
লিখেছেন: নাসীর আহমেদ
সকল কালের সকল দেশের নবী-রসূল আম্বিয়া কেরামরা ছিলেন স্বনামধন্য সাংবাদিক। তাঁরা পরজগতের সংবাদ এপার জগতে আনয়ন করেন। তাঁদের স বার্তা বাহক বলা হয়। যে সমস্ত কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকরা ঐশী বার্তাবাহক জিব্রাইল (আঃ) এর কাজ থেকে সংবাদ প্রাপ্ত নবীর অনুসরণ করেন তাঁরাও সত্য সংবাদ পরিবেশন করে জগতকে ধন্য করেন, তারা ঐশী জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করে জগতকে সমৃদ্ধ করেন। ফেক নিউজ সংগ্রহ করেন সেইসব সাংবাদিকরা যেমন- যোগী, মুনি, ঋষিরা শয়তানের কাছ থেকে ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত কবি সাহিত্যিক ও দার্শনিকরা মানুষকে বাস্তব বর্জিত ভাবের ঘোরে আচ্ছন্ন করে দেয়। আর একদল মানুষকে বাস্তবের নামে বস্তুবাদী নাস্তিক বানিয়ে দিয়ে মানুষকে প্রকৃতিপূজক বানিয়ে দেয়। তাই সত্য সাংবাদিক বিশ্বের গৌরব।
এধরনের এক সাংবাদিক ছিলেন পশ্চিম বঙ্গেরই এক বাঙালী সাংবাদিক মুজিবর রহমান। জাতীর জনক গান্ধীজী তাঁকে বলতেন নাম্বার ওয়ান অনেস্ট ম্যান অফ ইন্ডিয়া। গান্ধীজীকে যিনি গান্ধীজী বানিয়েছিলেন সেই লদ্ধপ্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক ‘কমরেড’ পত্রিকার বণবীর মৌলানা মোহাম্মদ আলী। পরে কমরেড পত্রিকার সম্পাদক হন মৌলোভী মুজিবর রহমান। জনাব মুজিবর রহমান ছিলেন দ্যা মুসলমান নামক ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক। বাংলায় মুসলিম সংবাদপত্রের জনক মৌলানা আকরাম খাঁর অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন মুজিবর রহমান। তাকে মৃত্যুশয্যায় দেখতে আসেন সদলবলে স্বয়ং নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস। তাঁর সম্পর্কে নেতাজী বলেন, “আমার সমগ্র গণসংযোগময় জীবনে কদাচিৎ এরূপ ন্যায়নিষ্ঠ যথার্থ আদর্শিক পরায়ণ মানুষের সংস্পর্শে এসেছি”। তাঁর কীর্তির চেয়ে তিনি অনেক মহৎ ছিলেন। তাঁর পরেও এসেছিলেন আরেক স্বনামধন্য সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ মৌলানা আবুল কালাম আযাদ। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসও ছিলেন। তাঁর গুণগ্রাহী এসব নেতাদের সাথে তিনি জেলও খেটেছেন। সে যুগের প্রায় সব জনকল্যাণমূলক কাজে তিনি জড়িত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে পত্রিকা অফিসে দেখা করতে আসতেন প্রফেসর হুমায়ুন কবীর, সৈয়দ বদরুদ্দোজা, ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি গোলাম মোস্তাফা, সাহিত্যিক আবুল মানসুর প্রমুখ অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী মানুষ।
পূর্বেই বলেছি সেকালের সমস্ত রাজনৈতিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক উদ্যোগের সাথে তিনি বাড়িতে ছিলেন। বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতি, খেলাফত ও কমিটি, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাংলা, বেগম রোকেয়া শিক্ষা সমিতি সবকিছুতেই তিনি ছিলেন। কোথায় ছিলেন না সেটাই বলা মুশকিল। তিনি কিছু মুসলমান চিনতেন না, মানুষ চিনতেন। তাঁর আদর্শের কথা তিনি স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছেন, Not isolation but cooperation with the different sister communities will be our motto in the field of public work অর্থাৎ জনসভার ক্ষেত্রে আমরা বিচ্ছিন্ন না হয়ে সমগোত্রীয় গোষ্ঠী সমূহকে নিয়ে কাজ করব এটাই আমাদের উদ্দেশ্য।
তিনি এপ্রসঙ্গে আরও বলেছেন, Politically and eco-nomically we are Indian first and Mohamed-an after words, spiritually and morally we are mohamedan first and Indian after words অর্থাৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রথমে আমরা ভারতীয় এরপরে মুসলমান আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর এই উদার ও বাস্তব সম্মত মানসিকতার জন্য তিনি All India Journalist Association- এর ও সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলনে স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির পক্ষ অবলম্বন করেন। তিনি মেয়র হওয়ার জন্য অনুরুদ্ধ হয়েও তা প্রত্যাখ্যান করেন সাংবাদিকতার কারণে। তিনি জাত সাংবাদিক ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগণা জেলার বসিরহাটের এই অসামান্য দরবেশ তুল্য মানুষটির কোন স্মৃতিচিহ্ন কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় কি? কাজের সময় কাজ ফুরালেই কাজের মানুষরা পাজী হয়ে যায়। তাঁদের শেষ জীবনও কাটে দুঃখে দৈন্যে। অকৃতদার ছিলেন তিনি। তাঁর গ্রামের নাম ছিল নেহালপুর। তিনি ছিলেন শায়খ পরিবারের সন্তান প্রকৃত শেখ।
পশ্চিমবঙ্গ অনেক বড়বড় সাধকের সাধন কেন্দ্র। এখানেই এসেছিলেন পীর গোরাচাঁদ বা সৈয়দ আব্বাস আলী। তাঁর চল্লিশজন সাগরেদ চল্লিশটি স্থানে ঠায় গেড়েছিলেন। জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবাই তাঁদের ভক্ত ছিলেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রও ছিলেন তাঁর ভক্ত। মধ্যযুগে এসেছিলেন পীর মুজাহিদ মোহাম্মদ গাজী পীর পাঁচালীতে তাঁদের বিবরণ রয়েছে। তাঁরাও এসেছিলেন রানারের মতো নয়া সংবাদ বহন করে। এঁদের নায়েবে নবী বলা হয়। মুজিবর রহমানও ছিলেন এমনই নায়েবে নবী। আমাদের কালের নায়েবে নবীরা এঁদের খবর রাখে না। যারা প্রাক্তনীদের খবর রাখেনা, তাদের খাদেমুল কওমরা তাদের খাদেমদের খবর রাখে না, তাদের বর্তমান হয় না। যাদের বর্তমান নেই, তাদের আবার ভবিষ্যৎ হয় নাকি? তারা সুদূর পারস্য থেকে এদেশে এসেছেন মুসাফির হিসাবে। এদেশের মাটি কিংবা মানুষের পূজা করেননি। তারা মানুষের সেবা করেছেন। এখন ভূমির পূজা হচ্ছে, মানুষের পূজা হচ্ছে, মানুষের সেবা হচ্ছে না, জীবে সেবা হচ্ছে জীব আবার কে? কুকুর, ছাগল, গরু, হংস, পদ্ম এমনকি গোবরে ফোটা পদ্মফুল খাতে বাসও নেই। এদেশে গোলাপ ফুলের কদর নেই কেননা প্রবাদ আছে গোলাপের সুবাস গোবরে পোকার জন্য জহর। পুঁথি সাহিত্যে লেখা আছে গোলাপ সম্পর্কে এই মহাকথাটি, ‘জহর কাতেল হয় গোবরে পোকার’।
(লেখক বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক)





