড়লি করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ-দেশে মোড়লি করে দেশকে শ্মশান-ভূমিতে পরিণত করছেন, তাঁদেরে পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা-পুঁটলি বেঁধে সাগর-পারে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না। তাঁদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনও। আমাদেরও এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকুকে দূর করতে হবে।
পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল-কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে।”
স্বভাবতই ব্রিটিশ সরকার তাঁর এই পত্রিকার বিরুদ্ধেও খড়গহস্ত হয়। কবির রচিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি ধূমকেতুতে প্রকাশিত হলে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে (এখন দেশে কথায় কথায় ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দানের প্রবণতা ফিরে এসেছে) তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। বিচারাধীন নজরুল দিয়েছিলেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। বিচারের পর তাঁর এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। নির্ভীক, সাহসী সাংবাদিকতার জন্য এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন সময়ের সেরা প্রোটাগনিস্ট। ধূমকেতু পত্রিকাটি ১৯২৩ সালের মার্চ মাসে বন্ধ হয়ে যায়। ধূমকেতু ধূমকেতুর মতোই আসে, সবাইকে চমকে দিয়ে আবার মিলিয়ে যায়। এই পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা হিসেবে ‘মোহররম সংখ্যা’, ‘আগমনী সংখ্যা’, ‘দেওয়ালী সংখ্যা’, ‘কংগ্রেস সংখ্যা’ ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমানে বাঙালি শারদীয়া প্রকাশ করে, ঈদসংখ্যা হাতে গোণা। যিনি পুজোসংখ্যা করেন, তিনি ঈদ বা মুহাররমের কথা ভুলে যান। আর কোনও সম্পাদক ঈদসংখ্যা প্রকাশ করলে সেখানে আবার অনেকেই সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ খুঁজে পান। সাংবাদিক কাজী নজরুল ১০০ বছর আগেই ‘মোহররম’ ও ‘দেওয়ালী’র আলো দেখিয়েছিলেন বৈকি!
১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে কাজী নজরুলের পরিচালনায় ফের আরেকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। সাপ্তাহিক এই পত্রিকার নাম ছিল ‘লাঙল’। কবি কংগ্রেসের সদস্য হন এই বছর। জাতীয় কংগ্রেসের একটি অংশ হিসেবে মজুর স্বরাজ দল তৈরিতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এই দলেরই মুখপত্র ছিল ‘লাঙল’ পত্রিকাটি। একে বাংলাভাষার প্রথম শ্রেণিসচেতন পত্রিকা বলা হয়। পরে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘গণবাণী’। এই দুই পত্রিকায় প্রকাশিত কবির নিবন্ধ ও কবিতাগুলিতে কৃষক-শ্রমিকের কথা উঠে এসেছে। ১৯২৬-এর এপ্রিলে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এরই প্রেক্ষাপটে কবি গণবাণীতে লেখেন ‘মন্দির ও মসজিদ’, ‘হিন্দু-মুসলমান’। নিবন্ধ দুটি আজকের উগ্র জাতীয়তাবাদ ও রামমন্দির-রাজনীতির ভারতবর্ষে সমান উপযোগী। ‘গণবাণী’র পর ‘সওগাত’ পত্রিকায় নজরুল কিছুদিন কাজ করেন। এরপর সাংবাদিকতা ছেড়ে গান-কবিতার জগতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন। পরবর্তীতে চল্লিশের দশকে নবপর্যায় নবযুগে কাজ করার মাধ্যমে শেষ হয় তাঁর সাংবাদিক জীবন। ১৯২০ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলা সাংবাদিকতায় তিনি যে নির্ভীকতার প্রমাণ দেন, লেখনীতে যে অসাধারণত্ব ফুটে ওঠে তার পরিচয় পাওয়া যায় ‘যুগ-বাণী’ (১৯২২), ‘দুর্দিনের যাত্রী’ (১৯২৬), ‘রুদ্র-মঙ্গল’ (১৯২৭) গ্রন্থগুলিতে। দৈনিক নবযুগে প্রকাশিত নিবন্ধগুলি ‘যুগ-বাণী’ বইতে ছাপা হয়। ধূমকেতুতে যে সকল সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ লেখেন, তারই কিছু নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘দুর্দিনের যাত্রী’। ধূমকেতু ও গণবাণীতে প্রকাশিত লেখার সংকলন ‘রুদ্র-মঙ্গল’। তিনটি বই-ই প্রকাশের পরপর ব্রিটিশদের চোখে বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং ব্রিটিশ রাজসরকার বইগুলির প্রচার ও মুদ্রণ বেআইনি ঘোষণা করে। এই জন্যই কাজী নজরুল বিদ্রোহী, চিরদুর্দম। তাঁর সাহস, নৈতিকতা, দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদা, সাহিত্যবোধ তাঁকে কিংবদন্তিতুল্য সাংবাদিকে পরিণত করেছে। বই বাজেয়াপ্ত হোক, জেলের সাজা হোক। কিন্তু নজরুল মানে ‘আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ’। কখনও আপস করেন না। তাই তো ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’তে তিনি লিখতে পেরেছেন, ‘আমি সত্যপ্রকাশের যন্ত্র। সে যন্ত্রকে অপর কোনও নির্মম শক্তি অবরুদ্ধ করলেও করতে পারে, ধ্বংস করলেও করতে পারে; কিন্তু সে-যন্ত্র যিনি বাজান, সে-বীণায় যিনি রুদ্র-বাণী ফোটান, তাঁকে অবরুদ্ধ করবে কে? সে-বিধাতাকে বিনাশ করবে কে? আমি মরব, কিন্তু আমার বিধাতা অমর। আমি মরব, রাজাও মরবে, কেননা আমার মতন অনেক রাজবিদ্রোহী মরেছে, আবার এমনই অভিযোগ-আনয়নকারী বহু রাজাও মরেছে, কিন্তু কোনও কালে কোনও কারণেই সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হয়নি তার বাণী মরেনি। সে আজও তেমনই করে নিজেকে প্রকাশ করেছে এবং চিরকাল ধরে করবে। আমার এই শাসন-নিরুদ্ধ বাণী আবার অন্যের কণ্ঠে ফুটে উঠবে।’
তথ্যঋণ:
১. নজরুল-রচনাবলী, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, বাংলাদেশ
২. আজহারউদ্দীন খান, বাংলা সাহিত্যে নজরুল, ডি এম লাইব্রেরি, কলকাতা
৩. মুজফফর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা
৪. গোলাম মুরশিদ, বিদ্রোহী রণক্লান্ত: নজরুল-জীবনী, প্রথমা





